Showing posts with label ইসলামিক জীবন. Show all posts
Showing posts with label ইসলামিক জীবন. Show all posts

Friday, August 23, 2019

পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়া তিন যুবক :-

পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়া তিন যুবক

একবার তিনজন লোক পথ চলছিল, এমন সময় তারা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হ’ল। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় হ’তে এক খন্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত কিছু সৎকাজের কথা চিন্তা করে বের কর, যা আললাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরা করেছ এবং তার মাধ্যমে আললাহর নিকট দো‘আ কর। তাহ’লে হয়ত আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর হ’তে পাথরটি সরিয়ে দিবেন।

তাদের একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ্‌! আমার আববা-আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তান্দের আগে আমার আববা-আম্মাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরী হয় এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে আসতে পারলাম না। এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর আমি তাঁদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে জাগানো আমি পছন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদেরকে পান করানোও সঙ্গত মনে করিনি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ্‌! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি তবে আপনি আমাদের হ’তে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই। তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।

দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদেরকে ভালবাসে,আমি তাকে তার চেয়েও অধিক ভালবাসতাম। একদিন আমি তার কাছে চেয়ে বসলাম (অর্থাৎ খারাপ কাজ করতে চাইলাম)। কিন্তু তা সে অস্বীকার করল যে পর্যন্ত না আমি তার জন্য একশ’ দিনার নিয়ে আসি। পরে চেষ্টা করে আমি তা যোগাড় করলাম (এবং তার কাছে এলাম)। যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম (অর্থাৎ সম্ভোগ করতে তৈরী হলাম) তখন সে বলল, হে আললাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর। অন্যায়ভাবে মোহর (পর্দা) ছিঁড়ে দিয়ো না। (অর্থাৎ আমার সতীত্ব নষ্ট করো না)। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন। তখন পাথরটা কিছুটা সরে গেল।

তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমি এক ‘ফারাক’ চাউলের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। যখন সে তার কাজ শেষ করল আমাকে বলল, আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সে তা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষি কাজ করতে লাগলাম এবং এর দ্বারা অনেক গরু ও তার রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছু দিন পর সে আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর (আমার মজুরী দাও)। আমি বললাম, এই সব গরু ও রাখাল নিয়ে নাও। সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সাথে ঠাট্টা কর না। আমি বললাম, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, ঐগুলো নিয়ে নাও। তখন সে তা নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকীটুকু সরিয়ে দিন। তখন আল্লাহ পাথরটাকে সরিয়ে দিলেন।

(আব্দুললাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/২৩৩৩, ‘চাষাবাদ’ অধ্যায়, অনুচেছদ-১৩; মুসলিম হা/২৭৪৩, মিশকাত হা/৪৯৩৮)।

শিক্ষা :

১. বান্দা সুখে-দুঃখে সর্বদা আল্লাহকে ডাকবে।

২. বিপদাপদের সময় আল্লাহকে ব্যতীত কোন মৃত ব্যক্তি বা অন্য কাউকে ডাকা শিরকে আকবর বা বড় শিরক।

৩. সৎ আমলকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।

৪. পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং স্ত্রী ও সন্তানদের উপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতে হবে।

৫. শ্রমিককে তার ন্যায্য পাওনা প্রদান করতে হবে।

Saturday, May 25, 2019

দ্বীনদরদী ভাই ও বোনের প্রতি লেখকের আরজ :-

দ্বীনদরদী ভাই ও বোনের প্রতি
লেখকের আরজ
দ্বীনী ভাই ও বোন!

একটু ভেবে দেখুন, আল্লাহ তাআলা যদি পেয়ারে হাবীব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবার আমাদের মাঝে প্রেরণ করেন এবং তিনি যদি আমাদের দ্বীন-ঈমানের এমন বেহাল দশা দেখতে পান, পাপ ও পঙ্কিলতার এমন বেপরোয়া জীবন প্রত্যক্ষ করেন, তাহলে তাঁর পবিত্র অন্তরে কেমন চোট লাগবে? তিনি কত বড় আঘাত পাবেন হৃদয়ে? আমাদের দ্বীনী অবস্থা কি ওহুদ ও তায়েফের চেও নবীজীকে অধিক মর্মাহত করবে না? এমতাবস্থায় দ্বীনের সঙ্গে যাদের কিছু সম্পর্ক রয়েছে, দ্বীনের প্রতি যাদের দিলে এখনো রয়েছে কিছু দরদ, কিছু ব্যাথা, তাদের প্রতি নবীজীর আহবান কী হবে, কী হবে ফরমান?

এই অক্ষম বান্দার দৃঢ় বিশ্বাস, তখন নবীজীর অসিয়ত এটাই হবে যে, আমার দিশেহারা উম্মতকে পথের সন্ধান দিতে, তাদের ভেতর ঈমানী রূহ এবং দ্বীনী যিন্দেগী ফিরিয়ে আনতে যা কিছু সম্ভব সবই করো। এর জন্য তোমাদের সবটুকু সামর্থ্য ব্যয় করো।

আমার দ্বীনী ভাই ও বোন!

আপনাদের আত্মা যদি অধম লেখকের এই অনুভবকে সমর্থন করে, তবে এখনই আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন, উম্মতের এছলাহ ও সংশোধনের জন্য আমরা আজীবন চেষ্টা করে যাবো। এটা আমাদের জীবনের বড় মিশন। লেখকের আন্তরিক বিশ্বাস, এই নাজুক সময়ে এটা হবে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি এবং নবীজীর দিলের দুআ লাভের প্রকৃষ্ট উপায়।

বক্ষমাণ কিতাবখানি এই দ্বীনী ফিকির ও তাবলীগের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। আল্লাহ তাআলার ফজলে কিতাবটিতে ইসলামের সারনির্যাস এসেগেছে। কিতাবে মোট বিশটি পাঠ রয়েছে। তাতে কোরআন-হাদীসের এমন বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, একজন সাধারণ মানুষ যদি তা বুঝে বুঝে পড়েন এবং সেগুলির উপর আমল করেন, তাহলে তিনি শুধু আমলদার মুসলমান নন, একজন খাঁটি মুমিন ও কামেল ওলী হয়ে যেতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।

কিতাবখানি লেখা হয়েছে সাধারণ মানুষদের জন্য। তারা নিজেরা পড়বেন, মসজিদে, ঘরেবাইরে কিতাবের বিষয়বস্তু নিয়ে পরস্পরে আলোচনা করবেন। তাহলে তাদের মাঝে ঈমানী জীবন এবং দ্বীনী সঞ্জীবন ফিরে আসবে, আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি এবং নবীজির রূহের দুআ নসীব হবে, ইনশাআল্লাহ। 

যদি সঙ্গতি থাকতো, তাহলে দেশের সকল মুসলমানের ঘরে কিতাবখানি পৌঁছে দিতাম। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যারা ইসলামকে জানতে চান, ইসলামের শিক্ষা অনুধাবন করতে চান তাদের হাতেও তুলে দিতাম। কিন্তু একা লেখকের পক্ষে তা সম্ভব নয়। যে সকল দ্বীনদরদী ভাই ও বোনের হাতে কিতাবখানি পৌঁছবে, তারা আখেরাতের অশেষ সওয়াবের নিয়তে কিতাবের বিষয়বস্তু‘ অন্যের নিকট পৌঁছাতে থাকবেন। সম্ভব হলে সংগ্রহ করে বা ছাপিয়ে বিতরণের চেষ্টা করবেন। আল্লাহ তাআলা সকলকে এই নেক কাজে শরিক হওয়ার তাওফীক দান করুন, আমীন।

মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী


ভূমিকা :-

ভূমিকা
(চতুর্থ সংস্করণ)

الحمد لله، نحمده، ونستعينه، ونستغفره، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمداً عبده ورسوله، صلى الله عليه وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين. أما بعد:
১.কোরআন-সুন্নাহর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে ছয়টি শিরোনামের মাঝে আমরা ইসলামের যাবতীয় বিধিবিধানকে সন্নিবেশিত দেখতে পাই। এক. ঈমান-আকিদা। দুই. ইবাদত-উপাসনা। তিন. মোয়ামালা-লেনদেন। চার. মোয়াশারা ও সহবস্থান-নীতি। পাঁচ. আখলাক ও স্বভাব-চরিত্র। ছয়. আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ও সিয়াসত (সৎ কাজে আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ ও দেশ-পরিচালনা)।

ঈমান-আকিদা কাকে বলে নবীজী এমন প্রশ্নের জবাবে সংক্ষেপে বলেন,

أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, ফেরেশতাদের অস্তিত্ব স্বীকার করা, আল্লাহর প্রেরিত কিতাব ও রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, কেয়ামত সংঘটনে বিশ্বাস করা ও তাকদীরের ভলো-মন্দ মেনে নেওয়া। সহীহ মুসলিম, ৮

ইবাদত-উপাসনা দ্বারা ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে গিয়ে নবীজী বলেন,

أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ، وَلاَ تُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمَ الصَّلاَةَ، وَتُؤَدِّيَ الزَّكَاةَ المَفْرُوضَةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ
এক আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, নামায আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমাজানের রোজা রাখা। সহীহ বোখারী, ৫০

অন্য হাদীসে এসেছে,

بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’-এর সাক্ষ্য দেওয়া, নামায আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, হজ্ব পালন করা, রমাজানের রোজা রাখা। সহীহ বোখারী, ৮

লেনদেন ও মোয়ামালা সাফ রাখার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরে একে অন্যের মাল অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। হাঁ, যদি পরস্পরের সম্মতিক্রমে কোনো লেনদেন হয় তবে ভিন্ন কথা। সূরা নিসা ৪/২৯

হাদীসে এসেছে,

مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي
যে প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়। সহীহ মুসলিম, ১০২

মোয়াশারা, সহঅবস্থানের আদব ও হকসমূহ রক্ষার বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে,

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালো মনে করে অপর ভায়ের জন্যও তা ভালো মনে করবে। সহীহ বোখারী, ১৩

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ
আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, কোনো কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরিক করো না। এবং সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম- অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধীনস্থদের সঙ্গে। সূরা নিসা ৪/৩৬

وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ. قِيلَ: وَمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الَّذِي لاَ يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَايِقَهُ
আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়! বলা হলো, কে সে ইয়া রাসূলাল্লাহ! বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হতে পারে না। সহীহ বোখারী, ৬০১৬

المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
মুসলিম সে, যার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে। সহীহ বোখারী, ১০

আখলাক-চরিত্র ও মন-মানসিকতা ভালো করার বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে,

أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا
মুমিনদের মাঝে তার ঈমান অধিকতর পূর্ণাঙ্গ, যার আখালাক যত ভালো। সুনানে আবু দাউদ, ৪৬৮২

নবীজী বলেন,

إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الْأَخْلَاقِ
আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য প্রেরিত হয়েছি। মুসনাদে আহমদ, ৮৯৫২

চারিত্রিক গুণ হলো ধৈর্য-স্থৈর্য, দয়া-মায়া, ন¤্রতা-ক্ষমাশিলতা, সততা-আমানতদারিতা, শালিনতা-লাজুকতা, দানশিলতা-সাহসিকতা, মেহমানদারি-সদ্ব্যবহার, স্বল্পেতুষ্টি-পরোপকার, আত্মমর্যাদাবোধ ও রুচিশিলতা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার, বড়র প্রতি সম্মান ও ছোটর প্রতি ¯েœহ, ওয়াদা রক্ষা ও নিয়ত খাঁটি করা ইত্যাদি।

আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ও সিয়াসত (সৎ কাজে আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ ও দেশ-পরিচালনা) সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,

كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবসমাজের কল্যাণের জন্য। তোমরা ভালো কাজের আদেশ দেবে আর মন্দ কাজে বাধা দেবে আর আল্লাহর প্রতি রাখবে ঈমান। সূরা আলে ইমরান ৩/১১০

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
আর যারা (অবিশ্বাসগত কারণে) আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার করে না তারা কাফের। সূরা মায়েদা ৫/৪৪

يَادَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ
 

হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীবীতে আমার প্রতিনিধি বানিয়েছি, অতএব তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার করো এবং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। অন্যথায় তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেব।সূরা সাদ ৩৮/২৬

২. আবার ইসলামের পরিচয় এভাবেও দেয়া হয় যে, আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ.
তারা কি (¯্রষ্টা ছাড়া) আপনা আপনিই সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই (নিজেদের) স্রষ্টা? সূরা তূর ৫২/৩৫

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى
মানুষ কি ভেবেছে তাকে (বিনা-বিধানে) অনর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে? সূরা কিয়ামাহ ৭৫/৩৬

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
না কি তোমরা ভেবেছো, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার নিকট প্রত্যানীত করা হবে না? সূরা মুমিনূন, ২৩/১১৫

এ-তিন আয়াত থেকে তিনটি প্রশ্ন সামনে আসে। এক. আমি কোত্থেকে এলাম, কে আমাকে সৃষ্টি করলেন? দুই. কেন আমি এলাম, ¯্রষ্টা কেন আমাকে সৃষ্টি করলেন? তিন. আমি যাবো কোথায়, আমার পরিণতি কী হবে?

মানুষ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বিভিন্ন ধর্ম-দর্শনের কাছে এই তিন প্রশ্নের সমাধান খুঁজে আসছে। কারণ এই প্রশ্নগুলোর সমাধান লাভের উপর মানবজন্মের সার্থকতা নির্ভর করে। কিন্তু কোনো ধর্ম-দর্শনই এর সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে পারেনি। এই তিনটি প্রশ্নের সবচে প্রশান্তিকর, সঠিক ও চূড়ান্ত সমাধান দিয়েছে ইসলাম। বলতে পারেন, এই তিন প্রশ্নের সমাধানের নাম ইসলাম।

৩.একবার নবীজী দ্বীনের পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে,

الدِّينُ النَّصِيحَةُ ثَلَاثًا قُلْنَا: لِمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা। কথাটি নবীজী তিনবার বললেন। আমরা আরজ করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) কার প্রতি কল্যাণ কামনা? নবীজী বললেন, আল্লাহর প্রতি, তাঁর কিতাব ও তাঁর রাসুলের প্রতি, মুসলমানদের শাসক ও মুসলিম জনসাধারণের প্রতি। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৬

এই পরিচয়কে আরও সংক্ষেপে এভাবে বলা হয় যে, দুটি হক আদায়ের নাম ইসলাম আল্লাহর হক ও বান্দার হক।

৪.নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হাবশা দেশের বাদশা আসহামা নাজাশী প্রশ্ন করেছিলেন, তোমাদের কোন সে দ্বীন, যাকে কেন্দ্র করে তোমরা তোমাদের কওমকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছো এবং অন্য কোনো জাতির প্রচলিত ধর্মেও প্রবেশ করতে পারোনি? জাফর ইবনে আবি তালেব তখন দারাজ কণ্ঠে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরলেন এভাবে,

أَيُّهَا الْمَلِكُ، كُنَّا قَوْمًا أَهْلَ جَاهِلِيَّةٍ نَعْبُدُ الْأَصْنَامَ، وَنَأْكُلُ الْمَيْتَةَ، وَنَأْتِي الْفَوَاحِشَ، وَنَقْطَعُ الْأَرْحَامَ، وَنُسِيءُ الْجِوَارَ يَأْكُلُ الْقَوِيُّ مِنَّا الضَّعِيفَ فَكُنَّا عَلَى ذَلِكَ. حَتَّى بَعَثَ اللهُ إِلَيْنَا رَسُولًا مِنَّا نَعْرِفُ نَسَبَهُ وَصِدْقَهُ وَأَمَانَتَهُ وَعَفَافَهُ، فَدَعَانَا: إِلَى اللهِ تَعَالَى لِنُوَحِّدَهُ وَنَعْبُدَهُ وَنَخْلَعَ مَا كُنَّا نَعْبُدُ نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنْ دُونِهِ مِنَ الْحِجَارَةِ وَالْأَوْثَانِ، وَأَمَرَ بِصِدْقِ الْحَدِيثِ، وَأَدَاءِ الْأَمَانَةِ، وَصِلَةِ الرَّحِمِ، وَحُسْنِ الْجِوَارِ، وَالْكَفِّ عَنِ الْمَحَارِمِ وَالدِّمَاءِ. وَنَهَانَا عَنْ: الْفَوَاحِشِ، وَقَوْلِ الزُّورِ، وَأَكْلِمَالِ الْيَتِيمِ، وَقَذْفِ الْمُحْصَنَةِ. وَأَمَرَنَا أَنْ نَعْبُدَ اللهَ وَحْدَهُ لَا نُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا وَأَمَرَنَا بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَالصِّيَامِ ... فَصَدَّقْنَاهُ وَآمَنَّا بِهِ، وَاتَّبَعْنَاهُ عَلَى مَا جَاءَ بِهِ فَعَبَدْنَا اللهَ وَحْدَهُ فَلَمْ نُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا، وَحَرَّمْنَا مَا حَرَّمَ عَلَيْنَا، وَأَحْلَلْنَا مَا أَحَلَّ لَنَا
হে মহান বাদশা! আমরা ছিলাম মূর্খতা ও বর্বরতায় অভ্যস্ত এক জাতি। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মরা-পঁচা খেতাম, অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজ করে বেড়াতাম, রক্তের সম্পর্কও বিনষ্ট করতাম, প্রতিবেশীর ক্ষতি করতাম, আমাদের সবলেরা দুর্বলের গ্রাস কেড়ে খেতো। এসবই ছিলো আমাদের আগের ধর্ম-কর্র্ম। অনন্তর আল্লাহ আমাদের মাঝে একজন রাসূল প্রেরণ করলেন, যার জাত-বংশ আমাদের চেনা, যার সততা ও বিস্বস্ততা সবার জানা, যার চরিত্রের শুদ্ধতা সম্পর্কে আমরা আস্বস্তÍ। তিনি আমাদের ডাকলেন আল্লাহর প্রতি আমরা যেন আল্লাহকে এক মানি, তাঁর উপাসনা করি, আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা আল্লাহকে ছেড়ে যেসব পাথর ও মূর্তির উপাসনা করতাম তা যেন আমরা ছেড়ে দিই। সাথে সাথে তিনি আমাদেরকে সত্যবাদিতার হুকুম করলেন; আমানত ফিরিয়ে দেওয়া, আত্মীয়তা রক্ষা করা এবং প্রতিবেশীর কল্যাণ কামনার আদেশ দিলেন; নিষিদ্ধ কাজ এবং রক্তপাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিলেন। বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনা থেকে নিষেধ করলেন; মিথ্যা বলা, এতিম-অসহায়ের মাল লুটে নেওয়া এবং সতী নারীর উপর অপবাদ দেওয়া থেকে বারণ করলেন। আদেশ করলেন আমরা যেন কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করি। আমাদেরকে নামায, যাকাত ও রোজা আদায়ের হুকুম করলেন।... আমরা তাঁকে সত্যায়ন করলাম, তাঁর প্রতি ঈমান আনলাম, তাঁর আনীত সকল বিষয়ে আমরা তাঁর অনুসরণ করলাম। তাই আমরা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করি না। তিনি আমাদের উপর যা হারাম করেছেন তাকে আমরা হারাম জানি, যা কিছু হালাল করেছেন তাকে আমরা হালাল মানি। মুসনাদে আহমদ, ১৭৪০

রোম-সরাট হিরাক্লিয়াস কুরাইশ সর্দার আবু সুফয়ানের নিকট জানতে চাইলেন, নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের কী আদেশ করে থাকেন? আবু সুফয়ান তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি বললেন,

يَقُولُ: اعْبُدُوا اللَّهَ وَحْدَهُ وَلاَ تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَاتْرُكُوا مَا يَقُولُ آبَاؤُكُمْ، وَيَأْمُرُنَا بِالصَّلاَةِ وَالزَّكَاةِ وَالصِّدْقِ وَالعَفَافِ وَالصِّلَةِ
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলে থাকেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। তোমাদের পিতৃপুরুষেরা এ-বিষয়ে যা বলে তা ছেড়ে দাও। তিনি আমাদেরকে নামায পড়তে, যাকাত দিতে, সত্য বলতে, শ্লীলতা রক্ষা করতে এবং আত্মীয়তা বজায় রাখতে আদেশ করেন। সহীহ বোখারী, ৭

৫.কখনো কখনো তিনটি মৌলিক আকিদা ও তার দাবি সামনে রেখে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ইসলাম হলো তাওহীদ, রেসালত ও আখেরাতে বিশ্বাস করার নাম।

তাওহীদ দ্বারা উদ্দেশ্য এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহই বিশ্বজগতের একমাত্র ¯্রষ্টা, প্রকৃত মালিক ও পরিচালক। কোনো সৃষ্টি তাঁর সমজাতীয় নয়, ফলে তিনি আমাদের নিকট অনুভবযোগ্য হলেও বিমূর্ত। সমগ্র সৃষ্টির অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ অবগত। একমাত্র তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী চিরঞ্জীব। সবাইকে তিনি রিযিক দেন, তাকদীরের ভালো-মন্দ তিনি নির্ধারণ করেন। সুতরাং দোয়া কবুল করার মালিক তিনি, ইবাদতের উপযুক্ত কেবল তিনি, আইন ও বিধান নির্ধারণের সর্বোচ্চ এখতিয়ার একমাত্র তাঁর।

রেসালত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছানোর জন্য যুগে যুগে বিভিন্নজনকে নবী বানিয়েছেন। সেই ধারার সর্বশেষ নবী হলেন আরব-বংশোদ্ভূত হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নবীগণ মানুষ, মানবিক যোগ্যতা ও গুণাবলির মাঝেই তাঁদের বিচরণ। তাঁরা মাসূম ও নিষ্পাপ, আল্লাহর বাণীর ধারক, বাহক ও বাস্তবায়নকারী। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর শব্দে শব্দে যা নাযিল হয়েছে তা হলো আল-কোরআন। এটি নাযিল হওয়ার দিন থেকে যথাযথভাবে সংরক্ষিত। আর তিনি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা অনুযায়ী যা কিছু করেছেন, সমর্থন করেছেন বা বলেছেন তার নাম হাদীস ও সুন্নাহ। মানুষকে এই কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করতে হবে, এর বিরুদ্ধাচরণের এখতিয়ার কারো নেই।

আখেরাতে বিশ্বাস রাখার অর্থ এই যে, দুনিয়ার এ-জীবনের পর আরেকটি অনন্ত জীবন আসবে, একদিন মহাপ্রলয় ঘটে জগতের সব তছনছ হয়ে যাবে। এরপর আল্লাহ তাআলা আবার সকলকে যিন্দা করবেন। তখন জীবনের প্রতিটি কাজ কর্মের হিসাব দিতে হবে। সেখানে কোনো অবিচার বা পক্ষপাত হবে না। যার কাজ-কর্ম শরীয়ত মতো হবে, সে জান্নাত পাবে, আর যার কাজ-কর্ম এর ব্যতিক্রম হবে, সে জাহান্নামে যাবে।

৬.ইসলামের কিছু প্রতীকী আমল এমন, যেগুলো কারো মাঝে পাওয়া গেলে এবং তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ না পাওয়া গেলে বাহ্যিকভাবে তাকে মুসলিম ধরে  নেওয়া হয়। যেমন হাদীসে এসছে,

مَنْ صَلَّى صَلاَتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا، وَأَكَلَ ذَبِيحَتَنَا فَذَلِكَ المُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللَّهِ وَذِمَّةُ رَسُولِهِ، فَلاَ تُخْفِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ
যে আমাদের মতো নামায পড়ে, আমাদের কেবলাকে কেবলা মানে এবং আমাদের জবাই করা পশু ভক্ষণ করে, সে ঐ মুসলমান, যার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মা সাব্যস্ত হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দেয়া নিরাপত্তার জিম্মা লংঘন করো না। সহীহ বোখারী, ৩৯১

অন্য হাদীসে এসছে,

أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ
আমি লোকদের বিরুদ্ধে ঐ পর্যন্ত লড়াই করতে আদিষ্ট, যাবত না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’-এর সাক্ষ্য দেয়, নামায আদায় করে, যাকাত প্রদান করে (বা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হয়ে কর দিতে সম্মত হয়)। সুতরাং যখন তারা এ-কাজগুলো করবে, তখন তারা আমার কাছ থেকে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। হাঁ, যদি ইসলামের অন্য কোনো হকের দাবি এসে পড়ে তবে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর। সহীহ বোখারী, ২৫

এমনকি যে শুধু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, সেও মুসলমান, যাবত না তার থেকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর দাবি বিরোধী কোনো আকিদা-আমল প্রকাশ পায়। হাদীসে এসছে,

أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَمَنْ قَالَهَا فَقَدْ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ وَنَفْسَهُ إِلَّا بِحَقِّهِ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ
আমি লোকদের বিরুদ্ধে ঐ পর্যন্ত লড়াই করতে আদিষ্ট, যাবত না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে, সুতরাং যে এই কালিমা বলবে, (বা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হয়ে কর দিতে সম্মত হবে) সে আমার কাছ থেকে তার জান-মালের নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। হাঁ, যদি ইসলামের অন্য কোনো হকের দাবি এসে পড়ে তবে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর। সহীহ বোখারী, ১৩৯৯

আরও ইরশাদ হয়েছে,

أُقَاتِلُ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَيُؤْمِنُوا بِي، وَبِمَا جِئْتُ بِهِ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ، عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ، وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ
আমি লোকদের বিরুদ্ধে ঐ পর্যন্ত লড়াই করতে আদিষ্ট, যাবত না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দেয়, আর আমার প্রতি এবং আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি তার প্রতি ঈমান আনে (বা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হয়ে কর দিতে সম্মত হয়)। সুতরাং যখন তারা এ-কাজগুলো করবে, তখন আমার কাছ থেকে তারা তাদের জান-মালের নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। হাঁ, যদি ইসলামের অন্য কোনো হকের দাবি এসে পড়ে তবে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর। সহীহ মুসলিম, ২১

আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবো, ইসলাম ও মুসলমানের উল্লিখিত পরিচয়গুলোর মাঝে পরস্পরে কোনো বিরোধ নেই। মূলত ইসলাম ও মুসলিমের পরিচয় দেওয়া অনেক বড় দায়িত্বশিলতার বিষয়। মাওলানা মনযূর নুমানী রহ. একজন প্রথিতযশা আলেম। তিনি নির্ভরযোগ্য আলেমগণের নিকট থেকে ইলমে দ্বীন শিখেছেন। এই কিতাবে তিনি উল্লিখিত পরিচয়গুলোকেই কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একটু তফসিল করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ইসলামের ব্যাপকতা ও সামগ্রিকতাকে বোঝার এবং তদানুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন, আমীন।

বিনীত

আবু সাবের আব্দুল্লাহ

জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা

২৫/৩/১৬ ঈ.


পরিশিষ্ট আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের সহজ তরিকা :-

পরিশিষ্ট
আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের সহজ তরিকা
আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি এবং পরকালের মুক্তির জন্য বক্ষমাণ পুস্তুকের আলোচিত বিশটি পাঠ –ইনশাআল্লাহ- যথেষ্ট। এখানে কয়েক ছত্রে পুরো কিতাবের সারাংশ তুলে ধরা হচ্ছে। যাতে মনে রাখা এবং আমল করা সহজ হয়।

১। ইসলামের প্রথম শিক্ষা এবং আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের প্রথম শর্ত হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বলে ঈমান আনা এবং এর দাবীর উপর অবিচল থাকা।

২। অত্যাবশ্যক পরিমাণ ধর্মীয় বিধিবিধান শিখে নেয়া এবং সেগুলির উপর আমল করা।

৩। ফরজ ইবাদতসমুহ আদায় করা এবং মানুষের হকগুলো আদায় করা।

৪। আদব-কায়দয় ও স্বভাব-চরিত্রে ভালো থাকা।

৫। কখনো গোনাহ হয়ে গেলে তওবা করা এবং কোনো ব্যক্তির সাথে বাড়াবাড়ি হয়েগেলে বদলা দিয়ে কিংবা মাফ চেয়ে মিটমাট করা।

৬। দুনিয়ার সবকিছু থেকে আল্লাহ ও তার রাসুলকে অধিক মুহাব্বত করা।

৭। দ্বীনের দাওয়াত, খেদমত ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার মেহনতের সঙ্গে যুক্ত থাকা।

৮। সমস্ত গোনাহ বিশেষত চুরি, ঘুশখোরি, মিথ্যা, ব্যভিচার, অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য, হিংসা-পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি কবীরা গোনাহসমুহ থেকে বেঁচে থাকা।

৯। তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করা এবং প্রতিদিন কিছু পরিমান যিকির ও তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা। যেমন কালিমায়ে তামজীদ, তাসবীহে ফাতেমী, দরুদ শরীফ ইত্যাদি পাঠ করা। এর বেশি যিকির করতে চাইলে কোনো যোগ্য ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া।

১০। আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ তথা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা। তাদেরকে ভালোবাসা এবং তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা। মূলত যারা আল্লাহর নেক বান্দাদের সোহবত পায়, ধীরে ধীরে তাদের মাঝে দ্বীনের সব আমলই এসে যায়। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে আমল করার তাওফীক দান করুন, আমীন।


২০তম পাঠ তওবা-এস্তেগফার :-

২০তম পাঠ
তওবা-এস্তেগফার
আল্লাহ তাআলা নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব দান করেছেন যেন মানুষ যেন ভালোমন্দ বুঝতে পারে। সওয়াবের কাজ থেকে গোনাহের কাজকে পৃথক করে নিতে পারে। সৎ পথে চলে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি এবং অন্যায় পথ ত্যাগ করে পরকালের মুক্তি অর্জন করেতে পারে। তাই যারা নবী-রাসুলগণ এবং আল্লাহর কিতাবসমুহের উপর ঈমানই রাখে না, তারা তো খোদাদ্র্ােহী। দ্বীন ও ঈমানের সঙ্গে তাদের কোনো সর্ম্পক নেই। সুতরাং যদি তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি পেতে চায়, দুনিয়ার শান্তি এবং আখেরাতের মুক্তি অর্জন করতে চায়, তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলগণ বিশেষত হয়রত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার আনীত শরীয়তের উপর ঈমান আনা তাদের প্রথম কর্তব্য। তা না হলে আল্লাহ পাকের সন্তুটি এবং আখেরাতের মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করা ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ।

মোটকথা, কাফের-মুশরিকদের মুক্তির প্রথম শর্ত হলো কুফর শিরক ত্যাগ করে ঈমান ও তাওহীদকে জীবনের মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা। কিন্তু যারা ঈমান এনেছে, দ্বীন ও শরীয়ত অনুযায়ী চলার অঙ্গীকার করেছে, তারা যদি শয়তানের ধোকায় কিংবা প্রবৃত্তির তাড়নায় গোনাহ করে বসে, তবে তাদের মুক্তির পথ হলো তওবা-এস্তেগফার।

তওবা অর্থ ফিরে আসা। এস্তেগফার অর্থ ক্ষমা চাওয়া। যখন কোনো গোনাহ হয়ে যায়, তখন আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া এবং আগামীতে সে গোনাহ না করার সংকল্প করে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা চাওয়াকে তওবা ও এস্তেগফার বলে।

গোনাহ, তওবা এবং তওবাকারীর অবস্থা বোঝার জন্য একটি উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। কেউ যদি কোনো মামুলি ক্ষোভ-দুঃখের কারণে বিষপান করে বসে আর বিষক্রিয়ার ফলে প্রচ- রকম ব্যথা-বেদনা আরম্ভ হয় এবং নাড়িভুড়ি কাটতে শুরু করে, তখন এই ব্যক্তি যেমন নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং চিকিৎসার জন্য ছটফট করতে থাকে, এমন বোকামি আর কখনো করবে না বলে পণ করে, একজন প্রকৃত তওবাকারীর অবস্থাও বিলকুল এমন হওয়া উচিৎ। অর্থাৎ যদি কখনো গোনাহ হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ তাআলার আযাবের ভয়ে অন্তরে খুবই অনুশোচনা আসবে এবং সামনে যেন এই গোনাহের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে। আর আল্লাহ পাকের নিকট অশ্রু ঝরিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। কোনো বান্দা যদি অনুভবের এই স্তরে উঠতে পারে, তবে আল্লাহ পাক তার জন্য আপন রহমতের দরোজা উম্মুক্ত করে দেন। যে বান্দা এমনভাবে তওবা করে, সে বান্দা গোনাহ থেকে সম্পূর্ণ পাক ও পবিত্র হয়ে যায়। বরং আল্লাহ পাকের নিকট আগের চেও অধিক প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়। এমনকি যুগযুগ সাধনা করে যে স্তরে উন্নীত হওয়া কঠিন, তওবার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের কোনো কোনো বান্দা অতি সহজে সেই স্তরে পৌঁছে যায়। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট খাঁটিভাবে তওবা করো। খুব সম্ভব তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের পাপসমুহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতে স্থান দেবেন, যার পাদদেশে নহরমালা বহমান থাকবে। সূরা তাহরীম ৬৬/৮

অন্য আয়াতে বলেন,

أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
এরপরও কি তারা তওবা-এস্তেগফার করবে না? অথচ আল্লাহ পাক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা মায়েদা ৫/৭৪

এক আয়াতে এসেছে,

وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
যারা আমার আয়তসমুহ বিশ্বাস করে, তারা যখন তোমার কাছে আসে, তখন তাদেরকে বলো, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের প্রতিপালক নিজের উপর রহমতের এই নীতি স্থির করেছেন যে, তোমাদের কেউ যদি অজ্ঞতাবশত কোনো গোনাহ করে ফেলে, অত:পর তওবা করে এবং আত্মসংশোধন করে, তবে তিনি হবেন তার প্রতি অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। সূরা আনআম ৬/৫৪

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ পাকের রহমতের কত বড় শান! তিনি আমাদের জন্য তওবার দরজা খুলে রেখে আমাদের ক্ষমা লাভের বিষয়টি সহজ করে দিয়েছেন। অন্যথায় আমাদের মতো গোন্হগারদের অবস্থা কী দাঁড়াতো! কোথায় আমাদের ঠিকানা হতো?

এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন, আল্লাহ পাক বলেন,

يَا عِبَادِي إِنَّكُمْ تُخْطِئُونَ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا، فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ
হে আমার বান্দা! তোমরা হয়তো দিনরাত গোনাহ করতে পারো, আর আমি পারি ক্ষমা করতে। সুতরাং আমার কাছে ক্ষমা চাও। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিবো। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭৭

অন্য হাদীসে এসেছে,

إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
আল্লাহ পাক প্রতি রাতে রহমত ও মাগফেরাতের হাতছানি দিয়ে ডাকেন, যেন দিনের বেলার গোনাহগারেরা তওবা করতে পারে। তেমনি দিনের বেলা হাতছানি দেন যেন রাতের বেলার গোনাহগারেরা ক্ষমা চাইতে পারে। আর আল্লাহ পাকের রহমতের এই আচরণ অব্যহত থাকবে কেয়ামতের পূর্বে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৫৯

এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন,

إِنَّ عَبْدًا أَصَابَ ذَنْبًا، وَرُبَّمَا قَالَ: أَذْنَبَ ذَنْبًا، فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ ذَنْبًا، وَرُبَّمَا قَالَ: أَصَبْتُ، فَاغْفِرْ، فَقَالَ رَبُّهُ: أَعَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ؟ غَفَرْتُ لِعَبْدِي، ثُمَّ مَكَثَ مَا شَاءَ اللهُ، ثُمَّ أَصَابَ ذَنْبًا، أَوْ: أَذْنَبَ ذَنْبًا، فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ، أَوْ أَصَبْتُ، آخَرَ، فَاغْفِرْهُ؟ فَقَالَ: أَعَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ؟ غَفَرْتُ لِعَبْدِي، ثُمَّ مَكَثَ مَا شَاءَ اللهُ، ثُمَّ أَذْنَبَ ذَنْبًا، وَرُبَّمَا قَالَ: أَصَابَ ذَنْبًا، فَقَالَ: رَبِّ أَصَبْتُ، أَوْ: أَذْنَبْتُ، آخَرَ، فَاغْفِرْهُ لِي، فَقَالَ: أَعَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ؟ غَفَرْتُ لِعَبْدِي ثَلاَثًا، فَلْيَعْمَلْ مَا شَاءَ.
আল্লাহর এক বান্দা কোনো গোনাহ করে ফেললো। অতঃপর আল্লাহ পাকের নিকট কাতর কণ্ঠে বললো, হে আমার মাওলা! ও আমার মালিক! আমার তো গোনাহ হয়ে গেছে, আমাকে তুমি মাফ করে দাও। তখন আল্লাহ পাক বলেন, আমার বান্দা তাহলে জানে, তার একজন রব আছে। তিনি গোনাহের কারণে ধরতে পারেন, মাফও করতে পারেন। আচ্ছা, আমি তাকে মাফ করে দিলাম। এরপর আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা অনুসারে একটা সময় পর্যন্ত সে গোনাহ থেকে বিরত থাকে। তারপর আবার গোনাহ করে বসে এবং কাঁপা কন্ঠে মাফ চায়, হে আল্লাহ! আমি গোনাহ করে ফেলেছি, আমাকে মাফ করে দাও। তখনও আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা জানে, তার কোনো মালিক আছে, তিনি ভুলের জন্য পাকড়াও করতে জানেন, ক্ষমাও কারতে পারেন। আমি আমার বান্দাকে বেকসুর খালাস করে দিলাম! অনন্তর একটি সময় পর্যন্ত সে ব্যক্তি গোনাহ থেকে বিরত থাকে। এরপর আবার কোনো সময় কোনো গোনাহ করে বসে এবং আল্লাহ নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, হে আল্লাহ! আমি তো আবার গোনাহ করে ফেলেছি, আমাকে মাফ করে দাও। এবারও আল্লাহ বলেন, আমার বান্দার দৃঢ় বিশ্বাস যে, তার কোনো প্রভূ আছে, যিনি গোনাহের কারনে শাস্তি দিতে পারেন, ক্ষমাও করতে পারেন। তাহলে ঠিক আছে, আমি তাকে মাফ করে দিলাম, সে যা ইচ্ছা যতটুকু ইচ্ছা করুক। সহীহ বোখারী, হাদীস নং ৭৫০৭

অন্য হাদীসে নবীজী বলেন,

التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لاَ ذَنْبَ لَهُ.
তওবা করার দ্বারা একজন গোনাহগার ঐ ব্যক্তির মতো পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, যে ব্যক্তি কোনো গোনাই করেনি। সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২৫০

স্মর্তব্য: এই হাদীসগুলোতে আল্লাহ পাকের দয়া ও করুণা-গুণের আশাব্যঞ্জক উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এগুলো শুনে আল্লাহ পাকের ক্ষমাশীলতার বাহানা করা এবং গোনাহের বিষয়ে বেপরোয়া হয়ে যাওয়া কিছুতেই কাম্য নয়। মুমিন ব্যক্তি কখনো এমন বেশরম সুবিধাবাদী আচরণ করতে পারে না। এই হাদীসগুলি শোনার পর তো একজন মুমিনের অন্তরে আল্লাহ পাকের মুহাব্বত আরও বেশি উথলে উঠবে। কৃতজ্ঞতায় অন্তরাত্মা স্নাত হয়ে যাবে। দুনিয়াতে কোনো মালিকের দয়াদ্রতার সুযোগ নিয়ে চাকর যদি তার অবাধ্য হয়ে যায়, তবে এই অকৃতজ্ঞ আচরণের কোনো ব্যখ্যা থাকে না। এই চাকর দয়া লাভের অনুপযুক্ত এটা সবাই মানে। তেমনি পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ পাকের যারা নাফরমানি করে, তাদের মতো নিকৃষ্ট ও অকৃতজ্ঞ আর কেউ নেই।

উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসগুলির উদ্দেশ্য হলো, কারো যদি গোনাহ হয়ে যায়, তাহলে সে যেন নিরাশ না হয়, বরং আল্লাহ পাকের নিকট কান্নাকাটি করে তওবা করে। তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে গোনাহ থেকে পাক সাফ করে দেবেন। আল্লাহ পাক অসন্তুষ্ট হওয়ার পরিবর্তে তার প্রতি আগের চেও বেশি সন্তুষ্ট হবেন। হাদীস শরীফে এসেছে,

لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ، مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ، فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ، فَأَيِسَ مِنْهَا، فَأَتَى شَجَرَةً، فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا، قَدْ أَيِسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ، فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا، قَائِمَةً عِنْدَهُ، فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا، ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ: اللهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ، أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ
গোনাহ হয়ে যাওয়ার পর বান্দা যখন আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং খাঁটি দিলে তওবা করে, তখন আল্লাহ তার তওবার কারণে ঐ ব্যক্তির চেও বেশি খুশি হন, যে সাহারা মরুভূমির মধ্যখানে একমাত্র সওয়ারি উটটি হারিয়ে ফেলেছে। আর সেই সওয়ারির উপরই ছিলো তার খাদ্যপানীয়। এখন সে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহ বৃক্ষতলে এলিয়ে দিয়েছে, হতাশ হয়ে মূত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। হঠাৎ দেখে উটটি তার সামনে! অমনি লোকটি লাফিয়ে উঠে উটের লাগাম ধরে আর আনন্দের আতিশয্যে মুখে ফসকে বলে ফেলে, আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার মালিক। নবীজী বলেন এই ব্যক্তি অলৌকিকভাবে তার সওয়ারিটি পেয়ে যত খুশি হয়েছে, একজন গোনাহগার বান্দা তওবা করলে আল্লাহ পাক তার চেও বেশি খুশি হন। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৪৭

এই হাদীস ও আয়াতসমুহ জানার পরও যারা গোনাহ থেকে তওবা করে আল্লাহ পাকের রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনে ব্রতী হয় না, তাদের মতো দুর্ভাগা এবং পোড়া কপালে আর কে আছে!

অনেকে এই ধারণায় তওবা করতে বিলম্ভ করে যে, ‘এখানো তো সুস্থ-সবল আছি, মরণের আরও অনেক বাকি।’ ভাই আমার! এটা শয়তানের নিছক ধোকা, সে নিজে আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে চিরতরে বিতাড়িত হয়েছে। এখন আমাদেরকেও তার সহগামী বানানোর অপচেষ্টায় আছে। মৃত্যু কবে আসবে তা কি আমরা জানি? আজকের দিনটিও তো আমার জীবনের শেষ দিন হতে পারে! তাহলে কিসের ভরসায় আমি তওবা করতে বিলম্ব করছি? সুতরাং গোনাহ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ তওবা করে নেয়াই বুদ্বিমানের কাজ। আল্লাহ পাক বলেন,

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا. وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
আল্লাহ পাক শুধু ঐ সমস্ত লোকের তওবা কবুল করার দায়িত্ব নিয়েছেন, যারা অজ্ঞতাবশত কোনো গোনাহ করে ফেললে জলদি জলদি তওবা করে নেয়। সুতরাং এমন লোকদেরকে আল্লাহ পাক ক্ষমা করে দেন। আল্লাহপাক সর্ববিষয়ে জ্ঞাত এবং প্রজ্ঞাবান। কিন্তু ঐ সকল লোকের জন্য তওবা কবুলের ওয়াদা নেই, যারা অন্যায় করতেই থাকে, এমনকি যখন তাদের কারো নিকট মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়ে যায়, তখন সে বলে ওঠে, এখন আমি তওবা করছি। আর যারা কাফের অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে, তাদের জন্যও কোনো ওয়াদা নেই। এদের জন্য আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। সূরা নিসা ৪/১৭-১৮

সুতরাং জীবনের অবশিষ্ট মুহূর্তগুলেকো গনিমত মনে করে অনতিবিলম্বে তওবা করা এবং আত্মসংশোধন করে নেয়া উচিৎ। জানা তো নেই কখন মৃত্যুর ডাক এসে পড়বে।

আমার ভাই ও বোন!

আমি আপনি জীবনে কতজনকে মৃত্যু বরণ করতে দেখছি। আমাদের অভিজ্ঞতা তো বলে, যে যে-অবস্থায় জীবন কাটায়, সে অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। অর্থাৎ সাধারণত এমন হয় না যে, কেউ সারা জীবন গাফলতের ভিতর কাটাবে আর মৃত্যুর দু’একদিন আগে তওবা করে ওলী হয়ে যাবে! সুতরাং নেককার অবস্থায় মৃত্যু চাইলে নেক জীবন গড়ে তোলা উচিৎ এবং সময় থাকতেই তা করা উচিৎ। তাহলেই ভালো অবস্থায় মৃত্যু হওয়া আশা করা যায় এবং আমরা নেককারদের সঙ্গ পাওয়ার আরজু করতে পারি।

যদি কোনো গোনাহ থেকে তওবা করার পর সেই গোনাই আবার হয়ে যায়, তাহলেও আল্লাহ পাকের রহমত থেকে নিরাশ হবার কোনো কারণ নেই। বরং আবার তওবা করবে। এমনকি শতবার যদি একই গোনাহ হয়ে যায়, তবে শতবারই তওবা করবে। আল্লাহ পাক তওবা কবুল করার ওয়াদা করেছেন। তিনি পরম দয়ালু। আর জান্নাত অনেক অনেক বড়, অনেক প্রসস্ত। সুতরাং খাঁটি দিলে তওবা করে যাওয়া আমাদের কাজ। আমরা আদের কাজ করেই যাবো।

তওবা-এস্তেগফারের শব্দ
এক. তওবা এস্তেগফার যে কোনো ভাষায় যে কোনো শব্দে হতে পারে। তবে হাদীস শরীফেও তওবার কিছু দুআ বর্ণিত হয়েছে। সন্দেহ নেই এগুলি অনেক বরকতময় এবং আল্লাহ পাকের নিকট প্রিয়। এগুলো শিখে নেয়া উচিৎ। যেমন-

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيَّ الْقَيُّومَ، وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি ঐ আল্লাহর কাছে যিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, স্বপ্রতিষ্ঠ বিশ্বনিয়ন্তা। আমি তার দিকে ফিরে আসছি। হাদীসে এসেছে,

যে ব্যক্তি এই কালিমা দ্বারা আল্লাহ পাকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দেবেন। যদিও সে জিহাদের ময়দান থেকে পালানোর মতো গোনাহ করে থাকে, যা আল্লাহ পাকের নিকট খুবই মারাত্মক গোনাহ হিসাবে চিহ্নিত। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫১৯

অন্য হাদীসে এসেছে,

যে ব্যক্তি শোয়ার সময় এই কালিমা দ্বারা তিনবার তওবা-এস্তেগফার করে, আল্লাহ পাক তার ছোট বড় সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন, যদিও তার গোনাহ সমুদ্রের ফেনার সমান হয়, সমস্ত বৃক্ষের পত্র-পল্লব সমপরিমাণ হয়, ঘন বালুর মিহি কণার সংখ্যায় হয় কিংবা পৃথিবী বয়সের সমান হয়। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৯৭ (এই হাদীসের সূত্র দুর্বল)

দুই. নবীজী কখনো শুধু ‘আছতাগ ফিরুল্লাহ’ বলে এস্তেগফার করতেন। এটা সংক্ষিপ্ততম এস্তেগফার। চলতে ফিরতে এর মাধ্যমে এস্তেগফার পড়ার অভ্যাস করা যায়।

তিন. হাদীসে এসেছে, নবীজী একটি এস্তেগফারকে ‘সাইয়িদুল এস্তেগফার তথা শ্রেষ্ট এস্তেগফার বলে মন্তব্য করেছেন। সেটি এই,

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
আয় আল্লাহ! তুমি তো আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কাউকে আমি ইবাদতের উপযুক্ত মানি না। আমি তোমারি হাতে বানানো গোলাম। তোমাকে যে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যথাসম্ভব আমি তা পালানের চেষ্টা করছি। আর আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার উপর কৃত তোমার অনুগ্রহের কথা আমি শতমুখে স্বীকার করছি এবং আজ আমার গোনাহগুলি নিয়ে তোমার দরবারে হাজির হয়েছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি ছাড়া গোনাহ মাফ করার কেউ নেই।

হাদীস শরীফে এসেছে,

যে ব্যক্তি এই কালিমাগুলোর অর্থের প্রতি ধ্যান রেখে আন্তরিক বিশ্বাসের সঙ্গে এর মাধ্যমে সকালে একবার এস্তেগফার করবে, রাত আসার আগে দিনে দিনে যদি সে মৃত্যু বরণ করে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে সন্ধায় এই কালিমাগুলির মধ্যমে তওবা করবে, ভোরের আগে ঐ রাতে যদি সে মারা যায়, তবে সে জান্নাতী হবে। সহীহ বোখারী, হাদীস নং ৬৩০৬

উল্লিখিত তিনটি এস্তেগফার সবার মুখস্থ থাকা উচিৎ। হাদীসে এসেছে,

طُوبَى لِمَنْ وَجَدَ فِي صَحِيفَتِهِ اسْتِغْفَارًا كَثِيرًا.
যার আমলনামায় এস্তেগফার বেশি থাকবে তার জন্য সুংবাদ। সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৮১৮

অন্য হাদীসে এসেছে,

مَنِ أكْثَرَ مِنَ الاسْتِغْفَارِ، جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ. إسناده ضعيف
যে ব্যক্তি সবসময় এস্তেগফার করে অর্থাৎ বেশি বেশি আল্লাহ পাকের নিকট মাফ চাইতে থাকে, আল্লাহ তাআলা তার সকল মুশকিল আসান করে দেন, পেরেশানিগুলি দূর করে দেন এবং তাকে এমনভাবে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২২৩৪

সুবহানাআল্লাহ! আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে বেশি বেশি তওবা-এস্তেগফার করার তাওফীক দান করুন, আমীন!


১৯তম পাঠ: দরুদ ও সালাম :-

১৯তম পাঠ:
দরুদ ও সালাম
দরুদ এবং সালামও এক প্রকার দুআ। আল্লাহ পাকের নিকট নবীজীর জন্য আমরা এ দুআ করে থাকি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বস্তুত আমাদের উপর আল্লাহ তাআলার পরে নবীজীর অনুগ্রহ সবচে বড়। তিনি হাজারো বিপদ-মুসিবত অতিক্রম করে আমাদের পর্যন্ত দ্বীন পৌঁছিয়েছেন। যদি তিনি সীমাহীন ত্যাগ ও কোরবানী স্বীকার না করতেন, তাহলে আমাদের নিকট দ্বীন পৌছতো না। আমরা কুফর শিরকের অন্ধকারেই নিমজ্জিত থেকে যেতাম, জাহান্নামের ইন্ধন হয়ে যেতাম।

ঈমান হলো সবচে বড় নেয়ামত। আর আমরা তা পেয়েছি নবীজীর উসিলায়। নবীজীকে এর উপযুক্ত কোনো বদলা আমরা দিতে পারবো না। আমাদের পক্ষে এটুকুই সম্ভব যে, পরম ভক্তি ও ভালোবাসায় অবগাহন করে আমরা বলবো, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। হে আল্লাহ! নবীজীর উপর বিশেষ রহমত ও শান্তি বর্ষণ করো। নবীজীর সম্মান ও মযার্দা বুলন্দ করে দাও। এই ধরনের দুআকে দরুদ ও সালাম বলে। কোরআন শরীফে আল্লাহ পাক বড় সুন্দররূপে ইরশাদ করেন,

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর উপর দরুদ পাঠ করে থাকেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো। সূরা আহযাব ৩৩/৫৬

দেখা যাচ্ছে, খোদ আল্লাহ রব্বুল আলামীন দরুদের মাধ্যমে নবীজীর প্রতি সম্মান ও শফকত প্রদর্শন করছেন। অনুরূপভাবে ফেরেশতারাও নবীজীর শানে দরুদ পাঠে মগ্ন আছেন। সুতরাং তোমরাও নবীজীর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাতে থাকো। দরুদ ও সালাম আল্লাহ পাকের খুবই প্রিয়। আর ফেরেশতারাও দরুদ পাঠে মাতোয়ারা। এর পরও কি কোনো মুসলমান নিয়মিত দরুদ না পড়ে থাকতে পারে?

দরুদ শরীফের ফজীলত
নবীজী এরশাদ কবেন,

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ، وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيئَاتٍ، وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ
যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ পাক তার উপর দশটি রহমত অবতীর্ণ করেন। তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেন। তাকে মর্যদা দশ স্তর বুলন্দ করেদেন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ১২৯৭

এক হাদীসে ইরশাদ করেন,

إِنَّ لِلَّهِ مَلَائِكَةً سَيَّاحِينَ فِي الْأَرْضِ يُبَلِّغُونِي مِنْ أُمَّتِي السَّلَامَ
পৃথিবীতে ভ্রাম্যমাণ কিছু ফেরেশতা রয়েছে। যেখানে যে উম্মত আমার নামে দরুদ ও সালাম পাঠ করে, এই ফেরেশতারা সেখান থেকে আমার নিকট তা নিয়ে আসে। সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ১২৮২

সুবহানাল্লাহ! কত বড় সৌভাগ্য! আমাদের সালাত ও সালাম নবীজীর দরবারে পৌঁছে যায় এবং এই উসিলায় তাঁর দরবারে আমাদের কথা আলোচনা হয়! একটি হাদীসে এসেছে,

أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ القِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلاَةً.
যে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করবে, কেয়ামতের দিন আমার সবচে নিকটে থাকবে সে। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৪৮৪

অন্য হাদীসে এসেছে,

البَخِيلُ الَّذِي مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ
ঐ ব্যক্তি বড় কৃপণ, যার সামনে আমার আলোচনা ওঠে, অথচ সে আমার উপর দরুদ পাঠ করে না। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৬

আরেক হাদীসে এসেছে,

رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ
তার মুখে ছাই পড়ুক, যে আমার নাম আসার পরও আমার জন্য দুআ করে না। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৫

মোটকথা, দরুদ পাঠ করা আমাদের উপর নবীজীর অনেক বড় হক। উপরন্তু এটা আমাদের অনেক বড় সৌভাগ্যের বিয়য় এবং আল্লাহ পাকের রহমত ও বরকত লাভের উসিলা। আল্লাহ পাক সকলকে বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করার তাওফীক দান করুন আমীন।

দরুদ-এর শব্দ
এক সাহাবী নবীজীর নিকট জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আলল্লাহর রাসুল! আমরা কিভাবে দরুদ পাঠ করবো? তখন নবীজী তাকে ‘দরুদে ইবরাহীমী’ শিক্ষা দিলেন, নামাযে এই দরুদখানি আমরা পাঠ করে থাকি। হাদীস শরীফে অনুরূপ আরেকটি দরুদের কথা এসেছে,

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَأَزْوَاجِهِ أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ، وَذُرِّيَّتِهِ وَأَهْلِ بَيْتِهِ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ. هذا إسناد ضعيف
আয় মেরে মাওলা! আমাদের উম্মী নবী, তাঁর স্ত্রীপরিজন ও বংশধরগণের উপর রহমত বর্ষণ করো, যেমন তুমি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের উপর রহমত বর্ষণ করেছো। নিশ্চই তুমি বড় প্রশংসিত এবং সম্মানিত। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৯৮২

যখন আমরা নবীজীর নাম নিবো অথবা অন্যের মুখ থেকে তাঁর নাম শুনবো, তখন গুরুত্বের সাথে, মুহাব্বতের সঙ্গে ‘সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ অথবা ‘আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম’ বলবো।

দরুদ ও সালামের ওজিফা
আল্লাহ ওয়ালারা তো দৈনিক কয়েক হাজারবার দরুদ পাঠ করে থাকেন। সাধারণত এ পরিমাণ হিম্মত আমাদের হয় না। আমরা যদি সকাল-সন্ধ্যা একশবার করে দরুদ পাঠ করি, তবে এটুকুই ইনশাআল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে এবং এর বরকতে নবীজীর কী পরিমাণ স্নেহ-মমতা আমরা লাভ করবো, এ-দুনিয়াতে তা অনুমান করাও সম্ভব নয়। একটি সংক্ষিপ্ত দরুদ নিম্নরূপ,

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَآلِهِ
হে আল্লাহ! নবী মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারের প্রতি আপনি রহম করুন।


১৮তম পাঠ: দুআ ও পার্থনা :-

১৮তম পাঠ:
দুআ ও পার্থনা
এটা সর্বজনস্বীকৃত সত্য যে, এই পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহ পাকের হুকুমে চলছে। ছোটবড় সব কিছু তার কুদরতি কব্জায় রয়েছে। সুতরাং সকল সমস্যায় তাকে ডাকা এবং সকল প্রয়োজনে তার নিকট দুআ করা একান্ত স্বভাবসিদ্ধ বিষয়। এই জন্য সকল ধর্মে প্রার্থনার বিধান রয়েছে। সবাই আপন আপন প্রয়োজনে সৃষ্টিকর্তার নিকট হাত পাতে। আর ইসলামের দুআর বিষয়টি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ পাক বলেন,

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
আর তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো। সূরা গাফির ৪০/৬০

অন্য আয়াতে বলেন,

قُلْ مَا يَعْبَأُ بِكُمْ رَبِّي لَوْلَا دُعَاؤُكُمْ
বলুন, তোমাদের দুআ যদি না থাকতো, তবে আমার রব তোমাদের কোনো পরওয়াই করতেন না। সূরা ফুরকান ২৫/৭৭

এক আয়াতে এসেছে,

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
হে রাসুল! আমার বান্দা আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে, আপনি বলুন, আমি নিকটেই আছি। যখন সে দুআ করে, আমি তার দুআ শুনি এবং কবুল করি। সূরা ২/১৮৬

প্রয়োজনের সময় দুআ করা এবং আল্লাহ পাকের নিকট সাহায্যে চাওয়া একটি ইবাদত, বরং দুআ হলো ইবাদতের সারনির্যাস। কেননা এর মাধ্যমে ‘আবদিয়্যত’ তথা নিজের গোলামি এবং অক্ষমতা প্রকাশ পায়। হাদীস শরীফে এসেছে,

إِنَّ الدُّعَاءَ هُوَ الْعِبَادَةُ. وفي الباب عن أنس عند الترمذي الدُّعَاءُ مُخُّ العِبَادَةِ وهو حسن في الشواهد.
দুআই ইবাদত। অন্য বর্ণনায় এসেছে, দুআ হলো ইবাদতের মগজ। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৮৩৫২

সুবহানাল্লাহ! দুনিয়াতে প্রয়োজন পুরনের জন্য বারবার হাত পাতলে একান্ত আপনজনও বিরক্ত হয়। আর আল্লাহ পাক নাখোশ হন বান্দা তাঁর কাছে না চাইলে, তাঁর নিকট হাত না পাতলে। হাদীস শরীফে এসেছে,

مَنْ فُتِحَ لَهُ مِنْكُمْ بَابُ الدُّعَاءِ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ. أَخْرَجَهُ التِّرْمِذِيُّ بِسَنَدٍ لَيِّنٍ
যার জন্য দুআর দরোজা খুলেগেলো অর্থাৎ যে আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে আন্তরিকভাবে দুআ করার তাওফীক প্রাপ্ত হলো, তার জন্য আল্লাহ পাকের রহমতের দরোজাও খুলে গেলো। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৮

দুআ যেমনিভাবে প্রয়োজন পুরণের উসিলা, তেমনি সেটা উঁচু মানের ইবাদতও বটে। কেননা দুআর দ্বারা আল্লাহ পাক বড় খুশি হন এবং বান্দার জন্য রহমতের দরোজাগুলি খুলে দেন। এখন বান্দা দ্বীনী প্রয়োজনে দুআ করুক আর দুনিয়াবী প্রয়োজনে। তবে নাজায়েয বিষয়ে দুআ করা জায়েয নয়।

এখানে মনে রাখার বিষয় হলো, যে দুআ যতটা দিল থেকে করা হবে এবং যতটা অক্ষমতা ও অসহায়ত্বের সঙ্গে করা হবে, আর যত বেশি আল্লাহ পাকের কুদরত ও রহমতের উপর একীন ও বিশ্বাস নিয়ে করা হবে, সে দুআ আল্লাহ তালার দরবারে তত বেশি কবুল হবে। কিন্তু যে দুআ অন্তর থেকে হবে না, বরং মুখোমুখ প্রথাপালনের জন্য হবে, সেটা আসলে দুআই নয়। হাদীস শরীফে এসেছে,

وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ لاَ يَسْتَجِيبُ دُعَاءً مِنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لاَهٍ.
জেনে রেখো, উদাসীনভাবে, অমনোযোগের সাথে যে দুআ করা হয়, আল্লাহ তাআলা সে দুআ কবুল করেন না। তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৭৯

কিছু পরামর্শ
এক. সকল সময়ে দুআ করা যায়। তবে বিশেষ কিছু সময় দুআ কবুলের সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেমন ফরজ নামাযের পর, শেষ রাতে, ইফতারের সময়, সফররত অবস্থায়, কোনো নেক কাজ করার পর, শুক্রবার আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, আযান ও একামতের মধ্যবর্তী সময়, আরাফার ময়দানে ইত্যাদি।

দুই. আল্লাহ পাক সকলের দুআ শোনেন ও কবুল করেন। অবশ্য যারা মুক্তাকী পরহেযগার, তাদের দুআ কবুল হওয়ায় অধিক সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ওলী-বুযুর্গদের দুআই শুধু কবুল হয়, সাধারণ মানুষের দুআ কখনোই কবুল হয় না। সুতরাং গোনাহগার হলেও দুআ ছেড়ে দেওয়া উচিৎ নয়। আল্লাহ পাক পরম করুণাময় এবং দয়ালু। তিনি গোনাহগারকে যেমন রিযিক দান করেন, তেমনি তার দুআও কবুল করেন। তাছাড়া দুআ তো ভিন্ন একটি ইবাদাতও বটে। তাই দুআ কবুল হোক আর না হোক, সওয়াবটা তো পাবো! তেমনি উদ্দেশ্য হাসিল না হলে কয়েকবার দুআ করেই হাল ছেড়ে দেয়া উচিৎ নয়। আল্লাহ পাক তো আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার অনুসারী নন। কখন কিভাবে দুআ কবুল হওয়ার মাঝে আমাদের কল্যাণ নিহিত, তিনিই তা ভালো জানেন, আমরা জানি না। সুতরাং আমাদের কাজ আমাদের করেই যাওয়া উচিৎ। হাদীস শরীফে এসেছে,

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو، لَيْسَ بِإِثْمٍ وَلَا بِقَطِيعَةِ رَحِمٍ، إِلَّا أَعْطَاهُ إِحْدَى ثَلَاثٍ: إِمَّا أَنْ يُعَجِّلَ لَهُ دَعْوَتَهُ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَإِمَّا أَنْ يَدْفَعَ عَنْهُ مِنَ السُّوءِ مِثْلَهَا
কোনো দুআ কখনো বেকার হয় না। তবে দুআ সফল হওয়ার ছুরত বিভিন্ন হতে পারে। কখনো বান্দা যা চায়, তা তার জন্য কল্যাণকর নয় বলে আল্লাহ পাক তাকে অন্য নেয়ামত দান করেন, বা দুআর বদৌলতে গোনাহ মাফ করে দেন। আল্লাহ তাআলা দুআকে আখেরাতের পুঁজি হিসাবে রেখে দেন। কখনো বা তার উপর থেকে কোনো বালা-মুসীবত টলিয়ে দেন। আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ৭১০

কিন্তু মানুষ তা বুঝতে পারে না বলে কিছু কিছু দুআ ব্যর্থ হয়েছে মনে করে। দুনিয়াতে যার অনেক দুআ কবুল হয়নি, আখেরাতে সেই দুআগুলোর বদলে যখন সে অনেক সওয়াব ও নেয়ামত দেখতে পাবে, তখন আক্ষেপ করবে, হায়! দুনিয়াতে আমার কোনো দুআই যদি কবুল না হতো এবং সবগুলির বদলা যদি এখানে এসে পেতাম, তাহলে কতই না ভালো হতো!

মোটকথা, আল্লাহ পাকের রহমত ও কুদরতের উপর ভরসা করে এবং কবুল হওয়ার বিষয়ে পূর্ণ আস্থা রেখে সকল প্রয়োজনে দুআ করা প্রত্যেক মুমিনের একান্ত কর্তব্য। আর এ-ব্যাপারেও পূর্ণ আস্বস্ত থাকা চাই যে, কোনো দুআই কখনো বেকার যায় না।

যথাসম্ভব দুআ এমন শব্দে করা উচিৎ, যার দ্বারা আল্লাহ পাকের বড়ত্ব এবং নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়। কোরআন ও হাদীসে এ ধরণের বহু দুআ বর্ণিত আছে। এগুলোই সবচে সুন্দর। এমন চল্লিশটি দুআ দুই নং পরিশিষ্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে প্রতিদিন কিছু সময় একান্তে দুআ-মোনাজাতে কাটানোর তাওফীক দান করুন, আমীন।


১৭তম পাঠ: আল্লাহর যিকির :-

১৭তম পাঠ:
আল্লাহর যিকির
ইসলামী শিক্ষার মূলকথা হলো, আল্লাহর বান্দা আল্লাহর হুকুম-মতো জীবন যাপন করবে এবং সকল কাজে আল্লাহ পাকের আনুগত্য করবে। সর্বাবস্থায় বান্দার দিলে যখন আল্লাহ পাকের কথা স্মরণ থাকবে, আল্লাহ পাকের ভয় ও মুহাব্বত যখন তার অন্তরে স্থান করে নেবে, কেবল তখন সকল কাজে আল্লাহ তাআলার হুকুমের সামনে আত্মসমর্পন করা সম্ভব হবে। এই জন্য বেশি বেশি যিকির করা ইসলামের একটি বড় শিক্ষা। যে ব্যক্তি বেশি বেশি তসবি পাঠ করে, তার অন্তরে আল্লাহ পাকের ভয়, মর্যাদা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। এটা পরীক্ষিত সত্য। আপনি যার রূপগুণের ধ্যানে দিনরাত মশগুল থাকবেন, তার মর্যাদা ও ভালোবাসা আপনার অন্তরে অবশ্যই গেঁথে যাবে এবং শনৈ শনৈ তা বৃদ্ধি লাভ করবে। তেমনি যারা সবসময় আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকে, যাদের জিহ্বা আল্লাহ পাকের যিকিরে সতেজ থাকে, তাদের অন্তর আল্লাহর মুহাব্বত ও আজমত এবং বড়ত্ব ও ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে যায়। এশক ও ভালোবাসার চেরাগ তাদের আত্মাকে আলোকিত করে তোলে। মোটকথা, ভালোবাসা ব্যতীত আনুগত্য পূর্ণতা পায় না। সুতরাং আল্লাহ পাকের আনুগত্যশীল বান্দা হতে হলে অন্তরে তাঁর ভালোবাসা পয়দা করতে হবে। আর তা হবে বেশি বেশি যিকির করার দ্বারা। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا. وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
হে মুমিনগণ! তোমরা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর নামে তসবি পাঠ করো। সূরা আহযাব ৩৩/৪১-৪২

অন্য আয়াতে বলেন,

وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করো। তাহলে তোমরা সফলকাম হবে। সূরা জুমুআ ৬২/১০

দুটি জিনিসের পিছনে পড়ে মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায়। আল্লাহ পাক সে-সম্পর্কে মুমিন বান্দাদের সতর্ক করে বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মালদৌলত আর বিবি-বাচ্চারা যেন তোমাদেরকে আল্লাহর যিকির থেকে বেখবর করে না ফেলে। এমনটা যারা করে, আসলেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত। সূরা মুনাফিকূন ৬৩/৯

পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ এবং নিঃসন্দেহে তা আল্লাহ পাকের যিকির, বরং উত্তম প্রকারের যিকির। কিন্তু কোনো মুসলমানের জন্য এটা সঙ্গত নয় যে, সে শুধু নামাযের যিকিরে সীমাবদ্ধ থাকবে, নামাযের বাইরে কোনো যিকির করবে না এবং আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করবে না। বরং ইসলামের নির্দেশ এই যে, তুমি যে অবস্থাতেই থাকো, আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল হয়ো না। আল্লাহ পাক বলেন,

فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلَاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِكُمْ
যখন নামায শেষ হয়ে যাবে, তখন দাড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহর যিকির করতে থাকবে। সূরা নিসা ৪/১০৩

যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে, তাদেরকে যুদ্ধাবস্থায়ও বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করার নিদের্শ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোনো শক্রবাহিনীর মুখোমুখী হও, তখন দৃঢ়পদ থাকো এবং বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করো, তাহলে তোমরা সফল হবে। সূরা আনফাল ৮/৪৫

আয়াতগুলো থেকে বোঝাগেলো, যিকিরের মাঝে মুসলমানদের সফলতার বিরাট দখল রয়েছে এবং যারা আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল তারা ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তেমনি একটি আয়াতে এসেছে,

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
মনে রেখো! আল্লাহর যিকিরের দ্বারাই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। সূরা রাআদ ১৩/২৮

হাদীস শরীফে এসেছে,

أَيُّ العِبَادِ أَفْضَلُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ القِيَامَةِ؟ قَالَ: الذَّاكِرُونَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتُ. إسناده ضعيف
নবীজীর নিকট জানতে চাওয়া হলো, কেয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচে মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত কী হবে? নবীজী বললেন, আল্লাহর যিকির, যিকিরকারী চাই সে পুরুষ হোক বা নারী। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৬

অন্য হাদীসে নবীজী বলেন,

مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُ رَبَّهُ، مَثَلُ الحَيِّ وَالمَيِّتِ
যে আল্লাহকে পাককে স্মরণ করে, আর যে করে না, তাদের দু’জনের উদাহরণ জীবিত আর মৃতের মতো। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪০৭

অর্থাৎ যে আল্লাহ তাআলার যিকির করে না, সে হলো মৃত। একটি হাদীসে নবীজী এরশাদ করেন,

إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ صِقَالَةً، وَإِنَّ صِقَالَةَ الْقُلُوبِ ذِكْرُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَمَا مِنْ شَىْءٍ أَنْجَى مِنْ عَذَابِ اللَّهِ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ. إسناده ضعيف
প্রত্যেক জিনিসের জং দূর করার জন্য রেত থাকে। আত্মার জং দূর করার রেত হলো যিকির। আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার জন্য উসিলা হিসাবে যিকিরের চে প্রভাবশালী কোনো আমল আর নেই। দাওয়াতে কাবীর বায়হাকী, হাদীস নং ১৯

যিকিরের হাকীকত

যিকিরের মূল কথা হলো, বান্দা যেন আল্লাহকে ভুলে না যায়। যে কাজে বা যে অবস্থায় বান্দা থাকুক, সে যেন আল্লাহ পাকের হুকুম বিস্মৃত না হয়। এর জন্য সর্বক্ষণ মুখে আল্লাহ পাকের নাম জপা শর্ত নয়। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, সবসময় যাদের অন্তরে আল্লাহ পাকের কথা স্মরণ থাকে, তাদের জিহ্বাও সর্বক্ষণ আল্লাহ পাকের যিকিরে সচল থাকে। আর এই অবস্থা অর্জন হয় তাদের, যারা বেশি বেশি মুখে যিকির করার মাধ্যমে দিল ও দেমাগে আল্লাহ পাকের ধ্যান ও খেয়ালের একটি বিশেষ আবহ তৈরি করে নেয় এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। তাই অধিক হারে মৌখিক যিকিরও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কেউ কেউ বেশি বেশি মৌখিক যিকির করাকে অনর্থক কাজ মনে করে। আমাদের মতে তাদের ধারণা যথার্থ নয়। যেহেতু হাদীসে পাকে স্পষ্ট এসেছে,

يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ شَرَائِعَ الإِسْلَامِ قَدْ كَثُرَتْ عَلَيَّ، فَأَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ أَتَشَبَّثُ بِهِ، قَالَ: لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ
জনৈক সাহাবী নবীজীর নিকট আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! ইসলামে তো অনেক আমলই আছে। আমাকে আপনি একটি আমলের কথা বলেদিন, যা আমি আজীবন আঁকড়ে থাকবো। নবীজী বললেন, তোমার জিহবা যেন সবসময় আল্লাহর যিকিরে আদ্র থাকে। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৫

অন্য এক হাদীসে এসেছে,

أَنَا مَعَ عَبْدِي إِذَا هُوَ ذَكَرَنِي وَتَحَرَّكَتْ بِي شَفَتَاهُ.
আল্লাহ পাক বলেন, বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে এবং আমার যিকিরে তার ঠোঁট দুটি নড়তে থাকে, তখন আমি তার সঙ্গী হয়ে যাই। সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৭৯২

১. নবীজীর শেখানো বিশেষ কিছু যিকির
এক: হাদীস শরীফে এসেছে,

أَفْضَلُ الذِّكْرِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ
সর্বোত্তম যিকির হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৮৩

অন্য হাদীসে এসেছে,

مَا قَالَ عَبْدٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ قَطُّ مُخْلِصًا، إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، حَتَّى تُفْضِيَ إِلَى العَرْشِ، مَا اجْتَنَبَ الكَبَائِرَ.
যখন কোনো বান্দা পূর্ণ এখলাসের সাথে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে, তখন আসমানের সবগুলি দরজা খুলে যায় এবং এই কালিমা সরাসরি আল্লাহ পাকের আরশে পৌঁছে যায়, যদি সে বান্দা কবিরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৯০

একটি হাদীসে এসেছে, হযরত মুসা আলইহিস সালাম আল্লাহ পাকের নিকট আরজ করলেন,

يَا رَبِّ عَلِّمْنِي شَيْئًا أَذْكُرُكَ بِهِ وَأَدْعُوكَ بِهِ، قَالَ: يَا مُوسَى: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، قَالَ مُوسَى: يَا رَبِّ: كُلُّ عِبَادِكَ يَقُولُ هَذَا، قَالَ: قُلْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، إِنَّمَا أُرِيدُ شَيْئًا تَخُصَّنِي بِهِ، قَالَ: يَا مُوسَى، لَوْ أَنَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعَ وَعَامِرَهُنَّ غَيْرِي، وَالْأَرَضِينَ السَّبْعَ فِي كَفَّةٍ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فِي كَفَّةٍ مَالَتْ بِهِنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ. صححه الحافظ ابن حجر في الفتح
হে আল্লাহ! আমাকে এমন কোনো কালিমা বাতলে দিন, যার দ্বারা আমি আপনার যিকির করতে পারি। উত্তর এলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ দ্বারা আমার যিকির করো। হযরত মুসা বললেন, এই কালিমা দ্বারা তো সবাই যিকির করে! আমি এটা ছাড়া বিশেষ কোনো কালিমা জানতে চাই। ইরশাদ হলো, হে মুসা! যদি সপ্তাকাশ ও তথাকার সমুদয় সৃষ্টি এবং সাত তবক জামিন এক পাল্লায় রাখা হয়, আর অন্য পাল্লায় এই কালিমা রাখা হয়, তবে এই কালিমার পাল্লাই অধিক ভারী হয়ে যাবে। সুনানে কুবরা নাসাঈ, হাদীস নং ১০৬০২

সত্যিই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এমনই ওজনী। কিন্তু লোকেরা একে একটি সাধারণ বাক্য বলে মনে করে। একজন আল্লাহ্র ওলী এক বিশেষ হালতে আমাকে লক্ষ্য করে বলেন,

‘কারো কাছে যদি দুনিয়ার সমস্ত সম্পদও থাকে এবং আমাকে বলে, তুমি দুনিয়ার এই সমস্ত সম্পদ নিয়ে যাও, বিনিময়ে তোমার একবারের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আমাকে দিয়ে দাও, তবে এই ফকির তাতে রাজী হবে না।’

এটা অতিরঞ্জন নয়, সত্য। আল্লাহ্ পাকের কোনো বান্দার ঈমান ও একীন যখন এ-পর্যায়ে উন্নীত হয়, তখন সে বুঝতে পারে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর মূল্য ও মর্যাদা কতো।

দুই: এক হাদীসে নবীজী বলেন,

أَفْضَلُ الكَلاَمِ أَرْبَعٌ: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالحَمْدُ لِلَّهِ، وَلاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
সকল কথার সেরা কথা এবং সকল কালিমার শ্রেষ্ঠ কালিমা হলো চারটি: ‘সুবহানাল্লাহ্’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ‘আল্লাহু আকবার’। সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৮৩৯

অন্য হাদীসে এসেছে,

لأَنْ أَقُولَ سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ.
যতদূর পৃথিবীর উপর সূর্য উদিত হয়, ততদূূর পৃথিবীর চেয়েও আমার কাছে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘ওয়ালহামদুল্লিাহ্’ ‘ওয়াল্লাহু আকবার’ বলা অধিক প্রিয়। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৫

কিছু হাদীসে ‘আলল্লাহু আকবার’ এর পর ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’-ও এসেছে। একে ‘কালিমায়ে তামজীদ’ বলে। কালিমায়ে তামজীদ আল্লাহ পাকের প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনার একটি পূর্ণাঙ্গ ওজিফা। আমাদের এক বুযুর্গ কালিমায়ে তামজীদের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘সুবহানাল্লাহ্’ অর্থ আল্লাহপাক সকল দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে এবং যা কিছু তাঁর শান-উপযোগী নয়, তা থেকে তিনি পূতপবিত্র। ‘আলহামদুলিলল্লাহ্’ অর্থ সমস্ত সৌন্দর্য, যোগ্যতা ও পূর্ণতার অধিকারী তিনি। অতএব সকল প্রশংসা তাঁর। যখন একমাত্র তিনিই সকল গুণাবলীর আধার এবং সকল দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে, তখন ইবাদতের উপযুক্তও কেবল তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আমরা তাঁর অক্ষম বান্দা। আর তিনি মহিয়ান ‘আল্লাহু আকবার’। কখনো আমরা তার ইবাদতের হক আদায় করতে পারবো না, যদি না তিনি সহায় হোন ‘লা হাওলা ওয়া লাকুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’

তিন: একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছে, নবী-কন্যা হযরত ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা নিজ হাতে ঘরের কাজ করতেন। নিজেই পানি আনতেন, চাক্কি ঘুরিয়ে আটা পিষতেন। একবার তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আরজ করলেন, এই কাজগুলো করতে আমার জন্য একটি চাকরানীর ব্যবস্থা করে দিন। তখন নবীজী কন্যা ফাতেমা ও জামাতা আলীকে বললেন,

إِذَا أَوَيْتُمَا إِلَى فِرَاشِكُمَا، أَوْ أَخَذْتُمَا مَضَاجِعَكُمَا، فَكَبِّرَا ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَسَبِّحَا ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَاحْمَدَا ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، فَهَذَا خَيْرٌ لَكُمَا مِنْ خَادِمٍ
আমি তোমাদেরকে এর চেয়েও উত্তম জিনিস শিখিয়ে দিচ্ছি, তোমরা শোয়ার সময় তেত্রিশবার ‘আল্লাহু আকবার’ তেত্রিশবার ‘সুবহানাল্লাহ্’, এবং তেত্রিশবার ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ এবং পড়বে। এটা চাকর-বাকরেরচেও অনেক উত্তম। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৩১৮

একে ‘তাসবীহে ফাতেমী’ বলা হয়।

অন্য হাদীসে এই তাসবিহগুলির ফজীলত সম্পর্কে এসেছে,

مَنْ سَبَّحَ اللهَ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، وَحَمِدَ اللهَ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، وَكَبَّرَ اللهَ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، فَتْلِكَ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ، وَقَالَ: تَمَامَ الْمِائَةِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ غُفِرَتْ خَطَايَاهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ
যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের পর তেত্রিশবার ‘সুবহানাল্লাহ্’, এবং তেত্রিশবার ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ এবং চৌত্রিশবার ‘আল্লাহু আকবার’ পড়বে এবং শেষে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাই ইন কদীর’ পড়বে, আল্লাহ পাক তার সমস্ত (ছগীরা) গোনাহ্ মাফ করে দিবেন, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমান হয় না কেন। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯৭

চার: একটি হাদীসে এসেছে,

مَنْ قَالَ: حِينَ يُصْبِحُ وَحِينَ يُمْسِي: سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، مِائَةَ مَرَّةٍ، لَمْ يَأْتِ أَحَدٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، بِأَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ
যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা একশবার করে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ পড়বে, কেয়ামতের দিন তার চে’ অধিক সওয়াব নিয়ে কেউ উঠতে পারবে না। হ্যাঁ, যে এর সাথে অন্য আমলও করে তার কথা ভিন্ন। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯২

পাঁচ: অন্য একটি হাদীসে এসেছে,

كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي المِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ، سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ العَظِيمِ
দুটি কালিমা উচ্চারণে সহজ, কিন্তু মিযানের পাল্লায় অনেক ভারী এবং দয়াল আল্লাহ নিকট খুবই প্রিয়। ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াবি হামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬৮২

উল্লিখিত যিকিরগুলির দুই একটি যিকিরও যদি কেউ নিয়মিত করতে থাকে, তবে তার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

যিকিরের ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, যিকিরের দ্বারা সওয়াব লাভের বিষয়টি বিশেষ কোনো রীতি-পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল নয়। যিকিরের যে কোনো কালিমা যে কোনো সংখ্যায় কোনো বান্দা এখলাসের সঙ্গে পড়বে, ইনশাআল্লাহ সে পূর্ণ সওয়াব লাভ করবে। তবে পীর-মাশায়েখগণ যে বিশেষ পদ্ধতি ও সংখ্যায় যিকির করার তালীম দেন, তা সেভাবেই করা উচিৎ। কারণ তাদের সামনে সওয়াব ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু উদ্দেশ্য থাকে। যেমন, আল্লাহ পাকের মুহাব্বত বৃদ্ধি পাওয়া, অন্তর নরম হওয়া, চোখে পানি আসা, সবসময় অন্তরে আল্লাহ্র উপস্থিতি অনুভব করা, কলবের রোগ-ব্যাধি দূর হওয়া ইত্যাদি। এই উদ্দেশ্যগুলি সাধনের জন্য হক্কানী পীর ও মাশায়েখগণের শেখানো জায়েয তরীকা অনুসারে যিকির করা আবশ্যক। অন্যথায় এ উদ্দেশ্যগুলি অর্জন করা সহজ নয়। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে, যেমন কেউ শুধু সওয়াবের জন্য সুরা ইয়াসীন তেলওয়াত করছে। তাহলে সে সকাল-সন্ধ্যা একবার একবার তেলওয়াত করবে। ফাঁকে-ফাঁকে আরও কয়েকবার তেলওয়াত করতে পারে। এতেই যথেষ্ঠ হয়ে যাবে। কিন্তু যে সুরা ইয়াসীন মুখস্ত করতে চায়, তাকে সকাল-সন্ধ্যায় বা ফাঁকে-ফাঁকে তেলওয়াত করলে হবে না, বরং বিশেষ প্রক্রিয়ায় একনাগাড়ে বহুবার তেলওয়াত করতে হবে। অন্যথায় সওয়াব পেলেও মুখস্ত হবে না।

ব্যস, সাধারণ যিকির এবং অলী-বুযুর্গদের বিশেষ পদ্ধতির যিকিরের মাঝে এই যা পার্থক্য। এই স্বাভাবিক পার্থক্য না বোঝার কারণে অনেকে বিভ্রান্ত হয়। আল্লাহপাক সকলকে বোঝার তাওফীক দান করুন, আমীন।

কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করা
আজকালের কতিপয় লোকের ধারণা, না বুঝে কোরআন তেলওয়াত করা একটি অর্থহীন কাজ। তারা কোরআন শরীফকে অন্যান্য আইনের বই কিংবা উপদেশমূলক গ্রন্থের মতোই মনে করে। সেগুলি যেমন অর্থ না বুঝে পড়া নিরর্থক, তেমনি কোরআন শরীফও না বুঝে পড়া নিরর্থক! অথচ কোরআন শরীফ অন্যান্য গ্রন্থের মত নয়, বরং তা আল্লাহ পাকের কালাম। কেউ যদি অর্থ না বোঝে, কিন্তু ভক্তি ও ভালবাসা নিয়ে তেলাওয়াত করে, তবে তাতেও অনেক ফায়দা হয়। কেননা তেলাওয়াত ভিন্ন একটি ইবাদত। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, কোরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য হলো হেদায়েত ও নসীহত। আর এই নসীহত ও হেদায়েত বুঝে বুঝে তেলাওয়াত করার দ্বারা অর্জন হয়। সুতরাং বুঝে বুঝে তেলাওয়াত করতে পারা অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। তাই কোরআন শরীফের অর্থ বোঝার চেষ্টা করা একান্ত কর্তব্য।

কোরআন তেলাওয়াত আল্লাহ পাকের উত্তম যিকির। হাদীস শরীফে এসেছে,

وَفَضْلُ كَلاَمِ اللهِ عَلَى سَائِرِ الكَلاَمِ كَفَضْلِ اللهِ عَلَى خَلْقِهِ. قال ابن حجر في الفتح: رجاله ثقات إلا عطية العوفي ففيه ضعف
সমস্ত মাখলুকের উপর আল্লাহ পাকের ফজীলত যেমন, সমস্ত কালামের উপর আল্লাহ তাআলার কালামের ফজীলতও তেমন। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৯২৬

অন্য হাদীসে এসেছে,

مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ.
যে ব্যক্তি কোরআন শরীফের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে দশ নেকী সমান একটি নেকী পাবে। আর আমি এটা বলছি না যে, ‘আলিফ-লাম-মীম’ পুরোটা একটি হরফ। বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ। ‘লাম’ আরেকটি হরফ এবং ‘মীম’ ভিন্ন একটি হরফ। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৯১০

এক হাদীসে তেলাওয়াতের ফজীলত সম্পর্কে এসেছে,

اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ
হে লোক সকল! তোমরা তেলাওয়াত করো, কেয়ামতের দিন তেলাওয়াতকারীদের জন্য কোরআন শরীফ সুপারিশ করবে। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮০৪

কিছু পরামর্শ
এক. বেশি বেশি যিকির করার কারণে যাদের অন্তরে আল্লাহর নাম জারি হয়ে গেছে এবং যিকির যাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে, তাদের জন্য সময় সংখ্যা ঠিক করে যিকির করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য আপন আপন অবস্থা বিবেচনা করে এবং শৃঙ্খলাগত প্রয়োজনে যিকিরের সময় ও সংখ্যা ঠিক করে নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে কোনো আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ করা ভালো। আর কোরআন তেলাওয়াতের জন্যও একটি রুটিন থাকা উচিৎ।

দুই. যথাসম্ভব যিকির করার সময় অর্থের প্রতি লক্ষ্য করা এবং আল্লাহ পাকের বড়ত্ব ও ভালোবাসা অন্তরে জাগরুক রাখা একান্ত কাম্য । এই ধ্যান রাখাও কাম্য যে, আল্লাহ পাক আমার সঙ্গে আছেন। তিনি আমাকে দেখছেন এবং আমার যিকির শুনছেন।

তিন. অযু ছাড়াও যিকির করা যায়। ইনশাআল্লাহ এতে সওয়াব কম হবে না। তবে অযুর সাথে যিকির করলে যিকিরের প্রভাব অধিক ভালো হয় এবং অন্তরে নূর পয়দা হয়।

চার. কালিমায়ে তামজীদ তথা ‘সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্রাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ এই যিকিরটিকে সব যিকিরের সমষ্টি বলা যেতে পারে। প্রায় সকল ওলী-বুযুর্গরা মুরীদদেরকে এই যিকির শিখিয়ে থাকেন। সাথে এস্তেগফার ও দরুদ শরীফ পড়তে বলেন। এস্তেগফার ও দরুদ শরীফ সম্পর্কে উনিশ ও বিশতম পাঠে আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের কলবকে তাঁর এশক ও মুহাব্বতে পূর্ণ করে দিন। আমাদের যবানকে তার যিকিরে সচল করে দিন এবং যিকিরের নূর ও বরকত আমাদের সকলকে নসীব করুন, আমীন।


১৬ তম পাঠ: জান্নাত ও জাহান্নাম :-

১৬ তম পাঠ:
জান্নাত ও জাহান্নাম
পৃথিবীতে ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে যাদের আমলও ভালো ছিলো, হাশরের মাঠে তারা আল্লাহ পাকের আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে। বরযখ ও কেয়ামতের সময়টা তাদের আরামে কাটবে এবং তারা দ্রুত জান্নাতে চলে যাবে। আর গুনাহগার মুমিনরা ক্ষমা প্রাপ্ত না হলে বরযখ ও কেয়ামতের আযাব এবং পাপ অনুপাতে জাহান্নামের শাস্তিও ভোগ করবে। এক সময় ঈমানের বরকতে তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু যারা কুফর ও শিরক অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে, তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।

মোটকথা ঈমান-একীন ও নেক-আমলের পুরস্কার হলো জান্নাত। আর কুফর শিরক ও বদ আমলের বদলা হলো জাহান্নাম। জান্নাতের সুখ-শান্তি আর জাহান্নামের দুঃখ-কষ্টের আলোচনায় কোরআন-হাদীস ভরপুর। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ
তাকওয়াবানদের জন্য তাদের রবের নিকট থাকবে এমন সব জান্নাত, যার তলদেশে নহরমালা প্রবহমান। অনন্তকাল তারা সেখানে অবস্থান করবে। তাদের পূতপবিত্র সহধর্মিনীগণ থাকবে। আর থাকবে আল্লাহ পাকের বিশেষ সন্তুষ্টি। সূরা আলে ইমরান ৩/১৫

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ أَصْحَابَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَاكِهُونَ. هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِئُونَ. لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَا يَدَّعُونَ. سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ
নিশ্চই জান্নাতীরা সেদিন সানন্দে আয়েশী কাজে মশগুল থাকবে। নিবিড় ছায়ায় তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে বসবে। তাদের জন্য থাকবে নানা রকম ফলমূল, আর যা ফরমায়েশ করবে তার সব। দয়াময় আল্লাহর পক্ষ হতে আসবে সশব্দ সালাম। সূরা ইয়সীন ৩৬/৫৫-৫৮

একটি আয়াতে এসেছে,

يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِصِحَافٍ مِنْ ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنْتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
সোনার পেয়ালা ও পান-পাত্র নিয়ে তাদের আশপাশে ঘোরা-ঘুরি হবে। কল্পনার সবকিছু এবং দৃষ্টিনন্দন যা কিছু সবই সেখানে থাকবে তোমার চিরকাল সেখানে অবস্থান করবে। সূরা যুখরুফ ৪৩/৭১

আরেক আয়াতে এসেছে,

مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَارٌ مِنْ مَاءٍ غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارٌ مِنْ لَبَنٍ لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارٌ مِنْ خَمْرٍ لَذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارٌ مِنْ عَسَلٍ مُصَفًّى وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ كَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِي النَّارِ وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَهُمْ
মুত্তাকীদের প্রতিশ্রুত জান্নাত এমন হবে যে, সেখানে থাকবে নহরমালা, যার পানি কখনো নষ্ট হবে না। থাকবে দুধের নদীনালা, যা কখনো বিস্বাদ হবে না। আরও কিছু শরাব-নদী, পানপিয়াসীদের জন্য তা হবে বড় সুপেয়। থাকবে মধুর স্রোতস্বিনী, যা হবে খুবই স্বচ্ছ ও পরিশেধিত। তাদের জন্য আরও থাকবে সর্র্ব রকম ফলফলাদি ও তাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে অশেষ ক্ষমা। এই চিরসুখীদের সাথে চিরদুঃখী জাহান্নামীদের কোনো তুলনা হতে পারে? উত্তপ্ত পানি গেলানোর কারণে যাদের নাড়িভূড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে! সূরা মুহাম্মদ ৪৭/১৫

একটি আয়াতে জান্নাতের এ-বৈশিষ্ট বর্ণিত হয়েছে যে,

لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ
কোনো কষ্ট সেখানে তাদেরকে স্পর্শই করবে না। সূরা হিজর ১৫/৪৮)

অথাৎ জান্নাতে সকল সময় সবকিছুতে শুধু শান্তি আর শান্তি, কোনো ব্যথা-বেদনার অস্তিত্ব সেখানে নেই।

এ-তো গেলো জান্নাতের মনোরম চিত্র। কোরআন শরীফে জাহান্নামের ভয়ংকার চিত্রও অংকিত হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন,

وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ فِي جَهَنَّمَ خَالِدُونَ. تَلْفَحُ وُجُوهَهُمُ النَّارُ وَهُمْ فِيهَا كَالِحُونَ
আর কিছু লোকের নেকীর পাল্লা হালকা হয়ে যাবে। এরা ঐ সকল লোক, যারা বদআমল করে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে, সূতরাং চিরকাল তারা জাহান্নামের আযাব ভোগ করবে। লেলিহান শিখা তাদের চেহারাকে ঝলসে দেবে এবং সেখানে তাদের পুরোটা দেহ বিদঘুটে হয়ে যাবে। সূরা মুমিনূন ২৩/১০৩-১০৪

অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,

إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ وَسَاءَتْ مُرْتَفَقًا
জালেমদের জন্য আমি মহা অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি। যার শিখা চুতুর্দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলবে। যখন পানির জন্য ছাতি ফাটিয়ে চিৎকার করবে, তখন তেলের গাদের মতো এমন গরম পানি তাদের খেতে দেওয়া হবে, যা তাদের মুখগুলি পুড়িয়ে কয়লা করে ফেলবে। হায়, কত নিকৃষ্ট সে পানি, কত নিকৃষ্ট সেই আবাসস্থল। সূরা কাহাফ ১৮/২৯

এক আয়াতে এসেছে,

فَالَّذِينَ كَفَرُوا قُطِّعَتْ لَهُمْ ثِيَابٌ مِنْ نَارٍ يُصَبُّ مِنْ فَوْقِ رُءُوسِهِمُ الْحَمِيمُ. يُصْهَرُ بِهِ مَا فِي بُطُونِهِمْ وَالْجُلُودُ. وَلَهُمْ مَقَامِعُ مِنْ حَدِيدٍ. كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا مِنْ غَمٍّ أُعِيدُوا فِيهَا وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ
কাফেরদের জন্য আগুনের পোশাক তৈরি করা হবে। টগবগে ফুটন্ত পানি তাদের মাথায় ঢেলে দেওয়া হবে। তখন পেটের নাড়ি-ভুড়িসহ শরীরের চামড়াগুলি খসেখসে পড়বে। লোহার বড় বড় মুগুর থাকবে। যন্ত্রণা-কাতর হয়ে যখনই তারা সেখানে থেকে বের হবার চেষ্টা করবে, তখনি জাহান্নামে ফিরিয়ে দেয়া হবে আর বলা হবে, জ্বলন্ত আগুনের স্বাদ চাখতে থাকো। সূরা হজ্ব ২২/১৯-২২

অন্য একটি আয়াতে এসেছে,

إِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُّومِ. طَعَامُ الْأَثِيمِ. كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ. كَغَلْيِ الْحَمِيمِ. خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ. ثُمَّ صُبُّوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ
নিশ্চই যাক্কুম-গাছ বড় পাপীদের খাবার হবে। এই খাবার হবে তেলের তলানির মতো। আর পেটে গিয়ে উথলাতে থাকবে গরম পানির মতো। ফেরেশতাদেরকে বলা হবে, একে পাকড়াও করে জাহান্নামের মধ্যখানে হেঁচড়ে নিয়ে যাও। তারপর এর মাথায় গরম পানির শাস্তি ঢেলে দাও। সূরা দুখান ৪৪/৪৩-৪৮

অন্য আয়াতে এসেছে,

وَيُسْقَى مِنْ مَاءٍ صَدِيدٍ. يَتَجَرَّعُهُ وَلَا يَكَادُ يُسِيغُهُ وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ وَمَا هُوَ بِمَيِّتٍ وَمِنْ وَرَائِهِ عَذَابٌ غَلِيظٌ
পুঁজ-গলা পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। সে পানি তাদের গলা দিয়ে নামতে চাবে না, তবু তারা গিলেগিলে পান করবে। আর সব দিক থেকে মৃত্যুর বিভীষিকা তাদের সামনে আসতে থাকবে। কিন্তু তারা মরবে না, বরং ক্রমেই কঠিনতর আযাব আসতে থাকবে। সূরা ইবরাহীম ১৪/১৬-১৭

একটি আয়াতে এসেছ,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ
যারা আমার হুকুম অমান্য করছে, শীঘ্রই আমি তাদেরকে জাহান্নামের আগুনে পুরবো। যখনি তাদের চামড়া সিদ্ধ হয়ে যাবে, তখনি নতুন চামড়া বদলে দিবো। যাতে নতুন করে শাস্তি ভোগ করতে পারে। সূরা নিসা ৪/৫৬

হাদীস শরীফেও জান্নাত ও জাহান্নামের বহু বিবরণ এসেছে। এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন, আল্লাহ পাক বলেন,

أَعْدَدْتُ لِعِبَادِيَ الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ، وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ
নেককারদের জন্য জান্নাতে আমি এমন সব জিনিস সাজিয়ে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, এবং কারো হৃদয়ে তার কল্পনাও আসেনি। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮২৪

জান্নাতীদের জন্য যত যত সুস্বাদু খাবার, মনোহরী ফুল আর ফল, সুপেয় কোমল পানীয়, দৃষ্টিনন্দন পোশাকআশাক, আলীশান ঘরবাড়ি, সবুজ-শ্যামল বাগবাগিচা এবং সুন্দর সুন্দর প্রিয়তমাসহ আরও যত সুখ-সম্ভোগ আর হাসি-আনন্দের নেয়ামত থাকবে, তার প্রকৃত অবস্থা তো আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। আমরা শুধু বিশ্বাস করি। হাদীসে এসেছে, যখন জান্নাতীরা সকলে জান্নাতে প্রবেশ করে সারবে, তখন আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঘোষণা হবে,

إِنَّ لَكُمْ أَنْ تَصِحُّوا فَلَا تَسْقَمُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَحْيَوْا فَلَا تَمُوتُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَشِبُّوا فَلَا تَهْرَمُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَنْعَمُوا فَلَا تَبْأَسُوا أَبَدًا
এখন থেকে চিরকাল তোমরা সুস্থ থাকো, কোনো অসুখবিসুখ আর হবে না। আজ থেকে তোমরা চিরঞ্জীব হয়েগেলে, মৃত্যু তোমাদের কাছে আসবে না। অদ্য হতে তোমরা চির যুবক, বার্ধক্য তোমাদের পাশে ভিড়বে না। এবার তোমরা চির সুখ আর শান্তিতে বসবাস করতে থাকো, কোনো দুঃখ-কষ্ট কখনো তোমাদের ছুঁবে না। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২/৩৮০

জান্নাতের সবচে বড় নেয়ামত হলো আল্লাহ পাকের দীদার ও দর্শন। হাদীস শরীফে এসেছে,

إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، نُودُوا: يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ، إِنَّ لَكُمْ عِنْدَ اللهِ مَوْعِدًا لَمْ تَرَوْهُ، فَقَالُوا: وَمَا هُوَ أَلَمْ يُبَيِّضْ وُجُوهَنَا، وَيُزَحْزِحْنَا عَنِ النَّارِ، وَيُدْخِلْنَا الْجَنَّةَ؟ قَالَ: فَيُكْشَفُ الْحِجَابُ، قَالَ: فَيَنْظُرُونَ إِلَيْهِ، فَوَاللهِ مَا أَعْطَاهُمُ اللهُ شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنْهُ
জান্নাতীরা যখন জান্নাতে পৌঁছে যাবে, তখন আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ডেকে বলা হবে, আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য আরও এক নেয়ামতের ওয়াদা রয়েছে, তোমরা কি তা চাও না? জান্নাতীরা বলবে, আল্লাহ কি আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেননি, জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে জান্নাত দান করেননি? তাহলে এর বেশি আর কী চাইতে পারি? তখন পর্দা সরিয়ে দেয়া হবে। সকল জান্নাতী আল্লাহ পাককে সরাসরি দেখতে পাবে। জান্নাতীদের নিকট আল্লাহ পাকের দীদারের নেয়ামতই সকল নেয়ামতের চে প্রিয় এবং শ্রেষ্ঠ মনে হবে। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৩৯২৪

আল্লাহ পাক আপন অনুগ্রহে আমাদের সকলকে এই নেয়ামতগুলি দান করুন, আমীন।

এক হাদীসে এসেছে,

يُؤْتَى بِأَنْعَمِ أَهْلِ الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَيُصْبَغُ فِي النَّارِ صَبْغَةً، ثُمَّ يُقَالُ: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ خَيْرًا قَطُّ؟ هَلْ مَرَّ بِكَ نَعِيمٌ قَطُّ؟ فَيَقُولُ: لَا، وَاللهِ يَا رَبِّ وَيُؤْتَى بِأَشَدِّ النَّاسِ بُؤْسًا فِي الدُّنْيَا، مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَيُصْبَغُ صَبْغَةً فِي الْجَنَّةِ، فَيُقَالُ لَهُ: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ بُؤْسًا قَطُّ؟ هَلْ مَرَّ بِكَ شِدَّةٌ قَطُّ؟ فَيَقُولُ: لَا، وَاللهِ يَا رَبِّ مَا مَرَّ بِي بُؤْسٌ قَطُّ، وَلَا رَأَيْتُ شِدَّةً قَطُّ
দুনিয়াতে যে ব্যক্তি সবচে বেশি আরামে ছিলো, সবচে বেশি জাঁকজমকের সাথে যে চলতো, দুর্ভাগ্যবশত এমন এক ব্যক্তি কেয়ামতের দিন জাহান্নামী সাব্যস্ত হবে। তাকে জাহান্নামের আগুনে একটি চুবানি দিয়ে তৎক্ষণাৎ বের করে আনা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি কখনো সুখে ছিলে? সে বলবে, আয় আল্লাহ! তোমার কসম, আমি কখনো সুখের মুখ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাকেই আবার জান্নাতের বারান্দা দিয়ে একটু ঘুরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি কখনো দুঃখ-দুর্দশায় ভুগেছো? সে বলে উঠবে, আয় আমার আল্লাহ! তোমার কসম, জীবনে সামান্য দুঃখ-কষ্টের শিকার কখনো হয়েছি বলে মনে পড়ে না। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৭

বস্তুত জান্নাতে যে বিস্ময়কর আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা আল্লাহ পাক করে রেখেছেন, যত বড় জনমদুঃখীই হোক, যদি সে একটি মুহূর্ত জান্নাত থেকে ঘুরে আসতে পারে, তবে তার সারা জীবনের সমস্ত কষ্টক্লেশ নিমিষেই উড়ে যাবে। আর জাহান্নাম এত কঠিন আযাব-ঘর যে, এর দুর্গন্ধ ও তাপদাহ নাকেমুখে লাগা-মাত্রই একজন চির সুখী মানুষ সারা জনমের সমস্ত সুখের কথা বেমালুম ভুলে যাবে।

একটি হাদীসে এসেছে,

إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا يَوْمَ القِيَامَةِ لَرَجُلٌ تُوضَعُ فِي أَخْمَصِ قَدَمَيْهِ جَمْرَةٌ، يَغْلِي مِنْهَا دِمَاغُهُ
জাহান্নামে সবচে লঘু শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তির অবস্থা এই হবে যে, তার পদতলে পাদুকার মতো অঙ্গার ফিট করে দেয়া হবে। ফলে চুলার উপর পানি যেমন টগবগ করতে থাকে, তেমনি তার মাথার মগজ টগবগ করতে থাকবে। সহীহ বোখারী, হাদীস নং ১৪৪

অন্য হাদীসে এসেছে,

وَلَوْ أَنَّ دَلْوًا مِنْ غَسَّاقٍ يُهَرَاقُ فِي الدُّنْيَا، لَأَنْتَنَ أَهْلُ الدُّنْيَا
জাহান্নামীদেরকে যে দুর্গন্ধযুক্ত গলিত পুঁজ পান করতে দেয়া হবে, তার মাত্র এক বালতি যদি পৃথিবীতে ঢেলে দেয়া হয়, তবে সমগ্র পৃথিবী দুর্গন্ধে ভরে যাবে। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১১৭৮৬

এক হাদীসে দোযখীদের যাক্কুম নামক খাদ্যের বর্ণনায় এসেছে,

وَلَوْ أَنَّ قَطْرَةً مِنَ الزَّقُّومِ قُطِرَتْ، لَأَمَرَّتْ عَلَى أَهْلِ الْأَرْضِ عَيْشَهُمْ، فَكَيْفَ مَنْ لَيْسَ لَهُمْ طَعَامٌ إِلَّا الزَّقُّومُ
যাক্কুম ফলের এক বিন্দু রস যদি দুনিয়াতে টপকে পড়তো, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত খাদ্য তিক্ত-বিনষ্ট হয়ে যেতো। এবার তবে ভেবে দেখো, যাদের খাবারই হবে এই চীজ, তাদের দশা কী হবে? মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৭৩৫

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে এবং সমস্ত ঈমানদারকে জাহান্নামের ছোট-বড় সকল আযাব থেকে রক্ষা করো, আমীন।

আমার প্রিয় ভাই ও বোন!

বরযখ, কেয়ামত ও দোযখ সম্পর্কে কোরআন ও হাদীস থেকে যা কিছু বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। আল্লাহ পাকের কসম! এগুলি হুবহু সত্য। মৃত্যুর পর সবকিছু আপন চোখে দেখতে পাবেন। কোরআন ও হাদীসে এ-বিষয়গুলো এতবার এতভাবে এজন্য আলোচনা করা হয়েছে, যেন আমরা সতর্ক হই, দোযখ থেকে বাঁচি এবং জান্নাত লাভে সচেষ্ট হই। দুনিয়ার এই দিনগুলো আজ না কাল শেষ হয়ে যাবে, সবাইকে মরতে হবে। কেয়ামত একদিন আসবে, হিসাব দিতে হবে। এখনো সময় আছে! আসুন আমরা তওবা করি। আগামী জীবন সঠিক পথে পরিচালনার শপথ নিই এবং জান্নাত লাভের চিন্তা-ফিকির করি। আল্লাহ না করুন, যদি উদাসীনতার ভিতর দিয়ে জীবন ফুরিয়ে যায়, তাহলে জাহান্নাম ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।

হে আল্লাহ! আমরা তোমার কাছে জান্নাত ভিক্ষা চাই। যে সকল কথা ও কাজ আমাদেরকে জান্নাতমুখী করবে, সেগুলি করার তাওফীক চাই। আর তোমার কাছে পানাহ চাই জাহান্নাম থেকে এবং যা কিছু আমাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে তা থেকে।


১৫তম পাঠ: মৃত্যুর পর বরযখ, কেয়ামত ও আখেরাত :-

১৫তম পাঠ:
মৃত্যুর পর বরযখ, কেয়ামত ও আখেরাত
এ কথা সবাই জানে ও মানে, যে ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করেছে তাকে মৃত্যু বরণ করতেই হবে। কিন্তু মৃত্যুর পর কী হবে কেউ তা জানে না। আপনা আপনি জানারও কোনো উপায় নেই। এটা শুধু আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। তিনি নবীদেরকে জানিয়েছেন, আমরা তা নবীদের কাছ থেকে জেনেছি। প্রত্যেক নবী তার জাতিকে জানিয়েছেন এবং প্রমাণ করে বুঝিয়েছেন, মৃত্যুর পরের ঘাটিগুলো কী কী, কোন ঘাটিতে কৃতকর্মের কোন শাস্তি বা পুরস্কার অপেক্ষা করছে সবি তারা উম্মতের সামনে বর্ণনা করেছেন। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু সর্বশেষ নবী, তাই তিনি এ বিষয়গুলো খুবই তফসিলের সাথে বয়ান করেছেন। সবগুলি একত্রিত করলে বিরাট এক কিতাব হয়ে যাবে।

কোরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তার সারাংশ হলো, মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে তিনটি অধ্যায় আসবে ।

এক. বরযখ অধ্যায়:
এর পরিধি মৃত্যুর পর থেকে (কেয়ামত ও) পুনরুত্থান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়। একে কবরের জগত বলা হয়। মৃত্যুর পর মানুষের দেহ দাফন হোক বা পুড়ে ছাই হোক, কিংবা জন্তুর পেটে যাক বা সাগরে ভাসুক সর্বাবস্থায় তার রূহ বা প্রাণ অক্ষয় থাকে। মৃত্যুর পর রূহ চলে যায় বরযখের জগতে। সেখানে ফেরেশতারা তাকে কিছু প্রশ্ন করে। যদি তার ঈমান ও আমলে সালেহ থাকে, তবে ঠিকঠিক উত্তর দিতে পারে। তখন ফেরেশতারা তাকে সুসংবাদ দিয়ে বলে, তুমি কেয়ামত পর্যন্ত আরামে ঘুমাও। কিন্তু সে যদি মুমিন না হয়, অথবা গোনাহগার মুসলমান হয়, তবে তখন থেকে তার উপর আযাব শুরু হয়ে যায় এবং কেয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকে।

দুই. হাশর ও কেয়ামত অধ্যায়:
এর সময়কাল কেয়ামত আরম্ভের পর থেকে বিচারকার্য শেষ হওয়া পর্যন্ত। কঠিন মাত্রায় ভূমিকম্প হলে যেমন সব কিছু চুরমার হয়ে যায়, তেমনি কেয়াতের সময় সমগ্র বিশ্বের সবকিছু ভেঙ্গেচুরে ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে। এই মহাপ্রলয় শেষে দীর্ঘকাল অতিবাহিত হবার পর সকল মানুষের পুনরুত্থান হবে। দুনিয়াতে কে কী আমল করেছে তার হিসাব হবে। হিসাবে যাদের নেক আমল বেশী হবে তারা জান্নাতে যাবার অনুমতি পাবে। আর যাদের বদ আমলের পাল্লা ভারী হবে, তাদেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এরই নাম হাশর ও কেয়ামত, মৃত্যুর পরের দ্বিতীয় অধ্যায়।

তিন. শেষ অধ্যায়:
বিচার শেষে জান্নাত বা জাহান্নামের ফায়সালা হবার পর এ অধ্যায়ের সূচনা হবে এবং অনন্ত কাল চলতে থাকবে। যারা জান্নাতী হবে, তারা এমন সুখ ও সম্ভোগে থাকবে, যা দুনিয়ার কোনো চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি এবং কোনো হৃদয়ে তার কল্পনাও আসেনি। আর যারা দোযখে যাবে, তারা কঠিন থেকে কঠিন আযাব ও শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে জাহান্নাম থেকে হেফাজত করুন।

জান্নাত ও জাহান্নাম মৃত্যুর পরের তৃতীয় এবং শেষ অধ্যায়। এখানে মানুষ স্ব-স্ব আমল অনুসারে অবস্থান করবে। এ সম্পর্কিত কিছু আয়াত ও হাদীস তুলে ধরা হচ্ছে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
প্রত্যেক জীবন মরণের স্বাদ গ্রহণ করবে। অতঃপর তোমরা আমার নিকট প্রত্যানীত হবে। সূরা আনকাবূত ২৯/৫৭

অনুরূপ এক আয়াতে এসেছে,

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর তোমাদের কৃতকর্মের ফল দেয়া হবে কেয়ামত দিবসে। সূরা আলে ইমরান ৩/১৮৫

অন্য আয়াতে এসেছে,

হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের ক্রোধকে ভয় করো। জেনে রাখো, কেয়ামতের প্রকম্পন বড়ই ভয়াবহ বিষয়। যে দিন সেই প্রকম্পন প্রত্যক্ষ্য করবে, সে দিন সকল স্তন্যদায়িনী মা তার দুধের শিশুর কথা ভুলে যাবে। গর্ভবতীদের গর্ভপাত হয়ে যাবে। সকল মানুষকে তোমার মনে হবে নেশাগ্রস্থ মাতাল, অথচ তারা মাতাল বা নেশাগ্রস্থ নয়, আসলে সেদিন আল্লাহর আযাব হবে বড় কঠিন! সূরা ২২/১-২

আরেক আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,

يَاأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ. يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ
স্মরণ করো সেদিনের কথা, যেদিন ভূম-ল ও পর্বতমালা ভীষণভাবে কেঁপে ওঠবে এবং পাহাড়সমুহ ঝুরঝুরে বালুর মতো উড়ে যাবে। সূরা হজ্ব ৭৩/১৪

অন্যত্র বলেন,

فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِنْ كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيبًا
কুফুরি করে সে দিনের আযাব থেকে কিভাবে বাঁচবে, যেদিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধ বানিয়ে ছাড়বে। সূরা ৭৩/১৭

অপর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,

فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَّةُ. يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ. وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ. وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ. لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ. وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُسْفِرَةٌ. ضَاحِكَةٌ مُسْتَبْشِرَةٌ. وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ. تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ
যে দিন গগণবিদারী আওয়াজ উপস্থিত হবে, সেদিন মানুষ আপন ভাই, পিতা-মাতা, স্ত্রী এবং সন্তান থেকেও পালিয়ে বেড়াবে। প্রতেকের এমন কঠিন অবস্থা হবে যে, অন্যের প্রতি লক্ষ্য করার সুযোগই হবে না। সেদিন কিছু চেহারা প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে এবং হাস্যোজ্জ্বল দেখাবে, আর কিছু চেহারা ধূলিমলিন হবে, কালিমায় আচ্ছন্ন হয়ে যাবে। সূরা আবাসা ৮০/৩৩-৪১

কেয়ামতের দিন সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলার সামনে হাজির করা হবে, কেউ কোন কিছু গোপন করতে পারবে না। আল্লাহ পাক বলেন,

يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ
সেদিন এমনভাবে তোমাদেরকে উপস্থাপন করা হবে যে, তোমাদের কোনো গুপ্ত বিষয় আর গুপ্ত থাকবে না। সূরা হাক্কাহ ৬৯/১৮

অন্য আয়াতে বলেন,

الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
আজ আমি তাদের মুখ সিলগালা করে দিবো। তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের অপকর্মের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। সূরা ইয়াসীন ৩৬/৬৫

অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেন,

وَيَوْمَ نُسَيِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَى الْأَرْضَ بَارِزَةً وَحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَدًا. وَعُرِضُوا عَلَى رَبِّكَ صَفًّا لَقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّنْ نَجْعَلَ لَكُمْ مَوْعِدًا. وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَاوَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا
সেদিনের কথা স্মরণ রাখো, যেদিন আমি পাহাড়গুলি টলিয়ে চুর্ণবিচূর্ণ করে মাটিতে মিশিয়ে দিবো। ফলে তুমি পৃথিবীটাকে একদম সমতল অবস্থায় দেখতে পাবে। তখন তাদের সকলকে আমি একত্রিত করবো এবং কাউকে বাদ দিবো না। সকলকে সারিবদ্ধভাবে আপনার পালনকর্তার দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ পাক বলবেন, আমি যেভাবে প্রথমবার তোমাদের সৃষ্টি করেছি, সেভাবে তোমরা আমার কাছে এসেগেছো, অথচ তোমরা বলে বেড়াতে, এই নির্ধারিত সময় আমি কখনো তোমাদের সামনে উপস্থিত করবো না! আর আমলনামা তাদের সামনে রাখা হবে। অপরাধীরা ভয়ে ভয়ে তাতে যা লেখা আছে তা দেখে বলে উঠবে, হায় কপাল! এ কেমন কিতাব! এতো আমাদের ছোট-বড় সব কিছুই হিসাব করে রেখেছে! সুতরাং তারা কৃতকর্মের ভালো-মন্দ সাক্ষাৎ বুঝতে পারবে। আপনার রব তো কারো প্রতি জুলুম করেন না। সূরা কাহাফ ১৮/৪৭-৪৯

মোটকথা, কেয়ামতের সময় হাশরের মাঠে যা যা ঘটবে, কোরআন শরীফে তার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। হাদীস শরীফে এসেছে,

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ كَأَنَّهُ رَأْيُ عَيْنٍ فَلْيَقْرَأْ: إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ، وَإِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ، وَإِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ
যে ব্যক্তি কেয়ামতের দৃশ্য চাক্ষুষ দেখতে চায়, সে যেন কোরআনের তাকবীর, ইনফেতার ও ইনশেকাক এই তিনটি সূরা পাঠ করে। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৩৩

এমনিভাবে হাদীস শরীফেও বরযখ, কেয়ামত ও আখেরাতের লম্বা বিবরণ এসেছে। নবীজী ইরশাদ করেন,

إِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا مَاتَ عُرِضَ عَلَيْهِ مَقْعَدُهُ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ، إِنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَمِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، وَإِنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ فَمِنْ أَهْلِ النَّارِ، يُقَالُ: هَذَا مَقْعَدُكَ، حَتَّى يَبْعَثَكَ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
তোমাদের কেউ যখন মৃত্যু বরণ করে, তখন প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দুবার হিসাব শেষে প্রাপ্ত তার জান্নাত বা জাহান্নামের অবস্থানক্ষেত্র তার সামনে প্রদর্শন করা হয় এবং বলা হয়, কেয়ামতের পর এই ঠিকানায় তুমি অবস্থান করবে। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৩১৩

অন্য হাদীসে এসেছে,

নবীজী একবার ওয়াজের সময় দোযখের কঠিন অবস্থা ও পরীক্ষাসমুহের বিবরণ তুলে ধরলেন। এতে উপস্থিত লোকেরা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। সহীহ বুখারী

আরও অনেক হাদীসে কবর তথা বরযখের জগতের আযাব ও সুয়াল-জয়াবের বিবরণ এসেছে।

কেয়ামত সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে,

ثُمَّ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ، فَلَا يَسْمَعُهُ أَحَدٌ إِلَّا أَصْغَى لِيتًا وَرَفَعَ لِيتًا، قَالَ: وَأَوَّلُ مَنْ يَسْمَعُهُ رَجُلٌ يَلُوطُ حَوْضَ إِبِلِهِ، قَالَ: فَيَصْعَقُ، وَيَصْعَقُ النَّاسُ، ثُمَّ يُرْسِلُ اللهُ أَوْ قَالَ يُنْزِلُ اللهُ - مَطَرًا كَأَنَّهُ الطَّلُّ أَوِ الظِّلُّ فَتَنْبُتُ مِنْهُ أَجْسَادُ النَّاسِ، ثُمَّ يُنْفَخُ فِيهِ أُخْرَى، فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ، ثُمَّ يُقَالُ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ هَلُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ، وَقِفُوهُمْ إِنَّهُمْ مَسْئُولُونَ
আল্লাহ তাআলার হুকুমে কেয়ামতের সময় যখন প্রথমবার শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে, তখন বিকট আওয়াজে সকল মানুষ অজ্ঞান হয়ে মারা যাবে। এরপর দ্বিতীয় ফুঁৎকারে আবার সবাই জীবিত হয়ে উঠবে। বলা হবে, তোমরা আপন প্রতিপালকের দরবারে হাজিরা দিতে চলো। ফেরেশতাদের বলা হবে, এদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করাও। এখানে কৃতকর্মের ব্যাপারে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৪০

একটি হাদীসে এসেছে, জনৈক সাহাবী নবীজীকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ পাক সমস্ত মাখলুককে দ্বিতীয়বার কিভাবে সৃষ্টি করবেন, দুনিয়াতে কি এর কোনো নজির আছে? নবীজী ইরশাদ করলেন,

أَمَا مَرَرْتَ بِوَادِي أَهْلِكَ مَحْلًا ؟ قَالَ: بَلَى، قَالَ: ثُمَّ مَرَرْتَ بِهِ يَهْتَزُّ خَضِرًا؟ قَالَ: بَلَى، قَالَ: فَكَذَلِكَ يُحْيِي اللَّهُ الْمَوْتَى وَذَلِكَ آيَتُهُ فِي خَلْقِهِ
তোমার কি কখনো এমন হয়নি যে, একবার স্বজাতির শষ্যক্ষেত্র দিয়ে অতিক্রম করার সময় তুমি তা শষ্যহীন শুকনো অবস্থায় দেখেছো, আবার অতিক্রম করার সময় দেখেছো তাতে সবুজ ফসল ঢেউ খেলছে? সাহাবী বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। নবীজী সাল্লাল্রাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটাই দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার উদাহরণ। এভাবেই আল্রাহ পাক সকল মৃতকে জীবিত করবেন। মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং ৮৭৪৬

আর এক হাদীসে এসেছে, নবীজী কোরআন শরীফের এই আয়াতখানি তেলাওয়াত করলেন,

يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا
কেয়মতের দিন জমিন তার তথ্য প্রকাশ করে দেবে। এরপর বললেন,

قَالَ: أَتَدْرُونَ مَا أَخْبَارُهَا؟ قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: فَإِنَّ أَخْبَارَهَا أَنْ تَشْهَدَ عَلَى كُلِّ عَبْدٍ أَوْ أَمَةٍ بِمَا عَمِلَ عَلَى ظَهْرِهَا، تَقُولُ: عَمِلَ يَوْمَ كَذَا كَذَا وَكَذَا، فَهَذِهِ أَخْبَارُهَا. هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ.
তোমরা এই আয়াতের মতলব জানো কি? সাহাবারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। নবীজী বললেন, ভূপৃৃষ্ঠ নিজেই কেয়ামতের দিন তার পৃষ্ঠে কৃত সকল নর-নারীর আমলের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। অর্থাৎ আল্লাহ পাকের হুকুমে জমীন কথা বলবে, অমুক দিন অমুক বান্দা-বান্দী আমার পৃষ্ঠে অমুক কাজ করেছে। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৫৩

অন্য হাদীসে এসেছে,

كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ شَهِيدًا، وَبِالْكِرَامِ الْكَاتِبِينَ شُهُودًا، قَالَ: فَيُخْتَمُ عَلَى فِيهِ، فَيُقَالُ لِأَرْكَانِهِ: انْطِقِي، قَالَ: فَتَنْطِقُ بِأَعْمَالِهِ
কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক কোনো কোনো বান্দাকে বলবেন, আজ তুমিই তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। আর আমার লেখক ফেরেশতারাও মওজুদ আছে। সুতরাং এটুকু সাক্ষ্য যথেষ্ট। অত:পর আল্লাহ পাকের হুকুমে এই বান্দার মুখে তালা লেগে যাবে। সে মুখে কিছুই বলতে পারবে না। তার অন্যন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সাক্ষ্য দিতে বলা হবে। তখন সেগুলি তার কর্মকা- সবিস্তারে তুলে ধরবে। সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৬৯

এক ব্যক্তি নবীজীর দরবারে হাজির হয়ে আরজ করলো,

يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ لِي مَمْلُوكِينَ يُكَذِّبُونَنِي وَيَخُونُونَنِي وَيَعْصُونَنِي، وَأَشْتُمُهُمْ وَأَضْرِبُهُمْ فَكَيْفَ أَنَا مِنْهُمْ؟ قَالَ: يُحْسَبُ مَا خَانُوكَ وَعَصَوْكَ وَكَذَّبُوكَ وَعِقَابُكَ إِيَّاهُمْ، فَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ بِقَدْرِ ذُنُوبِهِمْ كَانَ كَفَافًا، لَا لَكَ وَلَا عَلَيْكَ، وَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ دُونَ ذُنُوبِهِمْ كَانَ فَضْلًا لَكَ، وَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ فَوْقَ ذُنُوبِهِمْ اقْتُصَّ لَهُمْ مِنْكَ الفَضْلُ. قَالَ: فَتَنَحَّى الرَّجُلُ فَجَعَلَ يَبْكِي وَيَهْتِفُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَا تَقْرَأُ كِتَابَ اللَّهِ وَنَضَعُ المَوَازِينَ القِسْطَ لِيَوْمِ القِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ. فَقَالَ الرَّجُلُ: وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا أَجِدُ لِي وَلَهُمْ شَيْئًا خَيْرًا مِنْ مُفَارَقَتِهِمْ، أُشْهِدُكَ أَنَّهُمْ أَحْرَارٌ كُلُّهُمْ
হে আল্লাহর রাসুল! আমার কিছু ক্রীতদাস আছে, এরা কখনো কখনো অন্যায় করে, মিথ্যা বলে, খেয়ানত করে। আমি রেগে গিয়ে তাদের মন্দছন্দ বলি, মারধরও করি, কেয়ামতের দিন এর পরিণাম কী হবে? নবীজী ইরশাদ করলেন, আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিন পূর্ণ ইনসাফের সঙ্গে ফায়সালা করবেন। তোমার-দেয়া শাস্তি যদি অপরাধ সমান হয়, তবে তোমার হিস্যায় কিছু আসবে না, হিস্যা থেকে কিছু যাবেও না। আর যদি শাস্তি অপরাধের তুলনায় কম হয়, তবে অপরাধের বাকি অংশ ক্ষমা করার সওয়াব তোমার হিস্যায় আসবে। কিন্তু যদি অপরাধের চে শাস্তি বেশি হয়, তবে তাদের জন্য তোমার থেকে শোধ নেওয়া হবে। হাদীস শুনে প্রশ্নকারী লোকটি কান্নাকাটি আরম্ভ করলো। নবীজী লোকটির সামনে এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি ইনসাফের পাল্লা কায়েম করবো। তখন কারো প্রতি চুল পরিমাণ বেইনসাফি করা হবে না। কারো যদি শরিষাদানা সমান হক থাকে, তবে তাও আমি উপস্থিত করবো। পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের জন্য আমি যথেষ্ট।’ লোকটি বললো, হে রাসুল! তবে তো এটাই আমার জন্য নিরাপদ যে, আমি তাদের মুক্ত করে দিবো। আপনি সাক্ষী, আমি আমার সকল গোলাম আজাদ করে দিলাম। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩১৬৫

আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে জীবদ্দশায় মরণোত্তর জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করার এবং কবর, কেয়ামত ও আখেরাতের অবস্থাদির বিষয়ে সচেতন থাকার তাওফীক দান করুন, আমীন।


১৪ তম পাঠ: শহীদের মর্যাদা ও ফজীলত:-

১৪ তম পাঠ:
শহীদের মর্যাদা ও ফজীলত
যদি দ্বীনের উপর অবিচল থাকার কারণে আল্লাহ পাকের কোনো বান্দা-বান্দীকে হত্যা করা হয়, অথবা দ্বীনের পথে জিহাদ ও মেহনত করতে গিয়ে কারো মৃত্যু হয়, তবে শরীয়তের পরিভাষায় তাকে শহীদ বলে। আল্লাহ পাকের দরবারে শহীদের অনেক অনেক মর্যাদা। কোরআন শরীফে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ
যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে, তাদেরকে অন্য মৃতদের মতো মনে করো না। বরং তারা বিশেষ হায়াত প্রাপ্ত এবং তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিভিন্ন রিযিক ও নেয়ামত প্রাপ্ত হচ্ছে। সূরা আলে ইমরান ৩/১৬৯

এক হাদীসে এসেছে, নবীজী এরশাদ করেন,

 مَا أَحَدٌ يَدْخُلُ الجَنَّةَ يُحِبُّ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الدُّنْيَا، وَلَهُ مَا عَلَى الأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا الشَّهِيدُ، يَتَمَنَّى أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الدُّنْيَا، فَيُقْتَلَ عَشْرَ مَرَّاتٍ لِمَا يَرَى مِنَ الكَرَامَةِ
কোনো জান্নাতী এটা চাবে না যে, তাকে আবার দুনিয়াতে পাঠানো হোক, যদিও তাকে সারা পৃথিবীর মালিক বানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু একজন শহীদ তাঁর জান্নাতী মর্যাদা প্রত্যক্ষ করে কামনা করতে থাকবে, তাকে অন্তত দশবার দুনিয়াতে পাঠানো হোক, যেন প্রতিবার সে শহীদ হয়ে আসতে পারে। বুখারী, হাদীস নং ২৮১৭

স্বয়ং নবীজী শহীদী মৃত্যুর তামান্না করে ইরশাদ করেন,

 وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ... لَوَدِدْتُ أَنِّي أُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ، ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ، ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ
ঐ সত্ত্বার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আমার বড় ইচ্ছে হয়, আমি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হবো। আমাকে জীবিত করা হবে, আবার আমি নিহত হবো। পুনরায় আমাকে জিন্দা করা হবে এবং আমি আবার আল্লাহর রাস্তায় জীবন বিলিয়ে দিবো। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭২২৬

এক হাদীসে হসেছে,

 لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ سِتُّ خِصَالٍ: يُغْفَرُ لَهُ فِي أَوَّلِ دَفْعَةٍ، وَيَرَى مَقْعَدَهُ مِنَ الجَنَّةِ، وَيُجَارُ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ، وَيَأْمَنُ مِنَ الفَزَعِ الأَكْبَرِ، وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الوَقَارِ، اليَاقُوتَةُ مِنْهَا خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا، وَيُزَوَّجُ اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنَ الحُورِ العِينِ، وَيُشَفَّعُ فِي سَبْعِينَ مِنْ أَقَارِبِهِ
শহীদ আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে বড়বড় ছয়টি পুরস্কার পাবে।

এক. তাকে তৎক্ষণাৎ ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তাকে তার জান্নাতী নিবাস দেখনো হবে।

দুই. কবরের আযাব মাফ করে দেয়া হবে ।

তিন. হাশরের ময়দানে যখন ব্যতিক্রম ছাড়া সবাই সন্ত্রস্ত ও পেরেশান থাকবে, তখন আল্লাহ পাক তাকে সেই পেরেশানি ও বিভীষিকা থেকে মুক্ত রাখবেন।

চার. সেদিন তার মাথায় এমন একটি সম্মাননা মুকুট পরানো হবে, যার একেকটি হীরা ও মুক্তা দুনিয়া ও তার সব কিছু থেকে দামী হবে।

পাঁচ. স্ত্রী হিসাবে তাকে বাহাত্তরজন হুর দান করা হবে।

ছয়. তার নিকটজনদের মধ্যে হতে সত্তরজনের ব্যাপারে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৬৩

অন্য এক হাদীসে এসেছে,

يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ
প্রদেয় ঋণ ব্যতীত শহীদ ব্যক্তির সমস্ত গুনাহ আল্লাহ তাআলা মাফ করে দেবেন। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৮৬

শহীদের মতো আল্লাহ পাকের রাস্তায় কেউ যদি কষ্টের সম্মুখীন হয়, কারো শ্লীলতা হানি হয়, ধন-সম্পদ লুণ্ঠিত হয়, তবে আল্লাহ তাআলার দরবারে এমন ব্যক্তিও অনেক বড় বড় সম্মান প্রাপ্ত হয়, যা দেখে ওলী-বুযুর্গরাও ঈর্ষা করে। দুনিয়াতে এ নিয়ম আছে যে, সরকারের অনুগত সৈনিকেরা যদি বীরত্ব প্রদর্শন করে এবং রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় হতাহত হয়, তবে তাদেরকে রাষ্ট্রের পক্ষ হতে বড় বড় পুরস্কার ও খেতাব দেওয়া হয়। তেমনি যারা আল্লাহর দ্বীনের কাজ করার অপরাধে প্রহৃত হয়, লাঞ্ছিত হয়, এবং নানা ধরনের ক্ষতি ও বঞ্চনার শিকার হয়, আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিন তাদেরকে জনসমক্ষে এমন এমন সম্মান আর মর্যাদা দান করবেন যে, অন্যরা তা দেখে আক্ষেপ করবে, হায়! দুনিয়াতে যদি আল্লাহর রাস্তায় আমাদের সঙ্গেও জুলুম করা হতো, লাঞ্ছনা আর গঞ্জনার আচরণ করা হতো, তাহলে এই পুরস্কার ও সম্মান লাভ করে আমরাও আজ ধন্য হতাম!

আয় আল্লাহ! এমন সুযোগ যদি আমাদের জীবনে আসে, তবে আমাদেরকে তুমি দৃঢ়পদ রেখো, সাহায্যে কোরো।


১৩ম পাঠ: দ্বীনরক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি ব্যয় করা:-

১৩ম পাঠ:
দ্বীনরক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি ব্যয় করা
আমরা যে সত্য ধর্ম গ্রহণ করেছি এবং যে পরকালমুখী সার্বজনীন জীবন ব্যবস্থা অনুসরণ করছি, তা যেন সর্বাস্থায় সুরক্ষিত থাকে এবং ক্রমেই যেন পৃথিবীময় বিস্তৃতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করে এজন্য সর্ব শক্তি নিয়োগ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য । দ্বীনী পরিভাষায় একে ‘জিহাদ’ বলে। মুমিনদের প্রতি জিহাদ আল্লাহ তাআলার বিশেষ একটি হুকুম।

সাধারণ পরিভাষায় জিহাদের অর্থ ‘সশস্ত্র প্রচেষ্টা’ হলেও পরিস্থিতিভেদে এর রূপবদল হয়। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সবগুলিই গুরুত্বপূর্ণ। স্তরভেদে সবগুলিই জিহাদের আওতাভূক্ত। যেমন কোনো অঞ্চলে কুফুরী শক্তি প্রবল হওয়ার কারণে যদি খোদ মুসলমানদেরই দ্বীনের উপর কায়েম থাকা কঠিন হয়ে পড়ে, বরং কখনো কখনো বিপদ-আপদের শিকারও হতে হয়, তখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে সেখানে নিজের সমাজ ও পরিবারপরিজন নিয়ে দ্বীনের উপর মজবুতভাবে জমে থাকাই বড় জিহাদ। এমনিভাবে কোনো অঞ্চলের মুসলমানরা যদি অজ্ঞতা ও উদাসীনতার কারনে দ্বীন ও শরীয়ত থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তাদের এসলাহ ও সংশোধনের জন্য জানমাল ব্যায় করাটা জিহাদ। জালিম ও স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক কথা বলা এবং জনমত গড়ে তোলাও এক প্রকার জিহাদ। হাদীসে এসেছে,

أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَدْ وَضَعَ رِجْلَهُ فِي الْغَرْزِ: أَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِر
এক ব্যাক্তি ঘোড়ার পিঠে থাকা অবস্থায় নবীজীকে জিজ্ঞেস করলো, কোন জিহাদ সর্বোত্তম? নবীজী ইরশাদ করলেন, জালিম শাসকের সামনে হক বিষয়টি বলে দেওয়া উত্তম জিহাদ। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৮৮৩০

তেমনি আল্লাহ পাকের দ্বীন সম্পর্কে যারা সম্পূর্ণ বেখবর, তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া এবং ইসলামে দীক্ষিত করার জন্য দৌড়ঝাপ করাটা জিাহদ।

যদি কখনো এমন সুদিন আসে যে, কোনো ভূ-খডে মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তী পরিস্থিতি শামাল দেয়ার মতো শক্তি তাদের থাকে, আর জীবনের সর্বস্তরে দ্বীন রক্ষা কিংবা দ্বীনের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়, তবে তখন অস্ত্রযুদ্ধই সবচে বড় জিহাদ। বলার অপেক্ষা রাখে না, জাতিগত হানাহানি, অর্থসম্পদ ও ক্ষমতার লড়াই ইত্যাদি কখনো ‘জিহাদ’ নামে অভিহিত হতে পারে না। এমনিভাবে শরীয়তের যুদ্ধনীতির বাইরে কোনো প্রকার বাহুশক্তির প্রয়োগ জিহাদ নয়, বরং ফেতনা ও সন্ত্র¿াস। অতএব যুদ্ধ তখনি জিহাদ ও ইবাদত, যখন তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আল্লাহর দ্বীন রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য প্রয়োজনে সংঘটিত হয়।

আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও মেহনতের ফযীলত
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ
আল্লাহর দ্বীনের জন্য জিহাদ ও মেহনত করো যেমন করা উচিৎ। আল্লাহ তো তোমাদেরকে তার দ্বীনের খেদমতের জন্য নির্বাচন করেছেন। সূরা হজ্ব ২২/৭৮

অন্য আয়াতে বলেন,

 يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ. تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ. يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি বিনিময়চুক্তির কথা বলে দিবো, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা থেকে মুক্তি দেবে? চুক্তিটি হলো, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করবে, যা হবে তোমাদের জন্য অতি উত্তম কাজ, যদি তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো। বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের গুনাহসমুহ ক্ষমা করবেন এবং তোমাদের এমন সব জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নহরমালা প্রবহমান থাকবে। আরও দান করবেন চিরস্থায়ী জান্নাতের উত্তম আবাসস্থল। আসলে এটাই বড় সফলতা। সূরা সফ্ ৬১/১০-১২

হাদীসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো,

أَيُّ الْأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: إِيمَانٌ بِاللهِ، قَالَ: ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ: الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ
কোন আমল সবচে বড়? নবীজী বললেন, খাঁটি দিলে আল্লাহর উপর ঈমান আনা। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো, তারপর কোন আমল সর্বোত্তম? নবীজী বললেন, আল্লাহর দ্বীনের পথে জিহাদ ও মেহনত করা। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৩

অন্য একটি হাদীসে নবীজী বলেন,

مَا اغْبَرَّتْ قَدَمَا عَبْدٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَمَسَّهُ النَّارُ
আল্লাহর রাস্তায় চলতে গিয়ে যার দুটি পা ধূলিধুসরিত হয়েছে, এটা হতেই পারে না যে, জাহান্নামের আগুন সেই পা স্পর্শ করবে। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৮১১

একটি হাদীসে এসেছে,

فَإِنَّ مُقَامَ أَحَدِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهِ فِي بَيْتِهِ سَبْعِينَ عَامًا
আল্লাহর রাস্তায় এক মুহূর্ত দাঁড়ানো এবং সামান্য অংশ গ্রহণ ঘরের কোনো ৭০ বছর নামায পড়ার চেও উত্তম। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৫০

আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে দ্বীনের পথে জিহাদ ও মেহনত করার তাওদীক দান করুন, আমীন ।


১২তম পাঠ: শরীয়তের উপর অবিচলতা :-

১২তম পাঠ:
শরীয়তের উপর অবিচলতা
ঈমান আনার পর আলল্লাহ পাকের পক্ষ হতে একজন মুমিনের উপর যত দায়িত্ব বর্তায়, তার মধ্যে একটি বড় দায়িত্ব হলো, পূর্ণ মানসিক শক্তি ও প্রশান্তির সঙ্গে দ্বীন ও শরীয়তের উপর অটল-অবিচল থাকা। সময় যত সঙ্গীন হোক, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, কোনো অবস্থাতেই দ্বীন ও শরীয়ত থেকে বিচ্যুত না হওয়া। এর নাম হলো ‘ইস্তেকামাত’। আল্লাহ পাক এমন লোকের প্রশংসায় ইরশাদ করেন,

 إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ. نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ .نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ
নিশ্চই যারা আন্তরিকভাবে স্বীকার করে, আল্লাহ আমাদের রব ও প্রতিপালক, অতঃপর এর দাবীর উপর অটল-অবিচল থাকে, তাদের নিকট একটি সময় ফেরেশতাদলের আগমন হবে। তারা বলবে, তোমরা শংকিত হয়ো না, দুঃখ করো না, বরং প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং প্রফুল্ল থাকো। দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জীবনে আমরা তোমাদের সঙ্গী। আর তোমাদের কাংখিত ও প্রার্থিত সবকিছু তোমাদের জন্য জান্নাতে প্রস্তুত রয়েছে, পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল আল্লাহর পক্ষ হতে আতিথেয়তা স্বরূপ, যা চাবে যত চাবে তার সবই তোমাদের জন্য উপস্থিত থাকবে। সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩০-৩২

সুবহানাল্লাহ! শরীয়তের উপর অবিচল ব্যক্তিদের জন্য কত বড় সুসংবাদ! নিজের জানমাল সবকিছু কোরবান করেও যদি এই মর্তবা হাসিল করা যায়, তবে তাই হবে বড় সৌভাগ্যের বিষয়। হাদীস শরীফে এসেছে,

 يَا رَسُولَ اللهِ، قُلْ لِي فِي الْإِسْلَامِ قَوْلًا لَا أَسْأَلُ عَنْهُ أَحَدًا بَعْدَكَ - وَفِي حَدِيثِ أَبِي أُسَامَةَ غَيْرَكَ - قَالَ: قُلْ: آمَنْتُ بِاللهِ، فَاسْتَقِمْ
এক সাহাবী নবীজীর কাছে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ উপদেশ দান করুন, যাতে আপনার পর আর কাউকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না হয়। নবীজী ইরশাদ করলেন, বলো, আমার রব আল্লাহ! এবার এই কথার দাবীর উপর অবিচল থাকো এবং তোমার বন্দেগী ও যিন্দেগী সেমতে গড়ে তোলো। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৮

আল্লাহ পাকের অনুগত বান্দারা বড় বড় প্রলোভন ও ভয় ভীতি উপেক্ষা করে দ্বীনের উপর অবিচল থাকেন। আল্লাহ তাআলা কোরআন শরীফে তাদের কিছু ঘটনা আমাদের হেদায়েতের জন্য উল্লেখ করেছেন। যেমন যাদুকরদের ঈমান আনার ঘটনা। ফেরআউন যাদেরকে মুসা আলাইহিস সালামের মোকাবেলার জন্য একত্রিত করেছিলো। তাদেরকে অনেক পুরস্কার ও সম্মানের ওয়াদা দিয়েছিল। কিন্তু যখন মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের সত্যতা তাদের সামনে খুলে গেলো, তখন তারা ফেরআউনের বড় বড় পুরস্কার দু’পায়ে দলে তার কঠিন শাস্তি থেকে সম্পূর্ণ বেপরোয়া হয়ে বলে উঠলো,

قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَى
হারুন ও মুসা যে পালনকর্তার ইবাদতের দাওয়াত দেয়, আমরা তাঁর উপর ঈমান আনলাম। সূরা ত্বহা ২০/৭০

এরপর যখন ফেরআউন তাদেরকে কঠোর শাস্তির কথা শোনালো, বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে শূলিতে চড়ানোর হুমকি দিলো, তখন তারা ঈমানী সাহস নিয়ে ফেরআউনের মুখের উপর বলে দিলো,

 قَالُوا لَنْ نُؤْثِرَكَ عَلَى مَا جَاءَنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالَّذِي فَطَرَنَا فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا. إِنَّا آمَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْفِرَ لَنَا خَطَايَانَا
তোমার যা ইচ্ছে হুকুম দিতে পারো। (আল্লাহ না করুন) তোমার হুকুম তো শুধু এই দুনিয়াতে বাস্তবায়িত হতে পারে। (যদি হয়, তাতেও কিছু আসে যায় না) আমরা তো আমাদের প্রকৃত রবের উপর এই আশায় ঈমান এনেছি যে, পরকালে তিনি আমাদের গুনাহগুলি মাফ করে দেবেন। সূরা ত্বহা ২০/৭২-৭৩

খোদ ফেরআউনের স্ত্রীর ঘটনা আরও শিক্ষণীয়। ফেরআউন ছিলো মিশরের একচ্ছত্র অধিপতি! স্ত্রী আছিয়া ছিলো তার হৃদয়রাণী। এ-থেকেই আন্দাজ করা যায়, আছিয়া কত সুখ-সম্মান আর প্রতিপত্তির মালিক ছিলো! কিন্তু যখন মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত তাঁর অন্তরে আলো দান করলো তখন তিনি নির্ভীক কণ্ঠে ঈমানের ঘোষণা দিয়ে দিলেন! একটুও বিচলিত হননি যে, পরিণামে তো রাজকীয় আরাম-আয়েশের এই জীবন তাকে ছেড়ে দিতে হবে। ফেরআউনের পাশবিক জুলুমনির্যাতনও তাকে সইতে হবে। অনন্তর এই মহিয়ষী নারী ফেরআউনের এমন সব নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করে ঈমানের উপর অবিচল ছিলেন, যা শুনলেও কলজে শুকিয়ে যায়। কোরআন শরীফে আললাহ পাক তাঁর ত্যাগ-তিতীক্ষাকে মুমিন নরনারীর জন্য আদর্শরূপে উল্লেখ করে ইরশাদ করেন,

وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
মুমিনদের জন্য ফেরআউনের স্ত্রী আছিয়ার ঘটনা আল্লাহ পাক উদাহরণরূপে উল্লেখ করছেন । (চরম নির্যাতনের সময়) তিনি শুধু এই দুআ করতেন যে, হে আমার প্রতিপালক আল্লাহ! জান্নাতে তোমার নিকটতম স্থানে আমার নিবাস বানিয়ে দাও। ফেরআউনের অনিষ্ট থেকে তুমি আমাকে হেফাজত করো, এই জালিম সম্প্রদায়ের জুলুম থেকে আমাকে তুমি মুক্তি দাও। সূরা তাহরীম ৬৬/১১

সুবহানাল্লাহ! কতবড় সৌভাগ্য! কত বড় মর্যাদা! পুরো উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য, হযরত আবু বকর থেকে নিয়ে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুমিন নরনারীর জন্য হযরত আছিয়ার এস্তেকামত ও দৃঢ়তাকে আল্লাহ পাক আদর্শ স্থির করেছেন!

একবার মক্কার জীবনের সাহাবায়ে কেরাম নবীজীর কাছে আরজ করলেন,

أَلاَ تَدْعُو اللَّهَ لَنَا؟ قَالَ: كَانَ الرَّجُلُ فِيمَنْ قَبْلَكُمْ يُحْفَرُ لَهُ فِي الأَرْضِ، فَيُجْعَلُ فِيهِ، فَيُجَاءُ بِالْمِنْشَارِ فَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُشَقُّ بِاثْنَتَيْنِ، وَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ، وَيُمْشَطُ بِأَمْشَاطِ الحَدِيدِ مَا دُونَ لَحْمِهِ مِنْ عَظْمٍ أَوْ عَصَبٍ، وَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ
(হে আল্লাহর রাসুল! এই জালিমদের জুলুম সীমা ছাড়িয়ে গেছে।) এদের উপর বদ্দুআ করুন, অভিশাপ করুন। নবীজী বলেন, আহা! তোমরা এত তাড়াতাড়ি ভয় পেয়ে যাচ্ছো, অধৈর্য হয়ে পড়ছো! আগের কালের হকপন্থীদের সঙ্গে তো এ পর্যন্ত হয়েছে যে, গর্ত করে তাতে ঈমানদারকে আবক্ষ গেড়ে ফেলা হতো। এরপর লোহার চিরুনি দিয়ে মস্তক দ্বিখ-িত করে ফেলা হতো। তাদের হাড় থেকে গোশত আলাদা করে ফেলা হতো। কিন্তু এমন পাশবিক জুলুম সত্ত্বেও তারা দ্বীন থেকে পিছু হটতো না, ধৈর্যহারা হতো না। সহীহ বোখারী, হাদীস নং ৩৬১২

আল্লাহ পাক ঐ সকল মর্দে মুমিনের হিম্মত ও ইস্তেকামতের সামান্য অংশ আমাদের মতো কমজোরদেরও দান করুন, যদি ত্যাগের কোনো মুহূর্ত সামনে আসে, তাহলে তাদের পদাংক অনুসরণ করার শক্তি নসীব করুন, আমীন।


Most Recent Post :-

🌹🌻কেমন_হবে_জান্নাত🌺🌻