বিবিধ সুন্নাত
১. নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম পথ চলার সময় রাস্তা হতে লোকদের ধাক্কানো বা সরানো হত না। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৪২৩৬)
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট কেউ কিছু চাইলে তিনি কখনও না বলতেন না। (অর্থাৎ প্রার্থিত জিনিস থাকলে তা দিয়ে দিতেন, আর না থাকলে অপারগতা প্রকাশ করতেন।) (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৪২৯৪)
৩. প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো মুখ হতে স্বীয় চেহারা মুবারক ফিরিয়ে নিতেন না যতক্ষণ না সে তার চেহারা ফিরিয়ে নিত। কোন ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কানে কানে কোন কথা বলতে চাইলে তিনি তার দিকে স্বীয় কান মুবারক বাড়িয়ে দিতেন এবং যতক্ষণ তার কথা শেষ না হতো, ততক্ষণ স্বীয় কর্ণ মুবারক সরিয়ে নিতেন না। (ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ৩৭১৬/ আবু দাউদ, হাদীস নং- ৪৭৯৪)
৪. নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাক্ষাতকালে নিজেই আগে সালাম করতেন, তারপর দু’হাতে মুসাফাহা করতেন। অনেক দিন পর কারো সাথে সাক্ষাত হলে তার সাথে মু‘আনাকাও করতেন। (আবু দাউদ, হাদীস নং- ৫২১৪/ বুখারী শরীফ হাদীস নং- ৬২৬৫-৬২৬৬)
বি.দ্র. সালাম দেয়ার সময় হাত তোলা বিধর্মীদের নীতি। সুতরাং হাত তুলবে না। তবে আওয়াজ না পৌঁছার আশংকা থাকলে হাত তুলতে পারে। কিন্তু স্যালুটের মত করে হাত তুলবে না। আর মুসাফাহার সময় প্রত্যেকের এক হাত অপর ব্যক্তির দু‘হাতের মাঝখানে থাকবে। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং-৬২৬৫)
অমুসলিমদের হ্যান্ডসেকের মত করে হাত ধরবে না। মু‘আনাকার সময় উভয় ব্যক্তি নিজের ডান গর্দান একবার মিলাবে। সাধারণত লোকেরা উভয় দিকে তিনবার সিনা মিলিয়ে থাকে এবং ঈদের দিন মু‘আনাকার ধুম পড়ে যায়। এর কোন ভিত্তি নেই।
৫. রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে বিদায় দেয়ার সময় মুসাফাহা করতেন এবং এই দু‘আ পড়তেনঃ
أَسْتَوْدِعُ اللَّهَ دِينَكَ وأمانَتَكَ وَخَوَاتِيمَ عَمَلِكَ .
(আবু দাউদ, হাদীস নং- ২৬০১)
এবং যাকে বিদায় দিতেন তিনি এ দু‘আটি পড়তেনঃ
اَسْتَوْدَعْتُكَ اللَّهَ الَّذِي لَا يُضَيِّعُ وَدَائِعَهُ.
(ইবনে মাজাহ হাদীস নং- ২৮২৫)
৬. রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন পছন্দনীয় জিনিস হাসিল করলে এই দু‘আ পড়তেনঃ
اَلحَمْدُ لِلَّهِ الَّذي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ الصَّالِحَاتُ.
(ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ৩৮০৩)
৭. পক্ষান্তরে মনের ইচ্ছার ব্যতিক্রম কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে এই দু‘আ পড়তেন :الحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ.
(ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ৩৮০৩)
৮. রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে এই দু‘আ পড়তেনঃ
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، بِرَحْمَتِكَ أسْتَغِيثْ .
(তিরমিযী, হাদীস নং- ৩৫২৪)
৯. হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কারো দিকে তাকাতেন, তখন সম্পূর্ণ চেহারা ঘুরিয়ে তাকাতেন। অহংকারীদের ন্যায় আড় চোখে তাকাতেন না। (শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ১)
১০. হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা সৃষ্টি নীচু করে থাকতেন। অধিক লাজুক হওয়ার কারণে তিনি কারো প্রতি দৃষ্টি ভরে তাকাতে পারতেন না। (শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ২)
১১. হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম পথ চলার সময় কিছুটা সম্মুখ পানে ঝুঁকে চলতেন। দেখলে মনে হতো যেন তিনি উপর হতে নীচের দিকে অবতরণ করছেন। (শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ১)
১২. প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবার সাথে মিলেমিশে থাকতেন, স্বতন্ত্র মর্যাদা বজায় রেখে চলতেন না। মাঝে মাঝে তিনি হাসি-কৌতুকও করতেন। তবে সে কৌতুকও হতো বাস্তবসম্মত। কাউকে কটাক্ষ করে বা অবাস্তব কথা বলে তিনি কোন কৌতুক করতেন না।(শামায়িলে তিরমিযী,পৃ. ১৫)
বি.দ্র. হাসি কৌতুক-এর অনেক হিকমতের মধ্যে একটা হিকমত ছিল যে, এর কারণে লোকেরা নির্ভয়ে তাঁর নিকট যে কোন দীনী প্রশ্ন করার সুযোগ পেত।
১৩. কোন দুঃস্থ বা বৃদ্ধা মহিলা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলতে চাইলে, রাস্তার একপার্শ্বে গিয়ে তিনি তাদের কথা শুনতেন। (শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ২২)
১৪. রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় পরিবারের লোকদের ব্যাপারেও খুব লক্ষ্য রাখতেন। যাতে তাঁর দ্বারা তাদের কোনরূপ কষ্ট না হয়। এজন্য রাতে ঘর হতে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে উঠে জুতা পরিধান করতেন এবং নিঃশব্দে দরজা খুলে বের হতেন। অনুরূপভাবে ঘরে প্রবেশ করার সময়ও নিঃশব্দে প্রবেশ করতেন, যাতে ঘুমন্ত ব্যক্তিদের ঘুমের কোন প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে।(মুসলিম, হাদীস নং- ১০৩)
১৫. কোন সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাকে নামায এবং শরীয়তের অন্যান্য বিধি-বিধান পালনে অভ্যস্ত করানোর নির্দেশ দিতেন। (তিরমিযী, হাদীস নং- ৪০৭)
১৬. সন্তানের বয়স দশ বছর হলে প্রয়োজনে তাকে নামাযের জন্য হাত দ্বারা (বেত বা লাঠি দ্বারা নয়) প্রহার করার তাকীদ করতেন। (তিরমিযী, হাদীস নং- ৪০৭)
১৭. সকল গোত্রের সম্মানিত ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতেন। (শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ২৩)
১৮. দিনের সময়কে তিন ভাগ করে এক ভাগ আল্লাহর ইবাদত এবং দীনের ফিকিরের জন্য, এক ভাগ পরিবার-পরিজনের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য এবং আরেক ভাগ ব্যক্তিগত কাজ ও নিজের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট করে নেয়ার তা‘লীম দিতেন।(শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ২২)
১৯. রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অধিক পরিমাণ দরূদ পড়তে থাকা, প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ করা নবীজীর গুরুত্বপূর্ণ তালীম। (মুসলিম হাদীস নং- ৪০৮/ শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ২৩)
২০. কোন আত্মীয়ের পক্ষ থেকে দুর্ব্যবহার পেলে তাকে মাফ করে দিয়ে তার সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখা নবীজীর তরীকা। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৯৯১)
২১. সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর চাই সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক হালকা শব্দ করে তার ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইকামত বলা, কোন বুযুর্গের মুখে চিবিয়ে খেজুর, মিষ্টিদ্রব্য বাচ্চার মুখের তালুতে লাগিয়ে দেয়া, সপ্তম দিনে তার সুন্দর নাম রাখা এবং আক্বীকা করা। (তিরমিযী, হাদীস নং- ১৫১৪, ১৫২২, ১৫১৫/ মুসলিম, হাদীস নং- ৫৬১৭)
২২.আত্মীয়-স্বজনদের সাথে ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক সম্পর্ক রাখা এবং সর্বদা সাধ্যমত তাদের খোঁজ-খবর নেয়া। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৯৮৭)
২৩. বোগল, নাভীর নীচের অংশ নিয়মিত পরিস্কার করে রাখা, এগুলো পরিস্কার না করা অবস্থায় চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে গুনাহগার হবে। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৬২৯৭/ তিরমিযী, হাদীস নং- ২৭৫৮)
২৪. যাদের দাড়ি লম্বা হয়, তাদের দাড়ি তিন দিকে এক মুষ্টির কিছু বেশি বা কমপক্ষে এক মুষ্টি পরিমাণ রাখা ওয়াজিব। এক মুষ্টি থেকে ছোট করে রাখা বা একেবারে মুণ্ডিয়ে ফেলা হারাম। মোচ (গোঁফ) কাচি দ্বারা ছোট ছোট করে রাখা, যাতে উপরের ঠোঁটের কিনারা স্পষ্ট দেখা যায়। ব্লেড বা ক্ষুর দ্বারা মোচ একদম মুণ্ডিয়ে ফেলা অনুচিত। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৮৯২, ৫৮৯৩)
২৫. দুর্বলদের প্রতি সুনজর রাখা। তাদের প্রতি যুলুম হতে দেখলে সাধ্যানুযায়ী তা প্রতিহত করা। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ২৪৪৫)
২৬. নিজ স্ত্রীকে আনন্দ দানের জন্য তার সাথে কখনো কখনো হাসি-কৌতুক এবং খোশ গল্প করা। (শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ১৭)
২৭. মুসলমান ভাইয়ের সাক্ষাতে হাসিমুখে মিলিত হওয়া। সাক্ষাতের জন্য আগন্তুক ভাইয়ের উদ্দেশ্যে নিজস্থান থেকে সামান্য সরে গিয়ে বা অগ্রসর হয়ে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। (তিরমিযী, হাদীস নং- ১৮৩৩/ তাকমিলাতু ফাত্হুল্ মুলহিম, ৩ : ১২৭)
২৮. হাঁচি বা হাই আসলে হাত বা কাপড় দ্বারা মুখ ঢেকে নেয়া এবং যথাসাধ্য শব্দ কম করা। (আবু দাউদ, হাদীস নং- ৫০২৯)
২৯. বিধর্মীদের মত দেখা যায় বা সতর-এর আকৃতি প্রকাশ পায় বা পুরুষদের জন্য টাখনুর নীচে কাপড় পরা হারাম। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৭৮৭/ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ৮৬৬৫)
৩০. নীচের কয়েকটি বিষয়ের প্রতি খুব বেশি খেয়াল রাখা অপরিহার্য। কেননা, উক্ত কাজগুলোই দীনের সারমর্ম। এবং উক্ত বিষয়গুলোর ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরযে আইন।
ক. নিজের ঈমান আক্বীদা সহীহ ও মজবুত করা।
খ. ইবাদত-বন্দেগীসমূহ আমলী মশকের মাধ্যমে পরিপূর্ণ সুন্নাত অনুযায়ী শিখে নেয়া।
গ. রিযিককে হালাল রাখার ফিকির করা।
ঘ. পিতা-মাতা, স্ত্রী সন্তান থেকে নিয়ে সকল আত্মীয়-স্বজন ও মুসলমানদের হক আদায়ে সচেষ্ট থাকা। মোটকথা, বান্দার হক্বের ব্যাপারে খুব বেশি ফিকির রাখা নতুবা সমস্ত ইবাদত-এর সওয়াব শেষ হয়ে যাবে।
ঙ. নিজের আত্মার রোগের চিকিৎসার জন্য কোন হক্কানী বুযুর্গের সাথে সম্পর্ক রাখা।
চ. গুনাহে কবীরা, হারাম, মাকরূহে তাহরীমী ও মুশতাবিহ মনে হয় এমন জিনিস থেকে কঠোরভাবে পরহেয করা।
ছ. নিজের পরিবারের লোকজন,আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধব ও মহল্লাবাসী লোকদেরকে সর্বদা দীনের দাওয়াত দিতে থাকা এবং তাদের দীনের তা‘লীম দিতে থাকা। সারকথা, আল্লাহর দীনের জন্য প্রতিদিন কিছু সময় বের করা। (সূরা বাক্বারা, আয়াত, ১৭৭/ তিরমিযী, হাদীস নং-২২৬৭)
"আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু" * বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম * "ইসলামের আলোকে আমাদের জগৎ" Site এ সবাইকে স্বাগতম। * "প্রচার কর,যদি একটি মাত্র আয়াতও হয়"। [বুখারী-৩৪৬১] * "কেউ হেদায়েতের দিকে আহ্বান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে,তবে যারা অনুসরন করেছে তাদের সওয়াবের কোন কমতি হবেনা।"(মুসলিম-২৬৭৮) * আমাদের এই Site এ আল কুরআন/সুন্নাহ ভিত্তিক লিখনী দেয়া হবে- ইনশা আল্লাহ।আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন। * "জাযাকাল্লাহু/জাযাকি-আল্লাহু খায়রান”
Saturday, May 25, 2019
বিবিধ সুন্নাত
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Most Recent Post :-
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: আল কুরআন ১০০) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনুল কারীমে কতটি সূরা আছে? উত্তরঃ ১১৪টি। ১০১) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনের প্রথম সূর...
-
আবু জাহেলের হত্যার ঘটনা আব্দুর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেছেন “বদরের ময়দানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। একজন তরুণ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলঃ হে চাচা! আবু ...
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: সাহাবায়ে কেরাম (রা:) ৪৪২. প্রশ্নঃ সাহাবী কাকে বলে? উত্তরঃ যাঁরা ঈমানের সাথে নবী (সাঃ)এর সাথে সাক্ষাত লাভ করেছেন ...
No comments:
Post a Comment