Saturday, May 25, 2019

প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রীর পড়া উচিত :-

প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রীর পড়া উচিত
রাগ এমনই এক বাজে স্বভাব যার কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি লেগেই থাকে। অথচ মুমিনদের ঘরগুলো হওয়া উচিত ছিল দুনিয়ার বুকে এক টুকরো জান্নাত! ব্যাপারটি আরও ভয়ঙ্কর হয় যখন স্বামী-স্ত্রী দুজনই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে থাকে। আর এই সুযোগটুকুই নেয় শয়তান। এর মাঝে শয়তান স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে বিষ ঢেলে দেয়। স্বামী প্রকৃত দ্বীনদার না হলে অনেক সময় রাগের মাথায় তালাকের মতো ভয়ঙ্কর শব্দও উচ্চারণ করে ফেলে, যা তাদেরকে ডিভোর্সের দিকে নিয়ে যায়। অথচ উচিত ছিল একজন রেগে গেলেও বাকিজনের সবর করে তা হজম করা। কেননা রাগান্বিত অবস্থায় নিজের মুখের জোর প্রকাশের মাঝে কোন বীরত্ব নেই, বীরত্ব আছে রাগকে প্রকাশ না করে হজম করার মাঝে।

যত ভাল দ্বীনদার কাপলই হোক না কেন বিয়ের পর জীবনের কোন না কোন সময় ঝগড়া, মনোমালিন্য হবেই। এটি স্বাভাবিক। না হওয়াটাই হল অস্বাভাবিক...

যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে ভয় করে একে অপরকে লাইফ পার্টনার হিসেবে কবুল করেছেন তারা এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে বেশি দূর যেতে দেন না। কেননা তারা জানেন এটি সাময়িক উত্তেজনার ফলেই হয়েছে, আবার ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু স্বামী ভুল করেও নিজের স্বামীত্ব জাহির করার জন্য ভুল স্বীকার না করলে এবং স্ত্রীর কাছে মাফও না চাইলে স্ত্রীর মনে তা দাগ হিসেবে থেকে যাবেই যদিও স্ত্রী তা প্রকাশ করুক না কেন। স্ত্রীর দিক থেকেও ব্যাপারটি তেমনই। আবার স্বামী স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্যের কথা ফোন করে বাবার বাড়িতে জানানোর মতো বাচ্চাসুলভ কাজও কোন বুদ্ধিমতী নারীর স্বভাব হতে পারে না।

ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ্) এর স্ত্রী উম্মে সালিহ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার পর তার প্রশংসা করে বলেছিলেন,"আল্লাহর কসম,আমরা ৩০ বছর একসাথেই ছিলাম কিন্তু একটি বারের জন্যও আমাদের মাঝে কোন তর্ক হয়নি।"
তাকে প্রশ্ন করা হলো,"এটা কীভাবে সম্ভব? মানে আমরা বলতে চাচ্ছি,আপনাদের দু’জনের এই শক্তিশালী বন্ধন ও পারস্পরিক সুসম্পর্কের গোপন রহস্য কী ছিলো?"

তিনি খুব সুন্দর করে উত্তরটি দিলেন,"যখন আমার স্ত্রী আমার উপরে অসন্তুষ্ট হতো এবং আমার সাথে তর্ক করতে চাইত,আমি নিশ্চুপ থাকতাম। আবার যখন আমি তার উপরে অসন্তুষ্ট হতাম এবং তর্ক করতে যেতাম, সে নিশ্চুপ থাকত।" [আল-খাতিব আল বাগদাদী,তারিখ বাগদাদ,১৬/৬২৬]

আর প্রকৃত দ্বীনদার স্ত্রীরা কখনোই স্বামীর সাথে তর্ক করতে যাবে না, কেননা সে জানে স্বামীর মর্যাদা কতোটুকু। স্বামী ভুল করলেও সে সুযোগ দিবে যেন স্বামী তার ভুল বুঝতে পারে। অহেতুক স্বামীর রাগের সাথে পাল্লা দেয়ার জন্য সেও তর্ক জুড়ে দিবে না। স্বামী না বুঝে তাকে কিছু কটু কথা শুনিয়ে দিলেও সে আল্লাহর জন্যই সবর করবে। কেননা সে জানে শয়তানের ফাঁদে পড়ে তার স্বামী তার উপর অবিচার করলেও একসময় স্বামী নিজেই তার ভুল বুঝতে পেরে স্ত্রীর কাছে মাফ চাইবে। যে আল্লাহকে ভয় করে তার জীবনসঙ্গিনীকে কবুল করেছে সে অবশ্যই তার উপর জুলুম করতে পারে না।

রসুলুল্লাহ(ﷺ) বলেনঃ আমি যদি কোন ব্যক্তিকে অপর কোন ব্যক্তির সামনে সিজদা করার জন্য নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।

রাবি - আবু হুরাইয়া (রা.)
হাদিস - তিরমিযী, রিয়াদুস স্বলিহীনঃ ২৯১

রসুল(ﷺ) যেমন ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ঠিক তেমনি ছিলেন একজন সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী। তিনি স্ত্রীর ঘরের কাজেও সাহায্য করেছেন, স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতাও করেছেন, স্ত্রীদের প্রাপ্য হক যথাযথভাবেও আদায় করেছেন সেই রাসূলই(ﷺ) আবার একই সাথে স্ত্রীদের সাথে মন খারাপ করে ঘর থেকেও বের হয়ে গিয়েছিলেন! কিন্তু কোনদিন নিজের স্ত্রীদের গায়ে হাত তোলেনি নি, তাদেরকে গালি দেন নি – অন্যায়ভাবে কটু কথা বলে তাদেরকে কষ্ট দেন নি। বরং, তিনি কোমলতা প্রদর্শনের গুরুত্ব দিয়েছেন।

দুনিয়ার কোন মানুষই ভুল-ত্রুটির উর্ধে নয়। আপনার স্ত্রীও একজন মানুষ, তারা কোন রোবট নয় সুতরাং আপনি যেমন ভুল করতে পারেন, আপনার স্ত্রীও ভুল করতে পারে। আপনি নিজে চিন্তা করুন, আপনি দিনে-রাতে উঠতে বসতে কত ভুল করছেন কিন্তু আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করছেন ও সুযোগ দিচ্ছেন – তাহলে আপনি কেনো অন্য আরেকজনের সূক্ষ্ম ভুলকে পাহাড় সমান বানাচ্ছেন? স্ত্রীদের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করতে শিখুন, তাদেরকে উত্তম ভাষায় উপদেশ দিন, নিজে ভালো হয়ে তার সামনে সুন্দর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরুন। এতে করে যেমন আপনি নিজে মানসিকভাবে শান্তি পাবেন, স্ত্রী আপনার কটু কথার অত্যাচার থেকে রেহাই পাবে – এবং এইরকম ভালো আচরণ ও কোমলতার অভ্যাসের বিনিময়ে আশা করা যায় আপনার স্ত্রীর কোন ভুল থাকলে সে সংশোধন করতে আগ্রহী হবে।

অন্যদিকে আপনি যদি কোমলতা না দেখান, সামান্য ব্যপার নিয়ে স্ত্রীর সাথে বাধাবাধি করেন তাহলে জেনে রাখুন – এতে হিতে বিপরীত হবে। বেশি সমালোচনা দুনিয়ার সবচাইতে ভালো মানুষটাকেও খারাপ বানিয়ে দেয়, এতে তার মাঝে খারাপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়, ফলে সে নিজের ভুল সংশোধন না করে উলটো বেকে বসে। এইজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষদেরকে খুব বেশি নসীহত করেছেন , তারা যাতে করে তাদের স্ত্রীদের জন্য কল্যানকামী হয়, তাদের সাথে ভালো আচরণ করে।

রসুলুল্লাহ(ﷺ)বলেছেন, “আমার কাছ থেকে মেয়েদের সাথে ভালো ব্যবহার করার শিক্ষা নাও। কেননা নারী জাতিকে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে ওপরের হাড়টা সবচেয়ে বাঁকা। অতএব তুমি যদি সোজা করতে যাও, তবে ভেঙ্গে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি ফেলে রাখ তবে বাঁকা হতেই থাকবে। তাই, নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার কর।”

রাবি - আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু
হাদিস - বুখারি ও মুসলিম

দুনিয়ার বুকে আপনার স্ত্রী ও পরিবারের লোকজনই আপনার কোমলতা পাওয়ার সবচেয়ে বেশি দাবীদার। আপনি যদি আপনার ঘরের মেয়েদের সাথে খারাপ আচরণ করেন – আপনার আখিরাততো নষ্ট হবেই, সাথে সাথে একজন নিম্নশ্রেণীর পুরুষ হিসেবেই গণ্য হবেন।

মনে রাখতে হবে,“শুধুমাত্র সম্মানিত লোকেরাই নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করে। আর যারা অসম্মানিত, নারীদের প্রতি তাদের আচরণও হয় অসম্মানজনক।” হাদিস - তিরমিযী

শেষ করছি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুইটি হাদিস দিয়ে। অনুরোধ থাকবে বিবাহিত-হবু বিবাহিতরা প্রত্যেকেই মনে রেখে সে অনুযায়ী আ'মাল করবেন -

“পূর্ণ ঈমানদার সেই ব্যক্তি যার আখলাক অর্থাৎ চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে শ্রেষ্ঠ।” - তিরমিযী

“স্বামীকে খুশী রেখে যে স্ত্রী মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে যাবে।” - ইবনে মাযাহ, তিরমিযী

আল্লাহ্‌ তায়ালা প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রী কে দুনিয়াতে একে অপরের চাদর হবার তাউফিক দিন...


No comments:

Post a Comment

Most Recent Post :-

🌹🌻কেমন_হবে_জান্নাত🌺🌻