ভূমিকা
(চতুর্থ সংস্করণ)
الحمد لله، نحمده، ونستعينه، ونستغفره، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمداً عبده ورسوله، صلى الله عليه وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين. أما بعد:
১.কোরআন-সুন্নাহর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে ছয়টি শিরোনামের মাঝে আমরা ইসলামের যাবতীয় বিধিবিধানকে সন্নিবেশিত দেখতে পাই। এক. ঈমান-আকিদা। দুই. ইবাদত-উপাসনা। তিন. মোয়ামালা-লেনদেন। চার. মোয়াশারা ও সহবস্থান-নীতি। পাঁচ. আখলাক ও স্বভাব-চরিত্র। ছয়. আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ও সিয়াসত (সৎ কাজে আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ ও দেশ-পরিচালনা)।
ঈমান-আকিদা কাকে বলে নবীজী এমন প্রশ্নের জবাবে সংক্ষেপে বলেন,
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, ফেরেশতাদের অস্তিত্ব স্বীকার করা, আল্লাহর প্রেরিত কিতাব ও রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, কেয়ামত সংঘটনে বিশ্বাস করা ও তাকদীরের ভলো-মন্দ মেনে নেওয়া। সহীহ মুসলিম, ৮
ইবাদত-উপাসনা দ্বারা ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে গিয়ে নবীজী বলেন,
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ، وَلاَ تُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمَ الصَّلاَةَ، وَتُؤَدِّيَ الزَّكَاةَ المَفْرُوضَةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ
এক আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, নামায আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমাজানের রোজা রাখা। সহীহ বোখারী, ৫০
অন্য হাদীসে এসেছে,
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’-এর সাক্ষ্য দেওয়া, নামায আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, হজ্ব পালন করা, রমাজানের রোজা রাখা। সহীহ বোখারী, ৮
লেনদেন ও মোয়ামালা সাফ রাখার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরে একে অন্যের মাল অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। হাঁ, যদি পরস্পরের সম্মতিক্রমে কোনো লেনদেন হয় তবে ভিন্ন কথা। সূরা নিসা ৪/২৯
হাদীসে এসেছে,
مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي
যে প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়। সহীহ মুসলিম, ১০২
মোয়াশারা, সহঅবস্থানের আদব ও হকসমূহ রক্ষার বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে,
لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালো মনে করে অপর ভায়ের জন্যও তা ভালো মনে করবে। সহীহ বোখারী, ১৩
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ
আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, কোনো কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরিক করো না। এবং সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম- অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধীনস্থদের সঙ্গে। সূরা নিসা ৪/৩৬
وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ. قِيلَ: وَمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الَّذِي لاَ يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَايِقَهُ
আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়! বলা হলো, কে সে ইয়া রাসূলাল্লাহ! বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হতে পারে না। সহীহ বোখারী, ৬০১৬
المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
মুসলিম সে, যার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে। সহীহ বোখারী, ১০
আখলাক-চরিত্র ও মন-মানসিকতা ভালো করার বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে,
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا
মুমিনদের মাঝে তার ঈমান অধিকতর পূর্ণাঙ্গ, যার আখালাক যত ভালো। সুনানে আবু দাউদ, ৪৬৮২
নবীজী বলেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الْأَخْلَاقِ
আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য প্রেরিত হয়েছি। মুসনাদে আহমদ, ৮৯৫২
চারিত্রিক গুণ হলো ধৈর্য-স্থৈর্য, দয়া-মায়া, ন¤্রতা-ক্ষমাশিলতা, সততা-আমানতদারিতা, শালিনতা-লাজুকতা, দানশিলতা-সাহসিকতা, মেহমানদারি-সদ্ব্যবহার, স্বল্পেতুষ্টি-পরোপকার, আত্মমর্যাদাবোধ ও রুচিশিলতা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার, বড়র প্রতি সম্মান ও ছোটর প্রতি ¯েœহ, ওয়াদা রক্ষা ও নিয়ত খাঁটি করা ইত্যাদি।
আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ও সিয়াসত (সৎ কাজে আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ ও দেশ-পরিচালনা) সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবসমাজের কল্যাণের জন্য। তোমরা ভালো কাজের আদেশ দেবে আর মন্দ কাজে বাধা দেবে আর আল্লাহর প্রতি রাখবে ঈমান। সূরা আলে ইমরান ৩/১১০
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
আর যারা (অবিশ্বাসগত কারণে) আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার করে না তারা কাফের। সূরা মায়েদা ৫/৪৪
يَادَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ
হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীবীতে আমার প্রতিনিধি বানিয়েছি, অতএব তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার করো এবং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। অন্যথায় তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেব।সূরা সাদ ৩৮/২৬
২. আবার ইসলামের পরিচয় এভাবেও দেয়া হয় যে, আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ.
তারা কি (¯্রষ্টা ছাড়া) আপনা আপনিই সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই (নিজেদের) স্রষ্টা? সূরা তূর ৫২/৩৫
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى
মানুষ কি ভেবেছে তাকে (বিনা-বিধানে) অনর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে? সূরা কিয়ামাহ ৭৫/৩৬
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
না কি তোমরা ভেবেছো, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার নিকট প্রত্যানীত করা হবে না? সূরা মুমিনূন, ২৩/১১৫
এ-তিন আয়াত থেকে তিনটি প্রশ্ন সামনে আসে। এক. আমি কোত্থেকে এলাম, কে আমাকে সৃষ্টি করলেন? দুই. কেন আমি এলাম, ¯্রষ্টা কেন আমাকে সৃষ্টি করলেন? তিন. আমি যাবো কোথায়, আমার পরিণতি কী হবে?
মানুষ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বিভিন্ন ধর্ম-দর্শনের কাছে এই তিন প্রশ্নের সমাধান খুঁজে আসছে। কারণ এই প্রশ্নগুলোর সমাধান লাভের উপর মানবজন্মের সার্থকতা নির্ভর করে। কিন্তু কোনো ধর্ম-দর্শনই এর সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে পারেনি। এই তিনটি প্রশ্নের সবচে প্রশান্তিকর, সঠিক ও চূড়ান্ত সমাধান দিয়েছে ইসলাম। বলতে পারেন, এই তিন প্রশ্নের সমাধানের নাম ইসলাম।
৩.একবার নবীজী দ্বীনের পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে,
الدِّينُ النَّصِيحَةُ ثَلَاثًا قُلْنَا: لِمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা। কথাটি নবীজী তিনবার বললেন। আমরা আরজ করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) কার প্রতি কল্যাণ কামনা? নবীজী বললেন, আল্লাহর প্রতি, তাঁর কিতাব ও তাঁর রাসুলের প্রতি, মুসলমানদের শাসক ও মুসলিম জনসাধারণের প্রতি। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৬
এই পরিচয়কে আরও সংক্ষেপে এভাবে বলা হয় যে, দুটি হক আদায়ের নাম ইসলাম আল্লাহর হক ও বান্দার হক।
৪.নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হাবশা দেশের বাদশা আসহামা নাজাশী প্রশ্ন করেছিলেন, তোমাদের কোন সে দ্বীন, যাকে কেন্দ্র করে তোমরা তোমাদের কওমকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছো এবং অন্য কোনো জাতির প্রচলিত ধর্মেও প্রবেশ করতে পারোনি? জাফর ইবনে আবি তালেব তখন দারাজ কণ্ঠে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরলেন এভাবে,
أَيُّهَا الْمَلِكُ، كُنَّا قَوْمًا أَهْلَ جَاهِلِيَّةٍ نَعْبُدُ الْأَصْنَامَ، وَنَأْكُلُ الْمَيْتَةَ، وَنَأْتِي الْفَوَاحِشَ، وَنَقْطَعُ الْأَرْحَامَ، وَنُسِيءُ الْجِوَارَ يَأْكُلُ الْقَوِيُّ مِنَّا الضَّعِيفَ فَكُنَّا عَلَى ذَلِكَ. حَتَّى بَعَثَ اللهُ إِلَيْنَا رَسُولًا مِنَّا نَعْرِفُ نَسَبَهُ وَصِدْقَهُ وَأَمَانَتَهُ وَعَفَافَهُ، فَدَعَانَا: إِلَى اللهِ تَعَالَى لِنُوَحِّدَهُ وَنَعْبُدَهُ وَنَخْلَعَ مَا كُنَّا نَعْبُدُ نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنْ دُونِهِ مِنَ الْحِجَارَةِ وَالْأَوْثَانِ، وَأَمَرَ بِصِدْقِ الْحَدِيثِ، وَأَدَاءِ الْأَمَانَةِ، وَصِلَةِ الرَّحِمِ، وَحُسْنِ الْجِوَارِ، وَالْكَفِّ عَنِ الْمَحَارِمِ وَالدِّمَاءِ. وَنَهَانَا عَنْ: الْفَوَاحِشِ، وَقَوْلِ الزُّورِ، وَأَكْلِمَالِ الْيَتِيمِ، وَقَذْفِ الْمُحْصَنَةِ. وَأَمَرَنَا أَنْ نَعْبُدَ اللهَ وَحْدَهُ لَا نُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا وَأَمَرَنَا بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَالصِّيَامِ ... فَصَدَّقْنَاهُ وَآمَنَّا بِهِ، وَاتَّبَعْنَاهُ عَلَى مَا جَاءَ بِهِ فَعَبَدْنَا اللهَ وَحْدَهُ فَلَمْ نُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا، وَحَرَّمْنَا مَا حَرَّمَ عَلَيْنَا، وَأَحْلَلْنَا مَا أَحَلَّ لَنَا
হে মহান বাদশা! আমরা ছিলাম মূর্খতা ও বর্বরতায় অভ্যস্ত এক জাতি। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মরা-পঁচা খেতাম, অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজ করে বেড়াতাম, রক্তের সম্পর্কও বিনষ্ট করতাম, প্রতিবেশীর ক্ষতি করতাম, আমাদের সবলেরা দুর্বলের গ্রাস কেড়ে খেতো। এসবই ছিলো আমাদের আগের ধর্ম-কর্র্ম। অনন্তর আল্লাহ আমাদের মাঝে একজন রাসূল প্রেরণ করলেন, যার জাত-বংশ আমাদের চেনা, যার সততা ও বিস্বস্ততা সবার জানা, যার চরিত্রের শুদ্ধতা সম্পর্কে আমরা আস্বস্তÍ। তিনি আমাদের ডাকলেন আল্লাহর প্রতি আমরা যেন আল্লাহকে এক মানি, তাঁর উপাসনা করি, আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা আল্লাহকে ছেড়ে যেসব পাথর ও মূর্তির উপাসনা করতাম তা যেন আমরা ছেড়ে দিই। সাথে সাথে তিনি আমাদেরকে সত্যবাদিতার হুকুম করলেন; আমানত ফিরিয়ে দেওয়া, আত্মীয়তা রক্ষা করা এবং প্রতিবেশীর কল্যাণ কামনার আদেশ দিলেন; নিষিদ্ধ কাজ এবং রক্তপাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিলেন। বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনা থেকে নিষেধ করলেন; মিথ্যা বলা, এতিম-অসহায়ের মাল লুটে নেওয়া এবং সতী নারীর উপর অপবাদ দেওয়া থেকে বারণ করলেন। আদেশ করলেন আমরা যেন কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করি। আমাদেরকে নামায, যাকাত ও রোজা আদায়ের হুকুম করলেন।... আমরা তাঁকে সত্যায়ন করলাম, তাঁর প্রতি ঈমান আনলাম, তাঁর আনীত সকল বিষয়ে আমরা তাঁর অনুসরণ করলাম। তাই আমরা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করি না। তিনি আমাদের উপর যা হারাম করেছেন তাকে আমরা হারাম জানি, যা কিছু হালাল করেছেন তাকে আমরা হালাল মানি। মুসনাদে আহমদ, ১৭৪০
রোম-সরাট হিরাক্লিয়াস কুরাইশ সর্দার আবু সুফয়ানের নিকট জানতে চাইলেন, নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের কী আদেশ করে থাকেন? আবু সুফয়ান তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি বললেন,
يَقُولُ: اعْبُدُوا اللَّهَ وَحْدَهُ وَلاَ تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَاتْرُكُوا مَا يَقُولُ آبَاؤُكُمْ، وَيَأْمُرُنَا بِالصَّلاَةِ وَالزَّكَاةِ وَالصِّدْقِ وَالعَفَافِ وَالصِّلَةِ
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলে থাকেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। তোমাদের পিতৃপুরুষেরা এ-বিষয়ে যা বলে তা ছেড়ে দাও। তিনি আমাদেরকে নামায পড়তে, যাকাত দিতে, সত্য বলতে, শ্লীলতা রক্ষা করতে এবং আত্মীয়তা বজায় রাখতে আদেশ করেন। সহীহ বোখারী, ৭
৫.কখনো কখনো তিনটি মৌলিক আকিদা ও তার দাবি সামনে রেখে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ইসলাম হলো তাওহীদ, রেসালত ও আখেরাতে বিশ্বাস করার নাম।
তাওহীদ দ্বারা উদ্দেশ্য এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহই বিশ্বজগতের একমাত্র ¯্রষ্টা, প্রকৃত মালিক ও পরিচালক। কোনো সৃষ্টি তাঁর সমজাতীয় নয়, ফলে তিনি আমাদের নিকট অনুভবযোগ্য হলেও বিমূর্ত। সমগ্র সৃষ্টির অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ অবগত। একমাত্র তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী চিরঞ্জীব। সবাইকে তিনি রিযিক দেন, তাকদীরের ভালো-মন্দ তিনি নির্ধারণ করেন। সুতরাং দোয়া কবুল করার মালিক তিনি, ইবাদতের উপযুক্ত কেবল তিনি, আইন ও বিধান নির্ধারণের সর্বোচ্চ এখতিয়ার একমাত্র তাঁর।
রেসালত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছানোর জন্য যুগে যুগে বিভিন্নজনকে নবী বানিয়েছেন। সেই ধারার সর্বশেষ নবী হলেন আরব-বংশোদ্ভূত হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নবীগণ মানুষ, মানবিক যোগ্যতা ও গুণাবলির মাঝেই তাঁদের বিচরণ। তাঁরা মাসূম ও নিষ্পাপ, আল্লাহর বাণীর ধারক, বাহক ও বাস্তবায়নকারী। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর শব্দে শব্দে যা নাযিল হয়েছে তা হলো আল-কোরআন। এটি নাযিল হওয়ার দিন থেকে যথাযথভাবে সংরক্ষিত। আর তিনি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা অনুযায়ী যা কিছু করেছেন, সমর্থন করেছেন বা বলেছেন তার নাম হাদীস ও সুন্নাহ। মানুষকে এই কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করতে হবে, এর বিরুদ্ধাচরণের এখতিয়ার কারো নেই।
আখেরাতে বিশ্বাস রাখার অর্থ এই যে, দুনিয়ার এ-জীবনের পর আরেকটি অনন্ত জীবন আসবে, একদিন মহাপ্রলয় ঘটে জগতের সব তছনছ হয়ে যাবে। এরপর আল্লাহ তাআলা আবার সকলকে যিন্দা করবেন। তখন জীবনের প্রতিটি কাজ কর্মের হিসাব দিতে হবে। সেখানে কোনো অবিচার বা পক্ষপাত হবে না। যার কাজ-কর্ম শরীয়ত মতো হবে, সে জান্নাত পাবে, আর যার কাজ-কর্ম এর ব্যতিক্রম হবে, সে জাহান্নামে যাবে।
৬.ইসলামের কিছু প্রতীকী আমল এমন, যেগুলো কারো মাঝে পাওয়া গেলে এবং তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ না পাওয়া গেলে বাহ্যিকভাবে তাকে মুসলিম ধরে নেওয়া হয়। যেমন হাদীসে এসছে,
مَنْ صَلَّى صَلاَتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا، وَأَكَلَ ذَبِيحَتَنَا فَذَلِكَ المُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللَّهِ وَذِمَّةُ رَسُولِهِ، فَلاَ تُخْفِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ
যে আমাদের মতো নামায পড়ে, আমাদের কেবলাকে কেবলা মানে এবং আমাদের জবাই করা পশু ভক্ষণ করে, সে ঐ মুসলমান, যার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মা সাব্যস্ত হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দেয়া নিরাপত্তার জিম্মা লংঘন করো না। সহীহ বোখারী, ৩৯১
অন্য হাদীসে এসছে,
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ
আমি লোকদের বিরুদ্ধে ঐ পর্যন্ত লড়াই করতে আদিষ্ট, যাবত না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’-এর সাক্ষ্য দেয়, নামায আদায় করে, যাকাত প্রদান করে (বা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হয়ে কর দিতে সম্মত হয়)। সুতরাং যখন তারা এ-কাজগুলো করবে, তখন তারা আমার কাছ থেকে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। হাঁ, যদি ইসলামের অন্য কোনো হকের দাবি এসে পড়ে তবে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর। সহীহ বোখারী, ২৫
এমনকি যে শুধু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, সেও মুসলমান, যাবত না তার থেকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর দাবি বিরোধী কোনো আকিদা-আমল প্রকাশ পায়। হাদীসে এসছে,
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَمَنْ قَالَهَا فَقَدْ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ وَنَفْسَهُ إِلَّا بِحَقِّهِ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ
আমি লোকদের বিরুদ্ধে ঐ পর্যন্ত লড়াই করতে আদিষ্ট, যাবত না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে, সুতরাং যে এই কালিমা বলবে, (বা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হয়ে কর দিতে সম্মত হবে) সে আমার কাছ থেকে তার জান-মালের নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। হাঁ, যদি ইসলামের অন্য কোনো হকের দাবি এসে পড়ে তবে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর। সহীহ বোখারী, ১৩৯৯
আরও ইরশাদ হয়েছে,
أُقَاتِلُ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَيُؤْمِنُوا بِي، وَبِمَا جِئْتُ بِهِ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ، عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ، وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ
আমি লোকদের বিরুদ্ধে ঐ পর্যন্ত লড়াই করতে আদিষ্ট, যাবত না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দেয়, আর আমার প্রতি এবং আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি তার প্রতি ঈমান আনে (বা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হয়ে কর দিতে সম্মত হয়)। সুতরাং যখন তারা এ-কাজগুলো করবে, তখন আমার কাছ থেকে তারা তাদের জান-মালের নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। হাঁ, যদি ইসলামের অন্য কোনো হকের দাবি এসে পড়ে তবে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর। সহীহ মুসলিম, ২১
আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবো, ইসলাম ও মুসলমানের উল্লিখিত পরিচয়গুলোর মাঝে পরস্পরে কোনো বিরোধ নেই। মূলত ইসলাম ও মুসলিমের পরিচয় দেওয়া অনেক বড় দায়িত্বশিলতার বিষয়। মাওলানা মনযূর নুমানী রহ. একজন প্রথিতযশা আলেম। তিনি নির্ভরযোগ্য আলেমগণের নিকট থেকে ইলমে দ্বীন শিখেছেন। এই কিতাবে তিনি উল্লিখিত পরিচয়গুলোকেই কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একটু তফসিল করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ইসলামের ব্যাপকতা ও সামগ্রিকতাকে বোঝার এবং তদানুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন, আমীন।
বিনীত
আবু সাবের আব্দুল্লাহ
জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা
২৫/৩/১৬ ঈ.
"আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু" * বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম * "ইসলামের আলোকে আমাদের জগৎ" Site এ সবাইকে স্বাগতম। * "প্রচার কর,যদি একটি মাত্র আয়াতও হয়"। [বুখারী-৩৪৬১] * "কেউ হেদায়েতের দিকে আহ্বান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে,তবে যারা অনুসরন করেছে তাদের সওয়াবের কোন কমতি হবেনা।"(মুসলিম-২৬৭৮) * আমাদের এই Site এ আল কুরআন/সুন্নাহ ভিত্তিক লিখনী দেয়া হবে- ইনশা আল্লাহ।আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন। * "জাযাকাল্লাহু/জাযাকি-আল্লাহু খায়রান”
Saturday, May 25, 2019
ভূমিকা :-
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Most Recent Post :-
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: আল কুরআন ১০০) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনুল কারীমে কতটি সূরা আছে? উত্তরঃ ১১৪টি। ১০১) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনের প্রথম সূর...
-
আবু জাহেলের হত্যার ঘটনা আব্দুর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেছেন “বদরের ময়দানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। একজন তরুণ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলঃ হে চাচা! আবু ...
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: সাহাবায়ে কেরাম (রা:) ৪৪২. প্রশ্নঃ সাহাবী কাকে বলে? উত্তরঃ যাঁরা ঈমানের সাথে নবী (সাঃ)এর সাথে সাক্ষাত লাভ করেছেন ...
No comments:
Post a Comment