ঝিঙ্গার গুনাগুণ
➢ পর্ব - ১
➢ ঝিঙ্গা (Ribbed gourd) একটি গৌণ সবজি, Luffa acutangula। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফলে। এই সবজি শর্করা ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ। মার্চ-এপ্রিল ঝিঙ্গা চাষের অনুকূল সময়। বীজ বপনের ছয় সপ্তাহের মধ্যেই সবজির ফলন শুরু হয়। কচি অবস্থায় এটি সবজি হিসেবে ব্যবহূত হয়। ছোট ফল কখনও কখনও লবণে জারিয়ে সংরক্ষণ করা যায়।
➢ ঝিঙ্গা অতি প্রাচীন ফসল। এটি প্রধানত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঝিঙ্গা বাংলাদেশের একটি সুস্বাদু জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন সবজি।
➢ ঝিঙ্গা চাষের অনুকূল জলবায়ু ও মাটির বৈশিষ্ট্য
➢ দীর্ঘ সময়ব্যাপী উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং প্রচুর সূর্যালোকযুক্ত এলাকা ঝিঙ্গা চাষের জন্য উত্তম। সুনিষ্কাশিত উচ্চ জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোআঁশ মাটিতে ঝিঙ্গার ফলন ভালো হয়।
➢ উৎপাদন কৌশল চাষের মৌসুম
➢ ঝিঙ্গা সাধারণত খরিফ মৌসুমে চাষ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝিঙ্গার বীজ শীত শেষ হলেই বোনা হয়। গ্রীষ্মকালে চাষ হয় বলে ফসলে ঘন ঘন সেচের প্রয়োজন। ঝিঙ্গার খরা সহ্য করার ক্ষমতা কম।
➢ বীজ শোধন
➢ বীজবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং সবল-সতেজ চারা উৎপাদনের জন্য বীজ শোধন জরুরি। কেজিপ্রতি ২ গ্রাম প্রোভক্স/ ভিটাভ্যাক্স/ ক্যাপটান/ ব্যাভিস্টিন/ সিনকার ব্যবহার করে বীজ শোধন করা যায়।
➢ বীজের পরিমাণ
➢ ঝিঙ্গা চাষের জন্য শতাংশ জমি প্রতি ২.৫ গ্রাম পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হয়।
➢ প্রয়োগ পদ্ধতি
➢ মূল জমি তৈরির সময় জৈব সার, টিএসপি, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম ও বোরিক এসিডের অর্ধেক অংশ প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক জৈব সার, টিএসপি, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম ও বোরিক এসিড মাদায় প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ও এমওপি সমান তিন ভাগে ভাগ করে চারা রোপণের সময় প্রথম ভাগ, ১৫-২০ দিন পর দ্বিতীয় ভাগ এবং ৩৫-৪০ দিন পর তৃতীয় ভাগ প্রয়োগ করতে হবে।
➢ চারা রোপণ
➢ চারার বয়স ১৫-১৬ দিন হলে তা মাঠে তৈরি গর্তে লাগাতে হবে। চারাগুলো রোপণের আগের দিন বিকেলে পানি দিয়ে মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। পরের দিন বিকেলে চারা রোপণ করতে হবে। মাদাগুলোর মাটি ভালোভাবে ওলট-পাল্ট করে কোদাল দিয়ে এক কোপ দিয়ে চারা লাগানোর জন্য জায়গা করে নিতে হবে।
➢ চারার পলিব্যাগের ভাঁজ বারবার ব্লেড দিয়ে কেটে পলিব্যাগ সরিয়ে মাটির দলাসহ চারাটি নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়ে চারপাশে মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর পানি দিতে হবে। পলিব্যাগ সরানোর সময় এবং চারা রোপণের সময় সাবধান থাকতে হবে যাতে মাটির দলা ভেঙে চারার শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নতুবা শিকড়ের ক্ষতস্থান দিয়ে ঢলে পড়া রোগের (ফিউজারিয়াম উইন্ট) জীবাণু ঢুকবে এবং শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হলে গাছের বৃদ্ধি দেরিতে শুরু হবে।
➢ ফলন তোলা
➢ বীজ বোনার দেড়-দু’মাস পর থেকে ঝিঙ্গার ফল ধরা শুরু হয়। ঝিঙ্গা গাছ ২-৩ মাসব্যাপী ফল দিতে থাকে। স্ত্রী ফুল পরাগায়িত হওয়ার ৮-১০ দিনের মধ্যে গাছ ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। ফল কচি অবস্থায় সংগ্রহ করা উচিত। অধিক পরিপক্ব ফলের স্বাদ ও পুষ্টিমান উভয়ই কম। বীজ কোমল থাকা অবস্থায় ফল সংগ্রহ করতে হয় যাতে বীজসহ রান্না করা যায়।
➢ জীবনকাল
➢ ১২০-১৪০ দিন।
➢ ফলন
➢ ভালো জাত উর্বর মাটিতে উত্তমরূপে চাষ করতে পারলে একরপ্রতি ২০ টন ফলন পাওয়া সম্ভব।
➢ পর্ব - ২
➢ সব সবজিতে ভেষজ গুণ রয়েছে। ব্যবহারবিধি জানা থাকলে সবজি মাত্রই ভেষজ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ঝিঙ্গা আর ধুন্দুলের (চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় পরুল) ব্যতিক্রম নয়। অন্য দিকে ঝিঙ্গা আর ধুন্দুলের ভেষজ গুণের কথা বলতে গেলেই যকৃৎ ও প্লীহার (কলজে আর পিলে) কথা এসে যায়।
➢ বৈদিক শাস্ত্রমতে এ দু’টি মানুষের শরীরে যেন দু’টি দৈব্য। এরা যেন দুই ভাই, কাজ করে এরা একযোগে, একজন বিগড়ালে আরেকজনও বিগড়ে যায়; নয়তো বসে যায়। আবার এরা বিগড়ালে ঝিঙ্গা আর ধুন্দুল এদেরকে শাসন ও শায়েস্তা করতে পারে। ঝিঙ্গা ও ধুন্দুলের অপর নাম যথাক্রমে ধারা কোষিতক ও কোষিতক। মহাভারতের অনুসারে ভগবতীর নিজের কোষ হতে তৈরি এ দুই কোষিতকই একই গুণসম্পন্ন; তাই ব্যবহারবিধিও একই, এ জন্য পরবর্তীকালে এদের ব্যবহারবিধি একই সাথে দেয়া হলো।
➢ আয়ুর্বেদ মতে ঝিঙ্গা শীতল, মধুর, পিত্তনাশক, ুধাবর্ধক; তবে বাত, কফ ও বায়ু সৃষ্টি করে। এটি শ্বাসের কষ্ট অর্থাৎ হাঁপানি, জ্বর, কাশি ও কৃমিরোগ উপশম করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূরে করে ও পেট পরিষ্কার করে। এটি দেরিতে হজম হয় বলে রোগীদের পক্ষে খাওয়া অনুচিত।
➢ ধুন্দুল স্নিগ্ধ, বলকারক, রুচিবর্ধক, বায়ুনাশক, রক্তপিত্ত (নাক ও মুখ দিয়ে রক্তপড়া) ও বাতপিত্ত কমায়, ুধাবর্ধক, কৃমিনাশক ও কফ নিবারক। নিচে ঝিঙ্গা ও ধুন্দুলের ব্যবহারবিধি দেয়া হলো।
➢ শোথের মূত্রকৃচ্ছ্রতা : হৃদরোগ, যকৃৎগত রোগ বা অন্যান্য কারণে শোথ হয়; তাতে প্রস্রাবের কৃচ্ছ্রতাও হয়। সে সময় কাঁচা ঝিঙ্গা ও এর পাতার রস অথবা যেকোনো একটার রস নিয়ে একটু গরম করে রাখতে হবে। সে রস থেকে দুই চা চামচ করে ২ ঘণ্টা পর পর তিন-চারবার আধা কাপ পানির সাথে মিশিয়ে পান করতে হবে। তবে শুধু পাতার রস হলে দুইবার খাবে ও ঝিঙ্গা ফলের রস চারবার দেয়া যাবে। ক’দিন এভাবে খেলে ধীরে ধীরে শোথ ও মূত্রকৃচ্ছ্রতা, সে সাথে মূত্রস্বল্পতার উপশম হবে।
➢ বমির ভাব : চাপা অম্বল, গা প্রায় সময় বমি বমি করে, সে ক্ষেত্রে ঝিঙ্গার পাকা বীজ তিন-চারটা নিয়ে বেঁটে এক কাপ পানি গুলে খেতে হয়। তাতে পেটে বায়ু থাকলে তাও কমে যাবে। বমির ইচ্ছাটাও থাকবে না; তবে বীজ তেতো হলে বমি হয় বলে দুর্বল, বৃদ্ধ, শিশু ও গর্ভবতী মহিলাকে খাওয়ানো যাবে না।
➢ পাথুরী : ঝিঙ্গা লতার শিকড় (আকশী) গরুর দুধে বা ঠাণ্ডা পানিতে মেড়ে পর পর তিন দিন খেলে পাথুরী দূর হয়।
➢ মাথার যন্ত্রণা (শ্লেষ্মাজনিত) : কাঁচা ঝিঙ্গার রস দুই-তিন ফোঁটা নাকে টেনে নিলে এবং সে সাথে দুই চা চামচ রস একটু গরম করে সাত-আট চা চামচ পানিতে মিশিয়ে পান করলে শ্লেষ্মা বেরিয়ে গিয়ে যন্ত্রণা কমে যাবে। এ ছাড়া ঝিঙ্গা শুকিয়ে গুঁড়া করে নস্যি নিলে মাথাব্যথা সারে।
➢ অর্শের রক্ত পড়া : এ রোগকে রক্তার্শও বলা হয়। এতে রক্ত পড়ে, যন্ত্রণাও আছে। এ ক্ষেত্রে কচিও নয়, আবার পাকাও নয় (আধা পাকা) এ রকম ঝিঙ্গা কুচি কুচি করে কেটে রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে নিতে হয় এবং কাপড় বা চালনিতে চেলে সে গুঁড়া এক গ্রাম মাত্রায় নিয়ে আধা কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে দুইবার করে খেতে হয়।
➢ কুষ্ঠরোগ : আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে কুষ্ঠ কথার অর্থ ব্যাপক। এতে দাদকেও ক্ষুদ্র কুষ্ঠ বলা হয়েছে। যদি দেখা যায়, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না বা চিকিৎসাও সম্ভব হচ্ছে না, তখন ঝিঙ্গা পাতার রস এক-দেড় চা চামচ প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে একটু পানি মিশিয়ে খেতে হয়। কুষ্ঠের রূপ নিলে সে ঘায়ে পাতার রস লাগাতে হবে। এভাবে দুই মাস খেলে কিছুটা পরিত্রাণ মিলবে।
➢ চোখে পিঁচুটি বা জুড়ে যেতে থাকা : এটা শ্লেষ্মাধিকারজনিত কারণে অথবা ঠাণ্ডা লেগে যায়। এ সময় ঝিঙ্গার কচি পাতার রস প্রথমে গরম করে তারপর ঠাণ্ডা করে এক-দুই ফোঁটা করে দিতে হয়। ঝিঙ্গার বদলে ধুন্দুলও ব্যবহার করা যাবে।
➢ শোথোদর : ধুন্দুলের পাতার রস বড় চামচে দুই চামচ পান করলে ও পাতা বেঁটে পেটের ফোলা অংশের ওপর লাগালে এ রোগ সারে।
➢ নালী ঘা : তেতো ঝিঙ্গার রস নালী ঘায়ে লাগালে ঘা শুকিয়ে যায়।
আমাদের আরো অ্যাপস
"আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু" * বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম * "ইসলামের আলোকে আমাদের জগৎ" Site এ সবাইকে স্বাগতম। * "প্রচার কর,যদি একটি মাত্র আয়াতও হয়"। [বুখারী-৩৪৬১] * "কেউ হেদায়েতের দিকে আহ্বান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে,তবে যারা অনুসরন করেছে তাদের সওয়াবের কোন কমতি হবেনা।"(মুসলিম-২৬৭৮) * আমাদের এই Site এ আল কুরআন/সুন্নাহ ভিত্তিক লিখনী দেয়া হবে- ইনশা আল্লাহ।আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন। * "জাযাকাল্লাহু/জাযাকি-আল্লাহু খায়রান”
Saturday, May 25, 2019
ঝিঙ্গার গুনাগুণ:-
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Most Recent Post :-
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: আল কুরআন ১০০) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনুল কারীমে কতটি সূরা আছে? উত্তরঃ ১১৪টি। ১০১) প্রশ্নঃ পবিত্র কুরআনের প্রথম সূর...
-
আবু জাহেলের হত্যার ঘটনা আব্দুর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেছেন “বদরের ময়দানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। একজন তরুণ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলঃ হে চাচা! আবু ...
-
ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান বিষয়: সাহাবায়ে কেরাম (রা:) ৪৪২. প্রশ্নঃ সাহাবী কাকে বলে? উত্তরঃ যাঁরা ঈমানের সাথে নবী (সাঃ)এর সাথে সাক্ষাত লাভ করেছেন ...
No comments:
Post a Comment