ঈদের নামাযের তাকবীর কয়টি?
ঈদের নামাযে ৬ তাকবীর এর অর্থ অতিরিক্ত ৬ তাকবীর। অর্থাৎ নামাযের শুরুর এক তাকবীর ও রুকুর দুই তাকবীর ছাড়া ৬ তাকবীর। এই ৩ তাকবীরসহ মোট ৯ তাকবীর। তাহরীমা ও রুকুর দুই তাকবীর সব নামাযে বিদ্যমান থাকায় তা উল্লেখ না করে শুধু ৬ তাকবীরের কথা বলা হয়, যা ঈদের নামাযের জন্য বিশেষ বিধান। সারকথা এই যে, ৯ তাকবীর বা সাধারণ পরিভাষায় অতিরিক্ত ৬ তাকবীর এ দুয়ের মধ্যে শব্দগত কিছু পার্থক্য থাকলেও আমলগত কোনো পার্থক্য নেই। আমরা এর কিছু প্রমাণ নিচে তুলে ধরছি।
১ নং দলীল : কাসিম আবু আব্দির রহমান রহ. এর হাদীস
এ বিষয়ে সবচেয়ে সহীহ হাদীস হল বিশিষ্ট তাবেয়ী কাসিম আবু আবদুর রহমানের হাদীস, যা তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। কাসিম আবু আবদুর রহমান বলেন, আমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবী বর্ণনা করেছেন। তিনি (সাহাবী) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে ঈদের নামায পড়েছেন তাতে তিনি ৪টি করে তাকবীর দিয়েছেন। নামায শেষে আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ভুলে যেয়ো না, (ঈদের নামাযের তাকবীর) জানাযার নামাযের মত। এ কথা বলে তিনি বৃদ্ধাঙগুলি গুটিয়ে বাকি ৪ আঙুল দ্বারা ইশারা করলেন। শরহু মাআনিল আছার ৭২৭৩
এই হাদীসের সনদ সহীহ, এর রাবীগণ সকলেই ছিকা। ইমাম তহাবী রাহ. হাদীসটি বর্ণনা করে লেখেন, এই হাদীসের সনদ ‘হাসান’ আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ, ইয়াহইয়া ইবনে হামযা, ওযীন ও কাসিম সকলেই সহীহ হাদীস বর্ণনায় প্রসিদ্ধ। এঁরা প্রথমোক্ত (১২ তাকবীর বিষয়ক) হাদীসগুলোর বর্ণনাকারীদের মত নন। সুতরাং ঈদের তাকবীর প্রসঙ্গে সনদগত বিশুদ্ধতা বিবেচিত হলে এটি এর বিপরীত হাদীস অপেক্ষা গ্রহণের অধিক উপযুক্ত। (তাহাবী রহ. এর সনদ হাসান বলার অর্থ সহীহ। কারণ, ইমাম তাহাবী রহ. এর নিকট সহীহ ও হাসান পরিভাষা একই মানের ছিল)।
ইমাম বদরুদ্দীন আইনী রাহ. ‘নুখাবুল আফকার’ গ্রন্থে (১৬/৪৪২) বলেন, ‘এটির সনদ সহীহ এবং এর রাবীগণ ছিকা।’
শায়খ নাসির উদ্দিন আলবানী তার ‘সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা’ গ্রন্থে ইমাম তহাবী রাহ.-এর বক্তব্য সমর্থন করার পর লেখেন, ‘সুতরাং এটি (ইমাম) আবু দাউদ প্রমুখ ‘হাসান’ সনদে আবু আয়েশার সূত্রে আবু হুরায়রা রা.-এর যে হাদীস বর্ণনা করেছেন সেটার শক্তিশালী ‘শাহিদ’। ... এটি মূলত একটি বিরল ও শক্তিশালী বর্ণনা, যা ইমাম তাহাবী রহ. আমাদের জন্য সংরক্ষণ করেছেন...। এর শক্তি আরো বৃদ্ধি পায় আবদুর রাযযাক রহ. যা বর্ণনা করেছেন তা দ্বারা...।’
এরপর তিনি কিছু আছার উল্লেখ করে বলেন, ‘এসব শক্তিশালী আছার শিরোনামের হাদীস তথা আলোচিত হাদীসের সমর্থন করে। এগুলো মওকূফ হলেও মারফূর হুকুমে। কারণ এ ধরনের বিষয়ে (রাসূলের) নির্দেশনা ছাড়া এক জামাত সাহাবীর ঐক্য সম্ভব নয়। এ জাতীয় বিষয় যদি মওকূফরূপেও বর্ণিত হত তবু দলীল বিবেচিত হত। অথচ তা দু’টি মারফূ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে একটি শিরোনামের হাদীস অন্যটি এর শাহিদ আবু আয়েশার হাদীস...।’ সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, হদীস নং ২৯৯৭
২ নং দলীল : আবু আয়েশা রহ. এর হাদীস
প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ইমাম মাকহুল বলেছেন, আমাকে আবু হুরাইরা রা. এর একজন সঙ্গী আবু আয়েশা জানিয়েছেন যে, (কুফার আমীর) সাঈদ ইবনুল আস আবু মূসা আশআরী রা. ও হুযাইফা রা. কে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূল সা. ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরে কয় তাকবীর দিতেন? আবূ মূসা রা. উত্তরে বলেন, জানাযার তাকবীরের সমসংখ্যক (চার) তাকবীর দিতেন। হুযায়ফা রা. (আবূ মূসা রা. এর সমর্থনে) বললেন, তিনি ঠিক বলেছেন। আবূ মূসা রা. আরো বললেন, আমি যখন বসরার আমীর হিসাবে সেখানে অবস্থান করছিলাম তখন আমি সেখানে এভাবে চার তাকবীর দিতাম।
আবু আয়েশা বলেন, সাঈদ ইবনুল আসের এই প্রশ্নের সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তিনি আরো বলেন, ‘জানাযার মত চার তাকবীর’ আমার স্পষ্ট মনে আছে। -সুনানে আবু দাউদ ১১৫৩; মুসনাদে আহমদ ১৯৭৩৪; শরহু মাআনিল আসার ৭২৭৪; সুনানে কুবরা বাইহাকী ৬১৮৩
সনদের বিবেচনায় এই হাদীসটি ‘হাসান’ পর্যায়ের। আর হাসান হাদীস গ্রহণযোগ্য হাদীসেরই একটি প্রকার। - আসারুস সুনান পৃষ্ঠা ৩৪১
৩য় দলীল: সাহাবায়ে কেরামের ফতোয়া ও আমল
১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর আমল
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে তাঁর বিভিন্ন শাগরিদ এ কথা যেমন বর্ণনা করেছেন যে, তিনি দুই ঈদের নামাযে ৯টি করে তাকবীর দিতেন তেমনি একাধিক সূত্রে এর ব্যাখ্যাও বর্ণিত হয়েছে। আর উভয় ধরনের বর্ণনাই হাদীসের কিতাবে কমবেশি বিদ্যমান আছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন, দুই ঈদের নামাযে (প্রতি রাকাতে) জানাযার মত চার তাকবীর হবে। -আলমু‘জামুল কাবীর তবরানী ৯৫২২; কিতাবুল হুজ্জা আলা আহলিল মাদীনা ১/৩০৪
রেওয়ায়াতটির সনদ ‘সহীহ’। হাইসামী রহ. মাজমাউয যাওয়ায়েদে (২/৮২২) বলেছেন, রেওয়ায়াতটির রাবীগণ নির্ভরযোগ্য।
১. ইবনে আব্বাস রা. এর আমল
আবদুল্লাহ ইবনে হারিছ থেকে বর্ণিত, আমি ইবনে আব্বাস রা.-কে বছরায় ঈদের নামাযে ৯ তাকবীর দিতে দেখেছি এবং মুগীরা ইবনে শুবা রা.-কেও অনুরূপ করতে দেখেছি। ইসমাইল ইবনে আবুল ওলীদ বলেন, আমি খালিদকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইবনে আব্বাস রা. কীভাবে তাকবীর দিয়েছেন? উত্তরে তিনি আমাদের মা‘মার ও ছাওরীর সূত্রে বর্ণিত আবু ইসহাকের হাদীসে ইবনে মাসউদ রা. যেভাবে তাকবীর দিয়েছেন ঠিক তাই বর্ণনা করেছেন। মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৫৬৮৯
হাফেয ইবনে হাজার রাহ. বলেন, ‘এর সনদ সহীহ’। আদদিরায়া ১/১৭৩
২. আনাস রা. এর আমল
মুহাম্মাদ (ইবনে সীরীন) থেকে বর্ণিত, আনাস রা. বলেন, নামাযের তাকবীর (তাকবীরে তাহরীমা)সহ ৯ তাকবীর হবে প্রথম রাকাতে ৫টি আর দ্বিতীয় রাকাতে ৪টি। শরহু মাআনিল আছার ৪/৫৭৩
বদরুদ্দীন আইনী রাহ. ‘নুখাবুল আফকার’ গ্রন্থে (১৬/৪৫৪) বলেন, ‘ইমাম তহাবী এটি দু’টি সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন।’
৩. আসওয়াদ ও মাসরূক রহ. এর আমল
ইবরাহীম নাখায়ী থেকে বর্ণিত, আসওয়াদ ও মাসরূক ঈদের নামাযে ৯ তাকবীর দিতেন। প্রাগুক্ত ৪/৫৭৪
বদরুদ্দীন আইনী ‘নুখাবুল আফকার’ গ্রন্থে (১৬/৪৫৮) বলেন, ‘ইমাম তহাবী এটিও সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।’
এ ছাড়াও আবু কিলাবা, হাসান বছরী, মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন, শাবী, মুসায়্যিব (ইবনে রাফি) ও ইবরাহীম নাখায়ী থেকে এ ধরনের আরো বর্ণনা রয়েছে। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, শরহু মাআনিল আসার ২/৩৭২-৩৭৩; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ২/৭৯-৮১; মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক ৩/২৯৪-২৯৫
ঈদের নামাযের তাকবীর সংখ্যার বিভিন্নতা সম্পর্কে একটি কথা
সাহাবায়ে কেরাম থেকে ঈদের নামাযের তাকবীর সংক্রান্ত বিভিন্ন নিয়ম বর্ণিত আছে। এর মধ্যে আমরা ৯ বা ৬ তাকবীরের নিয়মটি শরঈ দলীল-প্রমাণ আপনাদের সামনে পেশ করলাম। এ ছাড়া ১২ তাকবীরেরও একটি নিয়ম আছে। প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া বা সহ ৭ তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকাতে ৫ তাকবীর। এ পদ্ধতিতে তাকবীরসমূহ উভয় রাকাতে কেরাতের আগে বলতে হয়। ফিকহের বেশ কয়েকজন ইমাম এই পদ্ধতিটি অবলম্বন করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এবং অন্য দুএকজন সাহাবী থেকে এই পদ্ধতিটি বর্ণিত হয়েছে। এর সমর্থনে ‘হাসান’ পর্যায়ের দুএকটি মারফু হাদীসও রয়েছে। বারো তাকবীরের কথাও যেহেতু হাদীস শরীফে আছে তাই এটিও একটি জায়েয পন্থা।
তবে মনে রাখতে হবে, এই বিভিন্নতা জায়েয-নাজায়েযের নয়; বরং কোন পদ্ধতিটি উত্তম তা নিয়ে। তাই তো ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেছেন, ঈদের তাকবীর প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ ছিল। তাঁদের অনুসৃত পন্থাগুলোর যে কোনটিই অবলম্বন করা যায়। -ফতহুল বারী ইবনে রজব হাম্বলী ৬/১৭৯
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.ও তাকবীরের এই মতভেদকে শুধু উত্তম নির্ণয়ের মতভেদ সাব্যস্ত করে বলেছেন, এর যে কোন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করে অপর পদ্ধতিকে ভুল বলা বা তার ব্যাপারে আপত্তি করা একটি ভ্রান্তি। -মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ২৪/২২৪; রিসালাতুল উলফা বাইনাল মুসলিমীন ইবনে তাইমিয়া ৪৫-৪৮ ও ৫৯-৬২
তবে হানাফী ফকিহগণ প্রথম পদ্ধতিটিকে উত্তম বলেছেন। কারণ:
১. হাদীস শরীফে এই পন্থাটি অত্যন্ত তাকিদ ও গুরুত্বের সাথে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। রাসূল সা. সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে এ পদ্ধতি অনুযায়ী নামায পড়েছেন শুধু তা-ই নয়; নামায শেষে আবার মৌখিক আলোচনার মাধ্যমেও পদ্ধতিটি শিখিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন তোমরা ভুলে যেয়ো না। এরপর হাতের আঙ্গুলি তুলে দেখিয়েছেন, তাকবীরের সংখ্যা কয়টি হবে।
২. এ পদ্ধতি যে হাদীসগুলোতে বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর সনদ অন্যান্য পদ্ধতির হাদীসগুলো সনদের চেয়ে অধিক সহীহ ও শক্তিশালী।
৩. প্রবীণ ও বড় বড় সাহাবীদের আমল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অনুযায়ী ছিল। তাঁদের বড় এক জামাত থেকে এ পদ্ধতিই বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম জাতিকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং প্রতিটি মতভেদকে তার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।
"আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু" * বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম * "ইসলামের আলোকে আমাদের জগৎ" Site এ সবাইকে স্বাগতম। * "প্রচার কর,যদি একটি মাত্র আয়াতও হয়"। [বুখারী-৩৪৬১] * "কেউ হেদায়েতের দিকে আহ্বান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে,তবে যারা অনুসরন করেছে তাদের সওয়াবের কোন কমতি হবেনা।"(মুসলিম-২৬৭৮) * আমাদের এই Site এ আল কুরআন/সুন্নাহ ভিত্তিক লিখনী দেয়া হবে- ইনশা আল্লাহ।আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন। * "জাযাকাল্লাহু/জাযাকি-আল্লাহু খায়রান”
Saturday, May 25, 2019
ঈদের নামাযের তাকবীর কয়টি? :-
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Most Recent Post :-
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: আল কুরআন ১০০) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনুল কারীমে কতটি সূরা আছে? উত্তরঃ ১১৪টি। ১০১) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনের প্রথম সূর...
-
আবু জাহেলের হত্যার ঘটনা আব্দুর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেছেন “বদরের ময়দানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। একজন তরুণ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলঃ হে চাচা! আবু ...
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: সাহাবায়ে কেরাম (রা:) ৪৪২. প্রশ্নঃ সাহাবী কাকে বলে? উত্তরঃ যাঁরা ঈমানের সাথে নবী (সাঃ)এর সাথে সাক্ষাত লাভ করেছেন ...
No comments:
Post a Comment