বুখারী শরীফ সব খণ্ড
بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
অধ্যায় - ৩৪ - পানি সিঞ্চন
( হাদিস নং - ২১৯৭-২২২৬ = মোট ৩০ টি হাদিস)
হাদিস ২১৯৭
সাঈদ ইবনু আবূ মারয়াম (রহঃ) সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট একটি পিয়ালা আনা হল। তিনি তা থেকে পান করলেন। তখন তাঁর ডান দিকে ছিল একজন বয়ঃকনিষ্ঠ বালক আর বয়স্ক লোকেরা ছিলেন তাঁর বাম দিকে। তিনি বললেন, হে বালক! তুমি কি আমাকে অবশিষ্ট (পানি টুকু) বয়স্কদেরকে দেওয়ার অনুমতি দিবে? সে বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার অবশিষ্ট পানির ব্যাপারে আমি কাউকে প্রাধান্য দিব না। এরপর তিনি তা তাকে দিলেন।
হাদিস ২১৯৮
আবূল ইয়ামান (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জন্য একটি বকরীর দুধ দোহন করা হল। তখন তিনি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-এর ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং সেই দুধের সংগে আনাস ইবনু মালিকের বাড়ীর কূপের পানি মিশানো হল। তারপর পাত্রটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দেওয়া হল। তিনি তা থেকে পান করলেন। পাত্রটি তাঁর মুখ থেকে আলাদা করার পর তিনি দেখলেন যে, তাঁর বাঁদিকে আবূ বকর ও ডান দিকে একজন বেদুঈন রয়েছে। পাত্রটি তিনি হয়ত বেদুঈনকে দিয়ে দেবেন এ আশংকায় উমর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ) আপনার পাশেই, তাকে পাত্রটি দিন। তিনি বেদুঈনকে পাত্রটি দিলেন, যে তাঁর ডানপাশে ছিল। তারপর তিনি বললেন, ডানদিকের লোক বেশী হক্দার।
হাদিস ২১৯৯
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঘাস উৎপাদন থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি রুখে রাখা যাবে না।
হাদিস ২২০০
ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতিরিক্ত ঘাসে বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত পানি রুখে রাখবে না।
হাদিস ২২০১
মাহমূদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খনি ও কূপে কাজ করা অবস্থায় অথবা জন্তু- জানোয়ারের আঘাতে মারা গেলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না এবং বিকাযে (খনিজ দ্রব্যে) পঞ্চমাংশ দিতে হবে।
হাদিস ২২০২
আবদান (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি কোন মুসলমানদের অর্থ সম্পদ (যা তার জিম্মায় আছে) আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা কসম খায়, সে আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে, আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট থাকবেন। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেনঃ যারা আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি এ নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে--- এর শেষ পর্যন্ত (৩:৭৭)। এরপর আশআস (রাঃ) এসে বলেন, আবূ আবদুর রাহমান (রাঃ) তোমার নিকট কি হাদীস বর্ণনা করছিলেন? এ আয়াতটি তো আমার সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আমার চাচাতো ভাইয়ের জায়গায় আমার একটি কূপ ছিল। (এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে বিবাদ হওয়ায়) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তোমার সাক্ষী পেশ কর। আমি বললাম, আমার স্বাক্ষী নেই। তিনি বললেন তাহলে তাকে কসম খেতে হবে। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , সে তো কসম করবে। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীস বর্ণনা করেন এবং আল্লাহ তা’আলা তাকে সত্যায়িত করে এই আয়াতটি নাযিল করেন।
হাদিস ২২০৩
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোকের প্রতি আল্লাহ তা’আলা দৃষ্টিপাত করবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এক ব্যাক্তি- যার নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আছে, অথচ সে মূসা ফিরকে তা দিতে অস্বীকার করে। অন্য একজন ব্যাক্তি, যে ইমামের হাতে একমাত্র দুনিয়ার স্বার্থে বায়আত হয়। যদি ইমাম তাকে কিছু দুনিয়ারী সুযোগ দেন, তা হলে সে খুশী হয়। আর যদি না দেন তবে সে অসন্তুষ্ট হয়। অন্য একজন সে ব্যাক্তি, যে আসরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের পর তার জিনিসপত্র (বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে) তুলে ধরে আর বলে যে, আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া অন্য কোনো মাবূদ নেই, আমার এই দ্রব্যের মূল্য এতো এতো দিতে আগ্রহ করা হয়েছে। (কিন্তু আমি বিক্রি করিনি) এতে এক ব্যাক্তি তাকে বিশ্বাস করে (তা ক্রয় করে নেয়)। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছমূল্যে বিক্রয় করে (৩:৭৭)।
হাদিস ২২০৪
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক আনসারী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে যুবাইর (রাঃ) এর সংগে হাররার নালার পানির ব্যাপাড়ে ঝগড়া করলো, যে পানি দ্বারা খেজুর বাগান সিঞ্চন করত। আনসারী বলল, নালার পানি ছেড়ে দিন, যাতে তা (প্রবাহিত থাকে) কিন্তু যুবাইর (রাঃ) তা দিতে অস্বীকার করেন। তারা দুজনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে এই নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর (রাঃ) কে বললেন, হে যুবাইর! তোমার যমীনে (প্রথমে) সিঞ্চন করে নেও। এরপর তোমার প্রতিবেশীর দিকে পানি ছেড়ে দাও। এতে আনসারী অসন্তুষ্ট হয়ে বলল, সে তো আপনার কুফাত ভাই। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারায় অসন্তুষ্টির লক্ষণ প্রকাশ পেল। এরপর তিনি বললেন, হে যুবাইর! তুমি নিজের জমি সিঞ্চন কর। এরপর পানি আটকিয়ে রাখ, যাতে তা বাঁধ পর্যন্ত পেৌছে। যুবাইর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, আমার মনে হয়, এ আয়াতটি এ সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ কিন্তু না, তোমার রবের কসম! তারা মু’মিন হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ বিসম্বাদের বিচার ভার আপসার উপর অর্পণ না করে (৪:৬৫)।
হাদিস ২২০৫
আবদান (রহঃ) উরওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যুবায়র (রাঃ) এক আনসারীর সঙ্গে ঝগড়া করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে যুবায়র! জমিতে পানি সেচের পর তা ছেড়ে দাও। এতে আনসারী বলল, সে তো আপনার কুফাত ভাই। একথা শুনে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে যুবায়র! পানি বাঁধে পৌঁছা র্পন্ত সেচ দিতে থাক। তারপর বন্ধ করে দাও। যুবায়র (রাঃ) বলেন, আমার ধারণা এ আয়াতটি এ সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ তোমার রবের কসম, তারা মু’মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার-ভার আপনার উপর অর্পণ না করে (৪:৬৫)।
হাদিস ২২০৬
মুহাম্মদ (রহঃ) উরওয়া ইবনু যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন আনসারী হাররার নালার পানি নিয়ে যুবাইরের সাথে ঝগড়া করল, যে পানি দিয়ে তিনি খেজুর বাগান সেচ দিতেন। এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে যুবাইর, সেচ দিতে থাক। তারপর নিয়ম-নীতি অনুযায়ী তিনি তাকে নির্দেশ দিলেন, তারপর তা তোমার প্রতিবেশীর জন্য ছেড়ে দাও। এতে আনসারী বলল, সে আপনার ফুফাত ভাই তাই। একথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন, সেচ দাও, পানি ক্ষেতের বাঁধ পর্যন্ত পৌঁছে গেলে বন্ধ করে দাও। যুবাইরকে তিনি তার পুরা হক দিলেন। যুবাইর (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, এ আয়াত এ সম্পর্কে নাযিল হয়ঃ তোমার প্রতিপালকের কসম, তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার-ভার আপনার উপর অর্পণ না করে। বর্ণনাকারী বলেন, ইবনু শিহাবের বর্ণনা হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ কথা পানি নেয়ার পর বাঁধ অবধি পৌঁছা পর্যন্ত তা বন্ধ রাখ। আনসার এবং অন্যান্য লোকেরা এর পরিমাণ করে দেখেছেন যে, তা টাখনু পর্যন্ত পৌঁছে।
হাদিস ২২০৭
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রাঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন লোক রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে তার ভীষন পিপাসা লাগলো। সে কূপে নেমে পানি পান করল। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেল যে, একটা কুকুর হাপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চাটছে। সে ভাবল, কুকুরটারও আমার মত পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামল এবং নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে সেটি ধরে উপরে উঠে এসে কুকুরটিকে পানি পান করাল। আল্লাহ্ পাক তার আমল কবূল করলেন এবং আল্লাহ তার গোনাহ মাফ করে দেন। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চতুস্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই সাওয়াব রয়েছে।
হাদিস ২২০৮
ইবনু আবূ মারয়াম (রহঃ) আসমা বিন্ত আবূ বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য গ্রহণের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। তারপর বললেন, দোযখ আমার নিকটবর্তী করা হলে আমি বললাম, হে রব, আমিও কি এই দোযখীদের সাথী হবো? এমতাবস্থায় একজন মহিলা আমার নযরে পড়ল। বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা, তিনি বলেছেন, বিড়াল তাকে (মহিলা) খামছাচ্ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ মহিলার কি হল? ফেরেশতারা জবাব দিলেন, সে একটি বিড়াল বেঁধে রেখেছিল, যার কারণে বিড়ালটি ক্ষুধায় মারা যায়।
হাদিস ২২০৯
ইসমাঈল (রাঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন মহিলাকে একটি বিড়ালের কারণে আযাব দেওয়া হয়। সে বিড়ালটি বেঁধে রেখেছিল, অবশেষে বিড়ালটি ক্ষুধায় মারা যায়। এ কারণে মহিলা জাহান্নামে প্রবেশ করলো। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ ভালো জানেন, বাঁধা থাকাকালীন তুমি তাকে না খেতে দিয়েছিলে, না পান করতে দিয়েছিলে এবং না তুমি তাকে ছেড়ে দিয়ে ছিলে, তা হলে সে যমীনের পোকা-মাকড় খেয়ে বেঁচে থাকত।
হাদিস ২২১০
কুতায়বা (রহঃ) সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট একটি পানির পেয়ালা আনা হল। তিনি তা থেকে পান করলেন। তাঁর ডানদিকে একজন বালক ছিলো, সে ছিলো লোকদের মধ্যে সবচাইতে কম বয়স্ক এবং বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেরা তার বাঁদিকে ছিল। তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে বালক! তুমি কি আমাকে জ্যেষ্ঠদের এটি দিতে অনুমতি দিবে? সে বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনার উচ্ছিষ্টের ব্যাপারে নিজের উপর কাউকে প্রাধান্য দিতে চাই না। এরপর তিনি তাকেই সেটি দিলেন।
হাদিস ২২১১
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি নিশ্চয়ই (কিয়ামতের দিন) আমার হাউজ(কাওসার) থেকে কিছু লোকদের এমনভাবে তাড়াব, যেমন অপরিচিত উট হাউজ হতে তাড়ান হয়।
হাদিস ২২১২
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইসমাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মা হাজিরা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপর আল্লাহ রহম করুন। কেননা যদি তিনি যমযমকে স্বভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দিতেন অথবা তিনি বলেছেন, যদি তা হতে অঞ্জলে পানি না নিতেন, তা হলে তা একটি প্রবাহিত ঝরনার পরিণত হত। জুরহাম গোত্র তাঁর নিকট এসে বলল, আপনি কি আমাদেরকে আপনার নিকট অবস্থান করার অনুমতি দিবেন? তিনি (হাজিরা) বললেনঃ হ্যাঁ। তবে পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা বললঃ ঠিক আছে।
হাদিস ২২১৩
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনি শ্রেণীর লোকেরা সাথে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন খতা বলবেন না এবং তাদের প্রতি তাকাবেনও না। (এক) যে ব্যাক্তি কোন মাল সামানের ব্যাপারে মিথ্যা কসম খেয়ে বলে যে, এর দাম এর চেয়ে বেশী বলে ছিলো কিন্তা তা সত্ত্বেও সে তা বিক্রি করেনি। (দুই) যে ব্যাক্তি আসরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর পর একজন মুসলমানের মাল-সম্পত্তি আত্মসাত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা কসম করে। (তিন) যে ব্যাক্তি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি মানুষকে দেয় না। আল্লাহ তা’আলা বলবেন (কিয়ামতের দিন) আজ আমি আমার অনুগ্রহ থেকে তোমাকে বঞ্চিত রাখব। যেরূপ তুমি তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি থেকে বঞ্চিত রেখে ছিলে অথচ তা তোমার হাতের তৈরী নয়। আলী (রহঃ) আর সালিহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি হাদীসের সনদটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন।
হাদিস ২২১৪
“ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) সা’ব ইবনু জাস্সামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ চারণভূমি সংরক্ষিত করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) ছাড়া আর কারো অধিকারে নেই। তিনি বলেনঃ আমাদের নিকট রিওয়ায়াত পৌচেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাকী’র চারণভূমি (নিজের জন্য) সংরক্ষিত করেছিলেন, আর উমর (রাঃ) সারাফ ও রাবাযার চারণভূমি সংরক্ষণ করেছিলেন।
হাদিস ২২১৫
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঘোড়া একজনের জন্য সাওয়াব, একজনের জন্য ঢাল এবং আরেকজনের জন্য পাপ। সাওয়াব হয় তার জন্য, যে আল্লাহর রাস্তায় তা জিহাদের উদ্দেশ্যে বেঁধে রাখে এবং সে ঘোড়ার রশি চারণভূমি বা বাগানে লম্বা করে দেয়। এমতাবস্থায়, সে ঘোড়া চারণ ভূমি বা বাগানের তার রশির দৈর্ঘ্য পরিমাণ যতটুকু চরবে, সে ব্যাক্তির জন্য সে পরিমাণ সওয়াব হবে। যদি তার রশি ছিড়ে যায় এবং সে একটি কিংবা দুটি টিলা অতিক্রম করে, তাহলে আর প্রতিটি পদচিহ্ন ও তার গোবর মালিকের জন্য জন্য সাওয়াবে গণ্য হবে। আর যদি তা কোন নহরের পাশ দিয়ে যায় এবং মালিকের ইচ্ছা ব্যতিরেকে সে তা থেকে পানি পান করে, তাহলে এ জন্য মালিক সাওয়াব পাবে। আর ঢাল স্বরূপ সে লোকের জন্য যে মুখাপেক্ষী ও ভিক্ষা নির্ভরতা থেকে বাঁচার জন্য তাকে বেঁধে রাখে। তারপর এর পিঠে ও গর্দানে আল্লাহর নির্ধারিত হক আদায় করতে ভুল করে না। গুনাহ্র কারণ সে লোকের জন্য, যে তাকে অহংকার ও লোক দেখাবার কিংবা মুসলমানদের প্রতি শত্রুতার উদ্দেশ্যে বেঁধে রাখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমার প্রতি কোন আয়াত নাযিল হয়নি। তবে এ ব্যাপারে একটি পরিপূর্ণ ও অনন্য আয়াত রয়েছে। (তা হল আল্লাহ তা’আলার বাণী) কেউ অনুপরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সে তাও দেখতে পাবে (৯৯:৭-৮)।
হাদিস ২২১৬
ইসমাঈল (রহঃ) যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একজন লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে পড়ে থাকা জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেনঃ থলেটি এবং তার মুখের বন্ধনটি চিনে রাখো। তারপর এক বছর পর্যন্ত তা ঘোষণা করতে থাক। যদি তার মালিক এসে যায় তো ভালো। তা নাহলে সে ব্যাপারে তুমি যা ভাল মনে কর তা করবে। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, হারানো বকরি কি করব? তিনি বললেন, সেটি হয় তোমার, না হয় তোমার ভাইয়ের, না হয় নেকড়ে বাঘের। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, হারানো উট হলে করব? তিনি বললেন, তাতে তোমার প্রয়োজন কি? তার সংগে তার মশ্ক ও খুর রয়েছে। সে জলাশয়ে উপস্থিত হয়ে গাছ-পেলা খাবে, শেষ পর্যন্ত তার মালিক তাকে পেয়ে যাবে।
হাদিস ২২১৭
মুয়াল্লা ইবনু আসা’দ (রহঃ) যুবাইর ইবনু আওয়াম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ রশি নিয়ে লাকড়ীর আটি বেঁধে তা বিক্রি করে, এতে আল্লাহ তা’আলা তার সম্মান রক্ষা করেন, এটা তার জন্য মানুষের কাছে ভিক্ষা করার চাইতে উত্তম! লোকজনের নিকট এমন চাওয়ার চেয়ে, যে চাওয়ায় কিছু পাওয়া যেতে পরে বা নাও পারে।
হাদিস ২২১৮
ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কারো নিকট সাওয়াল করা, যাতে সে তাকে কিছু দিতেও পারে আবার নাও দিতে পারে, এর চেয়ে পিঠে বোঝা বহন করা (তা বিক্রি করা) উত্তম।
হাদিস ২২১৯
ইব্রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আমি মালে গণীমত হিাবে একটি উট লাভ করি। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আরো একটি উট দেন। একদিন আমি উট দুটিকে একজন আনসারীর ঘরের দরজায় বসাই। আমার ইচ্ছা ছিলো এদের উপর ইযখির (এক ধরনের ঘাস) চাপিয়ে তা বিক্রি করতে নিয়ো যাবো। আমার সাথে বণূ কায়নুকার একজন স্বর্ণকার ছিলো। আমি এর (ইয্খির বিক্রি লব্ধ টাকা) দ্বারা ফাতিমা (রাঃ) এর ওলীমা করতে সমর্থ হব। সে ঘরে হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) শরাব পান করছিলেন। আর তাঁর সাথে একজন গায়িকাও ছিল। সে বলল, হে হামযা! তৈরী হও, মোটা উটগুলোর উদ্দেশ্যে। এরপর হামযা (রাঃ) উট দু’টোর দিকে তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাদের কুজ দু’টিও কেটে নিলেন এবং পেট ফেঁড়ে উভয়ের কলিজা বের করে নিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ইবনু শিহাব (রহঃ) জিজ্ঞাসা করি, কুজ কি করা হল? তিনি বলেন, সেটি কেটে নিয়ে গেলেন। ইবনু শিহাব বলেন, আলী বলেছেন, এই দৃশ্য দেখলাম এবং তাআমাকে ঘাবড়িয়ে দিল। এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। তাঁর নিকট তখন যায়দ ইবনু হারিসা (রাঃ) উপস্থিত ছিলেন। আমি তাঁকে খবর বললাম। তিনি বের হলেন এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন যায়দ (রাঃ)। আমিও তাঁর সঙ্গে গেলাম। তিনি হামযা (রাঃ) এর নিকট উপস্থিত হলেন এবং তার প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করলেন। হামযা দৃষ্টি উঁচু করে তাঁদের দিকে তাকালেন। আর বললেন, তোমরা আমার বাপ-দাদার দাস বটে। হামযা (রাঃ) এর এ অবস্থা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনে সরে তাদের নিকট থেকে চলে আসলেন। ঘটনাটি শরাব হারাম হওয়ার আগেকার।
হাদিস ২২২০
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদেরকে বাহরাইনে কিছু জায়গীর দিতে চাইলেন। তারা বলল, আমাদের মুহাজির ভাইদেরও আমাদের মতো জায়গীর না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের জন্য জায়গীর দিবেন না। তিনি বলেন, আমার পর শীঘ্রই তোমরা দেখবে, তোমাদের উপর অন্যদেরকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তখন তোমরা সবর করবে, যে পর্যন্ত না তোমরা আমার সঙ্গে মিলিত হও।
হাদিস ২২২১
ইবরাহীম ইবনু মুনযির (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন উটের হক এই যে, পানির কাছে তার দুধ দোহন করা।
হাদিস ২২২২
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে বলতে শুনেছি, যে ব্যাক্তি খেজুর গাছ তা’বীর করার পর বিক্রয় করে, তার ফল বিক্রেতার। কিন্তু ক্রেতা শর্ত করলে তা তারই। আর যদি কেউ গোলাম বিক্রয় করে। এবং তার সম্পদ থাকে তবে সে সম্পদ যে বিক্রি করর তার। কিন্তু যদি ক্রেতা শর্ত করে তাহলে তা হবে তার। মালিক (রহঃ) উমর (রাঃ) থেকে গোলাম বিক্রয়ের ব্যাপারে অনুরূপ বর্ণিত রয়েছে।
হাদিস ২২২৩
মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমান করে শুকনো খেজুরের বিনিময়ে আরায়্যা বিক্রি করার অনুমতি দিয়েছেন।
হাদিস ২২২৪
আবদুল্লাহ ইবনু মহাম্মদ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখাবারা, মুহাকালা ও শুকনো খেজুরের বিনিময়ে গাছের খেজুর বিক্রি করা এবং ফল উপযুক্ত হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। গাছে থাকা অবস্থায় ফল দিনার বা দিরহামের বিনিময়ে ছাড়া যেন বিক্রি করা না হয়। তবে আরায়্যার অনুমতি দিয়েছেন।
হাদিস ২২২৫
ইয়াহ্ইয়া ইবনু কাযাআ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমান করে শুকনো খেজুরের বিনিময়ে পাঁচ ওসাক কিংবা তার চাইতে কম আরায়ার বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন। বর্ণনাকারী দাউদ এ বিষয়ে সন্দেহ করেছেন।
হাদিস ২২২৬
যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) রাফি’ইবনু খাদীজ ও সাহল ইবনু আবূ হাসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁরা উভয়ে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযাবানা অর্থাৎ গাছে ফল থাকা অবস্থায় তা শুকনা ফলের বিনিময়ে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু যারা আরায়্যা করে, তাদের জন্য তিনি এর অনুমতি দিয়েছেন।
No comments:
Post a Comment