বুখারী শরীফ সব খণ্ড
بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
অধ্যায় - ৫১ - মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) - ৫
( হাদিস নং - ৪০২৮-৪১২১ = মোট ৯৪ টি হাদিস)
হাদিস নং - ৪০২৮
হযরত ইবরাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্নিত, বনী তামীম গোত্র থেকে একটি অশ্বারোহী দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আসল। (তাঁরা তাদের একজনকে সেনাপতি নিযুক্ত করার প্রার্থনা জানালে) আবূ বকর (রাঃ) প্রস্তাব দিলেন, কা’কা ইবনু মা’বাদ ইবনু যারারা (রাঃ) কে এদের আমীর নিযুক্ত করে দিন। উমর (রাঃ) বললেন, বরং একরা ইবনু হাবিস (রাঃ) কে আমীর বানিয়ে দিন। হযরত আবূ বকর (রাঃ) বললেন, তুমি কেবল আমার বিরোধিতাই করতে চাও। উমর (রাঃ) বললেন, আপনার বিরোধিতা করার ইচ্ছা আমি কখনো করিনা। এর উপর দু’জনের বাক-বিতন্ডা চলতে চলতে শেষ পর্যায়ে উভয়ের আওয়াজ উচ্চতর হল। ফলে এ সম্পর্কে আয়াত নাযিল হল, ‘‘হে মু’মিনগন! আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল) -এর সামনে তোমরা কোন ব্যাপারে অগ্রনী হয়োনা। বরং আল্লাহ্ কে ভয় করো, আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মু’মিনগন! তোমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র কন্ঠস্বরের উপর নিজেদের কন্ঠস্বর উঁচু করোনা। এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরুপ উচ্চস্বরে কথা বলোনা। কারন এতে তোমাদের আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে। (৪৯: ১-২)
হাদিস নং - ৪০২৯
হযরত ইসহাক (রহঃ) হযরত আবূ জামরা (রাঃ) থেকে বর্নিত, (তিনি বলেন), আমি ইবনু আববাস (রাঃ) কে বললাম, আমার একটি কলসী আছে। তাতে আমার জন্য (খেজুর ভিজিয়ে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম য তৈরী করা হয় এবং পানি মিঠা হয়ে সারলে আমি তা আরেকটি পাত্রে (ছোট গ্লাসে) ঢেলে পান করি। কিন্তু কখনো যদি ঐ পানি বেশি পরিমান পান করে লোকজনের সাথে বসে যাই এবং দীর্ঘক্ষন পর্যন্ত মজলিসে বসে থাকি, তখন আমার আশংকা হয় যে, (নেশার দোষে) আমি (লোকসম্মুখে) অপমানিত হব। তখন ইবনু আববাস (রাঃ) বললেন, আবদুল কাইস গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আসলে তিনি বললেন, কাওমের জন্য খোশ-আমদেদ। যাদের আগমন না ক্ষতিগ্রস্থ অবস্থায় হয়েছে, না অপমানিত অবস্থায়। তারা আরয করল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আমাদের ও আপনার মধ্যে মুদার গোত্রের মুশরিকরা প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। এ জন্য আমরা আপনার কাছে আশহুরল হুরুম (নিষিদ্ধ মাসসমূহ) ব্যতীত অন্য সময়ে আসতে পারিনা। কাজেই আমাদেরকে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি কথা বলে দিন, যেগুলোর উপর আমল করলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। আর যাঁরা আমাদের পেছনে (বাড়িতে) রয়ে গেছে তাদেরকে এর দাওয়াত দেব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদেরকে চারটি জিনিস পালন করার নির্দেশ দিচ্ছি। আর চারটি জিনিস থেকে বিরত থাকতে বলছি। (আমি তোমাদেরকে) আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিচ্ছি। তোমরা কি জানো আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা কাকে বলে? তা হল: আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া, আর সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করা, যাকাত দেওয়া, রমযানের রোযা পালন করা এবং গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ (বায়তুল মালে) জমা দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। আর চারটি জিনিস- লাউয়ের পাত্র, কাঠের তৈরী নাকীর নামক পাত্র, সবুজ কলসী এবং মুযাফফাত নামক তৈল মাখানো পাত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম য তৈরী করা থেকে নিষেধ করছি।
হাদিস নং - ৪০৩০
হযরত সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) হযরত আবূ জামরা (রাঃ) থেকে বর্নিত, (তিনি বলেন), আমি ইবনু আববাস (রাঃ) এর কাছ থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন- আবদুল কাইস গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আমরা অর্থাৎ এই ছোট্ট দল রাবীআর গোত্র। আমাদের এবং আপনার মাঝখানে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে মুদার গোত্রের মুশরিকরা। কাজেই আমরা নিষিদ্ধ মাসগুলো ছাড়া অন্য সময়ে আপনার কাছে আসতে পারিনা। এ জন্য আপনি আমাদেরকে এমন কিছু বিষয়ের নির্দেশ দিয়ে দিন, যেগুলোর উপর আমরা আমল করতে থাকব এবং যারা আমাদের পেছনে রয়েছে তাদেরকেও সেই দিকে আহবান জানাব। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে চারটি বিষয় আদায় করার হুকুম দিচ্ছি এবং চারটি জিনিস থেকে নিষেধ করছি। (বিষয়গুলো হল) আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা অর্থাৎ আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া। কথাটি বলে তিনি আঙ্গুলের সাহায্যে এক গুনেছেন। আর সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করা, যাকাত দেওয়া এবং তোমরা যে গনীমত লাভ করবে, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য (বায়তুল মালে) জমা দেওয়া। আর আমি তোমাদেরকে লাউয়ের পাত্র, নাকীর নামক খোদাইকৃত কাঠের পাত্র, সবুজ কলসী এবং মুযাফফাত নামক তৈল মাখানো পাত্র ব্যাবহার থেকে নিষেধ করছি।
হাদিস নং - ৪০৩১
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনু সুলায়মান ও বকর ইবনু মুদার (রহঃ) হযরত বুকাইর (রাঃ) থেকে বর্নিত, (তিনি বলেন), ইবনু আববাস (রাঃ) এর আযাদকৃত গোলাম কু্রাইব (রহঃ) তাকে বর্ননা করেছেন, ইবনু আববাস, আবদুর রহমান ইবনু আযহার এবং মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রহঃ) (এ তিনজনে) আমাকে আয়িশা (রাঃ) এর কাছে পাঠিয়ে বললেন, তাঁকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে সালাম জানাবে। এবং তাঁকে আসরের পরের দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। কারন আমরা অবহিত হয়েছি যে, আপনি নাকি এই দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে নিষেধ করেছেন- এ হাদীসও আমাদের কাছে পৌঁছেছে। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আমি হযরত উমর (রাঃ) সহ এ দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়কারী লোকদেরকে প্রহার করতাম। কুরায়ব (রাঃ) বলেন, আমি তাঁর [হযরত আয়িশা (রাঃ)] কাছে গেলাম এবং আমাকে যে ব্যাপারে পাঠিয়েছেন তা জানালাম। তিনি বললেন, বিষয়টি উম্মে সালমা (রাঃ) এর কাছে জিজ্ঞাসা কর। এরপর আমি তাঁদেরকে [হযরত আয়িশা (রাঃ) এর জবাবের কথা] জানালে তাঁরা আবার আমাকে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) এর কাছে পাঠালেন এবং হযরত আয়িশা (রাঃ) এর কাছে যা বলতে বলেছিলেন সেসব কথা তাঁর কাছেও গিয়ে বলতে বললেন। তখন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি যে, তিনি দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করা থেকে নিষেধ করেছেন। কিন্তু একদিন তিনি আসরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। এ সময় আমার কাছে ছিল আনসারদের বনী হারাম গোত্রের কতিপয় মহিলা। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। আমি তা দেখে খাদীমা কে পাঠিয়ে বললাম, তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং বলবে, ‘‘উম্মে সালমা (রাঃ) আপনাকে এ কথা বলেছেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আমি কি আপনাকে এ দু’রাকাত আদায় করা থেকে নিষেধ করতে শুনিনি? অথচ দেখতে পাচ্ছি, আপনি সেই দু’রাকাত আদায় করছেন’’। এরপর যদি তিনি হাত দিয়ে ইশারা করেন তাহলে পিছনে সরে যাবে। খাদীমা গিয়ে (সেভাবে কথাটি) বলল। তিনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন। খাদীমা পেছনের দিকে সরে গেল। এরপর সালাত (নামায/নামাজ) সেরে তিনি বললেন, হে আবূ উমাইয়ার কন্যা! (উম্মে সালমা) তুমি আমাকে আসরের পরের দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ)-এর কথা জিজ্ঞাসা করছ। আসলে আজ আবদুল কায়স গোত্র থেকে তাদের কয়েকজন লোক আমার কাছে ইসলাম গ্রহন করতে এসেছিল। তাঁরা আমাকে ব্যাস্ত রাখার কারনে যুহরের পরের দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করার সুযোগ আমার হয়নি। আর সেই দু’রাকাত হল এ দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ)।
হাদিস নং - ৪০৩২
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ জু’ফী (রহঃ) হযরত ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদে জুম’আর সালাত (নামায/নামাজ) জারী করার পর সর্বপ্রথম যে মসজিদ জুম’আর সালাত (নামায/নামাজ) জারী করা হয়েছিল তা হল বাহরাইনের জুয়াসা এলাকার আবদুল কায়স গোত্রের মসজিদ।
হাদিস নং - ৪০৩৩
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল অশ্বারোহী সৈন্য নজদের দিকে পাঠিয়েছিলেন। (সেখানে গিয়ে) তাঁরা সুমামা ইবনু উসাল নামক বনূ হানীফার এক ব্যাক্তিকে ধরে আনলেন এবং মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে তাকে বেঁধে রাখলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এসে বললেন, ওহে সুমামা! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে উত্তর দিল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে তো ভালই মনে হচ্ছে। (কারন আপনি মানুষের উপর কখনো জুলুম করেননা বরং অনুগ্রহই করে থাকেন)। যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে আপনি একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ দান করেন তা হলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যাক্তিকে অনুগ্রহ দান করবেন। আর যদি আপনি (এর বিনিময়ে) অর্থ সম্পদ চান তা হলে যতটা খুশী দাবি করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেই অবস্থার উপর রেখে দিলেন। এভাবে পরের দিন আসল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তাকে বললেন, ওহে সুমামা! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে বলল, আমার কাছ সেটিই মনে হচ্ছে যা (গতকাল) আমি আপনাকে বলেছিলাম যে, যদি আপনি অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন তা হলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যাক্তির উপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করবেন। তিনি তাকে সেই অবস্থায় রেখে দিলেন। এভাবে এর পরের দিনও আসল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে সুমামা! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে বলল, আমার কাছে তা-ই মনে হচ্ছে, যা আমি পূর্বেই বলেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা সুমামার বন্ধন খুলে দাও। এবার (মুক্তি পেয়ে) সুমামা মসজিদে নববীর নিকটস্থ একটি খেজুরের বাগান গেল এবং গোসল করল। এরপর ফিরে এসে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে বলল, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং হযরত মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। (তিনি আরো বললেন) ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আল্লাহর কসম, ইতিপূর্বে আমার কাছে যমীনের বুকে আপনার চেহারার চাইতে অধিক অপছন্দনীয় আর কোন চেহারা ছিলোনা। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সকল চেহারা অপেক্ষা অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম, আমার কাছ আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক ঘৃন্য অপর কোন দ্বীন ছিলোনা। কিন্তু এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে অধিক সমাদৃত। আল্লাহর কসম, আমার মনে আপনার শহরের চেয়ে বেশি খারাপ শহর অন্য কোনটি ছিলোনা। কিন্তু এখন আপনার শহরটই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আপনার অশ্বারোহী সৈনিকগন আমাকে ধরে এনেছে, সে সময় আমি উমরার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে ছিলাম। তাই এখন আপনি আমাকে কি কাজ করার হুকুম করেন? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে (দুনিয়া ও আখিরাতের) সু-সংবাদ প্রদান করলেন এবং উমরা আদায়ের জন্য নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি যখন মক্কায় আসলেন তখন জনৈক ব্যাক্তি তাঁকে বলল, তুমি নাকি নিজের দ্বীন ছেড়ে দিয়ে অন্য দ্বীন গ্রহন করেছ? তিনি উত্তর করলেন, না, (বেদ্বীন হইনি, কুফর, শিরক তো কোন দ্বীনই নয়) বরং আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ইসলাম গ্রহন করেছি। আর আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিনানুমতিতে তোমাদের কাছে ইমাম থেকে গমের একটি দানাও আসবেনা।
হাদিস নং - ৪০৩৪
হযরত আবূল ইয়ামান (রহঃ) হযরত ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে একবার মিথ্যুক মূসা য়লামা (মদিনায়) এসেছিল। সে বলতে লাগল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি আমাকে তাঁর পরবর্তীতে (স্থলাভিষিক্ত) নিয়োগ করে যায়, তা হলে আমি তাঁর অনুগত হয়ে যাবো। সে তার গোত্রের বহু লোকজনসহ এসেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবিত ইবনু কায়স ইবনু সাম্মাসকে সাথে নিয়ে তার দিকে অগ্রসর হলেন। সে সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে ছিল একটি খেজুরের ডাল। মূসা য়লামা তার সাথীদের মধ্যে ছিল, এমতাবস্থায় তিনি তার কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তিনি বললেন, যদি তুমি আমার কাছে এ তুচ্ছ ডালটিও চাও, তবে এটিও আমি তোমাকে দেবনা। তোমার ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা লংঘিত হতে পারেনা। যদি তুমি আমার আনুগত্য থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ্ তোমাকে ধ্বংস করে দিবেন। আমি তোমাকে ঠিক তেমনই দেখতে পাচ্ছি, যেমনটি আমাকে (স্বপ্নযোগে) দেখানো হয়েছে। এই সাবিত আমার পক্ষ থেকে তোমাকে জবাব দেবে। এরপর তিনি তার কাছ থেকে চলে আসলেন। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উক্তি ‘‘আমি তোমাকে তেমনই দেখতে পাচ্ছি যেমনটি আমাকে দেখানো হয়েছিল’’- সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) আমাকে জানালেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম, তখন স্বপ্নে দেখলাম, আমার দু’হাতে স্বর্ণের দু’টি খাড়ু। খাড়ু দু’টি আমাকে ঘাবড়িয়ে দিল (পুরুষের জন্য স্বর্ণের খাড়ু অবৈধ) তখন ঘুমের মধ্যেই আমার প্রতি নির্দেশ দেয়া হল, খাড়ু দু’টির উপর ফুঁ দাও। আমি সে দু’টির উপর ফুঁ দিলে তা উড়ে গেল। এরপর আমি এর ব্যাখ্যা করেছি দু’জন মিথ্যাবাদী (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাবীকারী) আমার পরে বের হবে। এদের একজন আনসী আর অপরজন মূসা য়লামা।
হাদিস নং - ৪০৩৫
হযরত ইসহাক ইবনু নাসর (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি ঘুমাচ্ছিলাম এমতাবস্থায় (স্বপ্নে) আমার নিকট যমীনের সমুদয় সম্পদ উপস্থাপন করা হল এবং আমার হাতে দু’টি সোনার খাড়ু রাখা হল। আমি আমার মনে ব্যাপারটি গুরুতর অনুভূত হলে আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হল যে, এগুলোর উপর ফুঁ দাও। আমি ফুঁ দিলাম, খাড়ু দু’টি উধাও হয়ে গেল। এরপর আমি এ দু’টির ব্যাখ্যা করলাম যে, এরা সেই দু’ মিথ্যাবাদী (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাবীকারী) যাদের মাঝখানে আমি অবস্থান করছি। অর্থাৎ সানআ শহরের অধিবাসী (আসওয়াদ আনসী) এবং ইয়ামামা শহরের অধিবাসী (মূসা য়লামাতুল কাযযাব)।
হাদিস নং - ৪০৩৬
হযরত সালত ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) হযরত আবূ রাজা উতারিদী (রহঃ) বলেন যে, (ইসলাম গ্রহন করার পূর্বে) আমরা একটি পাথরের পূজা করতাম। যখন এ অপেক্ষা উত্তম কোন পাথর পেতাম তখন এটিকে নিক্ষেপ করে দিয়ে অপরটির পূজা আরম্ভ করতাম আর কখনো যদি আমরা কোন পাথর না পেতাম তা হলে কিছু মাটি একত্রিত করে স্তুপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি বকরী এনে সেই স্তুপের উপর দোহন করতাম (যেনো কৃত্রিমভাবে তা পাথরের মতো দেখায়) তারপর এর চারপাশে তাওয়াফ করাতাম। আর রজব মাস আসলে আমরা বলতাম, এটা তীর থেকে ফলা বিচ্ছিন্ন করার মাস। কাজেই আমরা রজব মাসে তীক্ষ্ণতাযুক্ত সব ক’টি তীর ও বর্শা থেকে এর তীক্ষ্ণ অংশ খুলে আলাদা করে দিতাম। রাবী (মাহদী) (রহঃ) বলেন, আমি আবূ রাজা (রহঃ) কে বলত শুনেছি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়ত প্রাপ্তিকালে আমি ছিলাম অল্পবয়স্ক বালক। আমি আমাদের উট চরাতাম। তারপর যখন আমরা শুনলাম যে, তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] নিজের কাওমের উপর অভিযান চালিয়েছেন (এবং মক্কা জয় করে ফেলছেন) তখন আমরা পালিয়েএলাম জাহান্নামের দিকে অর্থাৎ মিথ্যাবাদী (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাবীকারী) মূসা য়লামার দিকে।
হাদিস নং - ৪০৩৭
হযরত সাঈদ ইবনু মুহাম্মদ জারমী (রহঃ) হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবা (রহঃ) বলেন, আমাদের কাছে এ খবর পৌঁছে যে, [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায়] মিথ্যাবাদী মূসা য়লামা একবার মদিনায় এসে হারিসের কন্যার ঘরে অবস্থান করেছিল। হারিস ইবনু কুরায়যের কন্যা তথা আবদুল্লাহ ইবনু আমিরের মা ছিল তার (মূসা য়লামার) স্ত্রী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাবিত ইবনু কায়স ইবনু শাম্মাস (রাঃ), তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খতীব বলা হতো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে ছিল একটি খেজুরের ডাল। তিনি তার কাছে গিয়ে তার সাথে কথাবার্তা রাখলেন। মূসা য়লামা তাঁকে [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে] বলল, আপনি ইচ্ছা করলে আমার এবং আপনার মাঝে কর্তৃত্বের বাধা এভাবে তুলে দিতে পারেন যে, আপনার পরে তা আমার জন্য নির্দিষ্ট করে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি যদি এ ডালটিও আমার কাছে চাও, তাও আমি তোমাকে দেবনা। আমি তোমাকে ঠিক তেমনই দেখতে পাচ্ছি, যেমনটি আমাকে (স্বপ্নযোগে) দেখানো হয়েছে। এই সাবিত ইবনু কায়স এখানে রইল, সে আমার পক্ষ থেকে তোমার জবাব দেবে। এ কথা বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সেখান থেকে) চলে গেলেন। উবায়দুল্লাহ্ ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ)-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উল্লেখিত স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন ইবনু আববাস (রাঃ) বললেন, [ আবূ হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক] আমাকে বলা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি ঘুমাচ্ছিলাম। এমতাবস্থায় আমাকে দেখানো হল যে, আমার দু’হাতে দু’টি সোনার খাড়ু রাখা হয়েছে। এতে আমি ঘাবড়ে গেলাম এবং তা অপছন্দ করলাম। তখন আমাকে (ফুঁ দিতে) বলা হল। আমি এ দু’টির উপর ফুঁ দিলে সে দুটি উড়ে গেল। আমি এ দু’টির ব্যাখ্যা করলাম যে, দু’জন মিথ্যাবাদী (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাবিদার) আবির্ভূত হবে। উবায়দুল্লাহ্ (রহঃ) বলেন, এ দু’জনের একজন হল আসওয়াদ আল আনসী, যাকে ফায়রুয নামক এক ব্যাক্তি ইয়ামান এলাকায় হত্যা করেছে, আর অপর জন হল মূসা য়লামা।
হাদিস নং - ৪০৩৮
হযরত আববাস ইবনু হুসায়ন (রহঃ) হযরত হুযায়ফা (রহঃ) বর্নিত, তিনি বলেন, নাজরান এলাকার দু’জন সরদার আকিব এবং সাইয়িদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে তাঁর সাথে মুবাহালা [১] করতে চেয়েছিল। বর্ননাকারী হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, তখন তাদের একজন অপরজনকে বলল, এরুপ করোনা। কারন আল্লাহর কসম, তিনি যদি সত্যি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়ে থাকেন আর আমরা তাঁর সাথে মুবাহালা করি, তাহলে আমরা এবং আমাদের পরবর্তী সন্তান-সন্ততি (কেউ) রক্ষা পাবেনা। তারা উভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বলল যে, আপনি আমাদের কাছ থেকে যা চাইবেন, আপনাকে আমরা তা-ই দেবো। তবে এর জন্য আপনি আমাদের সাথে একজন আমানতদার ব্যাক্তিকে পাঠিয়ে দিন। আমানতদার ছাড়া অন্য কোন ব্যাক্তিকে আমাদের সাথে পাঠাবেননা। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সাথে অবশ্যই একজন পুরা আমানতদার ব্যাক্তিকেই পাঠাবো, এ দায়িত্ব গ্রহনের নিমিত্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগন আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তখন তিনি বললেন, হে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ তুমি উঠে দাঁড়াও। তিনি যখন দাঁড়ালেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ হচ্ছে এই উম্মতের আমানতদার। [১] সত্য উদঘাটনের নিমিত্তে অনন্য উপায় হচ্ছে দু’পক্ষের পরস্পরকে বদদোয়া করা।
হাদিস নং - ৪০৩৯
হযরত মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) হযরত হুযায়ফা (রহঃ) বর্নিত, তিনি বলেন, নাজরান অধিবাসীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে বলল, আমাদের এলাকার জন্য একজন আমানতদার ব্যাক্তি পাঠিয়ে দিন। তিনি বললেন, তোমাদের কাছে আমি একজন আমানতদার ব্যাক্তিকেই পাঠাবো, যিনি সত্যই আমানতদার। কথাটি শুনে লোকজন সবাই আগ্রহভরে তাকিয়ে রইলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -তখন আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ (রাঃ) কে পাঠালেন।
হাদিস নং - ৪০৪০
হযরত আবূল ওয়ালীদ (হিশাম ইবনু আবদুল মালিক) (রহঃ) হযরত আনাস (রাঃ) সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, প্রত্যেক উম্মতের একজন আমানতদার রয়েছে। আর এ উম্মতের সেই আমানতদার হল আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্।
হাদিস নং - ৪০৪১
হযরত কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, বাহরাইনের অর্থ সম্পদ (জিযিয়া) আসলে তোমাকে এতো পরিমান, এতো পরিমান, এতো পরিমান দেবো। (এতো পরিমান শব্দটি) তিনি তিনবার বললেন। এরপর বাহরাইন থেকে আর কোন অর্থ সম্পদ আসেনি। অবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত হয়ে গেল। এরপর হযরত আবূ বাকার (রাঃ) এর যুগে যখন সেই অর্থ সম্পদ আসলো, তখন তিনি একজন ঘোষনাকারীকে নির্দেশ দিলেন। সে ঘোষনা করল: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যার ঋণ প্রাপ্য রয়েছে কিংবা কোন ওয়াদা অপূরন রয়ে গেছে সে যেনো আমার কাছে আসে (এবং তা নিয়ে নেয়)। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি আবূ বাকার (রাঃ) এর কাছে এসে তাঁকে জানালাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছিলেন, যদি বাহরাইন থেকে অর্থ-সম্পদ আসে তা হলে তোমাকে আমি এতো পরিমান এতো পরিমান দেবো। (এতো পরিমান কথাটি) তিনবার বললেন। জাবির (রাঃ) বলেন, তখন আবূ বাকার (রাঃ) আমাকে অর্থ সম্পদ দিলেন। জাবির (রাঃ) বলেন, এর কিছুদিন পর আমি আবূ বাকার (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করলাম। এবং তার কাছে মাল চাইলাম। কিন্তু তিনি আমাকে কিছুই দিলেননা। এরপর আমি তাঁর কাছে দ্বিতীয়বার আসি, তিনি আমাকে কিছুই দেননি। এরপর আমি তাঁর কাছে তৃতীয়বার এলাম। তখনো তিনি আমাকে কিছুই দিলেননা। কাজেই আমি তাঁকে বললাম, ‘আমি আপনার কাছে এসেছিলাম, কিন্তু আপনি আমাকে দেননি। তারপর (আবার) এসেছিলাম, তখনো দেননি। এরপরেও এসেছিলাম তখনো আমাকে আপনি দেননি। কাজেই এখন হয়তো আপনি আমাকে সম্পদ দিবেন নয়তো আমি মনে করব, আপনি আমার ব্যাপারে কৃপনতা অবলম্বন করেছে’। তখন তিনি বললেন, এ কি বলছ তুমি ‘আমার ব্যাপারে কৃপনতা করছেন’। (তিনি বললেন) কৃপনতা থেকে মারাত্নক ব্যাধি আর কি হতে পারে। কথাটি তিনি তিনবার বললেন। (এরপর তিনি বললেন) যতবারই আমি তোমাকে সম্পদ দেয়া থেকে বিরত হয়েছি, ততবারই আমার ইচ্ছা ছিলো যে, (অন্য কোথাও থেকে) তোমাকে দেবো। আমর [ইবনু দীনার (রহঃ)] মুহাম্মদ ইবনু আলী (রহঃ) এর মাধ্যমে জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি আবূ বাকার (রাঃ) এর কাছে আসলে তিনি আমাকে বললেন, এ (আশরাফী) গুলো গুনো। আমি ঐগুলো গুনে দেখলাম এখানে পাঁচশ’ (আশরাফী) রয়েছে। তিনি বললেন, (ওখান থেকে) এ পরিমান আরো দু’বার তুলে নাও।
হাদিস নং - ৪০৪২
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ এবং ইসহাক ইবনু নাসর (রহঃ) হযরত আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি ও আমার ভাই ইয়ামান থেকে এসে অনেক দিন পর্যন্ত অবস্থান করেছি। এ সময়ে তাঁর [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর] খিদমতে ইবনু মাসউদ (রাঃ) ও তাঁর আম্মার অধিক আসা-যাওয়া ও ঘনিষ্ঠতার কারনে আমরা তাঁদেরকে তাঁর [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর] পরিবারেরই অন্তর্ভুক্ত মনে করেছিলাম।
হাদিস নং - ৪০৪৩
হযরত আবূ নুআইম (রহঃ) হযরত যাহদাম (রহঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আবূ মূসা (রাঃ) এ এলাকায় এসে জারম গোত্রের লোকদেরকে মর্যাদাবান করেছেন। একদা আমরা তাঁর কাছে বসা ছিলাম। এ সময়ে তিনি মুরগীর গোশত দিয়ে দুপুরের খানা খাচ্ছিলেন। উপস্থিতদের মধ্যে এক ব্যাক্তি বসা ছিল। তিনি তাকে খানা খেতে ডাকলেন। সে বলল, আমি মুরগীকে একটি (খারাপ) জিনিস খেতে দেখেছি। এ জন্য খেতে আমার অরুচি লাগছে। তিনি বললেন, এসো। কেননা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুরগী খেতে দেখেছি। সে বলল, আমি শপথ করে ফেলছি যে, এটি খাবোনা। তিনি বললেন, এসে পড়ো। তোমার শপথ সম্বন্ধে আমি তোমাকে জানোাচ্ছি যে, আমরা আশ’আরীদের একটি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে তাঁর কাছে সাওয়ারী চেয়েছিলাম। তিনি আমাদেরকে সাওয়ারী দিতে অস্বীকার করলেন। এরপর আমরা (পূনরায়) তাঁর [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর] কাছে সাওয়ারী চাইলাম। তিনি তখন শপথ করে ফেললেন যে, আমাদেরকে তিনি সাওয়ারী দেবেননা। কিছুক্ষন পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গনীমতের কিছু উট আনা হল। তিনি আমাদেরকে পাঁচটি করে উট দেয়ার আদেশ দিলেন। উটগুলো হাতে নেয়ার পর আমরা পরস্পর বললাম, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাঁর শপথ থেকে অমনোযোগী করে ফেলছি (এবং উট নিয়ে যাচ্ছি) এমন অবস্থায় কখনো আমরা কামিয়াব হতে পারবোনা। কাজেই আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি শপথ করেছিলেন যে, আমাদের সাওয়ারী দেবেননা। এখনতো আপনি আমাদের সাওয়ারী দিলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই। তবে আমার নিয়ম হল, আমি যদি কোন ব্যাপারে শপথ করি আর এর বিপরীত কোনটিকে এ অপেক্ষা উত্তম মনে করি তাহলে (শপথকৃত ব্যাপার ত্যাগ করি) উত্তমটিকেই গ্রহন করে নেই।
হাদিস নং - ৪০৪৪
হযরত আমর ইবনু আলী (রহঃ) হযরত ইমরান ইবনু হুসাইন (রহঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, বনী তামীমের লোকজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসলে তিনি তাদেরকে বললেন, হে বনী তামীম! খোশ-খবরী গ্রহন কর। তারা বলল, আপনি খোশ-খবরী তো দিলেন, কিন্তু আমাদেরকে (কিছু আর্থিক সাহায্য) দান করুন। কথাটি শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহেরা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। এমন সময়ে ইয়ামানী কিছু লোক আসল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বনী তামীম যখন খোশ-খবর গ্রহন করলোনা, তাহলে তোমরাই তা গ্রহন কর। তাঁরা বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আমরা তা কবুল করলাম।
হাদিস নং - ৪০৪৫
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ আল-জু’ফী (রহঃ) হযরত আবূ মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামানের দিকে তাঁর হাত দিয়ে ইশারা করে বলেছেন, ঈমান হল ওখানে। আর কঠোরতা ও হৃদয়হীনতা হল রাবীয়া ও মুযার গোত্রদ্বয়ের সেসব মানুষের মধ্যে যারা উটের লেজের কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার দেয়, যেখান থেকে উদিত হয়ে থাকে শয়তানের উভয় শিং।
হাদিস নং - ৪০৪৬
হযরত মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, ইয়ামানবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। তাঁরা অন্তরের দিক থেকে অত্যন্ত কোমল ও দরদী। ঈমান হল ইয়ামানীদের, হিকমত হল ইয়ামানীদের, আত্নম্ভরিতা ও অহংকার রয়েছে উট-ওয়ালাদের মধ্যে, বকরী পালকদের মধ্যে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য। গুনদুর (রহঃ) এ হাদীসটি শুবা-সুলায়মান-যাকওয়ান (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ননা করেছেন।
হাদিস নং - ৪০৪৭
হযরত ইসমাঈল (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ঈমান হল ইয়ামানীদের, আর ফিতনার (বিপর্যয়ের) গোড়া হল ওখানে, যেখানে উদিত হয় শয়তানের শিং।
হাদিস নং - ৪০৪৮
হযরত আবূল ইয়ামান (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, ইয়ামানবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। তাঁরা অন্তরের দিক থেকে অত্যন্ত কোমল। আর মনের দিক থেকে অত্যন্ত দয়ার্দ্র। ফিকাহ্ হল ইয়ামানীদের আর হিকমাত হল ইয়ামানীদের।
হাদিস নং - ৪০৪৯
হযরত আবদান (রহঃ) হযরত আলকামা (রহঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমরা ইবনু মাসউদ (রাঃ) এর কাছে বসা ছিলাম। তখন সেখানে হযরত খাববাব (রাঃ) এসে বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান ইবনু মাসউদ)! এসব তরুন কি আপনার তিলাওয়াতের মতো তিলাওয়াত করতে পারে? তিনি বললেন, আপনি যদি চান তাহলে একজনকে হুকুম দেই যে, সে আপনাকে তিলাওয়াত করে শোনাবে। তিনি বললেন, অবশ্যই। ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, ওহে আলকামা, পড় তো। তখন যিয়াদ ইবনু হুদায়রের ভাই যায়েদ ইবনু হুদায়র বলল, আপনি আলকামাকে পড়তে হুকুম করেছেন, অথচ সে তো আমাদের মধ্যে ভাল তিলাওয়াতকারী নয়। ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, যদি তুমি চাও, তাহলে আমি তোমার গোত্র ও তার গোত্র সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেছেন তা জানিয়ে দিতে পারি। (আলকামা বলেন) এরপর আমি সূরায়ে মারয়াম থেকে পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করলাম। আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, আপনার কেমন মনে হয়? তিনি বললেন, বেশ ভালোই পড়েছে। আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, আমি যা কিছু পড়ি, তার সবই সে পড়ে নেয়। এরপর তিনি হযরত খাববাব (রাঃ) এর দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, তার হাতে একটি সোনার আংটি। তিনি বললেন, এখনো কি এ আংটি খুলে ফেলার সময় হয়নি? হযরত খাববাব (রাঃ) বললেন, ঠিক আছে, আজকের পর আর এটি আমার হাতে দেখতে পাবেননা। এ কথা বলে তিনি আংটিটি ফেলে দিলেন। হাদীসটি হযরত গুনদুর (রহঃ) শু’বা (রহঃ) থেকে বর্ননা করেছেন।
হাদিস নং - ৪০৫০
হযরত আবূ নুআইম (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, তুফায়েল ইবনু আমর (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, দাওস গোত্র হালাক হয়ে গেছে। তারা নাফরমানী করেছে এবং (দ্বীনের দাওয়াত) গ্রহন করতে অস্বীকার করেছে। সুতরাং আপনি তাদের প্রতি বদদোয়া করুন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আল্লাহ্! দাওস গোত্রকে হিদায়েত দান করুন এবং (দ্বীনের দিকে) নিয়ে আসুন।
হাদিস নং - ৪০৫১
হযরত মুহাম্মদ ইবনুল আলা (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসার জন্য রওয়ানা হয়ে রাস্তার মধ্যে বলেছিলাম, হে সুদীর্ঘ ও চরম পরিশ্রমের রাত! (তবে) এ রাত আমাকে দারুল কুফর থেকে মুক্তি দিয়েছে। (এটই আমার পরম পাওয়া) আমার একটি গোলাম ছিল। আসার পথে সে পালিয়েগেল। এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বায়আত করলাম। এরপর একদিন আমি তাঁর [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর] খেদমতে বসা ছিলাম। এমন সময় গোলামটি এসে হাযির। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবূ হুরায়রা! এই যে তোমার গোলাম (নিয়ে যাও)। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সে আযাদ- এই বলে আমি তাকে আযাদ করে দিলাম।
হাদিস নং - ৪০৫২
হযরত মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) হযরত আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমরা একটি প্রতিনিধি দলসহ হযরত উমর (রাঃ) এর দরবারে আসলাম। তিনি প্রত্যেকের নাম নিয়ে একজন একজন করে ডাকতে শুরু করলেন। তাই আমি বললাম, হে আমিরুল মু’মিনীন! আপনি কি আমাকে চিনেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ চিনি। লোকজন যখন ইসলামকে অস্বীকার করেছিল তখন তুমি ইসলাম গ্রহন করেছ। লোকজন যখন পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিল তখন তুমি সম্মুখে অগ্রসর হয়েছ। লোকেরা যখন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তুমি তখন ইসলামের ওয়াদা পূরন করেছ। লোকেরা যখন দ্বীনের সত্যতা অস্বীকার করেছিল তুমি তখন দ্বীনকে হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেছ। এ কথা শুনে আদী (রাঃ) বললেন, তা হলে এখন আমার কোন চিন্তা নেই।
হাদিস নং - ৪০৫৩
হযরত ইসমাঈল ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জে (হজ্জ) (মক্কার পথে) রওয়ানা হই। তখন আমরা উমরার (নিয়্যতে) ইহরাম বাঁধি। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষনা দিলেন, যাদের সঙ্গে কুরবানীর পশু রয়েছে, তারা যেন হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরা উভয়ের একসাথে ইহরামের নিয়্যত করে এবং হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার অনুষ্ঠানাদি সমাধা করার পূর্বে হালাল না হয়। এভাবে তাঁর [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর] সঙ্গে আমি মক্কায় পৌঁছি এবং ঋতুবতী হয়ে পড়ি। এ কারনে আমি বায়তুল্লায় তাওয়াফ- এর সাফা ও মারওয়ার সায়ী করতে পারলামনা। এ খবর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবহিত করলাম। তখন তিনি বললেন, তুমি তোমার মাথার চুল ছেড়ে দাও এবং মাথা (চিরুনি দ্বারা) আঁচড়াও আর কেবল হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বাঁধ ও উমরা ছেড়ে দাও। আমি তাই করলাম। এরপর আমরা যখন হাজ্জের (হজ্জের) কাজসমূহ সম্পন্ন করলাম, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর পুত্র (আমার ভাই) আবদুর রহমান (রাঃ) এর সঙ্গে তানঈম নামক স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। সেখান থেকে (ইহরাম বেঁধে) উমরা আদায় করলাম। তখন তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, এই উমরা তোমার পূর্বের কাযা উমরার পরিপূরক হল। হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, যারা উমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন তারা বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করে এবং সাফা ও মারওয়া সায়ী করার পর হালাল হয়ে যান এবং পরে মিনা থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর আর এক তাওয়াফ আদায় করেন। আর যাঁরা হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার ইহরাম এক সাথে বাঁধেন (হাজ্জে (হজ্জ) কিরানে), তাঁরা কেবল এক তাওয়াফ আদায় করেন।
হাদিস নং - ৪০৫৪
হযরত আমর ইবনু আলী (রহঃ) হযরত ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, মুহরিম ব্যাক্তি যখন বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করল তখন সে তাঁর ইহরাম থেকে হালাল হয়ে গেল। আমি ইবনু জুরায়জ) জিজ্ঞাসা করলাম যে, ইবনু আববাস (রাঃ) এ কথা কি করে বলতে পারেন? (যে সাফা ও মারওয়া সায়ী করার পূর্বে কেউ হালাল হতে পারে।)রাবী আতা (রহঃ) উত্তর বলেন, আল্লাহ্ তা’আলার এই কালামের দলীল থেকে যে, এরপর তার হালাল হওয়ার স্থল হচ্ছে বায়তুল্লাহ্ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁর সাহাবীদের হুজ্জাতুল বিদায় (এ কাজের পরে) হালাল হয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়ার ঘটনা থেকে। আমি বললাম, এ হুকুম তো আরাফা-এ উকুফ করার পর প্রযোজ্য। তখন আতা (রহঃ) বললেন, ইবনু আববাস (রাঃ) এর মতে উকুফে আরাফার পূর্বে ও পরে উভয় অবস্থায়ই এ হুকুম প্রযোজ্য।
হাদিস নং - ৪০৫৫
হযরত বায়ান (রহঃ) হযরত আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি (বিদায় হাজ্জে (হজ্জ)) মক্কার বাত্হা নামক স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মিলিত হলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বেঁধেছ?’ আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি আমাকে (পূনরায়) জিজ্ঞাসা করলেন, কোন প্রকার হাজ্জের (হজ্জ) ইহরামের নিয়ত করেছ? আমি বললাম, ‘আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইহরামের মতো ইহরামের নিয়্যত করে তালবিয়া পড়েছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ কর এবং সাফা ও মারওয়া সায়ী কর। এরপর (ইহরাম খুলে) হালাল হয়ে যাও। তখন আমি বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করলাম ও সাফা এবং মারওয়া সায়ী করলাম। এরপর আমি কায়েস গোত্রে এক মহিলার কাছে গেলাম, সে আমার চুল আঁচড়ে (ইহরাম থেকে মুক্ত করে) দিল।
হাদিস নং - ৪০৫৬
হযরত ইবরাহীম ইবনু মুনযির (রহঃ) হযরত ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী হযরত হাফসা (রাঃ) ইবনু উমর (রাঃ) কে জানিয়েছেন যে, বিদায় হাজ্জের (হজ্জ) বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দেন। তখন হযরত হাফসা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি কারনে হালাল হচ্ছেননা? তদুত্তরে তিনি বললেন, আমি আঠা (গাম) জাতীয় বস্তু দ্বারা আমার মাথার চুল জমাট করে ফেলেছি এবং কুরবানীর পশুর (নিদর্শনস্বরুপ) গলায় চর্ম বেঁধে (গলতানী বা গলকন্ঠ) দিয়েছি। কাজেই, আমি আমার (হাজ্জ (হজ্জ) সমাধা করার পর) কুরবানীর পশু যবেহ্ করার পূর্বে হালাল হতে পারবনা।
হাদিস নং - ৪০৫৭
হযরত আবূল ইয়ামান (রহঃ) হযরত আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, আশআম গোত্রের এক মহিলা বিদায় হাজ্জের (হজ্জ) সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞাসা করে। এ সময় ফজল ইবনু আববাস (রাঃ) (একই যানবাহনে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে উপবিষ্ট ছিলেন। মহিলাটি আবেদন করল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি হাজ্জ (হজ্জ) ফরয করেছেন। আমার পিতার উপর তা এমন অবস্থায় ফরয হল যে, তিনি অতীব বয়োবৃদ্ধ। যে কারনে যানবাহনের উপর সোজা হয়ে বসতেও সমর্থ নন। এমতাবস্থায় আমি তাঁর পক্ষ থেকে (নায়েবী) হাজ্জ (হজ্জ) আদায় করলে তা আদায় হবে কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ।
হাদিস নং - ৪০৫৮
হযরত মুহাম্মদ (রহঃ) হযরত ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, ফতেহ মক্কার বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে চললেন। তিনি (তাঁর) কাসওয়া নামক উটনীর উপর উসামা (রাঃ) কে পিছনে বসালেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিলাল ও উসমান ইবনু তালহা (রাঃ)। অবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাঁর বাহনকে) বায়তুল্লাহর নিকট বসালেন। তারপর উসমান ইবনু তালহা) (রাঃ) কে বললেন, আমার কাছে চাবি নিয়ে এসো। তিনি তাঁকে চাবি এনে দিলেন। এরপর কা’বা শরীফের দরজা তাঁর জন্য খোলা হল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , উসামা, বিলাল এবং উসমান (রাঃ) কা’বা ঘরে প্রবেশ করলেন। তারপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। এরপর তিনি দিবা ভাগের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন এবং পরে বের হয়ে আসেন। তখন লোকেরা কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার জন্য তাড়াহুড়া করতে থাকে। আর আমি তাদের অগ্রগামী হই এবং বিলাল (রাঃ) কে কাবার দরজার পিছনে দাঁড়ানো অবস্থায় পাই। তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন স্থানে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন? তিনি বললেন, ঐ সামনের দু’ স্তম্ভের মাঝখানে। এ সময় বায়তুল্লায় দুই সারিতে ছয়টি স্তম্ভ ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনের দুই খামের মাঝখানে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহর দরজা তাঁর পিছনে রেখেছিলেন এবং তাঁর চেহারা মুবারক ছিল আপনার বায়তুল্লায় প্রবেশকালে সামনে যে দেয়াল পড়ে সেদিকে। ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন তা জিজ্ঞাসা করতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আর যে স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছিলেন সেখানে লাল বর্নের মর্মর পাথর ছিল।
হাদিস নং - ৪০৫৯
হযরত আবূল ইয়ামান (রহঃ) হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিনী হুয়াই এর কন্যা হযরত সাফিয়া (রাঃ) বিদায় হাজ্জের (হজ্জ) সময় ঋতুবতী হয়ে পড়েন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কি আমাদের (মদিনার পথে প্রত্যাবর্তনে) বাঁধ সাধল? তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , তিনি তো তাওয়াফে যিয়ারাহ্ আদায় করে নিয়েছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে সেও রওয়ানা করুক।
হাদিস নং - ৪০৬০
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনু সুলাইমান (রহঃ) হযরত ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকাবস্থায় আমরা বিদায় হাজ্জ (হজ্জ) সম্পর্কে আলোচনা করতাম। আর আমরা বিদায় হাজ্জ (হজ্জ) কাকে বলে তা জানতামনা। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা বর্ননা করেন। তারপর তিনি মাসীহ্ দাজ্জাল সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং বলেন, আল্লাহ্ এমন কোন নাবী প্রেরন করেননি যিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক করেননি। নূহ (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর পরবর্তী নাবী গনও তাঁদের উম্মতগনকে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সে তোমাদের মধ্যে প্রকাশিত হবে। তার অবস্থা তোমাদের উপর প্রচ্ছন্ন থাকবেনা। তোমাদের কাছে এও অস্পষ্ট নয় যে, তোমাদের রব (আল্লাহ্) এক চোখ কানা নন। অথচ দাজ্জালের ডান চোখ কানা হবে। যেন তার চোখ একটি ফোলা আঙ্গুর। তোমরা সতর্ক থাক। আজকের এ দিন, এ শহর এবং এ মাসের মতো আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের শোণিত ও তোমাদের সম্পদকে তোমাদের উপর হারাম করেছেন। তোমরা লক্ষ্য কর, আমি কি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি। সমবেত সকলে বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, হে আল্লাহ্, আপনি সাক্ষী থাকুন। তিনি একথা তিনবার বললেন, (তারপর বললেন), তোমাদের জন্য পরিতাপ অথবা তিনি বললেন, তোমাদের জন্য আফসোস, সতর্ক থেকেো, আমার পরে তোমরা কুফরের দিকে প্রত্যাবর্তন করো না যে, একে অপরের গর্দান মারবে।
হাদিস নং - ৪০৬১
হযরত আমর ইবনু খালিদ (রহঃ) হযরত যায়েদ ইবনু আরকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঊনিশটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহন করেন। আর হিজরতের পর তিনি কেবল একটি হাজ্জ (হজ্জ) আদায় করেন। এরপর তিনি আর কোন হাজ্জ (হজ্জ) আদায় করেননি এবং তা হল বিদায় হাজ্জ (হজ্জ)। আবূ ইসহাক (রহঃ) বলেন, মক্কায় অবস্থানকালে তিনি (নফল) হাজ্জ (হজ্জ) আদায় করেন।
হাদিস নং - ৪০৬২
হযরত হাফস ইবনু উমর (রাঃ) হযরত জারির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জারীর (রাঃ)- কে বিদায় হাজ্জে (হজ্জ) বললেন, লোকজনকে চুপ থাকতে বলো। তারপর বললেন, মনে রেখ! আমার ইন্তেকালের পর তোমরা কাফিরে পরিনত হয়োনা যে, একে অপরের গর্দান মারবে।
হাদিস নং - ৪০৬৩
হযরত মুহাম্মদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) হযরত আবূ বাকরা (রাঃ) এর সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সময় ও কাল আবর্তিত হয় নিজ চক্রে ও অবস্থায়। যেদিন থেকে আল্লাহ্ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এক বছর বারো মাসে হয়ে থাকে। এর মধ্যে চার মাস সম্মানিত। তিনমাস পরপর আসে- যেমন যিলকদ, যিলহাজ্জ ও মুহাররাম এবং রজব মুদার যা জমাদিউল আখির ও শা’বান মাসের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে থাকে। (এরপর তিনি প্রশ্ন করলেন) এটি কোন মাস? আমরা বললাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল) -ই অধিক জানেন। এরপর তিনি চুপ থাকলেন। এমনকি আমরা ধারনা করলাম যে, হয়তো বা তিনি অচিরেই এ মাসের অন্য কোন নাম রাখবেন। (তারপর) তিনি বললেন, এ কি যিলহাজ্জ মাস নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কোন শহর? আমরা বললাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল) -ই অধিক জানেন। তারপর তিনি চুপ থাকলেন। আমরা ধারনা করলাম যে, হয়ত বা তিনি অচিরেই এ শহরের অন্য কোন নাম রাখবেন। তারপর তিনি বললেন, এটি কি (মক্কা) শহর নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিনটি কোন দিন? আমরা বললাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল) -ই ভালো জানেন। তারপর তিনি চুপ থাকলেন। এতে আমরা মনে করলাম যে, তিনি এ দিনটির অন্য কোন নামকরন করবেন। তারপর তিনি বললেন, এটি কি কুরবানীর দিন নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। এরপর তিনি বললেন, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ; (রাবী) মুহাম্মদ বলেন, আমার ধারনা যে, তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] আরও বলেছিলেন, তোমাদের মান-ইজ্জত তোমাদের উপর পবিত্র, যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের এই দিন, তোমাদের এই শহর ও তোমাদের এই মাস। তোমরা অচিরেই তোমাদের রবের সাথে মিলিত হবে। তখন তিনি তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। খবরদার! তোমরা আমার ওফাতের পরে বিভ্রান্ত হয়ে পড়োনা যে, একে অপরের গর্দান মারবে। শোন, তোমাদের উপস্থিত ব্যাক্তি অনুপস্থিত ব্যাক্তিকে আমার পয়গাম পৌঁছে দেবে। এটা বাস্তব যে, অনেক সময় যে প্রত্যক্ষভাবে শ্রবন করেছে তার থেকেও প্রচারকৃত ব্যাক্তি অধিকতর সংরক্ষণকারী হয়ে থাকে। (রাবী) মুহাম্মদ [ইবনু সীরীন (রহঃ)] যখনই এ হাদীস বর্ননা করতেন তখন তিনি বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যই বলেছেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জেনে রাখ, আমি কি (আল্লাহর বানী তোমাদের কাছে) পৌঁছিয়ে দিয়েছি? এভাবে দু’বার বললেন।
হাদিস নং - ৪০৬৪
হযরত মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) হযরত তারিক ইবনু শিহাব (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, একদল ইহুদী বলল, যদি এ আয়াত আমাদের প্রতি অবতীর্ন হতো, তাহলে আমরা উক্ত অবতরনের দিনকে ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করতাম। তখন হযরত উমর (রাঃ) তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, কোন আয়াত? তারা বলল, এই আয়াতঃ ‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন (জীবন-বিধান) কে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ন করলাম। (৫:৩)। তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেন, কোন স্থানে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল তা আমি জানি। এ আয়াত নাযিল হওয়ার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফা ময়দানে (জাবালে রহমতে) দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন।
হাদিস নং - ৪০৬৫
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, তিনি বলেন, আমরা (মদিনা মুনাওয়ারা থেকে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ উমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন আর কেউ কেউ হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম, আবার কেউ কেউ হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরা উভয়ের ইহরাম বেঁধেছিলেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বেঁধেছিলেন। যাঁরা শুধু হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বাঁধেন অথবা হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার ইহরাম একসঙ্গে বাঁধেন, তারা কুরবানীর দিন দশই যিলহাজ্জ এর পূর্বে হালাল হতে পারবেনা।
হাদিস নং - ৪০৬৬
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) হযরত মালিক (রহঃ) থেকে বর্ননা করেন, তিনি বলেন, উপরোক্ত ঘটনা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জ (হজ্জ)কালীন সময়ের। ইসমাঈল (রহঃ) সূত্রেও মালিক (রহঃ) থেকে অনু্রুপ বর্নিত আছে।
হাদিস নং - ৪০৬৭
হযরত আহমদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) হযরত সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস) (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জের (হজ্জ) সময় আমি বেদনাজনিত মরনাপন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আমার রোগ যে কঠিন আকার ধারন করেছে তা আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। আমি একজন বিত্তশালী লোক অথচ আমার একমাত্র কন্যা ব্যতীত অন্য কোন উত্তরাধিকারী নেই। এমতাবস্থায় আমি কি আমার সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ সা’দকা১ করে দেব? তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, ‘‘না’’। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তবে কি আমি এর অর্ধেক সা’দকা করে দেব? তিনি বললেন, ‘‘না’’। আমি বললাম, এক-তৃতীয়াংশ, তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ, এক তৃতীয়াংশ অনেক। তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের সচ্ছল অবস্থায় ছেড়ে যাওয়া তাদেরকে অভাবগ্রস্থ অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম- যারা পরে মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। আর তুমি যা-ই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্ত খরচ কর, তার বিনিময়ে তোমাকে প্রতিদান প্রদান করা হবে। এমনকি যে লোকমা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে ধর তারও। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি আমার সাথীদের পিছনে পড়ে থাকব? তিনি বললেন, তুমি পিছনে পড়ে থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করবে তা দ্বারা তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে ও সমুন্নত হবে। সম্ভবত তুমি পিছনে থেকে যাবে। ফলে তোমার দ্বারা এক সম্প্রদায় উপকৃত হবে। অন্য সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ইয়া আল্লাহ্! আমার সাহাবীদের হিজরত আপনি জারী রাখুন এবং তাদের পিছনের দিকে ফিরিয়ে দিবেননা। কিন্তু আফসোস সা’দ ইবনু খাওলা (রাঃ) এর জন্য, (রাবী বলেন) মক্কায় তাঁর মৃত্যু হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। ১) নিছক আল্লাহর জন্য তাঁর পথে দান করা।
হাদিস নং - ৪০৬৮
হযরত ইবরাহীম ইবনু মুনযির (রহঃ) হযরত নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্নিত, ইবনু উমর (রাঃ) তাঁদেরকে অবহিত করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জে (হজ্জ) তাঁর মাথা মুন্ডন করেছিলেন।
হাদিস নং - ৪০৬৯
হযরত উবায়দুল্লাহ্ ইবনু সাঈদ (রহঃ) হযরত নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্নিত, ইবনু উমর (রাঃ) তাঁকে অবহিত করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জে (হজ্জ) তাঁর মাথা মুন্ডন করেন এবং তাঁর সাহাবীদের অনেকেই আর তাঁদের কেউ কেউ মাথার চুল ছেঁটে ফেলেন।
হাদিস নং - ৪০৭০
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনু কাযাআ ও লায়িস (রহঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি গাধায় আরোহন করে রওয়ানা হন। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জ (হজ্জ)কালে মিনায় দাঁড়িয়ে লোকদের নিয়ে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করছিলেন। তখন গাধাটি সালাত (নামায/নামাজ)-এর একটি কাতারের সামনে এসে পড়ে। এরপর তিনি গাধার পিঠ থেকে অবতরন করেন এবং তিনি লোকদের সঙ্গে সালাত (নামায/নামাজ)-এর কাতারে সামিল হন।
হাদিস নং - ৪০৭১
হযরত মূসা’দ্দাদ (রহঃ) হিশামের পিতা [হযরত উরওয়া (রহঃ)] থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমার উপস্থিতিতে উসামা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিদায় হাজ্জের (হজ্জ) সফর সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে বললেন, মধ্যম গতিতে চলেছেন আবার যখন প্রশস্ত পথ পেয়েছেন তখন দ্রুতগতিতে চলেছেন।
হাদিস নং - ৪০৭২
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) হযরত আবূ আইউব (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জে (হজ্জ) (মুযদালিফায়) মাগরিব ও এশার সালাত (নামায/নামাজ) এক সাথে আদায় করেছেন।
হাদিস নং - ৪০৭৩
হযরত মুহাম্মদ ইবনু আলা (রহঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমার সাথীরা আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পাঠালেন তাদের জন্য যানবাহন চাওয়ার জন্য। কারন তাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে কঠিনতর যুদ্ধ অর্থাৎ তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহনেচ্ছু ছিলেন। অনন্তর আমি এসে বললাম, হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার সাথীরা আমাকে আপনার সমীপে এ জন্য পাঠিয়েছেন যে, আপনি যেন তাদের জন্য যানবাহনের ব্যাবস্থা করেন। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি রাগান্বিত। অথচ আমি তা অবগত নই। আর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যানবাহন না দেয়ার কারনে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফিরে আসি। আবার এ ভয়ও ছিল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হৃদয়ে আমার প্রতি না আবার অসন্তোষ আসে। তাই আমি সাথীদের কাছে ফিরে যাই এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তা আমি তাদের অবহিত করি। পরক্ষনেই শুনতে পেলাম যে হযরত বিলাল (রাঃ) ডাকছেন এ বলে যে, আবদুল্লাহ ইবনু কায়স কোথায়? তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তখন তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে ডাকছেন, আপনি উপস্থিত হোন। আমি যখন তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম তখন তিনি বললেন, এই জোড়া এবং ঐ জোড়া এমনি ছয়টি উটনী যা সা’দ থেকে ক্রয় করা হয়েছে, তা গ্রহন কর। এবং সেগুলো তোমার সাথীদের কাছে নিয়ে যাও। এবং বল যে, আল্লাহ্ তায়ালা (রাবীর সন্দেহ) অথবা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলো তোমাদের যানবাহনের জন্য ব্যাবস্থা করেছেন, তোমরা এগুলোর উপর আরোহন কর। এরপর আমি সেগুলোসহ তাদের কাছে গেলাম এবং বললাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকে তোমাদের বাহন হিসেবে দিয়েছেন। আল্লাহর কসম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা যারা শুনেছিল আমার সাথে তোমাদের কেউ এমন কারুর কাছে না যাওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদের চলে যেতে দিতে পারিনা- যাতে তোমরা এমন ধারনা না কর যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেননি, আমি তা তোমাদের বর্ণনা করেছি। তখন তারা আমাকে বললেন, আল্লাহর কসম, আপনি আমাদের কাছে সত্যবাদী বলে খ্যাত। তবুও আপনি যা পছন্দ করেন, আমরা অবশ্য করব। অনন্তর আবূ মূসা (রাঃ) তাদের মধ্যকার একদল লোককে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন এবং যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অপারগতা প্রকাশ এবং পরে তাদেরকে দেয়ার কথা শুনেছিলেন, তাদের কাছে আসেন। এরপর তাদের কাছে সেরুপ ঘটনা বর্ননা করলেন যেমন আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) বর্ননা করেছিলেন।
হাদিস নং - ৪০৭৪
হযরত মূসা’দ্দাদ (রহঃ) হযরত মুসআব ইবনু সা’দ তাঁর পিতা (আবূ ওয়াক্কাস) (রাঃ) থেকে বর্ননা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধাভিযানে রওয়ানা হন। আর আলী (রাঃ) কে খলীফা মনোনীত করেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, আপনি কি আমাকে শিশু ও মহিলাদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি এ কথায় রাযী নও যে, তুমি আমার কাছে সে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবে যেমন হযরত হারুন (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হযরত মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পক্ষ থেকে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবে এতোটুকু পার্থক্য যে, (তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আর) আমার পরে আর কোন নাবী নেই। আবূ দাউদ (রহঃ) বলেন, শু’বা (রহঃ) আমাকে হাকাম (রহঃ) থেকে বর্ননা করেন যে, তিনি বলেন, আমি মুসআব (রহঃ) থেকে শুনেছি।
হাদিস নং - ৪০৭৫
হযরত উবায়দুল্লাহ্ ইবনু সাঈদ (রহঃ) সাফওয়ান এর পিতা ইয়ালা ইবনু উমাইয়া (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে উসরা এর যুদ্ধে অংশগ্রহন করি। ইয়ালা বলতেন যে, উক্ত যুদ্ধ আমার কাছে নির্ভরযোগ্য আমলের অন্যতম বলে বিবেচিত হতো। হযরত আতা (রহঃ) বলেন যে, সাফওয়ান বলেছেন, ইয়ালা (রাঃ) বর্ননা করেন, আমার একজন (দিনমজুর) চাকর ছিল, সে একবার এক ব্যাক্তির সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হল এবং এক পর্যায়ে একজন অন্যজনের হাত দাঁত দ্বারা কেটে ফেলল। আতা (রহঃ) বলেন, আমাকে সাফওয়ান (রহঃ) অবহিত করেছেন যে, উভয়ের মধ্যে কে কার হাত দাঁত দ্বারা কেটেছিল তার নাম আমি ভুলে গেছি। রাবী বলেন, আহত ব্যাক্তি ঘাতকের মুখ থেকে নিজ হাত মুক্ত করার পর দেখা গেল, তার সম্মুখের দুটো দাঁত উৎপাটিত হয়ে গেছে। তারপর তারা এ মামলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমীপে পেশ করে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাঁতের ক্ষতিপূরনের দাবি বাতিল করেছেন। আতা (রহঃ) বলেন যে, আমার ধারনা যে, বর্ননাকারী এ কথাও বলেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তবে কি সে তার হাত তোমার মুখে চিবানোর জন্য ছেড়ে দিবে? যেমন উটের মুখে চিবানোর জন্য ছেড়ে দেয়া হয়?
হাদিস নং - ৪০৭৬
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনু কা’আব ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্নিত, কা’আব (রাঃ) অন্ধ হয়ে গেলে তাঁর সন্তানদের মধ্যে থেকে যিনি তাঁর সাহায্যকারী ও পথ-প্রদর্শনকারী ছিলেন, তিনি (আবদুল্লাহ) বলেন, আমি কা’আব ইবনু মালিক (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, যখন তাবুক যুদ্ধ থেকে তিনি পশ্চাতে থেকে যান তখনকার অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন তার মধ্যে তাবুক যুদ্ধ ছাড়া আমি কোন যুদ্ধ থেকে পেছনে থাকিনি। তবে আমি বদর যুদ্ধেও অংশগ্রহন করিনি। কিন্তু উক্ত যুদ্ধ থেকে যারা পেছনে পড়ে গেছেন, তাদের কাউকে ভৎসনা করা হয়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল কুরাইশ দলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁদের এবং তাঁদের শত্রুবাহিনীর মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবা রজনীতে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে ইসলামের উপর অঙ্গীকার গ্রহন করেন, আমি তখন তাঁর সঙ্গে ছিলাম। ফলে বদর প্রান্তরের উপস্থিতিকে আমি প্রিয়তর ও শ্রেষ্ঠতর বলে বিবেচনা করিনি। যদিও আকাবার ঘটনা অপেক্ষা লোকদের মধ্যে বদরের ঘটনা অধিক প্রসিদ্ধ ছিল। আর আমার অবস্থার বিবরন এই- তাবুক যুদ্ধ থেকে আমি যখন পেছনে থাকি তখন আমি এত অধিক সুস্থ, শক্তিশালী ও সচ্ছল ছিলাম যে আল্লাহর কসম, আমার কাছে কখনো ইতিপূর্বে কোন যুদ্ধে একই সাথে দু’টো যানবাহন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, যা আমি এ যুদ্ধের সময় সংগ্রহ করেছিলাম। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অভিযান পরিচালনার সংকল্প গ্রহন করতেন, দৃশ্যত তার বিপরীত ভাব দেখাতেন। এ যুদ্ধ ছিল ভীষন উত্তাপের সময়, অতি দূরের সফর, বিশাল মরুভূমি এবং অধিক সংখ্যক শত্রুসেনার মুকাবিলা করার। কাজেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযানের অবস্থা মুসলমানদের কাছে প্রকাশ করে দেন যেন তারা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সম্বল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গী লোক সংখ্যা ছিল অধিক যাদের হিসাব কোন রেজিষ্ট্রারে লিখিত ছিলনা। কা’আব (রাঃ) বলেন, যার ফলে যেকোনো লোক যুদ্ধাভিযান থেকে বিরত থাকতে ইচ্ছা করলে তা সহজেই করতে পারত এবং ওহী মারফত এ খবর পরিজ্ঞাত না করা পর্যন্ত তা সংগোপন থাকবে বলে সে ধারনা করত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এমন সময় যখন ফল-ফলাদি পাকার ও গাছের ছায়ায় আরাম উপভোগের সময় ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং এবং তাঁর সঙ্গী মুসলিম বাহিনী অভিযানে যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহন করে ফেলেন। আমিও প্রতি সকালে তাঁদের সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহন করতে থাকি। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনি। মনে মনে ধারনা করতে থাকি, আমি তো যখন ইচ্ছা যেতে সক্ষম। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আমার সময় কেটে যেতে লাগল। এদিকে অন্য লোকেরা পুরাপুরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলল। ইতিমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথী মুসলিমগন রওয়ানা করলেন অথচ আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারলামনা। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, এক দু’দিনের মধ্যে আমি প্রস্তুত হয়ে পরে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হব। এভাবে আমি প্রতিদিন বাড়ি হতে প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন করার মানসে বের হই, কিন্তু কিছু না করেই ফিরে আসি। আবার বের হই, আবার কিছু না করে ঘরে ফিরে আসি। ইত্যবসরে বাহিনী অগ্রসর হয়ে অনেক দূর চলে গেল। আর আমি রওয়ানা করে তাদের সাথে পথে মিলে যাবার ইচ্ছা পোষন করতে থাকলাম। আফসোস যদি আমি তাই করতাম! কিন্তু তা আমার ভাগ্যে জোটেনি। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা হওয়ার পর আমি লোকদের মধ্যে বের হয়ে তাদের মাঝে বিচরন করতাম। একথা আমার মনকে পীড়া দিত যে, আমি তখন (মদিনায়) মুনাফিক এবং দুর্বল ও অক্ষম লোক ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আমার কথা আলোচনা করেননি। অনন্তর তাবুকে একথা জনতার মধ্যে উপবিষ্টাবস্থায় জিজ্ঞাসা করে বসলেন, কা’আব কি করল? বনী সালমা গোত্রের এক লোক বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ধন-সম্পদ ও আত্নগরিমা তাকে আসতে দেয়নি। একথা শুনে হযরত মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) বললেন, তুমি যা বললে তা ঠিক নয়। ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কসম, আমরা তাঁকে উত্তম ব্যাক্তি বলে জানি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। কা’আব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন আমি যখন অবগত হলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা মুনাওয়ারার দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন, তখন আমি চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়লাম এবং মিথ্যার বাহানা খুঁজতে থাকলাম। মনে স্থির করলাম, আগামীকাল এমন কথা বলব, যাতে করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্রোধকে প্রশমিত করতে পারি। আর এ সম্পর্কে আমার পরিবারস্থ জ্ঞানীগুনীদের থেকে পরামর্শ গ্রহন করতে থাকি। এরপর যখন প্রচারিত হল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে পৌঁছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা তিরোহিত হয়ে গেল। আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মালো যে, এমন কোন পন্থা অবলম্বন করে আমি তাঁকে কখনো ক্রোধমুক্ত করতে সক্ষম হবোনা, যাতে মিথ্যার নামগন্ধ থাকে। অতএব আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত গ্রহন করলাম যে, আমি সত্যই বলব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাতে মদিনায় পদার্পন করলেন। তিনি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন, তারপর লোকদের সামনে বসতেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরুপ করলেন, তখন যারা পশ্চাঁদপদ ছিলেন তারা তাঁর কাছে এসে শপথ করে করে অক্ষমতা ও আপত্তি পেশ করতে লাগল। এরা সংখ্যায় আশির অধিক ছিল। অনন্তর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহ্যিকভাবে তাদের ওযর-আপত্তি গ্রহন করলেন, তাদের বায়আত করলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত অবস্থা আল্লাহর হাওয়ালা করে দিলেন। [কা’আব (রাঃ) বলেন] আমিও এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেদমতে উপস্থিত হলাম। আমি যখন তাঁকে সালাম দিলাম তখন তিনি রাগান্বিত চেহেরায় মুচকি হাসি হাসলেন। তারপর বললেন, এসো। আমি সে অনুসারে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাঁর সম্মুখে বসে গেলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি কারনে তুমি অংশগ্রহন করলেনা? তুমি কি যানবাহন ক্রয় করনি? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ, করেছি। আল্লাহর কসম, এ কথা সুনিশ্চিত যে, আমি যদি আপনি ছাড়া অন্য কোন দুনিয়াদার ব্যাক্তির সামনে বসতাম তাহলে আমি তাঁর অসন্তুষ্টিকে ওযর-আপত্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রশমিত করার প্রয়াস চালাতাম। আর আমি তর্কে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি পরিজ্ঞাত যে, আজ যদি আমি আপনার কাছে মিথ্যা বলে আমার প্রতি আপনাকে রাযী করার চেষ্টা করি, তাহলেই অচিরেই মহান আল্লাহ্ তায়ালা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিতে পারেন। আর যদি আপনার কাছে সত্য প্রকাশ করি, যাতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তবুও আমি এতে মহান আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমা পাওয়ার নির্ঘাত আশা রাখিি। না, আল্লাহর কসম, আমার কোন ওযর ছিলনা। আল্লাহর কসম, সেই অভিযানে আপনার সাথে না যাওয়াকালীন সময় আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে সত্য কথাই বলেছে। তুমি এখন চলে যাও, যতদিনে না তোমার সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা ফায়সালা করে দেন। তাই আমি উঠে চলে গেলাম। তখন বনী সালিমার কতিপয় লোক আমার অনুসরন করল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম, তুমি ইতিপূর্বে কোন গুনাহ্ করেছ বলে আমাদের জানানেই। তুমি কি অন্যান্য পশ্চাঁদগামীর মতো তোমার অক্ষমতার একটি ওযর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পেশ করে দিতে পারতেনা? আর তোমার এ অপরাধের কারনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাই তো যথেষ্ট ছিল। আল্লাহর কসম, তারা আমাকে অনবরত কঠিনভাবে ভৎর্সনা করতে থাকে। ফলে আমি পূর্ব স্বীকারোক্তি থেকে প্রত্যাবর্তন করে মিথ্যা বলার বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করতে থাকি। এরপর আমি তাদের বললাম, আমার মতো এ কাজ আর কেউ করেছে কি? তারা জওয়াব দিল, হ্যাঁ, আরও দু’জন তোমার মতো বলেছে। এবং তাদের ক্ষেত্রেও তোমার মতো একই রুপ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কে কে? তারা বললো, একজন মুরারা ইবনু রবী আমরী এবং অপরজন হলেন হিলাল ইবনু উমায়্যা ওয়াকিফী। এরপর তারা আমাকে অবহিত করল যে, তারা উভয়ে উত্তম মানুষ এবং তারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন। সেজন্য উভয়ে আদর্শবান। যখন তারা তাদের নাম উল্লেখ করল, তখন আমি পূর্ব মতের উপর অটল রইলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যকার যে তিনজন তাবুকে অংশগ্রহন হতে বিরত ছিল তাদের সাথে কথা বলতে মুসলমানদের নিষেধ করে দিলেন। তদনুসারে মুসলমানরা আমাদের পরিহার করে চললো। আমাদের প্রতি তাদের আচরন পরিবর্তন করে নিল। এমনকি এদেশ যেন আমাদের কাছে অপরিচিত হয়ে গেল। এ অবস্থায় আমরা পঞ্চাশ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার অপর দু’জন সাথী তো সংকট ও শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হলেন। তারা নিজেদের ঘরে বসে কাঁদতে থাকেন। আর আমি যেহেতু অধিকতর যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম তাই বাইরে বের হয়ে আসতাম, মুসলমানদের জামাআতে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতাম। এবং বাজারে চলাফেরা করতাম কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতনা। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাযির হয়ে তাঁকে সালাম দিতাম। যখন তিনি সালাত (নামায/নামাজ) শেষে মজলিসে বসতেন তখন আমি মনে মনে বলতাম ও লক্ষ করতাম, তিনি আমার সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁটদ্বয় নেড়েছেন কিনা? তারপর আমি তাঁর নিকটবর্তী স্থানে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতাম এবং গোপন দৃষ্টিতে তাঁর দিকে দেখতাম যে, আমি যখন সালাত (নামায/নামাজ) মগ্ন হতাম তখন তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি দিতেন, আর যখন আমি তাঁর দিকে তাকাতাম তখন তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি লোকদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলার আচরন দীর্ঘকাল ধরে বিরাজমান থাকে। একদা আমি আমার চাচাত ভাই ও প্রিয় বন্ধু হযরত আবূ কাতাদা (রাঃ) এর বাগানের প্রাচীর টপকে প্রবেশ করে তাঁকে সালাম দেই। কিন্তু আল্লাহর কসম, তিনি আমার সালামের জওয়াব দিলেন না। আমি তখন বললাম, হে আবূ কাতাদা, আপনাকে আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি জানেন যে, আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল) কে ভালোবাসি? তখন তিনি নীরবতা পালন করলেন। আমি পূনরায় তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি এবারও কোন জবাব দিলেন না। আমি পূন: (তৃতীয়বারও) তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল) ই ভালো জানেন। তখন আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। অগত্যা আমি পূনরায় প্রাচীর টপকে ফিরে এলাম। কা’আব (রাঃ) বলেন, একদা আমি মদিনার বাজারে বিচরন করছিলাম। এমতাবস্থায় সিরিয়ার এক কৃষক বনিক যে মদিনার বাজারে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে এসেছিল, সে বলছে, আমাকে কা’আব ইবনু মালিককে কেউ পরিচয় করিয়ে দিতে পারে কি? তখন লোকেরা তাকে আমার প্রতি ইশারায় দেখাচ্ছিল। তখন সে এসে গাসসানি বাদশার একটি পত্র আমার কাছে হস্তান্তর করল। তাতে লেখা ছিল, পর সমাচার এই, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সাথী আপনার প্রতি জুলুম করেছে। আর আল্লাহ্ আপনাকে মর্যাদাহীন ও আশ্রয়হীন করে সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনাকে সাহায্য-সহানুভূতি করব। আমি যখন এ পত্র পড়লাম, তখন আমি বললাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। তখন আমি চুলা খোঁজ করে তার মধ্যে পত্রটি নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম। এ সময় পঞ্চাশ দিনের চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে এক সংবাদবাহক আমার কাছে এসে বলল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি আপনার স্ত্রী হতে পৃথক থাকবেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দিব, না অন্য কিছু করব? তিনি উত্তর দিলেন, তালাক দিতে হবে না বরং তার থেকে পৃথক থাকুন এবং তার নিকটবর্তী হবেননা। আমার অপর দু’জন সঙ্গীর প্রতি একই আদেশ পৌঁছালেন। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পিত্রালয়ে চলে যাও। আমার এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত তুমি তথায় অবস্থান কর। কা’আব (রাঃ) বলেন, আমার সঙ্গী হিলাল ইবনু উমায়্যার স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , হিলাল ইবনু উমায়্যা অতি বৃদ্ধ, এমন বৃদ্ধ যে, তাঁর কোন খাদিম নেই। আমি তাঁর খেদমত করি, এটা কি অপছন্দ করেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না তবে সে তোমার বিছানায় আসতে পারবেনা। সে বলল, আল্লাহর কসম, এ সম্পর্কে তার কোন অনুভূতই নেই। আল্লাহর কসম, তিনি এ নির্দেশ পাওয়া অবধি সর্বদা কান্নাকাটি করছেন। [কা’আব (রাঃ) বলেন] আমার পরিবারের কেউ আমাকে পরামর্শ দিল যে, আপনিও যদি আপনার স্ত্রী সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে অনুমতি চাইতেন, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিলাল ইবনু উমায়্যার স্ত্রীকে তাঁর (স্বামীর) খেদমত করার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি কখনো তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে অনুমতি চাইবো না। আমি যদি তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতি চাই, তবে তিনি কি বলবেন, তা আমার জানানেই। আমি তো নিজেই আমার খেদমতে সক্ষম। এরপর আরও দশরাত অতিবাহিত করলাম। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন থেকে আমাদের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেন তখন থেকে পঞ্চাশ রাত পূর্ন হল। এরপর আমি পঞ্চাশতম রাত শেষে ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলাম এবং আমাদের ঘরের ছাদে এমন অবস্থায় বসে ছিলাম যা আল্লাহ্ তা’আলা (কুরআনে) বর্ননা করেছেন। আমার জানো-প্রাণ দুর্বিষহ এবং গোটা জগতটা যেন আমার জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ন হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় শুনতে পেলাম এক চীৎকার কারীর চীৎকার। সে সালা পাহাড়ের উপর চড়ে উচ্চস্বরে ঘোষনা করছে, হে কা’আব ইবনু মালিক! সুসংবাদ গ্রহন করুন। হযরত কা’আব (রাঃ) বলেন, এ শব্দ আমার কানে পৌঁছামাত্র আমি সিজদায় লুটে পড়লাম। আর আমি অনুভব করলাম যে, আমার সুদিন ও খুশীর খবর এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের পর আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে আমাদের তাওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ প্রকাশ করেন। তখন লোকেরা আমার এবং আমার সঙ্গীদ্বয়ের কাছে সুসংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। এবং তড়িঘড়ি একজন অশ্বারোহী লোক আমার কাছে আসে এবং আসলাম গোত্রের অপর এক ব্যাক্তি দ্রুত আগমন করে পাহাড়ের উপর আরোহন করত চীৎকার দিতে থাকে। তার চীৎকারের শব্দ ঘোড়া অপেক্ষাও দ্রুত পৌঁছল। যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসল, আমি তখন আমার নিজের পরিধেয় দুটো কাপড় তাকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য দান করলাম। আর আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, ঐ সময় সেই দুটো কাপড় ছাড়া আমার কাছে আর কোন কাপড় ছিলোনা। আমি দুটো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে রওয়ানা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসতে লাগল। তারা তাওবা কবুলের মুবারকবাদ জানোাচ্ছিল। তারা বলছিল, তোমাকে মুবারকবাদ যে মহান আল্লাহ্ রাববুল আলামিন তোমার তাওবা কবুল করেছেন। কা’আব (রাঃ) বলেন, অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে বসা ছিলেন এবং তাঁর চতুস্পার্শ্বে জনতার সমাবেশ ছিল। হযরত তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ (রাঃ) দ্রুত উঠে এসে আমার সাথে মূসা ফাহা করলেন ও মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম, তিনি ব্যতীত আর কোন মুহাজির আমার জন্য দাঁড়াননি। আমি তালহার ব্যাবহার ভুলতে পারবোনা। কা’আব (রাঃ) বলেন, এরপর আমি যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম জানালাম, তখন তাঁর চেহারা আনন্দের আতিশয্যে ঝকঝক করছিল। তিনি আমাকে বললেন, তোমার মাতা তোমাকে জন্মদানের দিন হতে যতদিন তোমার উপর অতিবাহিত হয়েছে তার মধ্যে উৎকৃষ্ট ও উত্তম দিনের সুসংবাদ গ্রহন কর। কা’আব বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, আমার পক্ষ থেকে নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুশী হতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারক এতো উজ্জ্বল ও প্রোজ্জ্বল হতো যেন পূর্নিমার চাঁদের ফালি। এতে আমরা তাঁর সন্তুষ্টি বুঝতে পারতাম। আমি যখন তাঁর সম্মুখে বসলাম তখন আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আমার তাওবা কবুলের শুকরিয়া স্বরুপ আমার ধন-সম্পদ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল) এর পথে দান করতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কিছু মাল তোমার কাছে রেখে দাও। তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, খায়বরে অবস্থিত আমার অংশটি আমার জন্য রাখলাম। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , মহান আল্লাহ্ তাআলা সত্য বলার কারনে আমাকে রক্ষা করেছেন, তাই আমার তাওবা কবুলের নিদর্শন অক্ষুন্ন রাখতে আমার অবশিষ্ট জীবনে সত্যই বলব। আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি এ সত্য বলার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জানিয়েছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার জানামতে কোন মুসলিমকে সত্য কথার বিনিময়ে এরুপ নিয়ামত আল্লাহ্ দান করেননি যে নিয়ামত আমাকে দান করেছেন। [কা’আব (রাঃ) বলেন] যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখে সত্য কথা বলেছি সেদিন হতে আজ পর্যন্ত অন্তরে মিথ্যা বলার ইচ্ছাও করিনি। আমি আশা পোষন করি যে, বাকী জীবনও আল্লাহ্ তাআলা আমাকে মিথ্যা থেকে হিফাজত করবেন। এরপর আল্লাহ্ তাআলা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর এই আয়াত নাযিল করেন অর্থাৎ আল্লাহ্ অনুগ্রহ পরায়ন হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি এবং মুহাজিরদের প্রতি এবং তোমরা সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। (৯ ১১৭-১১৯)। [কাআব (রাঃ) বলেন] আল্লাহর শপথ, ইসলাম গ্রহনের পর থেকে কখনো আমার উপর এতো উৎকৃষ্ট নিয়ামত আল্লাহ্ প্রদান করেননি যা আমার কাছে শ্রেষ্ঠতর, তা হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আমার সত্য বলা ও তাঁর সাথে মিথ্যা না বলা, যদি মিথ্যা বলতাম তবে মিথ্যাবাদীদের মতো আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। সেই মিথ্যাবাদিদের সম্পর্কে যখন ওহী নাযিল হয়েছে তখন জঘন্য অন্তরের সেই লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তাআলা বলেছেনঃ অর্থাৎ, তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা আল্লাহর শপথ করবে আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না। (৯:৯৫-৯৬)। কাআব (রাঃ) বলে, আমাদের তিনজনের তাওবা কবুল করতে বিলম্ব করা হয়েছে--- যাদের তাওবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবুল করেছেন যখন তারা তাঁর কাছে শপথ করেছে, তিনি তাদের বায়আত গ্রহন করেছেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। আমাদের বিষয়টি আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্থগিত রেখেছেন। এর প্রেক্ষাপটে আল্লাহ্ বলেন--- সেই তিনজনের প্রতিও যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। (৯:১১৮) কুরআনের এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি যারা তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছনে ছিল ও মিথ্যা কসম করে ওযর- আপত্তি পেশ করেছিল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তা গ্রহন করেছিলেন। বরং এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে আমরা যারা পেছনে ছিলাম এবং যাদের প্রতি সিদ্ধান্ত দেয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল।
হাদিস নং - ৪০৭৭
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ জু’ফী (রহঃ) হযরত ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সামুদ গোত্রের) হিজর বস্তি অতিক্রম করেন, তখন তিনি বললেন, যারা নিজ আত্নার উপর অত্যাচার করেছে তাদের আক্রান্তস্থলে ক্রন্দনাবস্থা ব্যতীত প্রবেশ করোনা। যেন তোমাদের প্রতিও শাস্তি নিপতিত না হয় যা তাদের প্রতি নিপতিত হয়েছিল। তারপর তিনি তাঁর মস্তক আবৃত করেন এবং অতি দ্রুতবেগে চলে উক্ত স্থান অতিক্রম করেন।
হাদিস নং - ৪০৭৮
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) হযরত ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজর নামক স্থান দিয়ে অতিক্রমকালে তাঁর সঙ্গীদের বললেন, তোমরা ঐ শাস্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া প্রবেশ করোনা-- যাতে তোমাদের উপরও সেরুপ বিপদ আপতিত না হয় যেরুপ তাদের উপর আপতিত হয়েছিল।
হাদিস নং - ৪০৭৯
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) হযরত মুগীরা ইবনু শু’বা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (প্রকৃতির) প্রয়োজনে বাহিরে গেলেন। (ফিরে এলে) আমি দাঁড়িয়ে তাঁর (ওযুর) পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম। (স্থানটি কোথায়) তা আমার স্মরন নেই। তবে তা ছিল তাবুক যুদ্ধের সময়কার। এরপর তিঁনি তাঁর চেহেরা ধৌত করেন। এবং তাঁর বাহুদ্বয় ধৌত করতে গেলে দেখা গেল যে, তাঁর জামার আস্তিন আটসাঁট। তখন তিনি উভয় বাহুকে জামার মধ্য থেকে বের করে আনেন এবং তা ধৌত করেন। তারপর তিন তাঁর মোজার উপর মুসেহ্ করেন।
হাদিস নং - ৪০৮০
হযরত খালিদ ইবনু মাখলাদ (রহঃ) হযরত হুমায়দ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদিনাতে পদার্পন করলাম তখন তিনি বললেন, এই মদিনার অপর নাম ত্বাবা (পবিত্র) এবং এই উহুদ এমন পাহাড় যে, সে আমাদের ভালোবাসে আর আমরাও তাকে ভালোবাসি।
হাদিস নং - ৪০৮১
হযরত আহমাদ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদিনার নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি বললেন, মদিনাতে এমন সম্প্রদায় রয়েছে যারা কোন দূরপথ ভ্রমন করেনি, এবং কোন উপত্যকাও অতিক্রম করেনি তবুও তারা তোমাদের সাথে (সওয়াবে) শরীক রয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) আরয করলেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , তারা তো মদিনায়-ই অবস্থান করছিল। তখন তিনি বললেন, তারা মদিনায়ই রয়ে গেছে, তবে ওযর তাদের আটকে রেখেছিল।
হাদিস নং - ৪০৮২
হযরত ইসহাক (রহঃ) হযরত আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা সাহমী (রাঃ) কে তাঁর পত্রসহ কিসরার কাছে প্রেরন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ নির্দেশ দেন যে, সে যেন পত্রখানা প্রথমে বাহরাইনের গভর্নরের কাছে দেয় এবং পরে বাহরাইনের গভর্নর যেন কিসরার হাতে পত্রটি পৌঁছিয়ে দেয়। কিসরা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্রখানা পড়ল, তখন তা ছিড়ে টুকরা করে ফেলল। (রাবী বলেন) আমার যতদূর মনে পড়ে, ইবনুল মূসা য়্যাব (রাঃ) বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি এ বলে বদদোয়া করেন, আল্লাহ্ তাদেরকেও সম্পূর্নরুপে টুকরো টুকরো করে দিন।
হাদিস নং - ৪০৮৩
হযরত উসমান ইবনু হায়সাম (রহঃ) হযরত আবূ বাকরা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রুত একটি বানী আমাকে জঙ্গে জামালের (উষ্ট্রের যুদ্ধ) দিন মহা উপকার করেছে, যে সময় আমি সাহাবায়ে কিরামের সাথে মিলিত হয়ে জামাল যুদ্ধে শরিক হতে প্রায় প্রস্তুত হয়েছিলাম। আবূ বাকরা (রাঃ) বলেন, সে বানীটি হল, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যবাসী কিসরা তনয়াকে তাদের বাদশাহ মনোনীত করেছেন, তখন তিনি বললেন, কখনোই সে জাতি সফলতার মুখ দেখবেনা যারা স্ত্রীলোককে তাদের প্রশাসক নির্বাচন করে।
হাদিস নং - ৪০৮৪
হযরত আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) হযরত সায়েব ইবনু ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমার স্মৃতিপটে এখনও সে ঘটনা জাগে যে, মদিনার ছেলেপুলের সাথে ছানিয়্যাতুল বিদায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বাগত জানাতে আমিও গিয়েছিলাম। সুফয়ান (রাঃ) এর রিওয়ায়েতে স্থলে শব্দের উল্লেখ রয়েছে।
হাদিস নং - ৪০৮৫
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) হযরত সায়েব ইবনু ইয়াযীদ) (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, আমি স্মৃতিচারন করি যে, ছানিয়্যাতুল বিদায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বাগত জানাতে মদিনার ছেলেদের সাথে গিয়েছিলাম, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন।
হাদিস নং - ৪০৮৬
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) হযরত উম্মুল ফদল বিনতে হারিস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মাগরিবের সালাত (নামায/নামাজ) সূরা ‘‘ওয়াল মুরসালাত (নামায/নামাজ) উরফা’’ পাঠ করতে শুনেছি। তারপর আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রুহ মুবারক কবজ করা পর্যন্ত তিনি আর আমাদের নিয়ে কোন সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেননি।
হাদিস নং - ৪০৮৭
হযরত মুহাম্মদ ইবনু আরআরা (রহঃ) হযরত ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) ইবনু আববাস (রাঃ) কে তাঁর কাছে বসাতেন। এতে আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) তাঁকে বললেন, আমাদেরও তো ইবনু আববাস (রাঃ) এর সমবয়সী ছেলেপুলে আছে! তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেন, সে কিরুপ মর্যাদার লোক তা তো আপনারাও জানেন। এরপর হযরত উমর (রাঃ) ইবনু আববাস (রাঃ) কে এই আয়াতের প্রকৃত মর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন তিনি বললেন, এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের খবর তাঁকে [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে] অবগত করানো হয়েছে। তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেন, আমিও তা-ই মনে করি যা তুমি মনে করছ।
হাদিস নং - ৪০৮৮
হযরত কুতায়বা (রহঃ) হযরত সাঈদ ইবনু জুবায়র (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, ইবনু আববাস (রাঃ) বললেন, বৃহস্পতিবার! বৃহস্পতিবারের ঘটনা কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ-জ্বালা প্রবলভাবে দেখা দেয়। তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে আস, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দিয়ে যাই যেন তোমরা এরপর কখনও বিভ্রান্ত না হও। তখন তারা পরস্পর মতভেদ করতে থাকে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে মতবিরোধ করা শোভনীয় নয়। এরপর কিছুসংখ্যক লোক বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবস্থা কেমন? তিনি কি প্রলাপ বকছেন? তোমরা তাঁর কাছে থেকে ব্যাপারটি বুঝে নাও। এতে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ব্যাপারটি পূনরুথ্থাপনের উদ্যোগ নিলেন। তখন তিনি বললেন, তোমরা আমাকে আমার অবস্থায় ছেড়ে দাও, তোমরা যে কাজের দিকে আমাকে আহবান জানোাচ্ছ তার চেয়ে আমি উত্তম অবস্থায় অবস্থান করছি। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে তিনটি নসীহত করলেন (১) আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বহিষ্কার করে দিবে, (২) দূতদের সেরুপ আদর-আপ্যায়ন করবে যেমন আমি করতাম এবং তৃতীয়টি বলা থেকে তিনি নীরব থাকলেন অথবা বর্ননাকারী বলেন, তৃতীয়টি আমি ভুলে গিয়েছি।
হাদিস নং - ৪০৮৯
হযরত আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের সময় যখন নিকটবর্তী হল এবং ঘরে ছিলো লোকের সমাবেশ, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আস, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দেই, যেন তোমরা পরবর্তীতে পথভ্রষ্ট না হও। তখন তাদের মধ্যকার কিছু লোক বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ-যন্ত্রনা কঠিনতর অবস্থায়, আর তোমাদের কাছে তো কুরআন মউযূ (ওজু/অজু/অযু)দ আছে। আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। ইত্যবসরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারের লোকজনের মধ্যে মতানৈক্য শুরু হয়ে যায়, এবং তারা পরস্পর বাক-বিতন্ডা করত থাকেন। তাদের কেউ বললেন, তোমরা কাগজ উপস্থিত কর, তিনি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দিন। যাতে তোমরা তাঁর পরে কোন বিভ্রান্তিতে নিপতিত না হও। আবার কেউ বললেন এর বিপরীত। এরপর যখন বাক-বিতন্ডা ও মতবিরোধ চরমে পৌঁছল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা উঠে চলে যাও। উবায়দুল্লাহ্ (রাঃ) বলেন, ইবনু আববাস (রাঃ) বলতেন, এ ছিল অত্যন্ত দু:খজনক ব্যাপার যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামের জন্য কিছু লিখে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের মতবিরোধ ও উচ্চ শব্দই মূলত প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
হাদিস নং - ৪০৯০
হযরত ইয়াসারা ইবনু সাফয়ান ইবনু জামীল আল লাখমী (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যু-এরোগকালে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কে ডেকে আনলেন এবং চুপে চুপে কিছু বললেন, তখন হযরত ফাতিমা (রাঃ) কেঁদে ফেললেন, এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূনরায় তাঁকে ডেকে চুপে চুপে কিছু বললেন, তখন তিনি হাসলেন। পরে আমরা এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে রোগে আক্রান্ত আছেন এ রোগেই তাঁর ইন্তেকাল হবে। এ কথাটই তিনি গোপনে আমাকে বলেছেন। তখন আমি কাঁদলাম। আবার তিনি আমাকে চুপে চুপে বললেন, তাঁর পরিবার-পরিজনের মধ্যে সর্বপ্রথম আমই তাঁর সঙ্গে মিলিত হব, তখন আমি হাসলাম।
হাদিস নং - ৪০৯১
হযরত মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি একথা শুনছিলাম যে, কোন নাবী মারা যান না যতক্ষন না তাঁকে ইখতিয়ার প্রদান করা হয় দুনিয়া বা আখিরাত গ্রহন করার। যে রোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন সে রোগে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মৃত্যু যন্ত্রনায় আক্রাস্তাবস্থায় বলতে শুনেছি, তাঁদের সাথে যাঁদের প্রতি আল্লাহ্ তা’আলা নিয়ামত প্রদান করেছেন [তাঁরা হলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-গন, সিদ্দীকগন এবং শহীদগন। ] (৪:৭২) তখন আমি ধারনা করলাম যে তিনিও ইখতিয়ার প্রাপ্ত হয়েছেন।
হাদিস নং - ৪০৯২
হযরত মুসলিম (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু রোগে আক্রান্ত হন, তখন তিনি বলতেছিলেন, ‘‘ফির রাফীকিল আলা’’। উর্ধ্বলোকের মহান বন্ধুর সাথে (আমাকে মিলিত করুন। )
হাদিস নং - ৪০৯৩
হযরত আবূল ইয়ামান (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্থাবস্থায় বলতেন, কোন নাবী (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রান কখনো কবজ করা হয়নি, যতক্ষন না তাঁর স্থান জান্নাতে দেখানে হয়েছে। তারপর তাঁকে জীবিত রাখা হয় অথবা ইন্তেকালের ইখতিয়ার দেয়া হয়। এরপর যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর মাথা হযরত আয়িশা (রাঃ) এর উরুতে রাখাবস্থায় তাঁর জানো কবজের সময় উপস্থিত হল তখন তিনি চৈতন্যহীন হয়ে পড়লেন। এরপর যখন তিনি চেতনা ফিরে পেলেন তখন তিনি ঘরের ছাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললেন, হে আল্লাহ্! উর্ধ্বজগতের মহান বন্ধুর সাথে (আমাকে মিলিত করুন)। অনন্তর আমি বললাম, তিনি আর আমাদের মাঝে থাকছেন না। এরপর আমি উপলব্ধি করলাম যে, ইহা ঐ কথাই যা তিনি আমাদের কাছে বর্ননা করতেন। আর তাই ঠিক।
হাদিস নং - ৪০৯৪
হযরত মুহাম্মদ (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ), রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমার বুকে হেলান দেওয়া অবস্থায় রেখেছিলাম এবং আবদুর রহমানের হাতে তাজা মিসওয়াকের ডাল ছিল যা দিয়ে সে দাঁত পরিষ্কার করছিল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন। আমি মিসওয়াকটি নিলাম এবং তা চিবিয়ে নরম করলাম। তারপর তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দিয়ে দাঁত মর্দন করলেন। আমি তাঁকে এর আগে এতো সুন্দরভাবে মিসওয়াক করতে আর কখনোও দেখিনি। এ থেকে অবসর হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উভয় হাত অথবা আঙ্গুল উপরে উঠিয়ে তিনবার বললেন, উর্ধ্বলোকের মহান বন্ধুর সাথে (আমাকে মিলিত করুন), তারপর তিনি ইন্তেকাল করলেন। হযরত আয়িশা (রাঃ) বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুক ও থুতনির মধ্যস্থলে থাকাবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
হাদিস নং - ৪০৯৫
হযরত হিববান (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, তিনি বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়তেন তখন তিনি আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা (ফালাক ও নাস) পাঠ করে নিজ দেহে ফুঁক দিতেন এবং স্বীয় হাত দ্বারা শরীর মুসেহ্ করতেন। এরপর যখন তিনি মৃত্যু-এরোগে আক্রান্ত হলেন, তিনি আমি আশ্রয় প্রার্থনার সূরাদ্বয় দ্বারা তাঁর শরীরে দম করতাম, যা দিয়ে তিনি দম করতেন। আমি তাঁর হাত দ্বারা তাঁর শরীর মুসেহ্ করিয়ে দিতাম।
হাদিস নং - ৪০৯৬
হযরত মুআল্লাহ্ ইবনু আসা’দ (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পূর্বে যখন তাঁর পিঠ আমার উপর হেলান দেয়া অবস্থায় ছিল, তখন আমি কান ঝুঁকিয়ে দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলছে শুনেছি, হে আল্লাহ্! আমাকে মাফ করুন, রহম করুন এবং (উর্ধ্বজগতের) মহান বন্ধুর সাথে আমাকে মিলিত করুন।
হাদিস নং - ৪০৯৭
হযরত সালত ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, যে রোগ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর সুস্থ হয়ে উঠেননি সে রোগাবস্থায় তিনি বলেন, ইহুদীদের প্রতি আল্লাহ্ লা’নত করেছেন। তারা তাদের নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দের কবরগুলোকে সিজদার স্থানে পরিনত করেছে। হযরত আয়িশা (রাঃ) মন্তব্য করেন, এরুপ প্রথা যদি না থাকত তবে তাঁর কবরকেও খোলা রাখা হতো। কারন তাঁর কবরকেও মসজিদ (সিজদার স্থান) বানানোর আশংকা ছিল।
হাদিস নং - ৪০৯৮
হযরত সাঈদ ইবনু উফায়র (রহঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ প্রবল হল ও ব্যাথা তীব্র আকার ধারন করল, তখন তিনি আমার ঘরে সেবা-শুশ্রুষা করার ব্যাপারে তাঁর বিবিগনের নিকট অনুমতি চাইলেন। তখন তাঁরা তাঁকে অনুমতি দিলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে ইবনু আববাস (রাঃ) ও অপর একজন সাহাবীর সাহায্যে জমীনের উপর পা হিঁচড়ে চলতে লাগলেন। উবায়দুল্লাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) কে হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) কথিত ব্যাক্তি সম্পর্কে অবহিত করলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি সেই দ্বিতীয় ব্যাক্তি যার নাম হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) উল্লেখ করেননি, তার নাম জানো? আমি বললাম, না। ইবনু আববাস (রাঃ) বললেন, তিনি হলেন হযরত আলী (রাঃ)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী হযরত আয়িশা (রাঃ) বর্ননা করেন যে, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর ব্যাথা বেড়ে গেল, তখন তিনি বললেন, তোমরা এমন সাত মশক যার মুখ এখনোও খোলা হয়নি, তা থেকে আমার শরীরে পানি ঢেলে দাও। যেন আমি (সুস্থ হয়ে) লোকদের উপদেশ দিতে পারি। এরপর আমরা তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী হযরত হাফসা (রাঃ) এর একটি বড় গামলায় বসালাম। তারপর আমরা উক্ত মশক হতে তাঁর উপর ততক্ষন পর্যন্ত পানি ঢালা অব্যাহত রাখলাম, যতক্ষন না তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমাদের ইশারা করে জানালেন যে, তোমরা তোমাদের কাজ সম্পন্ন করেছ। হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের কাছে গিয়ে তাদের সাথে জামাতে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন। উবায়দুল্লাহ্ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবা (রহঃ) আমাকে জানালেন যে, হযরত আয়িশা ও আবদুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) উভয়ে বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগ-যাতনায় অস্থির হতেন তখন তিনি তাঁর কালো চাঁদর দিয়ে নিজ মুখমন্ডল ঢেকে রাখতেন। আবার যখন জ্বরের উষ্ণতা হ্রাস পেত তখন মুখমন্ডল থেকে চাঁদর সরিয়ে ফেলতেন। রাবী বলেন, এরুপ অবস্থায়ও তিনি বলতেন, ইহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর লানত, তারা তাদের নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দের কবরকে মসজিদে পরিনত করেছে। তাদের কৃতকর্ম থেকে সতর্ক করা হয়েছে। উবায়দুল্লাহ্ (রহঃ) বলেন যে, হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি আবূ বকর (রাঃ) এর ইমামতির ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বারবার আপত্তি করেছি। আর আমার তাঁর কাছে বারবার আপত্তি করার কারন ছিল এই, আমার অন্তরে একথা আসেনি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে তাঁর স্থলে কেউ দাঁড়ালে লোকেরা তাকে পছন্দ করবে। বরং আমি মনে করতাম যে, কেউ তাঁর স্থলে দাঁড়ালে লোকেরা তাঁর প্রতি খারাপ ধারনা পোষন করবে, তাই আমি ইচ্ছা করলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দায়িত্ব হযরত আবূ বকর (রাঃ) এর পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রদান করুন। আবূ আবদুল্লাহ বুখারী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস হযরত ইবনু উমর, আবূ মূসা ও ইবনু আববাস (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ননা করেছেন।
হাদিস নং - ৪০৯৯
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এমন অবস্থায় ওফাত হয় যে, আমার বুক ও থুতনির মধ্যস্থলে তিনি হেলান দেওয়া অবস্থায় ছিলে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যু-যন্ত্রনার পর আমি আর কারো জন্য মৃত্যু-যন্ত্রনাকে কঠোর বলে মনে করিনা।
হাদিস নং - ৪১০০
হযরত ইসহাক (রহঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, হযরত আলী ইবনু আবূ তালীব (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ হতে বের হয়ে আসেন যখন তিনি মৃত্যুরোগে আক্রান্ত ছিলেন। তখন সাহাবীগন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবূল হাসান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ কেমন আছেন? তিনি বললেন, আল্-হামদুলিল্লাহ্, তিনি কিছুটা সুস্থ। তখন হযরত আববাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) তাঁর হাত ধরে তাঁকে বললেন, আল্লাহর কসম, তুমি তিন দিন পরে অন্যের দ্বারা পরিচালিত হবে। আল্লাহর শপথ, আমি মনে করি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রোগে অচিরেই ওফাত হবেন। কারন আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশের অনেকের মৃত্যুকালীন চেহারার অবস্থা লক্ষ্য করেছি। চল যাই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করি যে, তিনি (খিলাফতের) দায়িত্ব কার উপর ন্যাস্ত করে যাচ্ছেন। যদি আমাদের মধ্যে থাকে তো তা আমরা জানোব। আর যদি আমাদের ছাড়া অন্যদের উপর ন্যাস্ত করে যান, তাহলে তাও আমরা জানতে পারব এবং তিনি এ ব্যাপারে আমাদের তখন অসীয়ত করে যাবেন। তখন হযরত আলী (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, যদি এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমরা জিজ্ঞাসা করি আর তিনি আমাদের নিষেধ করে দেন, তবে তারপরে লোকেরা আর আমাদের তা প্রদান করবেনা। আল্লাহর কসম, এজন্য আমি কখনোই এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করবোনা।
হাদিস নং - ৪১০১
সাঈদ ইবনু উফায়র (রাঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, সোমবারে সাহাবীগণ ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) রত ছিলেন। আর আবূ রবক (রাঃ) তাদের সালাত (নামায/নামাজ)-এর জামাতের ইমামতী করছিলেন। হঠাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রাঃ) এর কক্ষের পর্দা উঠিয়ে তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। সাহাবীগণ কাতারবন্দী অবস্থায় সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের নিমিত্ত পিছিয়ে আসতে মনস্থ করলেন। তিনি ধারনা করেছিলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের জন্য বেরিয়ে আসার ইচ্ছা করছেন। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনের আনন্দে সাহাবীগণের সালাত (নামায/নামাজ) ভঙ্গের উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে ইশারায় তাদের সালাত (নামায/নামাজ) পুরা করতে বললেন। তারপর তিনি কক্ষে প্রবেশ করলেন ও পর্দা টেনে দিলেন।
হাদিস নং - ৪১০২
মুহাম্মদ ইবনু উবায়দা (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রায়ই বলতেন, আমরা প্রতি আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে, আমার পালার দিনে এবং আমার হলকুম ও সিনার মধ্যস্থলে থাকাবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকাল হয় এবং আল্লাহ্তাআলা তাঁর ইন্তেকালের সময় আমার থুথু তাঁর থুথুর সাথে মিশ্রিত করে দেয়। এ সময় আবদুর রহমান (রাঃ) আমার নিকট প্রবেশ করে এবং তার হাতে মিসওয়াক ছিল। আর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে (আমার বুকে) হেলান লাগান অবস্থায় রেখেছিলাম। আমি লক্ষ্য করলাম যে, তিনি আবদুর রহমানের দিকে তাকাচ্ছেন। আমি অনুভবন করতে পারলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসওয়াক চাচ্ছেন। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি আপনার জন্য মিসওয়াক আনব? তিনি তখন মাথায় ইশারায় জানালেন যে, হ্যাঁ, আন। তখন আমি মিসওয়াক আনলাম। কিন্তু মিসওয়াক শক্ত ছিল, তাই আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি এটি আপনার জন্য নরম করে দিব? তখন তিনি মাথায় ইশারায় হ্যাঁ বললেন। তখন আমি মিসওয়াকটি চিবিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি মিসওয়াক করলেন। তাঁর সম্মুখে পাত্র অথবা পেয়ালা ছিল (রাবী উমরের সন্দেহ) তাতে পানি ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার স্বীয় হস্তদ্বয় উক্ত পানির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে তার দ্বারা তাঁর চেহারা মাসেহ (ঠান্ডা) করালেন এবং আল্লাহ ব্যাতিত কোন মাবুদ নেই, সত্যই মৃত্যুযন্ত্রণা কঠিন। তারপর উভয় হাত উপর দিকে উত্তোলন করে বলছিলেন, আমি উর্ধ্বলোকের মহান বন্ধু সাথে মিলিত হতে চাই। এ অবস্থায় তাঁর ইন্তেকাল হল আর হাত শিথিল হয়ে গেল।
হাদিস নং - ৪১০৩
ইসমাঈল আয়িশার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যে রোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন সে অবস্থায় তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, আমি আগামীকাল কার ঘরে থাকব। আগামী কাল কার ঘরে থাকব? এর দ্বারা তিনি আয়িশা (রাঃ) এর ঘরে থাকার পালার প্রতি ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। অন্য সহধর্মিনীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যার ঘরে ইচ্ছা সেখানে অবস্থান করার অনুমতি দিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রাঃ) এর ঘরে অবস্থান করতে থাকেন। এমনকি তাঁর ঘরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য নির্ধারিত পালার দিন আমার ঘরে ইন্তেকাল করেন এবং আল্লাহ্তাঁর রূহ কবজ করেন এ অবস্থায় যে, তাঁর মাথায় আমা হলকুম ও সীনার মধ্যস্থলে ছিল এবং আমার থুথুর সাথে তাঁর থুথু মিশ্রিত হয়ে যায়। তারপর তিনি বলেন, আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ) এর হাতে একটি মিসওয়াক ছিল যা দিয়ে সে তার দাঁত মাজছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন। আমি তখণ তাকে বললাম, হে আবদুর রহমান এই মিসওয়াকটি আমাকে দাও, তখন সে তা আমাকে দিয়ে দিল। আমি সেটি চিবিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসওয়াকটি দ্বারা দাঁত পরিস্কার করলেন, আর তিনি তখন আমার বুকে হেলান লাগান অবস্থায় ছিলেন।
হাদিস নং - ৪১০৪
সুলাইয়মান ইবনু হারব (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে আমার পালার দিনে এবং হলকুম ও সীনার মধ্যস্থলে থাকা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থ্য হতেন তখন আমাদের মধ্যকার কেউ দোয়া পড়ে তাঁকে ঝাড়ফুঁক করতেন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ঝাড়ফুঁক করার জন্য তাঁর কাছে গেলাম। তখন তিনি তাঁর মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেন, ঊর্ধ্বলোকের বন্ধুর সাথে (মিলিত হতে চাই), ঊর্ধ্ব জগতের মহান বন্ধুর সাথে (মিলিত হতে চাই)। এ সময় আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ) আগমন করলেন। তাঁর হাতে মিসওয়াকের একটি তাজা ডাল ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সেদিকে তাকালেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, তাঁর [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] মিসওয়াকের প্রয়োজন। তখন আমি সেটি নিয়ে চিবালাম, ঝেড়ে পরিস্কার করলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তা দিলাম। তখন তিনি এর দ্বারা এত সুন্দরভাবে দাঁত পরিস্কার করলেন যে এর আগে কখনও এরূপ করেননি। তারপর তা আমাকে দিলেন। এরপর তাঁর হাত ঢলে পড়ল অথবা রাবী বলেন তাঁর হাত থেকে ঢলে পড়ল। আল্লাহ্ তা’আলা আমার থুথুকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর থুথুর সাথে মিলিয়ে দিলেন। দুনিয়ার জীবনের শেষ দিনে এবং আখিরাতের প্রথম দিনে।
হাদিস নং - ৪১০৫
ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে তার সুনহের বাড়ি থেকে আগমন করেন। ঘোড়া থেকে অবতরন করে তিনি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন, কিন্তু কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে সোজা আয়িশা (রাঃ) এর কাছে উপস্থিত হন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্যে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামনী চাঁদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। তখন তিনি চেহারা হতে কাপড় হটিয়ে তাঁর ওপর ঝুঁকে পড়েন এবং তাঁকে চুমু দেন ও কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, আমর মাতাপিতা আপনার প্রতি কুরবান হোক! আল্লাহর কসম আলালাহ্তো আপনাকে দু’বার মৃত্যু দিবেন না, যে মৃত্যু ছিলো আপনার জন্য নির্ধারিত সে মৃত্যু আপনি গ্রহন করে নিলেন। ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেন, আমাকে আবূ সালামা (রাঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, আবূ বকর (রাঃ) বের হয়ে আসেন তখন উমর (রাঃ) লোকজনের সাথে কথা বলছিলেন। এ সময় আবূ বকর (রাঃ) তাঁকে বলেন, হে উমর বসে পড়। উমর (রাঃ) বসতে অস্বীকার করলেন। তখন সাহাবীগণ উমর (রাঃ) কে ছেড়ে আবূ বকর (রাঃ) এর প্রতি মনোনিবেশ করলেন। তখন আবূ বকর (রাঃ) ভাষণ দিলেন- “এরপর আপনাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদ্ এর ইবাদত করতেন, তিনি তো ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদত করতেন (জেনে রাখুন) আল্লাহ চিরঞ্জীব, চির অমর। মহান আল্লাহ্ বলেন, মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গত হয়েছেন। কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন (৩ : ১৪৪) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, আবূ বকর (রাঃ) এর পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানতো না যে আল্লাহ্তা’আলা এরূপ আয়াত নাযিল করেছেন। এরপর সমস্ত সাহাবী তাঁর থেকে উক্ত আয়াত শিখে নিলেন। তখন সকালে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন। আমকে সাঈদ ইবনু মূসা ইয়্যাব (রহঃ) অবহিত করেন যে, উমর (রাঃ) বলেছেন, আল্লাহর কসম, আমি যখন আবূ বকর (রাঃ) কে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন হতভম্ব হয়ে গেলাম, এবং আমার পা দু’টি যেন আমাকে আর বহন করতে পারছিল না, আমি জমীনের ওপর পড়ে গেলাম। যখন আমি শুনতে পেলাম যে, তিনি তিলাওয়াত করছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন।
হাদিস নং - ৪১০৬
আবদুল্লাহ ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) আয়িশা ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আবূ বকর (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর তাঁকে চুমু দেন।
হাদিস নং - ৪১০৭
আলী ইবনু মাদিনী) (রহঃ) বলেন, আমার কাছে ইয়াহ্ইয়া (রাঃ) এতদ অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাঁর মুখে ঔষধ ঢেলে দিতাম। তিনি ইশারায় আমাদেরকে তাঁর মুখে ঔষধ ঢালতে নিষেধ করলেন। আমরা বললাম, এটা ঔষধের প্রতি রোগীর সাধারণ বিরক্তিভাব (তাই নিষেধ মানলাম না)। যখন তিনি সুস্থ্যবোধ করলেন তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের ঔষধ সেবন করাতে নিষেধ করিনি? আমরা বললাম, আমরা মনে করেছিলাম এটা ঔষধের প্রতি রোগীর সাধারণ বিরক্তিভাব। তখন তিনি বললেন, আব্বাস ব্যতীত বাড়ীর প্রত্যেকের মুখে ঔষধ ঢাল তা আমি দেখি। কেননা সে তোমাদের মাঝে উপস্থিত নেই। এ হাদীস ইবনু আবূ যিনাহ আয়িশা (রাঃ) থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করেন।
হাদিস নং - ৪১০৮
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি বলেন, আয়িশা (রাঃ) এর কাছে উল্লেখ করা হল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী (রাঃ)-কে ওসীয়াত করে গেছেন। তখন তিনি বললেন, একথা কে বলেছে? আমার বুকের সাথে হেলান দেওয়া অবস্থায় আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি। তিনি একটি চিলিমচি আনতে বললেন, তাতে থুথু ফেললেন এবং ইন্তেকাল করলেন। অতএব আমি বুঝতে পারছি না তিনি কিভাবে আলী (রাঃ)- কে ওসীয়াত করলেন।
হাদিস নং - ৪১০৯
আবূ নুআঈম (রহঃ) তালহা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ)- কে জিজ্ঞাসা করলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ওসীয়াত করে গেছেন? তিনি বললেন, না। তখন আমি বললাম, তাহলে কেমন করে মানুষের জন্য ওসীয়াত লিপিবদ্ধ করা হল অথবা কিভাবে এর নির্দেশ দেয়া হল? তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন সম্পর্কে ওসীয়াত করে গেছেন।
হাদিস নং - ৪১১০
কুতায়বা (রহঃ) আমর ইবনু হারিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন দীনার, দিরহাম, গোলাম বাঁদি রেখে যাননি। কেবলমাত্র মাদা উষ্ট্রীটি যার উপর তিনি আরোহণ করতেন এবং তাঁর যুদ্ধাস্ত্র আর একখন্ড (খায়বর এ ফদাকের) জমীন যা মূসা ফিরদের জন্য দান করে গেছেন।
হাদিস নং - ৪১১১
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেহুশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ফাতিমা (রাঃ) বললেন, উহ! আমার পিতার উপর কত কষ্ট! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আজকের পরে তোমার পিতার উপর আর কোন কষ্ট নেই। যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন তখন ফাতিমা (রাঃ) বললেন, হায়! আমার পিতা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর বাসস্থান। হায় পিতা! জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম - কে তাঁর ইন্তেকালের খবর পরিবেশন করছি। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে সমাহিত করা হল, তখন ফাতিমা (রাঃ) বললেন, হে আনাস! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে মাটি চাপা দিতে কি করে তোমাদের প্রাণ সায় দিল।
হাদিস নং - ৪১১২
বিশ্র ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্থ থাকাকালীন বলতেন, কোন নাবী র ওফাত হয়নি যতক্ষণ না তাকে জান্নাতে তাঁর ঠিকানা দেখানো হয়। তারপর তাঁকে ইখতিয়ার প্রদান করা হয় (দুনিয়া বা আখিরাত গ্রহণের), যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর রোগ বৃদ্ধি পেল তখন তাঁর মাথা আমার উরুর উপর ছিল এ সময় তিনি মূর্ছা যান। তারপর আবার হুশ ফিরে এলে, ছাদের দিকে তিনি দৃষ্টি উত্তোলন করেন। তারপর বলেন, হে আল্লাহ আমাকে উর্ধ্ব জগতের মহান বন্ধুর (সান্নিধ্য দান করুন)। তখন আমি বললাম, তাহলে তো তিনি আর আমাদের মাঝে থাকতে চাচ্ছেন না। আমি বুঝতে পারলাম যে, এটা ঐ কথা যা তিনি সুস্থাবস্থায় আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর শেষ কথা যা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন তা হল -হে আল্লাহ্! উর্ধ্বলোকের বন্ধুর সাথে আমাকে মিলিত করুন।
হাদিস নং - ৪১১৩
আবূ নুআইম (রহঃ) আয়িশা ও ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুযুলে কুরআনের দশ বছর মক্কায় বসবাস করেছেন এবং মদিনাতেও দশ বছর কাটান।
হাদিস নং - ৪১১৪
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তেষট্টি বছর বয়সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর ওফাত হয়। ইবনু শিহাব যুহরী বলেন, আমাকে সাঈদ ইবনু মূসা ইয়্যাব এরূপই অবহিত করেন।
হাদিস নং - ৪১১৫
কাবীসা (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন এমন অবস্থায় যে, তাঁর বর্ম (যুদ্ধাস্ত্র) ইহুদীর কাছে ত্রিশ সা' যবের বিনিময়ে বন্ধক রাখা ছিল।
হাদিস নং - ৪১১৬
আবূ আসিম যাহ্হাক ইবনু মাখলাদ (রহঃ) আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) কে (একটি যুদ্ধের আমীর) নিযুক্ত করেন। এতে সাহাবীগণ (নিজেদের মধ্যে) ১ নুযুলে কুরআনের সময় মক্কায় মোট ১৩ বছর। তবে প্রথম নাযিলের পর তিন বছরকাল ওহী বন্ধ থাকে এ জন্য এখানে দশ বছর বলা হয়েছে। সমালোচনা করেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি জানতে পেরেছি যে, তোমরা উসামার আমীর নিযুক্তি সম্পর্কে সমালোচনা করছো, অথচ সে আমার নিকট প্রিয়তম লোক।
হাদিস নং - ৪১১৭
ইসমাঈল (রহঃ) আবদুল্লাহ আব্ন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সেনাদল প্রেরণ করেন এবং উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) কে তাদের আমীর নিযুক্ত করেন। তখন সাহাবীগণ তাঁর নেতৃত্বের সমালোচনা করতে থাকেন। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং বললেন, তোমরা আজ তার নেতৃত্বের সমালোচনা করছ, এভাবে তোমরা তাঁর পিতা (যায়দ)- এর নেতৃত্বের প্রতিও সমালোচনা করতে। আল্লাহর কসম সে (যায়দ) ছিল নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ব্যাক্তি এবং সে আমার কাছে লোকদের মধ্যে প্রিয়তম ব্যাক্তি। আর এ (উসামা) তার পিতার পরে লোকদের মধ্যে আমার কাছে প্রিয়তম ব্যাক্তি।
হাদিস নং - ৪১১৮
আসবাগ (রহঃ) সুনাবিহী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করেন আপনি কখন হিজরত করেছেন? তিনি বলেন, আমরা ইয়ামান থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়ে জুহফাতে পৌঁছি। তখন একজন অশ্বারোহীকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, খবর কি খবর কি? তিনি বললেন, পাঁচদিন অতিবাহিত হল আমার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সমাহিত করেছি। তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি শবেকদর সম্পর্কে কিছু শুনেছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর মুয়াযযিন বিলাল (রাঃ) আমাকে জানিয়েছেন যে, তা রমযানের শেষ দশ দিনের সপ্তম দিনে রয়েছে।
হাদিস নং - ৪১১৯
আবদুল্লাহ ইবনু রাজা (রহঃ) আবূ ইসহাক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যায়দ ইবনু আরকাম (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে কতটি যুদ্ধ করেছেন? তিনি বলেন, সতেরটি। আমি বললাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটি যুদ্ধ করেছেন? তিনি বললেন, উনিশটি।
হাদিস নং - ৪১২০
আবদুল্লাহ ইবনু রাজা (রহঃ) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে পনেরটি যুদ্ধ করেছি।
হাদিস নং - ৪১২১
আহমদ ইবনু হাসান বুরাইদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ষোলটি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন।
No comments:
Post a Comment