বুখারী শরীফ সব খণ্ড
بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
অধ্যায় - ৫১ - মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) - ৪
( হাদিস নং - ৩৯৩৪-৪০২৭ = মোট ৯৫ টি হাদিস)
হাদিস নং - ৩৯৩৪
আহমদ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, সেদিন (মূতার যুদ্ধের দিন) তিনি শাহাদত প্রাপ্ত জা’ফর ইবনু আবূ তালিব (রাঃ)-এর লাশের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। (তিনি বলেন) আমি জা’ফর (রাঃ)-এর দেহে তখন বর্শা ও তরবারির পঞ্চাশটি আঘাতের চিহৃ গুণেছি। আর তম্মধ্যে কোনটাই তাঁর পশ্চাৎ দিকে ছিল না।
হাদিস নং - ৩৯৩৫
আহমদ ইবনু আবূ বাকর (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মূতার যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়িদ ইবনু হারিসা (রাঃ)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করে বলেছিলেন, যদি যায়েদ (রাঃ) শহীদ হয়ে যায় তাহলে জাফর ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) সেনাপতি হবে। যদি জাফর (রাঃ)-ও শহীদ হয়ে যায় তাহলে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ) সেনাপতি হবে। আবদুল্লাহ [ইবনু উমর (রাঃ)] বলেন, ঐ যুদ্ধে তাদের সাথে আমিও ছিলাম। যুদ্ধ শেষে আমরা জাফর ইবনু আবূ তালিব (রাঃ)-কে তালাশ করলে তাকে শহীদগণের মধ্যে পেলাম। তখন আমরা তার দেহে তরবারী ও বর্শার নব্বইটিরও অধিক আঘাতের চিহৃ দেখতে পেয়েছি। [১] [১ ] ইতিপূর্বের হাদীসে যেহেতু কেবল তরবারি ও বর্শার আঘাতগুলো গণনা করা হয়েছিল এ জন্য পঞ্চাশটি আঘাতের কথা বলা হয়েছে। আর বক্ষ্যমাণ হাদীসে বর্শা ও তীরের আঘাতগুলো গণনা করা হয়েছে, তাই নব্বইরও অধিক সংখ্যার কথা বলা হয়েছে। কিংবা পূর্ব হাদীসে কেবল সম্মুখের দিকে অবস্থিত আঘাতগুলো গণনা করা হয়েছিল। আর বর্তমান হাদীসে সম্মুখ-পশ্চাৎ নির্বিশেষে সমগ্র দেহের আঘাতগুলো গণনা হয়েছে। তাই সংখ্যার পরিমাণে উভয় হাদীসের মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে।
হাদিস নং - ৩৯৩৬
আহমদ ইবনু ওয়াকিদ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট (মূতার) যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খবর এসে পৌছার পূর্বেই তিনি উপস্থিত মুসলমানদেরকে যায়িদ, জাফর ও ইবনু রাওয়াহা (রাঃ)-এর শাহাদতের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যায়িদ (রাঃ) জতাকা হাতে অগ্রসর হলে তাঁকে শহীদ করা হয়। তখন জাফর (রাঃ) পাতাকা হাতে অগ্রসর হল, তাকেও শহীদ করে ফেলা হয়। তারপর ইবনু রাওয়াহা (রাঃ) পতাকা হাতে নিল। এবার তাকেও শহীদ করে দেয়া হল। এ সময়ে তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। (তারপর তিনি বললেন) অবশেষে সাইফুল্লাহ্দের মধ্যে এক সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি) হাতে পতাকা ধারণ করেছে। ফলত আল্লাহ্ তাদের উপর (আমাদের) বিজয় দান করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৩৭
কুতায়বা (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়িদ ইবনু হারিসা, জাফর ইবনু আবূ তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ)-এর শাহাদতের সংবাদ এসে পৌঁছলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে পড়লেন। তাঁর চেহারায় শোকের চিহৃ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি তখন দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে তাকিয়ে দেখলাম, জনৈক ব্যাক্তি তাঁর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! জাফর (রাঃ)-এর পরিবারের মেয়েরা কান্নাকাটি করছে। তখন তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] মেয়েদেরকে বারণ করার জন্য লোকটিকে হুকুম করলেন। লোকটি ফিরে গেলো। তারপর আবার এসে বলল, আমি তাদেরকে নিষেধ করেছি। কিন্তু তারা তা শোনেনি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পুনঃ হুকুম করলেন। লোকটি সেখানে গেল কিন্তু পুনরায় এসে বলল, আল্লাহর কসম তারা আমার কথা মানছে না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, (তারপর) সম্ভবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, তা হলে তাদের মুখের উপর মাটি ছুঁড়ে মার। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি লোকটিকে বললাম, আল্লাহ্ তোমার নাককে অপমানিত করুক। আল্লাহর শপথ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে যে কাজ করতে বলেছেন তাতে তুমি সক্ষম নও অথচ তুমি তাঁকে বিরক্ত করা পরিত্যাগ করছ না।
হাদিস নং - ৩৯৩৮
মুহাম্মদ ইবনু আবূ বকর (রহঃ) আমির (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু উমর (রাঃ)-এর নিয়ম ছিল যে, যখনই তিনি জাফর ইবনু আবূ তালিব (রাঃ)-এর পুত্র (আবদুল্লাহ)-কে সালাম দিতেন তখনই তিনি বলতেন, তোমার প্রতি সালাম, হে দু’ডানাওয়ালা পুত্র। [১] [১ ] মূতার লড়াইয়ে জাফর ইবনু আবূ তালিব (রাঃ)-এর দু’টি হাতই কেটে যাওয়ার কারণে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। আর এর বিনিময়ে আল্লাহ তাঁকে দু’টি পাখা দান করেছেন যেগুলোর সাহায্যে তিনি জান্নাতের মধ্যে উড়ে বেড়ান। এবং এ কারণেই জাফরকে তাইয়্যার উপাধি দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) ঐ দিকে ইঙ্গিত করেই তাঁর ছেলেকে দু’পাখাওয়ালার পুত্র বলে ডাকতেন। (কাসতুলানী, শরহে বুখারী)
হাদিস নং - ৩৯৩৯
আবূ নুআইম (রহঃ) কায়স ইবনু আবূ হাযিম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবনু ওয়ালিদ (রাঃ) থেকে শুনেছি, তিনি বলছেন, মূতার যুদ্ধে আমার হাতে নয়টি তরবারি ভেঙ্গে গিয়েছিল। পরিশেষে আমার হাতে একটি প্রশস্ত ইয়ামানী তরবারি ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
হাদিস নং - ৩৯৪০
মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) কায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) থেকে শুনেছি, তিনি বলছেন, মূতার যুদ্ধে আমার হাতে নয়খানা তরবারি ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে গিয়েছিল। (পরিশেষে) আমার হাতে আমার একটি প্রশস্ত ইয়ামানী তরবারই টিকেছিল।
হাদিস নং - ৩৯৪১
ইমরান ইবনু মায়সারা (রহঃ) নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সময় আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ) (কোন কারণে) সংজ্ঞাহীন হয়ে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর বোন ‘আমরা [বিনত রাওয়াহা (রাঃ)] হায়, হায় পাহাড়ের মতো আমরা ভাই, হায়রে অমুকের হত, তমুকের মত ইত্যাদি গুণ উল্লেখ করে কান্নাকাটি শুরু করল। এরপর সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে তিনি তাঁর বোনকে বললেন, তুমি যেসব কথা বলে কান্নাকাটি করেছিলে সেসব কথা সম্পর্কে আমাকে (বিদ্রূপাত্মকভাবে) জিজ্ঞাসা করে বলা হয়েছে, তুমি কি সত্যই এরূপ?
হাদিস নং - ৩৯৪২
কুতায়বা (রহঃ) নু’মান ইবনু বাশীর (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সময় আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ) বেহুঁশ হয়ে পড়লেন যেভাবে উপরোক্ত হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। (তারপর তিনি বলেছেন) এরপর তিনি [আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ)] যখন (মূতার লড়াইয়ে) শহীদ হন তখন তাঁর বোন মোটেই কান্নাকাটি করেনি।
হাদিস নং - ৩৯৪৩
আমর ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমরা প্রত্যূষে গোত্রটির উপর আক্রমণ করি এবং তাদেরকে পরাজিত করে দেই। এ সময়ে আনসারদের এক ব্যাক্তি ও আমি তাদের (হুরকাদের) একজনের পিছু ধাওয়া করলাম। আমরা যখন তাকে ঘিরে ফেললাম তখন সে বলে উঠলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এ বাক্য শুনে আনসারী তার অস্ত্র সামলে নিলেন। কিন্তু আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। আমরা মদিনা প্রত্যাবর্তন করার পর এ সংবাদ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কান পর্যন্ত পৌঁছলে তিনি বললেন, হে উসামা। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ? আমি বললাম, সে তো আত্মরক্ষার জন্য কলেমা পড়েছিল। এর পরেও তিনি এ কথাটি ‘হে উসামা! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ’ বারবার বলতে থাকলেন। এত আমার মন চাচ্ছিল যে, হায় যদি সেই দিনটির পূর্বে আমি ইসলামই গ্রহণ না করতাম! (তা হলে কতই ভাল হত, আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এহেন অনুতাপের কারণ হতে হত না। )[১] [১ ] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঘটনায় দারুণভাবে ব্যথিত হয়েছেন দেখে তিনি অনুতাপের আতিশয্যে এ কথা বলেছেন। নতুবা পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ যে খারাপ করে ফেলেছেন এ কথা বলা উদ্দেশ্য নয়। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বর্ণনা করেছেনঃ এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে নিহত ব্যাক্তির দিয়্যাত (রক্তপণ) আদায়ের জন্য আদেশ দিয়েছেন।
হাদিস নং - ৩৯৪৪
কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) সালামা ইবনু আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আর তিনি যেসব অভিযান (বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে) পাঠিয়েছিলেন তম্মধ্যে নয়টি অভিযানে আমি অংশ নিয়েছি। এসব অভিযানে একবার আবূ বকর (রাঃ) আমাদের সেনাপতি থাকতেন, আরেকবার উসামা (রাঃ) আমাদের সেনাপতি থাকতেন। উমর ইবনু হাফস ইবনু গিয়াস (রহঃ) অপর একটি হাদীসে তাঁর পিতা ইয়াযীদ ইবনু আবী উবায়দা (রাঃ)-এর মাধ্যমে সালমা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আর তিনি (বিভিন্ন দিকে) যেসব সেনাদল পাঠিয়েছিলেন এর নয়টি সেনাদলে অংশ নিয়েছি। এ সব সেনাদলে একবার আবূ বকর (রাঃ) আমাদের সেনাপতি থাকতেন। আরেকবার উসামা (রাঃ) আমাদের সেনাপতি থাকতেন।
হাদিস নং - ৩৯৪৫
আবূ আসিম দাহ্হাক ইবনু মাখলাদ (রহঃ) সালামা ইবনু আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং যায়িদ ইবনু হারিসা (রাঃ)-এর সাথেও যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে (যায়িদকে) আমাদের সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৪৬
মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) সালামা ইবনু আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। এতে তিনি খায়বার , হুদায়বিয়া, হুনায়ন ও যিকারাদের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাকারী ইয়াযীদ (রহঃ) বলেন, অবশিষ্ট যুদ্ধগুলোর নাম আমি ভুলে গিয়েছি।
হাদিস নং - ৩৯৪৭
কুতায়বা (রহঃ) আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে এবং যুবাযর ও মিকদাদ (রাঃ)-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলে পাঠালেন যে, তোমরা রওয়ানা হয়ে রাওযায়ে খাখ নামক স্থানে চলে যাও, সেখানে সাওয়ারীর পিঠে হাওদায় আরোহিণী জনৈক মহিলার কাছে একখানা পত্র আছে। তোমরা ঐ পত্রটি সেই মহিলা থেকে কেড়ে আনবে। আলী (রাঃ) বলেন, আমরা রাওযায়ে খাখ পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। গিয়েই আমরা হাওদায় আরোহিণী মহিলাটিকে দেখতে পেলাম। আমরা (তাকে) বললাম, পত্রটি বের কর। সে উত্তর দিলঃ আমার কাছে কোন পত্র নেই। আমরা বললাম অবশ্যই তোমাকে পত্রটি বের করতে হবে, অন্যথায় আমরা তোমরা কাপড়-চোপড় খুলে তালাশ করব। রাবী বলেন, মহিলাটি তখন তার চুলের খোপা থেকে পত্রটি বের করল। আমরা পত্রটি নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে আসলাম। দেখা গেল এটি হাতিব ইবনু আবূ বালতা’আ (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে মক্কার কতিপয় মুশরিকের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি এতে মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর গৃহীত কিছু গোপন তৎপরতার সংবাদ ফাঁস করে দিয়েছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে হাতিব! এ কি কাজ করেছ? তিনি বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! (অনুগ্রহ পূর্বক) আমার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। আমি কুরাইশদের স্বগোত্রীয় কেউ ছিলাম না বরং তাদের বন্ধু অর্থাৎ তাদের মিত্র গোত্রের একজন ছিলাম। আপনার সঙ্গে যেসব মুহাজির আছেন কুরাইশ গোত্রে তাঁদের অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন। যারা এদের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদের হিফাজত করছে। আর কুরাইশ গোত্রে যখন আমার বংশগত কোন সম্পর্ক নেই তাই আমি ভাবলাম যদি আমিতাদের কোন উপকার করে দেই তাহলে তারা আমরা পরিবার-পরিজনের হিফাজতে এগিয়ে আসবে। কখনো আমি আমর দ্বীন পরিত্যাগ করা কিংবা ইসলাম গ্রহণের পর কুফরকে গ্রহণ করার জন্য এ কাজ করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, সে (হাতিন) তোমাদের কাছে সত্য কথাই বলেছে। উমর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেবো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ল্লাহ্ বললেন, দেখ, সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তুনি তো জানো না, হয়তো আল্লাহ্ তা’আলা বদরে অংশগ্রহণকারীরদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে বলে দিয়েছেন, তোমরা যা খুশী করতে থাক, আমি তোমারদেরক ক্ষমা করি দিয়েছি। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এ সূরা অবতীর্ণ করেনঃ হে মু’মিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছ অথচ তারা তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এবং তোমাদেরকে (স্বদেশ থেকে) বহিস্কার করেছে এ কারণে যে তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস কর। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে থাক তবে কেন তোমরা ওদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর তা আমি সম্যক অবগত আছি। আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ কাজ করে সে তো বিচ্যুত হয়ে যায় সরল পথ থেকে (৬০:১)
হাদিস নং - ৩৯৪৮
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জানিয়েছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ করেছেন। বর্ণনাকারী যুহরী (রহঃ) বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মূসা য়্যাব (রহঃ)-কেও অনুরূপ বর্ণনা করতে শুনেছি। আরেকটি সূত্র দিয়ে তিনি উবায়দুল্লাহ্ ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ)-এর মাধ্যমে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেছেন, (মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা পালন করছিলেন। অবশেষে তিনি যখন কুদায়দ এবং উস্ফান নামক স্থানদ্বয়ের মধ্যবর্তী কাদীদ নামক জায়গার ঝরনাটির কাছে পৌঁছেন কখন তিনি ইফ্তার করেন। এরপর রমযান মাস খতম হওয়া পর্যন্ত তিনি আর রোযা পালন করেননি।
হাদিস নং - ৩৯৪৯
মাহমুদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে মদিনা থেকে (মক্কা অভিযানে) রওয়ানা হন। তাঁর সঙ্গে ছিল দশ হাজার সাহাবী। তখন (মক্কা থেকে) হিজরত করে মদিনা চলে আসার সাড়ে আট বছর অতিক্রম হয়ে গিয়েছিল। তিনি ও তাঁর সঙ্গী মুসলিমগণ রোযা অবস্থায়ই মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। অবশেষে তিনি যখন উস্ফান ও কুদায়দ স্থানদ্বয়ের মধ্যবর্তী কাদীদ নামক জায়গার ঝরনার নিকট পৌঁছলেন কথন তিনি ও সঙ্গী মুসলিগণ ইফতার করলেন। যুহরী (রহঃ) বলেছেনঃ (উম্মাতের জীবনযাত্রায়) ফাতওয়া হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাজকর্মের শেষোক্ত আমলটিকেই চূড়ান্ত দলীল হিসাবে গণ্য করা হয়। (কেননা শেষোক্ত আমল এর পূর্ববর্তী আমলকে রহিত করে দেয়)।
হাদিস নং - ৩৯৫০
আইয়াশ ইবনু ওয়ালীদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে হুনায়নের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন। সঙ্গী মুসলিমদের অবস্থা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কেউ ছিলেন রোযাদার। আবার কেউ রোযাবিহীন অবস্থায়। তাই তিনি যখন সওয়ারীর উপর বসলেন কথন তিনি একপাত্র দুধ কিংবা পানি আনতে বললেন। তারপর তিনি পাত্রটি হাতের উপর কিংবা সওয়ারীর উপর রেখে (সমবেত) লোকজনের দিকে তাকালেন। এ অবস্থা দেখে রোযাবিহীন লোকেরা রোযাদার লোকদেরকে ডেকে বললেনঃ তোমরা রোযা ভেঙ্গে ফেল। আবদুর রায্যাক, মা’মার, আইয়ুব, ইা (রহঃ) সূত্রে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের বছর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - অভিযানে বের হয়েছিলেন। এভাবে হাম্মাদ ইবনু যায়িদ আইয়ুব ইা (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও বিষয়টি বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৫১
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে রোযা অবস্থায় (মক্কা অভিমুখে) সফর করেছেন। অবশেষে তিনি উসফান নামক স্থানে উপনীত হলে একপাত্র পানি দিতে বললেন। তারপর দিনের বেলাই তিনি সে পানি পান করলেন যেন তিনি লোকজনকে তাঁর রোযাবিহীন অবস্থা দেখাতে পারেন। এরপর মক্কা পৌঁছা পর্যন্ত তিনি আর রোযা পালন করেননি। বর্ণনাকারী বলেছেন, পরবর্তীকালে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলতেন সফরে কোন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা পালন করতেন আবার কোন কোন সময় তিনি রোযাবিহীন অবস্থায়ও ছিলেন। তাই সফরে (তোমাদের) যার ইচ্ছা সে রোযা পালন করতে পার আর যার ইচ্ছা সে রোযাবিহীন অবস্থায়ও থাকতে পার। (সফর শেষে আবাসে আ আদায় করে নেবে)।
হাদিস নং - ৩৯৫২
উবায়দ ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) হিশামের পিতা [উরওয়া ইবনু যুবায়র (রাঃ)] থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের বছর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মক্কা অভিমুখে) রওয়ানা করেছেন। এ সংবাদ কুরাইশদের কাছে পৌঁছলে আবূ সুফিয়ান ইবনু হারব, হাকীম ইবনু হিযাম এবং বুদায়ল ইবনু ওয়ারক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য বেরিয়ে এলো। তারা রাতের বেলা সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে (মক্কার অদুরে) মাররুয জাহ্রান নামক স্থান পর্যন্ত এসে পৌঁছলে আরাফার ময়দানে প্রজ্বলিত আলোর মত অসংখ্য আগুন দেখতে পেল। আবূ সুফিয়ান (আশ্চর্যান্বিত হয়ে) বলে উঠল, এ সব কিসের আলো? ঠিক যেন আরাফার ময়দানে প্রজ্বলিত আলোর মত (অসংখ্য বিস্তৃত)। বুদায়ল ইবনু ওয়ারকা উত্তর করল, এগুলো আমর গোত্রেরে (চুলার) আলো। আবূ সুফিয়ান বলল, আমর গোত্রের লোক সংখ্যা এ অপেক্ষা অনেক কম। ইত্যবসরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কয়েকজন সামরিক প্রহরী তাদেরকে দেখে ফেলল এবং কাছে গিয়ে তাদেরকে পাকড়াও করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে নিয়ে এলো। এ সময় আবূ সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করল। এরপর তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] যখন (সেনাবাহিনী সহ মক্কা নগরীর দিকে) রওয়ানা হলেন তখন আব্বাস (রাঃ)-কে বললেন, আবূ সুফিয়ানকে পথের একটি সংকীর্ণ জায়গায় (পাহাড়ের কোণে) দাঁড় করাবে, যেন সে মুসলমানদের সমগ্র সেনাদলটি দেধতে পায়। তাই আব্বাস (রাঃ) তাকে যথাস্থানে থামিয়ে রাখলেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে আগমনকারী বিভিন্ন গোত্রের লোকজন আলাদা আলাদাভাবে খন্ডদল হয়ে আবূ সুফিয়ানের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করে যেতে লাগল। প্রথমে একটি দল অতিক্রম করে গেল। আবূ সুফিয়ান বললেন, হে আব্বাস (রাঃ), এরা কারা? আব্বাস (রাঃ) বললেন, এরা গিফার গোত্রের লোক। আবূ সুফিয়ান বললেন, আমার এবং গিফার গোত্রের মধ্যে কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল না। এরপর জুহায়না গোত্রের লোকেরা অতিক্রম করে গেলেন, আবূ সুফিয়ান অনুরূপ বললেন। তারপর সা’দ ইবনু হুযায়ম গোত্র অতিক্রম করল, তখনো আবূ সুফিয়ান অনুরূপ বললেন। তারপর সুলায়ম গোত্র অতিক্রম করলেও আবূ সুফিয়ান অনুরূপ বললেন। অবশেষে একটি বিরাট বাহিনী তার সামনে এলো যে, এত বিরাট বাহিনী এ সময় তিনি আর দেখেননি। তাই (আশ্চর্য হয়ে) জিজ্ঞাসা করলেন, এরা কারা? আব্বাস (রাঃ) উত্তর দিলেন, এরাই (মদিনার) আনসারবৃন্দ। সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) তাঁদের দলপতি। তাঁর হাতেই রয়েছে তাঁদের পতাকা। (অতিক্রমকালে) সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) বললেন, হে আবূ সুফিয়ান! আজকের দিন রক্তপাতের দিন, আজকের দিন কাবার অভ্যন্তরে রক্তপাত হালাল হওয়ার দিন। আবূ সুফিয়ান বললেন, হে আব্বাস! আজ হারাম ও তার অধিবাসীদের প্রতি তোমাদের করুণা প্রদর্শনেরও কত উত্তম দিন। তারপর আরেকটি সেনাদল আসল। সংখ্যাগত দিক থেকে এটি ছিল সবচেয়ে ছোট দল। আর এদের মধ্যেই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ। যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রাঃ)-এর হাতে ছিল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ঝান্ডা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবূ সুফিয়ানের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছেলেন, তখন আবূ সুফিয়ান বললেন, সা’দ ইবনু উবাদা কি বলছে আপনি তা কি জানেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কি বলেছে? আবূ সুফিয়ান বললেন, সে এ রকম এ রকম বলেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সা’দ ঠিক বলেনি বরং আজ এমন একটি দিন যে দিন আল্লাহ্ কা’বাকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আজকের দিনে কা’বাকে গিলাফে আচ্ছাদিত করা হবে। বর্ণনাকারী বলেন, (মক্কা নগরীতে পৌঁছে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজুন নামক স্থানে তাঁর পতাকা স্থাপনের নির্দেশ দেন। বর্ণনাকারী উরওয়া নাফি’ জুবায়র ইবনু মুত্ঈম আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি যাবায়র ইবনু আওয়াম (রাঃ)-কে (মক্কা বিজয়ের পর একদা) বললেন, হে আবূ আবদুল্লাহ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে এ জায়গায়ই পতাকা স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। উরওয়া (রাঃ) আরো বলেন, সে, দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ ইবনু ওয়ালীদকে মক্কার উঁচু এলাকা কাঁধার দিক থেকে প্রবেশ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (নিম্ন এলাকা) কুদার দিক থেকে প্রবেশ করেছিলেন। সেদিন খালিদ ইবনু ওয়ালীদের অশ্বারোহী সৈন্যদের মধ্য থেকে হুবায়শ ইবনুল আশআর এবং করয ইবনু জাবির ফিহ্রী (রাঃ)-এ দু’জন শহীদ হয়েছিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৫৩
আবূল ওয়ালীদ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফ্ফার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তাঁর উটনীর উপর দেখেছি, তিনি ‘তারজী’ করে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করছেন। বর্ণনাকারী মু’আবিয়া ইবনু কুররা (রহঃ) বলেন, যদি আমার চতুষ্পার্শ্বে লোকজন জমায়েত হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত, তা হলে আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফ্ফাল (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর তিরাওয়াত বর্ণনা করতে যেভাবে তারজী করেছিলেন আমিও ঠিক সে রকমে তারজী করে তিলাওয়াত করতাম।
হাদিস নং - ৩৯৫৪
সুলায়মান ইবনু আবদুর রহমান (রহঃ) উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি মক্কা বিজয়ের কালে [বিজয়ের একদিন পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে] বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগামীকাল আপনি কোথায় অবস্থান করবেন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আকীল কী আমাদের জন্য কোন বাড়ি অবশিষ্ট রেখে গিয়েছে? এরপর তিনি বললেন, মুমিন ব্যাক্তি কাফেরের ওয়ারিশ হয় না, আর কাফেরও মু’মিন ব্যাক্তির ওয়ারিশ হয় না। ১ (পরবর্তীকালে) যুহরী (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, আবূ তালিবের ওয়ারিশ কে হয়েছিল? তিনি বলেছেন, আকীল এবং তালিব তার ওয়ারিশ হয়েছিল। মামার (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আপনি আগামীকাল কোথায় অবস্থান করবেন কথাটি (উসামা ইবনু যায়িদ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তার হাজ্জের (হজ্জ) সফরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কিন্তু ইউনূস (রহঃ) তাঁর হাদীসে মক্কা বিজয়ের সময় বা হাজ্জের (হজ্জ) সফর কোনটিরই উল্লেখ করেননি। [১ ] আবূ তালিবের মৃত্যুকালে তার পুত্র আকীল কাফের অবস্থান ছিল। এ দিকে আবূ তালিবেরও ঈমান গ্রহণের সৌভাগ্য হয়নি। এ জন্য আকীল তার উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন আর আলী এবং জা’ফর মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁরা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছেন। কিন্তু আকীল পরবর্তীকালে সমুদয় সম্পদ জমা-জমি বিক্রয় করে ফেলে এবং মুসলমান হয়ে যায়। এ জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত উক্তি করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৫৫
আবূল ইয়ামান (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের পূর্বে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ আমাদেরকে বিজয় দান করলে ইন্শাআল্লাহ্ ‘খাইফ’ হবে আমাদের অবস্থানস্থল, যেখানে কাফেররা কুফরীর উপর পরস্পরে শপথ গ্রহণ করেছিল। [১] [১ ] হিজরতের পূর্বে একবার কাফেররা সম্মিলিতভাবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ‘খাইফ’ নামক স্থানে একত্রিত হয়েছিল এবং তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিবকে মক্কা থেকে বহিস্কার করে খাইফ এলাকায় নির্বাসন দেয়ার ফয়সালা করেছিল। পরিশেষে সকলে এ ফয়সালা মুতাবি কাজ করে যাবে এ কথার উপর তারা পরস্পর শপথ করে একটি চুক্তিনামাও স্বাক্ষর করেছিলেন। এটই খাইফের দস্তাবেজ নামে প্রসিদ্ধ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদিকেই ইশারা করেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৫৬
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে বললেন, বনী কিনানার খাইফ নামক স্থানেই হবে আমাদের আগামী কালের অবস্থানস্থল, যেখানে কাফেররা কুফরের উপর পরস্পর শপথ গ্রহণ করেছিল।
হাদিস নং - ৩৯৫৭
ইয়াহ্ইয়া ইবনু কাযাআ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথায় লোহার টুপি পরিহিত অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেছেন। তিনি সবেমাত্র টুপি খুলেছেন এ সময় এক ব্যাক্তি এসে বলল, ইবনু খাতাল কাবার গিলাফ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে হত্যা কর। [১] ইমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন, আমাদের ধারণামতে সেদিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহ্রাম অবস্থায় ছিলেন না। তবে আল্লাহ্ আমাদের চেয়ে ভাল জানেন।
হাদিস নং - ৩৯৫৮
সাদাকা ইবনু ফাযল (রহঃ) আবদুল্লাহ [ইবনু মাসউদ (রাঃ)] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন বায়তুল্লাহর চারপাশ ঘিরে তিনশত ষাটটি প্রতিমা স্থাপিত ছিল। তিনি হাতে একটি লাঠি নিয়ে (বায়তুল্লাহর অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন এবং) প্রতিমাগুলোকে আঘাত করতে থাকলেন আর (মুখে) বলতে থাকলেন, হক এসেছে, বাতিল অপসৃত হয়েছে। হক এসেছে বাতিলের আর উদ্ভব ও পুনরুদ্ভব ঘটবে না।
হাদিস নং - ৩৯৫৯
ইসহাক (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আগমন করার পর তৎক্ষণাৎ বায়তুল্লাহর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা থেকে বিরত রইলেন, কারণ সে সময় বায়তুল্লাহর অব্যন্তরে অনেক প্রতিমা স্থাপিত ছিল। তিনি এগুলোকে বের করে ফেলার জন্য আদেশ দিলেন। প্রতিমাগুলো বের করা হল। তখন (ঐগুলোর সাথে) ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মূর্তিও বেরিয়ে আসল। তাদের উভয়ের হাতে ছিল মুশরিকদের ভাগ্য নির্ণয়ের কয়েকটি তীর। কখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ তাদেরকে ধ্বংস করুক। তারা অবশ্যই জানত যে, ইবরাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয়ের কাজ করেননি। এরপর তিনি বায়তুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করলেন। আর প্রত্যেক কোণায় কোণায় গিয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিলেন এবং বেরিয়ে আসলেন। আর সেখানে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেননি। মা’মার (রহঃ) আইয়্যুব (রহঃ) সূত্রে এবং ওহায়ব (রহঃ) আইয়্যুব (রহঃ)-এর মাধ্যমে ইকরাম (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৬০
হায়সাম ইবনু খারিজা (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের বছর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উঁচু এলাকা ‘কাদা’-এর দিক দিয়ে প্রবেশ করেছেন। আবূ উসামা এবং ওহায়ব (রহঃ) ‘কাদা’-এর দিক দিয়ে প্রবেশ করার বর্ণনায় হাব্স ইবনু মায়সারা (রহঃ)-এর অনুসরণ করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৬১
উবায়দ ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) হিশামের পিতা থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের বছর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উঁচু এলাকা অর্থাৎ ‘কাদা’ নামক স্থান দিয়ে প্রবেশ করেছিলন।
হাদিস নং - ৩৯৬২
আবূল ওয়ালীদ (রহঃ) ইবনু আবী লায়লা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে চাশতের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে দেখেছে-এ কথাটি একমাত্র উম্মে হানী (রাঃ) ছাড়া অন্য কেউ আমাদের কাছে বর্ণনা করেননি। তিনি বলেছেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়িতে গোসল করেছিলেন, এরপর তিনি আট রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন। উম্মে হানী (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এ সালাত (নামায/নামাজ) অপেক্ষা হালকাভাবে অন্য কোন সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে দেখিনি। তবে তিনি রুকূ, সিজ্দা পুরোপুরই আদায় করেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৬৩
মুহাম্মাদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ‘সালাত (নামায/নামাজ)-এর রুকূ’ ও সিজ্দায় পড়তেন, সুবহানাকা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকাল্লাহুম্মা ইগফিরলী অর্থাৎ অতি পবিত্র হে আল্লাহ্! হে আমাদের প্রভু! আমি তোমারই প্রশংসা করছি। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা করে দাও।
হাদিস নং - ৩৯৬৪
আবূ নুমান (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর (রাঃ) তাঁর (পরামর্শ মজলিসে) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বর্ষীয়ান সাহাবাদের সঙ্গে আমাকেও শামিল করতেন। তাই তাঁদের কেউ কেউ বললেন, আপনি এ তরুণকে কেন আমাদের সাথে মজলিসে শামিল করেন। তার মত সন্তান তো আমাদেরও আছে। তখন উমর (রাঃ) বললেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) ঐ সব মানুষের একজন যাদের (মর্যাদা ও জ্ঞানের গভীরতা) সম্পর্কে আপনারা অবহিত আছেন। ইবনু আব্বাস বলেন, একদিন তিনি (উমর) তাদেরকে পরামর্শ মজলিসে আহবান করলেন এবং তাঁদের সাথে তিনি আমাকেও ডাকলেন। তিনি ইবনু আব্বাস) বলেন, আমার মনে হয় সেদিন তিনি তাঁদেরকে আমার ইল্মের গভীরতা দেখানোর জন্যই ডেকেছিলেন। উমর বলেন, (আরবী আয়াত) এভাবে সূরাটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ সূরা সম্পর্কে আপনাদের কি বক্তব্য? তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বললেন, এখানে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে যে, যখন আমাদেরকে সাহায্য করা হবে এবং বিজয় দান করা হবে তখন যেন আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আর কেউ কেউ বললেন, আমরা অবগত নই। আবার কেউ কেউ কোন উত্তরই করেননি। এ সময় উমর (রাঃ) আমাকে বললেন, ওহে ইবনু আব্বাস! তুমি কি এ রকমই মনে কর? আমি বললাম, জ্বী, না। তিনি বললেন, তা হলে তুমি কি রকম মনে কর? আমি বললাম, এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওফাতের সংবাদ। আল্লাহ্ তাঁকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। ‘যখন আল্লাহর সাহয্য এবং বিজয় আসবে’ অর্থাৎ মক্কা বিজয়। সেটিই হবে আপনার ওফাতের পূর্বাভাস। সুতরাং এ সময়ে আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করবেন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। অবশ্যই তিনি তাওবা কবুলকারী। এ কথা শুনে উমর (রাঃ) বললেন, এ সূরা থেকে তুমি যা যা উপলব্ধি করেছ আমি ঐটি ছাড়া অন্য কিছু উপলব্ধি করিনি।
হাদিস নং - ৩৯৬৫
সাঈদ ইবনু শুরু াহ্বীল (রহঃ) আবূ শুরু ায়হিল আদাবী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, (মদিনার শাসনকর্তা) আমর ইবনু সাঈদ যে সময় মক্কা অভিমুখে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করছিলেন তখন আবূ শুরু ায়হিল আদাবী (রাঃ) তাকে বলেছিলেন, হে আমাদের আমীর! আপনি আমাকে একটু অনুমতি দিন, আমি আপাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একটি বানী শোনাবো, যেটি তিনি মক্কা বিজয়ের পরের দিন বলেছিলেন। সেই বাণীটি আমার দু’কান শুনেছে। আমার হৃদয় তা হিফাজত করে রেখেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সে কথাটি বলছিলেন তখন আমার দু’চোখ তাঁকে অবলোকন করেছে। প্রথমে তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং সানা পাঠ করেন। এর পর তিনি বলেন, আল্লাহ্ নিজে মক্কাকে হারাম ঘোষণা দিয়েছেন। কোন মানুষ এ ঘোষণা দেয়নি। কাজেই যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ এবং কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান এনেছে তার পক্ষে (অন্যায়ভাবে) সেখানে রক্তপাত করা কিংবা এখানকার গাছপালা কর্তন করা কিছুতেই হালাল নয়। আর আল্লাহর রাসূল -এর সে স্থানে লড়াইয়ের কথা বলে যদি কেউ নিজের জন্যও সুযোগ করে নিতে চায় তবে তোমরা তাকে বলে দিও, আল্লাহ্ তাঁর রাসূল) -এর ক্ষেত্রে (বিশেষভাবে) অনুমতি দিয়েছিলেন, তোমাদের জন্য কোন অনুমতি দেনদি। আর আমার ক্ষেত্রেও তা একদিনের কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই কেবল অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর সেদিনই তা পুনরায় সেরূপ হারাম হয়ে গেছে যেরূপে তা একদিন পূর্বে হারাম ছিল। উপস্থিত লোকজন (এ কথাটি) অনুপস্থিত লোকদের কাছে পৌঁছিয়ে দেবে। (বর্ণনাকারী বলেন) পরবর্তী সময়ে আবূ সুরাইয়া (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, (হাদীসটি শোনার পর) আমর ইবনু সাঈদ আপনাকে কি উত্তর করেছিলেন? তিনি বললেন, আমর আমাকে বললেন, হে আবূ সুরাইয়া ! হাদীসটির বিষয়ে আমি তোমার চেয়ে অধিক অবগত আছি। (কথা ঠিক) কিন্তু, হারামে মক্কা কোন অপরাধী বা খুন থেকে পলায়নকারী কিংবা কোন চোর বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে আশ্রয় দেয় না।
হাদিস নং - ৩৯৬৬
কুতায়বা (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের বছর তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে মক্কায় অবস্থানকালে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল) মদের বেচাকেনা হারাম ঘোষণা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৬৭
আবূ নুআয়ম ও কাবীসা (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে (মক্কায়) দশ দিন অবস্থান করেছিলাম। এ সময়ে আমরা সালাত (নামায/নামাজ)-এর কসর করতাম।
হাদিস নং - ৩৯৬৮
আবদান (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের সময়ে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উনিশ দিন অবস্থান করেছিলেন, এ সময়ে তিনি দু’ রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন।
হাদিস নং - ৩৯৬৯
আহমাদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের সময়ে) সফরে আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে উনিশ দিন (মক্কায়) অবস্থান করেছিলাম। [১] এ সময়ে আমরা নামায়ে কসর করেছিলাম। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, আমরা সফরে উনিশ দিন পর্যন্ত কসর করতাম। এর চাইতে অধিক দিন অবস্থান করলে আমরা পূর্ণ সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতাম। (অর্থাৎ চার রাকাত আদায় করতাম)। [১ ] আনাস (রাঃ) এবং ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসদ্বয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অবস্থানের মেয়াদ বর্ণনায় পার্থক্য দেখা গেলেও হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, মূলত হযরত আনাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি বিদায় হাজ্জ (হজ্জ)র সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অবস্থান মেয়াদ এবং ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসে মক্কা বিজয়ের সফরে তাঁর অবস্থান মেয়াদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হাদিস নং - ৩৯৭০
ইব্রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি সুনাইন আবূ জামিলা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। যুহরী (রহঃ) বলেন, আমরা (সাঈদ) ইবনু মূসা য়্যিব (রহঃ)-এর সাথে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় আবূ জামিলা [১] (রাঃ) দাবি করেন যে তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে মক্কা বিজয়ের বছর (যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য) বের হয়েছিলেন। [১ ] আবূ জামীলা সাহাবী কি সাহাবী নন-এ বিষয়টি মুহাদ্দিসীনের কাছে বিতর্কিত বিষয়। ইবনু মান্দাহ্, আবূ নুআয়ম প্রমুখ ইমাম তাঁকে সাহাবীদের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এখানে উল্লিখিত সনদ দিয়ে ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সাহাবী হওয়ার পক্ষে প্রমাণ পেশ করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৭১
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আমর ইবনু সালিমা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আইয়ুব (রহঃ) বলেছেন, আবূ কিলাবা আমাকে বললেন, তুমি আমর ইবনু সালিমার সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস কর না কেন? আবূ কিলাবা (রহঃ) বলেন, এরপর আমি আমর ইবনু সালিমার সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, আমরা (আমাদের গোত্র) পথিকদের যাতায়াত পথের পাশে একটি ঝরনার নিকট বাস করতাম, (মক্কার) লোকজনের কি অবস্থা? মক্কার লোকজনের কি অবস্থা? আর ঐ লোকটিরই কি অবস্থা? তারা বলত, সে ব্যাক্তি তো দাবি করেন যে, আল্লাহ্ তাঁক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানিয়ে পাঠিয়েছেন। তাঁর প্রতি ওহী অবতীর্ণ করেছেন। (কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করে বললেন) তাঁর কাছে আল্লাহ্ এ রকম ওহী নাযিল করেছেন। (আমর ইবনু সালিমা বলেন) তখন (পথিকদের মুখ থেকে শুনে) আমি সে বাণীগুলো মুখস্থ করে ফেলতাম যেন তা আজ আমার হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। সমগ্র আরববাসী ইসলাম গ্রহণের জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ের অপেক্ষা করছিল। তারা বলত, তাঁকে তাঁর স্বগোত্রীয় লোকদের সঙ্গে (প্রথমে) বোঝাপড়া করতে দাও। কেননা তিনি যদি তাদের উপর বিজয় লাভ করেন তাহলে তিনি সত্য সত্যই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এরপর মক্কা বিজয়ের ঘটনা সংঘটিত হল। এবার সব গোত্রই তাড়াহুড়া করে ইসলামে দীক্ষিত হতে শুরু করল। আমাদের কাওমের ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে আমার পিতা বেশ তাড়াহুড়া করলেন। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করে বাড়ি ফিরলেন তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি সত্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র দরবার থেকে তোমাদের কাছে এসেছি। তিনি বলে দিয়েছেন যে, অমুক সময়ে তোমাদের একজন আযান দিবে এবং তোমাদের মধ্যে যে কুরআন মেশি মুখস্থ করেছে সে সালাত (নামায/নামাজ)-এর ইমানতি করবে। (এরপর সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করার সময় হল) সবাই এ রকম একজ্বীন লোককে খুঁজতে লাগল। কিন্তু আমার চেয়ে অধিক কুরআন মুখস্থকারী অন্য কাউকে পাওয়া গেল না। কেননা আমি কাফেলার লোকদের থেকে শুনে (কুরআন) মুখস্থ করতাম। কাজেই সকলে আমাকেই (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের জন্য) তাদের সামনে এগিয়ে দিল। অথচ তখনো আমি ছয় কিংবা সাত বছরের বালক। আমার একটি চাঁদর ছিল, যখন আমি সিজ্দায় যেতাম তখন চাঁদরটি আমার গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে উপরের দিকে উঠে যেত। (ফলে পেছনের অংশ অনাবৃত হয়ে পড়ত) তখন গোত্রের জনৈক মহিলা বলল, তোমরা তোমাদের ইমামের পেছনের অংশ আবৃত করে দাও না কেন? তাই সবাই মিলে কাপড় খরিদ করে আমাকে একটি জামা তৈরি করে দিল। এ জামা পেয়ে আমি এত আনন্দিত হয়েছিলাম যে, কখনো অন্য কিছুতে এ আনন্দিত হইনি।
হাদিস নং - ৩৯৭২
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। অন্য সনদে লায়েস (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উতবা ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) তার ভাই সা’দ [ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)]-কে ওয়াসিয়াত করে গিয়েছিল যে, সে যেন যামআর বাঁদীর সন্তানটি তাঁর নিজের কাছে নিয়ে নেয়। উতবা বলেছির, পুত্রটি আমার ঔরসজাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা বিজয়কালে সেখানে আগমন করলেন (সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাসও তাঁর সাথে মক্কায় আসেন। সুযোগ পেয়ে) তখন তিনি যামআর বাঁদীর সন্তানটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে উপস্থিত করলেন। তাঁর সাথে আবদ ইবনু যামআ (যামআর পুত্র) ও আসলেন। সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস দাবি উত্থাপন করে বললেন, সন্তানটি তো আমার ভাতিজা। আমার ভাই আমাকে বলে গিয়েছেন যে, এ সন্তান তার ঔরসজাত কিন্তু আবদ ইবনু যামআ তার দাবি পেশ করে বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , এ আমার ভাই, এ যাম্আর সন্তান, তাঁর বিছানায় এর জম্ম হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন যামআর ক্রীতদাসীর সন্তানের প্রতি নযর দিয়ে দেখলেন যে, সন্তানটি দৈহিক আকৃতিগত দিক থেকে উতবা ইবনু আবূ ওয়াক্কাসের সাথেই বেশি সা’দৃশ্যপূর্ণ। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবদ ইবনু যামআ! সন্তানটি তুমি নিয়ে যাও। সে তোমার ভাই। কেননা সে তার (তোমার পিতা যামআর) বিছানায় জম্মগ্রহণ করেছে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সন্তানটির দৈহিক আকৃতি উতবা ইবনু আবী ওয়াক্কাসের আকৃতির সা’দৃশ্য দেখার কারণে (তাঁর স্ত্রী) সাওদা বিনতে যামআ (রাঃ)-কে বললেন, হে সওদা! তুমি তার (বিতর্কিত সন্তানটির) থেকে পর্দা করবে। ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) বলেছেন যে এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সন্তানের (আইনগত) পিতৃত্ব স্বামীর। আর ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে পাথর। ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ) বলেছেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর নিয়ম ছিল যে তিনি এ কথাটি উচ্চস্বরে বলতেন।
হাদিস নং - ৩৯৭৩
মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহঃ) উরওয়া ইবনু যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যামানায় (মক্কা) বিজয় অভিযানের সময়ে জনৈকা মহিলা চুরি করেছিল। তাই তার গোত্রের লোকজন আতংকিত হয়ে গেল এব উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ)-এর কাছে এসে (উক্ত মহিলার ব্যাপারে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট সুপারিশ করার জন্য অনুরোধ করল। উরওয়া (রাঃ) বলেন, উসামা (রাঃ) এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে যখনি কথা বললেন, তখন তাঁর চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। তিনি উসামা (রাঃ)-কে বললেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত একটি হুকুম (হাদ) প্রয়োগ করার ব্যাপারে আমার কাছে সুপারিশ করছ? উসামা (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এরপর সন্ধ্যা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খতবা দিতে দাঁড়ালেন। যথাযথভাবে আল্লাহর হাম্দ ও প্রশংসা পাঠ করে বললেন, “আম্মা বাদ” তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ কারণে ধ্বংস হয়েছিল যে, তারা তাদের মধ্যকার অভিজাত শ্রেণীর কোন লোক চুরি করলে তার উপর শরীয়ত নির্ধারিত দন্ড প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকত। পক্ষান্তরে কোন দুর্বল লোক চুরি করলে তার উপর দন্ড প্রয়োগ করত। যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তাঁর শপথ, যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত তা হলে আমি তার হাত কেটে দিতাম। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মহিলাটির হাত কেটে দিতে আদেশ দিলেন। ফলে তার হাত কেটে দেওয়া হল। অবশ্য পরবর্তীকালে সে উত্তম তওবার অধিকারিণী হয়েছিল এবং (রানু সুলায়েম গোত্রের এক ব্যাক্তির সঙ্গে) তার বিয়ে হয়েছিল। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ ঘটনার পর সে আমার কাছে প্রায়ই আসত। আমি তার বিভিন্ন প্রয়োজন ও সমস্যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খেদমতে পেশ করতাম।
হাদিস নং - ৩৯৭৪
আমর ইবনু খালিদ (রহঃ) মুজাশি’ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের পর আমি আমার ভাই (মুজালিদ)-কে নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি যেন আর্পান তার কাছ থেকে হিজরত করার ব্যাপারে বায়াআত গ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হিজরতকারিগণ (মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকারিগণ) হিজরতের সমুদয় মর্যাদা ও বরকত পেয়ে গেছেন। (এখন আর হিজরতের অবকাশ নেই) আমি বললাম, তা হলে কোন্ বিষয়ের উপর আপনি তার কাছ থেকে বায়আত গ্রহণ করবেন? তিনি বললেন, আমি তাঁর কাছ থেকে বায়আত গ্রহণ করবো ইসলাম, ঈমান ও জিহাদের উপর। [বর্ণনাকারী আবূ উসমান (রাঃ) বলেছেন] পরে আমি আবূ মাবাদ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি ছিলেন তাঁদের দু’ভাইয়ের মধ্যে বড়। আমি তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, মুজাশি’ (রাঃ) ঠিকই বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৭৫
মুহাম্মদ ইবনু আবূ বকর (রহঃ) মুজাশি’ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ মা’বাদ (রাঃ) (মুজালিদ)-কে নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গেলাম, যেন তিনি তাঁর কাছ থেকে হিজরতের জন্য বায়আত গ্রহণ করেন। তখন তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, হিজরতের মর্যাদা (মক্কা বিজয়ের পূর্বেকার) হিজরতকারীদের দ্বারা সমাপ্ত হয়ে গেছে। আমি তার কাছ থেকে ইসলাম ও জিহাদের জন্য বায়আত গ্রহণ করব। [বর্ণনাকারী আবূ উসমান নাহদী (রহঃ) বলেন] এরপরে আমি আবূ মা’বাদ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, মুজাশি’ (রাঃ) সত্যই বলেছেন। অন্য সনদে খালিদ (রহঃ) আবূ উসমান (রহঃ)-এর মাধ্যমে মুজাশি’ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি তার ভাই মুজালিদ (রাঃ)-কে নিয়ে এসেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৭৬
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু উমর (রাঃ)-কে বললাম, আমি সিরিয়া দেশে হিজরত করার ইচ্ছা করেছি। তিনি বললেন, এখন হিজরতের কোন প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন আছে জিহাদের। সুতরাং যাও, নিজ অন্তরের সাথে বোঝাপড়া করে দেখ, যদি জিহাদের সাহস খুঁজে পাও (তবে ভাল, গিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ কর)। অন্যথায় হিজরতের ইচ্ছা থেকে ফিরে আস। অন্য সনদে নাযর [ইবনু শুমাইল (রহঃ)] মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেছেন) আমি ইবনু উমর (রাঃ)-কে (এ কথা) বললে তিনি উত্তর করলেন, বর্তমানে হিজরতের কোন প্রয়োজন নেই, অথবা তিনি বলেছেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওফাতের পর হিজরতের কোন প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি উপরোল্লিখিত হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেন।
হাদিস নং - ৩৯৭৭
ইসহাক ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) মুজাহিদ ইবনু জাব্র আল-মাক্কী (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলতেনঃ মক্কা বিজয়ের পর হিজরতের কোন প্রয়োজন অবশিষ্ট নেই।
হাদিস নং - ৩৯৭৭
ইসহাক ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) মুজাহিদ ইবনু জাব্র আল-মাক্কী (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলতেনঃ মক্কা বিজয়ের পর হিজরতের কোন প্রয়োজন অবশিষ্ট নেই।
হাদিস নং - ৩৯৭৮
ইসহাক ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) ‘আতা ইবনু আবূ রাবাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উবায়দ ইবনু উমায়র (রহঃ) সহ আয়িশা (রাঃ)-এর সাক্ষাতে গিয়েছিলাম। সে সময় উবায়দ (রহঃ) তাঁকে হিজরত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, বর্তমানে হিজরতের কোন প্রয়োজন নেই। পূর্বে মু’মিন ব্যাক্তির এ অবস্থা ছিল যে, সে তার দ্বীনকে ফিত্নার হাত থেকে হিফাজন করতে হলে তাকে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল) -এর দিকে (মদিনার দিকে) পালিয়েযেতে হতো। কিন্তু বর্তমানে (মক্কা বিজয়ের পর) আল্লাহ্ ইসলামকে বিজয় দান করেছেন। তাই এখন ম’মিন যেখানে যেভাবে চায় আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। তবে বর্তমানে জিহাদ এবং হিজরতের সওয়াবের নিয়্যাত রাখা যেতে পারে।
হাদিস নং - ৩৯৭৯
ইসহাক (রহঃ) মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুত্বার জন্য দাঁড়িয়ে বললেন, যেদিন আল্লাহ্ সমুদয় আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সেই দিন থেকেই তিনি মক্কা নগরীকে সম্মান দান করেছেন। তাই আল্লাহ্ কর্তৃক এ সম্মান প্রদানের কারণে এটি কিয়ামত দিবস পর্যন্ত সম্মানিত থাকবে। আমার পূর্বেকার কারো জন্য তা (কখনো) হালাল করা হয়নি, আমার পরবর্তী কারো জন্যও তা হালাল করা হবে না। আর আমার জন্যও মাত্র একদিনের সামান্য অংশের জন্যই তা হালাল করা হয়েছিল। এখানে অবস্থিত শিকারকে তাড়ানো যাবে না, কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের কাঁটাতেও কাস্তে ব্যবহারে করা যাবে না। ঘাস কাটা যাবে না। রাস্তায় পড়ে থাকা কোন জিনিসকে মালিকের হাতে পৌঁছেয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হারানো প্রাপ্তি সংবাদ প্রচারকারী ব্যতীত অন্য কেউ তুলতে পাবে না। এ ঘোষণা শুনে আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ইয্খির ঘাস ব্যতীত। কেননা ইয্খির ঘাস আমাদের কর্মকার ও বাড়ির (ঘরের ছাউনির) কাজে প্রয়োজন হয়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ থাকলেন। এর কিছুক্ষণ পরে বললেন, ইয্খির ব্যতীত। ইয্খির ঘাস কাটা জায়েয। অন্য সনদে ইবনু জুবায়ের (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণিত রয়েছে। তাছাড়া এ হাদীস আবূ হুরায়রা (রাঃ) ও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৮০
মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমাইর (রহঃ) ইসমাঈল (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আউফা (রাঃ)-এর হাতে একটি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। (আঘাতের ব্যাপারে) তিনি বলেছেন, হুনাইনের (যুদ্ধের) দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে থাকা অবস্থায় আমাকে এ আঘাত করা হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি কি হুনাইন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? তিনি বললেন, এর পূর্বের যুদ্ধগুলোতেও অংশগ্রহণ করেছি।
হাদিস নং - ৩৯৮১
মুহাম্মদ ইবনু কাসীর (রহঃ) আবূ ইসহাক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি বারা ইবনু আযিব (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, এক ব্যাক্তি এসে তাকে জিজ্ঞাস করলো, হে আবূ উমর! হুনাইনের যুদ্ধের দিন আপনি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিলেন কি? তখন তিনি বলেন যে, আমি তো নিজেই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেননি। তবে মুজাহিদদের অগ্রবর্তী যোদ্ধাগণ (গনীমত কুড়ানোর কাজে) তাড়াহুড়া করলে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা তাঁদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় আবূ সুফিয়ান ইবনুল হারিস (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাদা খচ্চরটির মাথা ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। আর রাসুলু্ল্লাহ্ তখন বলছিলেন, আমি যে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে কোন মিথ্যা নেই, আমি তো (কুরাইশ নেতা) মুত্তালিবের সন্তান।
হাদিস নং - ৩৯৮২
আবূল ওয়ালীদ (রহঃ) আবূ ইসহাক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি শুনলাম যে, বারা ইবনু আযিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, হুনাইন যুদ্ধের দিন আপনারা কি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিলেন? তিনি বললেন, কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেন নি। তবে তারা (হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা) ছিল দক্ষ তীরন্দাজ, [এ কারণে তারা তীর বর্ষণ আরম্ভ করলে বসাইকে পেছনে হেঁটে যেতে হয়েছে তবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেছনে হটেননি]। তিনি (অটলভাবে দাঁড়িয়ে) বলছিলেন, আমি যে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে কোন মিথ্যা নেই। আমি (তো কুরাইশ নেতা) আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।
হাদিস নং - ৩৯৮৩
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) আবূ ইসহাক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বারআ (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন যে, তাঁকে কায়স গোত্রের জনৈক ব্যাক্তি জিজ্ঞেস করেছিল যে, হুনায়ন যুদ্ধের দিন আপনারা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছ থেকে পেলিয়েছিলেন? তখন তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পেলান নি। তবে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা ছিল সুদক্ষ তীরন্দাজ। আমরা যখন তাদের উপর আক্রমণ চালালাম তখন তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে আরম্ভ করে। আমরা গনীমত তুলতে শুরু করলাম ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা (অতর্কিতভাবে) তাদের তীরন্দাজ বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হলাম। তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তাঁর সাদা রংয়ের খচ্চরটির পিঠে আরোহণ অবস্থায় দেখেছি। আর আবূ সুফিয়ান (রাঃ) তাঁর খচ্চরের লাগাম ধরেছিলেন, তিনি বলছিলেন, আমি আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , এতে কোন মিথ্যা নেই। বর্ণনাকারী ইসরাঈল এবং যুহাইর (রহঃ) বলেছেন যে, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খচ্চরটির (পিঠ থেকে) নীচে আবতরণ করেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৮৪
সাঈদ ইবনু উফাইর ও ইসহাক (রহঃ) মারওয়ান এবং মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিগণ যখন ইসলাম কবূল করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে এলো এবং তাদের (যুদ্ধ লুন্ঠিত) সম্পদ ও বন্দীদেরকে ফেরত দেওয়ার প্রার্থনা জানালো তখন তিনি দাঁড়ালেন এবং তাদের বললেন, আমার সঙ্গে যারা আছে (সাহানাগণ) তারেদ অবস্থা তো তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সত্য কথাই আমার কাছে বেশি প্রিয়। কাজেই তোমরা যুদ্ধবন্দী অথবা সম্পদের যে কোন একটিকে গ্রহণ করতে পার। আমি তোমাদের জন্য (পথেই) অপেক্ষা করছিলাম। বস্তুত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তন করার পথে (জিরানা জায়গায়) দশ রাতেরও অধিক সময় পর্যন্ত তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিদের কাছে যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে এ দু’টির মধ্যে একটির বেশি ফেরত দিতে সম্মত নন তখন তারা বললেন, আমরা আমাদের বন্দীদেরকে গ্রহণ করতে চাই। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথাযোগ্য হাম্দ ও সানা পাঠ করে বললেন, আম্মা বায়াদু, তোমাদের (হাওয়াযিন গোত্রের মুসলিম) ভাইয়েরা তওবা করে আমাদের কাছে এসেছে, আমি তাদের বন্দীদেরকে তাদের নিকট ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত করেছি। অতএব তোমাদের মধ্যে যে আমার এ সিদ্ধান্তকে খুশি মনে গ্রহণ করে নেবে সে (তার অংশের বন্দীকে) ফেরত দাও। আর তোমাদের মধ্যে যে তার অংশের অধিকারকে অবশিষ্ট রেখে তা এভাবে ফেরত দিতে চাইবে যে, ফাইয়ের সম্পদ থেকে (আগামীতে) আল্লাহ্ আমাকে সর্বপ্রথম যা দান করবেন তা দিয়ে আমি তার এ বন্দীর মূল্য পরিশোধ করবো, তবে সেও তাই করো। তখন সকল লোক উত্তর করলোঃ ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা আপনার প্রখম সিদ্ধান্ত খুশিমনে গ্রহণ করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে এ ব্যপারে কে খুশিমনে অনুমতি দিয়েছে আর কে খুশিমনে অনুমতি দেয়নি আমি তা বুঝতে পারিনি। তাই তোমরা ফিরে যাও এব তোমাদের মধ্যাকার বিজ্ঞ ব্যাক্তিদরে সাথে আলাপ কর। তাঁরা আমার কাছে বিষয়টি পেশ করবে। সবাই ফিরে গেল। পরে তাদের বিজ্ঞ ব্যাক্তিদের সাথে আলাপ কর। তাঁরা আমার কছে বিষয়টি পেশ করবে। সবাই ফিরে গেল। পরে তাদের বিজ্ঞ ব্যাক্তিগণ তাদের সাথে (আলাদা আলাদাভাবে) আলাপ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট ফিরে এসে জানালো যে, সবাই তাঁর (প্রথম) সিদ্ধান্তকেই খুশি মনে মেনে নিয়েছে এবং (ফেরত দেয়া) অনুমতি দিয়েছে। [ইমাম ইবনু শিহান যুহরী (রহঃ) বলেন] হাওয়াযিন গোত্রের বন্দীদের বিষয়ে এ হাদীসটই আমি অবহিত হয়েছে।
হাদিস নং - ৩৯৮৫
আবূ নু’মান (রহঃ) নাফি’ (সাখতিয়ানী) (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! । হাদসিটি অন্য সনদে মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হুনায়নের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করার কালে উমর (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জাহিলিয়্যাতের যুগে মানত করা তাঁর একটি ই’তিকাফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সেটি পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন হাদীসটি হাম্মাদ-আইয়ূব-নাফে (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া জারীর ইবনু হাযিম এবং হাম্মাদ ইবনু সালাম (রহঃ)-ও এ হাদীসটি আইয়ুব, নাফে (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৯৮৬
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়নের বছর আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমরা যখন (যুদ্ধের জন্য) শত্রুদের মুখোমুখি হলাম তখন মুসলিমদের মধ্যে বিশৃংখলা দেখা দিল। এ সময় আমি মুশরিকদের এক ব্যাক্তিকে দেখলাম সে মুসলিমদের এক ব্যাক্তিকে পরাভূত করে ফেলেছে। তাই আমি কাফের লোকটির পশ্চাৎ দিকে গিয়ে তরবারি দিয়ে তার কাঁধ ও ঘাড়ের মধ্যবর্তী শক্ত শিরার উপর আঘাত হানলাম এবং লোকটির পরিহিত লৌহ বর্মটি কেটে ফেললাম। এ সময় সে আমার উপর আক্রমণ করে বসলো এবং আমাকে এত জোরে চাপ দিয়ে জড়িয়ে ধরল যে, আমি আমার মৃত্যুর গন্ধ অনুভব করতে লাগলাম। এরপর লোকটই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো আর আমাকে ছেড়ে দিল। এরপর আমি উমর [ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)]-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, লোকজনের (মুসলিমদের) কি হল, (যে সবাই বিশৃংখল হয়ে গেলো)? তিনি বললেন, মহান ও শক্তিশালী আল্লাহর ইচ্ছা। এরপর সবাই (আবার) ফিরে এলো (এবং মুশরিকদের উপর হামলা চালিয়ে যুদ্ধে জয়ী হল) যুদ্ধের পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এক স্থানে) বসলেন এবং ঘোষণা দিলেন, যে ব্যাক্তি কোন মুশরিক যোদ্ধাকে হত্যা করেছে এবং তার কাছে এর প্রমাণ রয়েছে তাঁকে তার (নিহত ব্যাক্তির) পরিত্যক্ত সব সম্পদ প্রদান করা হবে। এ ঘোষণা শুনে আমি (দাঁড়িয়ে সবাইকে লক্ষ করে) বললাম, আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো কেউ আছে কি? (কিন্তু কোন জবাব না পেয়ে) আমি বসে পড়লাম। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেনঃ (তারপর) আবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ ঘোষণা দিলেন। আমি দাঁড়িয়ে বললাম, আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো কেউ আছে কি? কিন্তু (এবারও কোন সাড়া না পেয়ে) আমি বসে পড়লাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারপর অনুরূপ ঘোষণা দিলে আমি দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, আবূ কাতাদা! তোমার কি হয়েছে? আমি তাঁকে ব্যাপারটি জানালাম। এ সময়ে এক ব্যাক্তি বললো, আবূ কাতাদা (রাঃ) ঠিকই বলেছেন, তবে নিহত ব্যাক্তির পরিত্যক্ত দ্রব্যগুলো আমার কাছে আছে। সুতরাং সেগুলো আমাকে দিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি তাঁকে সম্মত করে দিন। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, না, আল্লাহর শপথ, তা হতে পারে না। আল্লাহর সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এর পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তার যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি তোমাকে দিয়ে দেয়ার ইচ্ছা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতে পারেন না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবূ বকর (রাঃ) ঠিকই বলছে। সুতরাং এসব দ্রব্য তুমি তাঁকে (আবূ কাতাদা) দিয়ে দাও। [ আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন] তখন সে আমাকে পরিত্যক্ত দ্রব্যগুলো দিয়ে দিল। এ দ্রব্যগুলোর বিনিময়ে আমি বনী সালিমার এলাকায় একটি বাগান খরিদ করআম। আর ইসলাম কবূল করার পর এটই ছিল প্রথম উপার্জিত মাল যা দিয়ে আমি আমার অর্থের বুনিয়াদ রেখেছি। অপর সনদে লাইস (রহঃ) আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনাইন যুদ্ধের দিন আমি দেখতে পেলাম যে, একজন মুসলিম এক মুশরিকের সাথে লড়াই করছে। অপর এক মুশরিক মুসলিম ব্যাক্তির পেছন দিক থেকে তাকে হত্যা করার জন্য আত্রমণ করছে। আমি আক্রমণকারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সে আমাকে আঘাত করার জন্য তার হাত উঠাল। আমি তার হাতের উপর আঘাত করলাম এবং তা কেটে ফেললাম। সে আমাকে ধরে সজোরে চাপ দিল। এমনকি আমি (মৃত্যুর) ভয় পেয়ে গেলাম। এরপর সে আমাকে ছেড়ে দিল ও সে দুর্বল হয়ে পড়ল। আমি তাকে আক্রমণ করে মেরে ফেললাম। মুসলিমগণ পালাতে লাগলেন। আমিও তাঁদের সাথে পেলালাম। হঠাৎ লোকদের মাঝে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে দেখতে পেয়ে আমি তাকে বললাম, লোকজনের অবস্থা কি? তিনি বললেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হয়েছে। এরপর লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট ফিরে এলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যে মুসলিম ব্যাক্তি (শত্রুদলের) কাউকে হত্যা করেছে বলে প্রমাণ পেশ করতে পারবে নিহত ব্যাক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ সে-ই পাবে। আমি যে একজনকে হত্যা করেছি সে ব্যাপারে আমি দাঁড়িয়ে সাক্ষী খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু আমর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার কাউকে পেলাম না। তখন আমি বসে পড়লাম। এরপর আমি ঘটনাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে বর্ণনা করলাম। তখন তাঁর সঙ্গীদের একজন বললেন, উল্লিখিত নিহত ব্যাক্তির (পরিত্যক্ত) হাতিয়ার আমার কাছে আছে। তা আমাকে দিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি তাকে সম্মত করে দিন। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, না, তা হতে পারে না। আল্লাহর সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল) -এর পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তাকে না দিয়ে এ কুরায়শী দুর্বল ব্যাক্তিকে তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] দিতে পারেন না। রাবী বলেন, এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং আমাকে তা দিয়ে দিলেন। আমি এর দ্বারা একটি বাগান খরিদ করলাম। আর ইসলাম কবূল করার পর এটই ছিল প্রথম উপার্জিত মাল, যা দিয়ে আমি আমার অর্থের বুনিয়াদ রেখেছি।
হাদিস নং - ৩৯৮৭
মুহাম্মদ ইবনু আলা (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়ন যুদ্ধ থেকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবসর হওয়ার পর তিনি আবূ আমির (রাঃ)-কে একটি সৈন্যবাহিনীর আমীর নিযুক্ত করে আওতাস গোত্রের প্রতি পাঠালেন। যুদ্ধে তিনি (আবূ আমির) দুরায়দ ইবনু সিম্মার সাথে মুকাবিলা করলে দুরায়দ নিহত হয় এবং আল্লাহ্ তার সহযোগী যোদ্ধাদেরকেও পরাজিত করেন। আবূ মূসা (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ আমির (রাঃ)-এর সাথে আমাকেও পাঠিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে আবূ আমির (রাঃ)-এর হাঁটুতে একটি তীর নিক্ষিপ্ত হয়। জুশাম গোত্রের এক লোক তীরটি নিক্ষেপ করে তাঁর হাঁটুর মধ্যে বসিয়ে দিয়েছিল। তখন আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, চাচাজানো! কে আপনার উপর তীর ছুঁড়েছে? তখন তিনি আবূ মূসা (রাঃ)-কে ইশারার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ঐ যে, ঐ ব্যাক্তি আমাকে তীর মেরেছে। আমাকে হত্যা করেছে। আমি লোকটিকে লক্ষ করে তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম আর সে আমাকে দেখামাত্র ভাগতে শুরু করলো। আমি এ কথা বলতে বলতে তার পশ্চাঁদ্ধাবন করলাম, (পেলাচ্ছো কেন,)বেহায়া দাঁড়াও না, দাঁড়াও। লোকটি থেমে গেলো। এবার আমরা দু’জনে তরবারি দিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করলাম এবং শেষ পর্যন্ত আমি ওকে হত্যা করে ফেললাম। তারপর আমি আবূ আমির (রাঃ)-কে বললাম, আল্লাহ্ আপনার আঘাতকারীকে হত্যা করেছেন। তিনি বললেন, (ঠিক আছে, এবার তুমি আমার হাঁটু থেকে) তীরটি বের করে দাও। আমি তীরটি বের করে দিলাম। তখন ক্ষতস্থান থেকে কিছু পানিও বেরিয়ে আসলো। তিনি আমাকে বললেন, হে ভাতিজা! (আমি হয়তো বাঁচবো না) তাই তুমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার সালাম জানাবে এবং আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে বলবে। আবূ আমির (রাঃ) তাঁর স্থলে আমাকে সেনাবাহিনীর আমীর নিযুক্ত করলেন। এরপর তিনি কিছুক্ষণ বেঁচেছিলেন, তারপর ইন্তেকাল করলেন। (যুদ্ধ শেষে) আমি ফিরে এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর বাড়ি প্রবেশ করলাম। তিনি তখন পাকানো দড়ির তৈরি একটি খাটিয়ায় শায়িত ছিলেন। খাটিয়ার উপর (নামেমাত্র) একটি বিছানা ছিল। কাজেই তাঁর পিঠে এবং পার্শ্বদেশে পাকানো দড়ির দাগ পড়ে গিয়েছিল। আমি তাঁকে আমাদের এবং আবূ আমির (রাঃ)-এর সংবাদ জানালাম। (তাঁকে এ কথাও বললাম যে) তিনি (মৃত্যুর পূর্বে) বলে গিয়েছেন, তাঁকে [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে] আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে বলবে। এ কথা শুনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি আনতে বললেন এবং উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন। তারপর তাঁর দু’হাত উপরে তুলে তিনি দোয়া করে বললেন, হে আল্লাহ্! তোমার প্রিয় বান্দা আবূ আমিরকে মাগফিরাত দান করো। [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ার মুহূর্তে হাতদ্বয় এত উপরে তুললেন যে] আমি তাঁর বগলদ্বয়ের শুভ্রাংশ পর্যন্ত দেখতে পেয়েছি। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ্! কিয়ামত দিবসে তুমি তাঁকে তোমার অনেক মাখলুকের উপর, অনেক মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করো। আমি বললামঃ আমার জন্যও (দোয়া করুন)। তিনি দোয়া করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ্! ‘আবদুল্লাহ ইবনু কায়সের গুনাহ্ ক্ষমা করে দাও এবং কিয়ামত দিবসে তুমি তাঁকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করাও। বর্ণনাকারী আবূ বুরদা (রাঃ) বলেন, দু’টি দোয়ার একটি ছিল আবূ আমির (রাঃ)-এর জন্য আর অপরটি ছিলো আবূ মূসা (আশআরী) (রাঃ)-এর জন্য।
হাদিস নং - ৩৯৮৮
হুমাইদী (রহঃ) উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আমার কাছে এক হিজড়া ব্যাক্তি বসা ছিল, এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি শুনলাম, সে (হিজড়া ব্যাক্তি) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া (রাঃ)-কে বলছে, হে আবদুল্লাহ! কি বলো, আগামীকাল যদি আল্লাহ্ তোমাদেরকে তায়েফের উপর বিজয় দান করেন তা হলে গায়লানের কন্যাকে অবশ্যই তুমি লুফে নেবে। কেননা সে (এতই স্থুলদেহ ও কোমল যে), সামনের দিকে আসার সময়ে তার পিঠে চারটি ভাঁজ পড়ে আবার পিঠ ফিরালে সেখানে আটটি ভাঁজ পড়ে। [উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন] তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এদেরকে (হিজড়াদেরকে) তোমাদের কাছে প্রবেশ করতে দিও না। ইবনু উয়াইনা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, ইবনু জুরায়জ (রাঃ) বলেছেন, হিজড়া লোকটির নাম ছিলো হীত।
হাদিস নং - ৩৯৮৯
মাহমুদ (রহঃ) হিশাম (রহঃ) থেকে পূর্বোক্ত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। তবে তিনি এ হাদীসে এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন যে, সেদিন তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] তায়িফ অবরোধ করা অবস্থায় ছিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৯০
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ অবরোধ করলেন। (এবং দীর্ঘ পনেরোরও অধিক দিন পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে গেলেন) কিন্তু তাদের কাছ থেকে কিছুই হাসিল করতে পারেননি। তাই তিনি বললেন, ইন্শা আল্লাহ্ আমরা (অবরোধ উঠিয়ে মদিনার দিকে) ফিরে যাবো। কথাটি সাহাবীদের মনে ভারী অনুভূত হল। তাঁরা বললেন, আমরা চলে যাবো, তায়েফ বিজয় করবো না? বর্ণনাকারী একরার কাফিলুন শদ্বের স্থলে নাকফুলো (অর্থাৎ আমরা ‘যুদ্ধবিহীন ফিরে যাবো’) বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঠিক আছে, সকালে গিয়ে লড়াই করো। তাঁরা (পরদিন) সকালে লড়াই করতে গেলেন, এতে তাঁদের অনেকেই আহত হলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইন্শা আল্লাহ্ আমরা আগামীকাল ফিরে চলে যাবো। তখন সাহাবাদের কাছে কথাটি মনঃপূত হল। এ অবস্থা দেখে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। বর্ণনাকারী সুফিয়ান (রহঃ) একবার বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মুচকি হাসি হেসেছেন। হুমায়দী (রহঃ) বলেন, সুফিয়ান আমাদিগকে এ হাদীসের পূর্ণ সূত্রটিতে ‘খবর’ শব্দ প্রয়োগ করে বর্ণনা করেছেন (অর্থাৎ কোথাও ‘আন’ শব্দ প্রয়োগ করেন নি)।
হাদিস নং - ৩৯৯১
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) আবূ উসমান [নাহ্দী (রহঃ)] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাদীসটি শুনেছি সা’দ থেকে, যিনি আল্লাহর পথে গিয়ে সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলেন এবং আবূ বকর (রাঃ) থেকেও শুনেছি যিনি (তায়েফ অবরোধকালে) সেখানকার স্থানীয় কয়েকজনসহ তায়েফের পাঁচিলের উপর চড়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসেছিলেন। তাঁরা দু’জনই বলেছেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যাক্তি তার জানাথাকা সত্ত্বেও অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম। হিশাম (রহঃ) বলেন, মা’মার (রহঃ) আমাদের কাছে আসিম- আবূল আলিয়া (রহঃ) অথবা আবূ উসমান নাহদী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি সা’দ এবং আবূ বকর (রাঃ)-এর মাধ্যমে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসটি শুনেছি। আসিম (রহঃ) বলেন, আমি (আবূল আলিয়া অথবা আবূ উসমান) (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা কররাম, নিশ্চয় আপনাকে হাদীসটি এমন দু’জন রাবী বর্ণনা করেছেন যাঁদেরকে আপনি আপনার নিশ্চয়তার জন্য যথেষ্ট মনে করেন। তিনি উত্তরে বললেন, অবশ্যই, কেননা তাদের একজন হলেন সেই ব্যাক্তি যিনি আল্লাহর রাস্তায় সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলোন। আর অপর জন হলেন যিনি তায়েফের (নগরপাঁচিল টপকিয়ে) এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে সাক্ষাৎকারী তেইশ জনের একজন।
হাদিস নং - ৩৯৯২
মুহাম্মদ ইবনু ‘আলা (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল (রাঃ)-সহ মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী জিরানা নামাক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তখন, আমি তাঁর কাছে ছিলাম। এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এক বেদুঈন এসে বলল, আপনি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা পূরণ করবেন না? তিনি তাঁকে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করো। সে বললো, সুসংবাদ গ্রহণ কর কথাটি তো আপনি আমাকে অনেকবারই বলেছেন। তখন তিনি আবূ মূসা ও বিলাল (রাঃ)-এর দিকে ফিরে সক্রোধে বললেন, লোকটি সুসংবাদ ফিরিয়ে দিয়েছে। তোমরা দু’জন তা গ্রহণ করো। তাঁরা উভয়ে বললেন, আমরা তা গ্রহণ করলাম। এরপর তিনি পানি ভরে একটি পাত্র আনতে বললেন। (পানি আনা হল) তিনি এর মধ্যে নিজের উভয় হাত ও মুখমন্ডল ধুয়ে কুল্লি করলেন। তারপর [ আবূ মূসা ও বিলাল (রাঃ)-কে] বললেন, তোমরা উভয়ে এ থেকে পান করো এবং নিজেদের মুখমন্ডলি ও বুকে ছিটিয়ে দাও। আর সুসংবাদ গ্রহণ করো। তাঁরা উভয়ে পাত্রটি তুলে নিয়ে যথা নির্দেশ কাজ করলেন। এমন সময় উম্মে সালামা (রাঃ) পর্দার আড়াল থেকে ডেকে বললেন, তোমাদের মায়ের জন্যও কিছু অবশিষ্ট রেখে দিও। অতএব তাঁরা এ থেকে অবশিষ্ট কিছু উম্মে সালামা (রাঃ)-এর জন্য রেখে দিলেন।
হাদিস নং - ৩৯৯৩
ইয়াকুব ইবনু ইব্রাহীম (রহঃ) সাফওয়ান ইবনু ইয়া’লা ইবনু উমাইয়া (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, ইয়ালা (রাঃ) (অনেক সময়) বলতেন যে, আহা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার মুহূর্তে যদি তাঁকে দেখতে পেতাম। ইয়া’লা (রাঃ) বলেন, এরই মধ্যে একদা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিরানা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তাঁর (মাথার) উপর একটি কাপড় টানিয়ে ছায়া করে দেয়া হয়েছিল। আর সেখানে তাঁর সঙ্গে সাহাবীদের কয়েকজনও উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় তাঁর কাছে এক বেদুঈন আসলো। তার গায়ে খুশবূ মাখানো ছিলো এবং পরনে ছিলো একটি জোব্বা। সে বললো, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ঐ ব্যাক্তি সম্পর্কে আপনি কী মনে করেন যে গায়ে খুশবু মাখানোর পর জোব্বা পরিধান করা অবস্থায উমরা আদায়ের জন্য ইহ্রাম বেঁধেছে? [প্রশ্নকারীর জবাব দেয়ার পূর্বেই উমর (রাঃ) দেখলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেহারায় ওহী অবতীর্ণ হওয়ার চিহৃ দেখা যাচ্ছে] তাই উমর (রাঃ) হাত দিয়ে ইশারা করে ইয়া’লা (রাঃ)-কে আসতে বললেন। ইয়া’লা (রাঃ) এলে উমর (রাঃ) তাঁর মাথাটি (ছায়ার নিচে) ঢুকিয়ে দিলেন। তখন তিনি (ইয়া’লা) দেখতে পেলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেহারা লাল বর্ণ হয়ে রয়েছে। আর ভিতরে শ্বাস দ্রুত যাতায়াত করছে। এ অবস্থা কিছুক্ষণ পর্যন্ত ছিন, তারপর স্বাভঅবিক অবস্থায় ফিরে এলো। তখন তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে লোকটি কোথায়, কিছুক্ষণ আগে যে আমাকে ‘উমরার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল। এরপর লোকটিকে খুঁজে আনা হলে তিনি বললেনঃ তোমার গায়ে যে খুশবু রযেছে তা তুমি তিনবার ধুয়ে ফেল এবং জোব্বাটি খুলে ফেল। তারপর হাজ্জ (হজ্জ) আদায়ে যা কিছু করে থাক উমরাতেও সেগুলোই পালন কর।
হাদিস নং - ৩৯৯৪
মূসা ইবনু ইস্মাঈল (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ ইবনু আসিম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়নের দিবসে আল্লাহ্ যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে গনীমতের সম্পদ দান করলেন তখন তিনি ঐগুলো সেসব মানুষের মধ্যে বন্টন করে দিলেন যাদের হৃদয়কে ঈমানের উপর সুদৃঢ় করার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেছিলেন। আর আনসারগণকে কিছুই তিনি দেননি। ফলে তাঁরা যেন নাখোশ হয়ে গেলেন। কেননা অন্যান্য লোক যা পেয়েছে তাঁরা তা পান নি। অথবা তিনি বলেছেনঃ তাঁরা যেন দুঃখিত হয়ে গেলেন। কেননা অন্যান্য লোক যা পেয়েছে তারা তা পাননি। কাজেই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, হে আনসারগণ! আমি কি তোমাদেরকে গুমরাহীর মধ্যে লিপ্ত পাইনি, যার পরে আল্লাহ্ আমার দ্বারা তোমাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন? তোমরা ছিলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন, যার পর আল্লাহ্ আমার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরকে জুড়ে দিয়েছেন। তোমরা ছিলে রিক্তহস্ত, যার পরে আল্লাহ্ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন। এভাবে যখনই তিনি কোন কথা বলেছেন তখন আনসারগন জবাবে বলতেন, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল) ই আমাদের উপর অধিক ইহ্সানকারী। তিনি বললেনঃ আল্লাহর রাসূল -এর জবাব দিতে তোমাদেরক বাধা দিচ্ছে কিসে? তাঁরা তখনও তিনি যা কিছু বলছেন তার উত্তরে বলে গেলেন, আল্লাহ্ এবাং তাঁর রাসূল) ই আমাদের উপর অধিক ইহ্সানকারী। তিনি বললেন, তোমরা ইচ্ছা করলে বলতে পার যে, আপনি আমাদের কাছে এমন এমন (সংকটময়) সময়ে এসেছিলেন (যেগুলোকে আমরা বিদূরিত করেছি এবং আপনাকে সাহায্য করেছি) কিন্তু তোমরা কি এ কথার সন্তুষ্ট নও যে, অন্যান্য লোক বকরী ও উট নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা তোমাদের বাড়ি ফিরে যাবে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাথে নিয়ে। যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে হিজরত করানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত না থাকত তা হলে আমি আনসারদের মধ্যকারই একজন থাকতাম। যদি লোকজন কোন উপত্যকা ও গিরিপথ দিয়ে চলে তা হলে আমি আনসারদের উপত্যকা ও গিরিপথ দিয়েই চলব। আনসারগণ হল (নববী) দেহসংযুক্ত গেঞ্জি আর অন্যান্য লোক হল উপরের জামা। আমার বিদায়ের পর অচিরেই তোমরা দেখতে পাবে অন্যদের অগ্রাধিকার। তখন ধৈর্য ধারণ করবে (দ্বীনের উপর টিকে থাকবে) অবশেষে তোমরা হাউজে কাওসারে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।
হাদিস নং - ৩৯৯৫
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ্ তাঁর রাসূল) -কে হাওয়াযিন গোত্রের সম্পদ থেকে গনীমত হিসেবে যতটুকু দান করতে চেয়েছেন দান করলেন, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় লোককে এক একশ’ করে উট দান করতে লাগলেন। (এ অবস্থা দেখে) আনসারদের কিছুসংখ্যক লোক বলে ফেললেন, আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ক্ষমা করুন, তিনি আমাদেরকে বাদ দিয়ে কুরাইশদেরকে (গনীমতের মাল) দিচ্ছেন। অথচ আমাদের তরবারি থেকে এখনো তাদের তাজা রক্ত টপকাচ্ছে। আনাস (রাঃ) বলেন, তাঁদের এ কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বর্ণনা করা হলে তিনি আনসারদের কাছে সংবাদ পাঠালেন এবং তাদেরকে একটি চামড়ার তৈরি তাঁবুতে জামায়েত করলেন। এবং তাঁরা ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে উপস্থিত থাকতে অনুমতি দেননি। এরপর তাঁরা সবাই জমায়েত হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে বললেন, তোমাদের কাছ থেকে কি কথা আমার নিকট পৌঁছলো? আনসারদের বিজ্ঞ উলামাবৃন্দ বললেনঃ ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের নেতৃস্থানীয় কেউ তো কিছু বলেনি, তবে আমাদের কতিপয় কমবয়সী লোকেরা বলেছে যে, আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ক্ষমা করুন, তিনি আমাদেরকে বাদ দিয়ে কুরাইশদেরকে (গনীমতের মাল) দিচ্ছেন। অথচ আমাদের তরবারিগুলো থেকে এখনো তাদের তাজা রক্ত টপকাচ্ছে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি অবশ্য এমন কিছু লোককে (গনীমতের মাল) দিচ্ছি যারা সবেমাত্র কুফ্র ত্যাগ করে ইসলামে প্রবেশ করেছে। আর তা এ জন্য যেন তাদের মনকে আমি ঈমানের উপর সুদৃঢ় করতে পারি। তোমরা কি এত সন্তুষ্ট নও যে, অন্যান্য লোক ফিরে যাবে ধন-সম্পদ নিয়ে আর তোমরা বাড়ি ফিরে যাবে (আল্লাহর) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে? আল্লাহর কসম, তোমরা যে জিনিস নিয়ে ফিরে যাবে তা অনেক উত্তম ঐ ধন-সম্পদ অপেক্ষা, যা নিয়ে তারা ফিরে যাচ্ছে। আনসারগন বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরা এতে সন্তুষ্ট থাকলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, অচিরেই তোমরা (নিজেদের উপর) অন্যদের প্রাধান্য প্রবলভাবে অনুভব করতে থাকবে। অতএব, আমার মৃত্যুর পর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল) -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত তোমরা সবর করে থাকবে। আমি হাউজে কাওসারের নিকট থাকব। আনাস (রাঃ) বলেন, কিন্তু তাঁরা (আনসাররা) সবর করেননি।
হাদিস নং - ৩৯৯৬
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের মধ্যে গনীমতের মাল বন্টন করে দিলেন। এতে আনসারগণ নাখোশ হয়ে গেলেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট থাকবে না যে, লোকজন পার্থিব সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা আল্লাহর রাসূল কে নিয়ে ফিরবে? তাঁরা উত্তর দিলেন, অবশ্যই (সন্তুষ্ট থাকবো)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি লোকজন কোন উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করে তা হলে আমি আনসারদের উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করবো।
হাদিস নং - ৩৯৯৭
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়নের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাওয়াযিন গোত্রের মুখোমুখি হলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল দশ হাজার (মুহাজির ও আনসার সৈনিক) এবং (মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণকারী) নও-মুসলিমগণ। যুদ্ধে এরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। এ মুহূর্তে তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, ওহে আনসার সকল! তাঁরা জওয়াব দিলেন, আমরা হাযির, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার সাহায্য করতে আমরা প্রস্তুত এবং আপনার সামনেই আমরা উপস্থিত। (অবস্থা আরো তীব্র আকার ধারণ করলে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাওয়ারী থেকে নেমে পড়লেন আর বলতে থাকলেন, আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল)। (শেষ পর্যন্ত) মুশরিকরাই পরাজিত হল। (যুদ্ধশেষে) তিনি নও-মুসলিম এবং মুহাজিরদেরকে (গনীমতের সম্পূর্ণ সম্পদ) বন্টন করে দিলেন। আর আনসারদেরকে কিছুই দিলেন না। এতে তারা নিজেদের মধ্যে সে কথা বলাবলি করছিল। তখন তিনি তাদেরকে ডেকে এনে একটি তাঁবুর ভিতর একত্রিত করলেন এবং বললেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট থাকবে না যে, লোকজন তো বকরী ও উট নিয়ে চলে যাবে আর তোমরা চলে যাবে আল্লাহর রাসূল কে নিয়ে। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বললেন, যদি লোকজন একটি উপত্যকা দিয়ে গমন করে আর আনসারগণ একটি গিরিপথ দিয়ে গমন করে তা হলে আমি আমার জন্য আনসারদের গিরিপথকেই গ্রহণ করবো।
হাদিস নং - ৩৯৯৮
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের লোকজনকে জমায়েত করে বললেন, কুরাইশরা অতি সম্প্রতিকালের জাহিলিয়াত বর্জনকারী (নও-মুসলিম) এবং দুর্দশাগ্রস্ত। তাই আমি তাদেরকে অনুদান দিয়ে তাদের মন জয় করার ইচ্ছা করেছি। তোমরা কি সন্তুষ্ট থাকবে না যে, অন্যান্য লোক পার্থিব ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা তোমাদের ঘরে ফিরে যাবে আল্লাহর রাসূল কে নিয়ে। তারা বললেন, অবশ্যই (সন্তুষ্ট থাকবো)। তিনি আরো বললেন, যদি লোকজন একটি উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করে আর আনসারগণ একটি গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করে যায়, তা হলে আমি আনসারদের গিরিপথ অথবা তিনি বলেছেন, আনসারদের উপত্যকা দিয়েই অতিক্রম করে যাবো।
হাদিস নং - ৩৯৯৯
কাবীসা (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের গনীমত বন্টন করে দিলেন, তখন আনসারদের এক ব্যাক্তি বলে ফেলল যে, এই বন্টনের ব্যাপারে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখেন নি। কথাটি শুনে আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে আসলাম এবং তাঁকে কথাটি জানিয়ে দিলাম। তখন তাঁর চেহারার বং পরিবর্তিত হয়ে গেল। তারপর তিনি বললেন, আল্লাহ্, মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সবর করেছিলেন।
হাদিস নং - ৪০০০
কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়নের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কোন লোককে (গনীমতের মাল) বেশি বেশি করে দিয়েছিলেন। যেমন আকরা’কে একশ’ উট দিয়েছিলেন। ‘উয়ায়নাকে অনুরূপ (একশ’ উট) দিয়েছেলেন। এভানে আরো কয়েকজনকে দিয়েছেন। এতে এক ব্যাক্তি বলে উঠলো, এ বন্টন পদ্ধতিতে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্য রাখা হয়নি। (রাবী বলেন) আমি বললাম, অবশ্যই আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এ কথা জানিয়ে দিব। এরপর [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি শুনে] বললেন, আল্লাহ্ মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর উপর করুণা বর্ষণ করুন। তাঁকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন।
হাদিস নং - ৪০০১
হযরত মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়নের দিন হাওয়াযিন, গাতফান ইত্যাদি গোত্র নিজেদের গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণী ও সন্তান-সন্ততিসহ যুদ্ধক্ষেত্রে এলো। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলো দশ হাজার তুলাকা [১] সৈনিক। যুদ্ধে তারা সবাই তাঁর পাশ থেকে পিছনে সরে গেল। ফলে তিনি একাকী রয়ে যান। সেই সংকটময় মূহুর্তে তিনি আলাদা-আলাদাভাবে দু’টি ডাক দিয়েছিলেন, তিনি ডান দিক ফিরে বলেছিলেন, ওহে আনসারসকল, তাঁরা সবাই উত্তর করলেন, আমরা হাযির ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আপনি সুসংবাদ নিন, আমরা আপনার সঙ্গেই আছি। এরপর তিনি বাম দিকে ফিরে বলেছিলেন, ওহে আনসারসকল। তাঁরা সবাই উত্তরে বললেন, আমরা হাযির ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আপনি সুসংবাদ নিন, আমরা আপনার সঙ্গেই আছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাদা রঙের খচ্চরটির পিঠে ছিলেন। (অবস্থা আরো তীব্র হলে) তিনি নিচে নেমে পড়লেন এবং বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল)। (শেষ পর্যন্ত) মুশরিক দলই পরাজিত হল। সে যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গনীমত হস্তগত হল। তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] সেসব সম্পদ মুহাজির এবং নও-মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। আর আনসারদেরকে তার কিছুই দেননি। তখন আনসারদের (কেউ কেউ) বললেন, কঠিন মূহুর্ত আসলে আমাদেরকে ডাকা হয় আর গনীমত অন্যদেরকে দেওয়া হয়। কথাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। তাই তিনি তাদেরকে একটি তাঁবুতে জমায়েত করে বললেন, হে আনসারগন! একি কথা আমার কাছে পৌঁছলো? তাঁরা চুপ করে থাকলেন। তিনি বললেন, হে আনসারগন! তোমরা কি খুশি থাকবেনা যে, লোকজন দুনিয়ার ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা (বাড়ি) ফিরে যাবে আল্লাহর রাসূল ’কে সঙ্গে নিয়ে? তাঁরা বললেনঃ অবশ্যই। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি লোকজন একটি উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনসারগন একটি গিরিপথ দিয়ে চলে তাহলে আমি আনসারদের গিরিপথকেই গ্রহন করে নেবো। বর্ণনাকারী হিশাম (রহঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আবূ হামযা (আনাস ইবনু মালিক) আপনি কি এ ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি তাঁর কাছ থেকে আলাদা থাকতাম বা কখন? (যে আমি তখন সেখানে থাকবোনা)। [১] ‘তুলাকা’ শব্দটি ‘তালীক’- এর বহু বচন। এর অথ হল মুক্তিপ্রাপ্ত। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীদের কয়েকজন ব্যতীত অবশিষ্ট সবাইকে সাধারনভাবে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তুলাকা শব্দ দিয়ে সে সব ক্ষমাপ্রাপ্তদেরকে বুলানো হয়েছে। হুনায়ন যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী মুক্তিপ্রাপ্তদের সংখ্যা আলোচ্য হাদীসে দশ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত দশ হাজার ছিলো আনসার ও মুহাজিরদের সৈনিক সংখ্যা। আর ‘তুলাকা’দের সংখ্যা ছিলো এর এক-দশমাংশেরও অনেক কম। এ জন্য ইবনু হাজার আসকালানী ও অন্যান্য হাদীসবিদদের মতানুসারে এখানে ‘তুলাকা’ শব্দের পূর্বে একটি ‘ওয়া’ হরফ উহ্য আছে। অর্থাৎ দশ হাজার আনসার ও মুহাজির এবং মুক্তিপ্রাপ্ত লোকজন।
হাদিস নং - ৪০০২
হযরত আবূ নু’মান (রহঃ) ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদের দিকে একটি সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন, তাতে আমিও ছিলাম। (এ যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের অংশে) আমাদের সবার ভাগে বারোটি করে উট পৌঁছল। উপরন্তু আমাদেরকে একটি করে উট বেশিও দেওয়া হল। কাজেই আমরা সকলে তেরোটি করে উট নিয়ে ফিরে আসলাম।
হাদিস নং - ৪০০৩
হযরত মাহমুদ ইবনু গায়লান) ও নুয়াঈম (রহঃ) সালিমের পিতা [আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ)] থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) কে বনী জাযিমার বিরুদ্ধে এক অভিযানে পাঠিয়েছিলেন। (সেখানে পৌঁছে) খালিদ (রাঃ) তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। (তারা দাওয়াত কবুল করেছিল) কিন্তু আমরা ইসলাম কবুল করলাম, এ কথাটি বুঝিয়ে বলত পারছিলোনা। তাই তারা বলতে লাগলো, আমরা স্ব-ধর্ম ত্যাগ করলাম, আমরা স্ব-ধর্ম ত্যাগ করলাম। খালিদ (রাঃ) তাদেরকে হত্যা ও বন্দী করতে থাকলেন। এবং আমাদের প্রত্যেকের কাছে বন্দীদেরকে সোপর্দ করতে থাকলেন। অবশেষে একদিন তিনি আদেশ দিলেন আমাদের সবাই যেন নিজ নিজ বন্দীকে হত্যা করে ফেলি। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি আমার বন্দীকে হত্যা করবোনা, আর আমার সাথীদের কেউই তার বন্দীকে হত্যা করবেনা (কারন ব্যাপারটি সন্দেহযুক্ত)। অবশেষে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ফিরে আসলাম। আমরা তাঁর কাছে এ ব্যাপারটি উল্লেখ করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দু’হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ্! খালিদ যা করেছে আমি তার দায় থেকে মুক্ত (আমি এর সাথে জড়িত নই)। এ কথাটি তিনি দু’বার বলেছেন।
হাদিস নং - ৪০০৪
হযরত মূসা’দ্দাদ (রহঃ) হযরত আলী ইবনু আবূ তালিব) (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, এক অভিযানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। এবং আনসারদের এক ব্যাক্তিকে তার সেনাপতি নিযুক্ত করে তিনি তাদেরকে তাঁর (সেনাপতির) আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (পরে কোন কারনে) আমীর ক্রুদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করতে নির্দেশ দেননি? তাঁরা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা আমার জন্য কিছু কাঠ সংগ্রহ করো। তাঁরা কাঠ সংগ্রহ করলেন। তিনি বললেন, এগুলোতে আগুন লাগিয়ে দাও। তাঁরা আগুন লাগালেন। তখন তিনি বললেন, এবার তোমরা সকলে এ আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ো। (আদেশ মতো) তাঁরা ঝাঁপ দেয়ার সংকল্পও করে ফেললেন। কিন্তু তাদের কয়েকজন বাধা দিয়ে বলতে লাগলেন, আগুন থেকেই তো আমরা পালিয়েগিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। (অথচ এখানে সেই আগুনেই ঝাঁপ দেয়ারই আদেশ)। এভাবে জ্বলতে জ্বলতে অবশেষে আগুন নিভে গেলো এবং তার ক্রোধও থেমে গেলো। এরপর এ সংবাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, যদি তারা আগুনে ঝাঁপ দিত তা হলে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আর এ আগুন থেকে বের হতে পারতোনা। কেননা আনুগত্য কেবল সৎ কাজের।
হাদিস নং - ৪০০৫
হযরত মূসা (রাঃ) হযরত আবূ বুরদা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ মূসা এবং মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) কে ইয়ামানের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। বর্ননাকারী বলেন, তৎকালে ইয়ামানে দু’টি প্রদেশ ছিলো। তিনি তাদের প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে বলে দিলেন, তোমরা (এলাকাবাসীদের সাথে) কোমল আচরন করবে, কঠিন আচরন করবেনা। এলাকাবাসীদের মনে সুসংবাদের মাধ্যমে উৎসাহ সৃষ্টি করবে, অনীহা সৃষ্টি হতে দেবেনা। এরপর তাঁরা দু’জনে নিজ নিজ শাসন এলাকায় চলে গেলেন। আবূ বুরদা (রাঃ) বললেন, তাঁদের প্রত্যেকেই যখন নিজ নিজ এলাকায় সফর করতেন এবং অন্যজনের কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে যেতেন তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত হলে তাদের সালাম বিনিময় করতেন। এভাবে হযরত মু’আয (রাঃ) একবার তাঁর এলাকায় এমন স্থানে সফর করছিলেন, যে স্থানটি তাঁর সাথী হযরত আবূ মূসা (রাঃ) এর এলাকার নিকটবর্তী ছিল। সুযোগ পেয়ে তিনি খচ্চরের পিঠে চড়ে (আবূ মূসা’র এলাকায়) পৌঁছে গেলেন। তখন তিনি দেখলেন যে হযরত আবূ মূসা (রাঃ) বসে আছেন আর তাঁর চারপাশে অনেক লোক জমায়েত হয়ে রয়েছে। আরো দেখলেন, পাশে এক লোককে তার গলার সাথে উভয় হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। হযরত মু’আয (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবদুল্লাহ ইবনু কায়স (আবূ মূসা), এ লোকটি কে? তিনি উত্তর দিলেন, এ লোকটি ইসলাম গ্রহন করার পর মুরতাদ হয়ে গেছে। হযরত মু’আয (রাঃ) বললেন, তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি সাওয়ারী থেকে অবতরন করবোনা। আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, এ উদ্দেশ্যেই তাকে এখানে আনা হয়েছে। সুতরাং আপনি অবতরন করুন। তিনি বললেন, না তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি নামবোনা। ফলে আবূ মূসা (রাঃ) হুকুম করলেন এবং লোকটিকে হত্যা করা হল। এরপর হযরত মু’আয (রাঃ) অবতরন করলেন। মু’আয (রাঃ) বললেন, ওহে আবদুল্লাহ! আপনি কিভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন? তিনি বললেন, আমি (রাত-দিনের সব সময়ই) কিছুক্ষন পরপর কিছু অংশ করে তেলাওয়াত করে থাকি। তিনি বললেন, আর আপনি কিভাবে তিলাওয়াত করেন, হে মু’আয? উত্তরে তিনি বললেন, আমি রাতের প্রথম ভাগে শুয়ে পড়ি এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিদ্রা যাওয়ার পর আমি উঠে পড়ি। এরপর আল্লাহ্ আমাকে যতটুকু তাওফীক দান করেন তিলাওয়াত করতে থাকি। এ পদ্ধতি অবলম্বন করার জন্য আমি আমার নিদ্রার অংশকেও সাওয়াবের বিষয় বলে মনে করি, যেভাবে আমি আমার তিলাওয়াতকে সাওয়াবের বিষয় বলে মনে করে থাকি।
হাদিস নং - ৪০০৬
হযরত ইসহাক (রহঃ) হযরত আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে (আবূ মূসা’কে গভর্নর নিযুক্ত করে) ইয়ামানে পাঠিয়েছেন। তখন তিনি ইয়ামানে তৈরী করা হয় এমন কতিপয় শরাব সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ঐগুলো কি কি? আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, তা হল বিত্উ ও মিযর শরাব। বর্ননাকারী হযরত সাঈদ (রহঃ) বলেন, (কথার ফাঁকে) আমি আবূ বুরদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বিত্উ কি? তিনি বললেন, বিত্উ হল মধু থেকে গ্যাজানোো রস আর মিযর হল যবের গ্যাজানোো রস। (সাঈদ বলেন) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সকল নেশা উৎপাদক বস্তুই হারাম। হাদীসটি জারীর এবং আবদুল ওয়াহিদ শায়বানী (রহঃ) এর মাধ্যমে হযরত আবূ বুরদা (রাঃ) সূত্রেও বর্ননা করেছেন।
হাদিস নং - ৪০০৭
হযরত মুসলিম (রহঃ) হযরত আবূ বুরদা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, তার দাদা আবূ মূসা ও মু’আয (রাঃ) কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (গভর্নর হিসেবে) ইয়ামানে পাঠালেন। এ সময় তিনি (উপদেশ স্বরুপ) বলে দিয়েছিলেন, তোমরা লোকজনের সাথে কোমল আচরন করবে। কখনো কঠিন আচরন করবেনা। মানুষের মনে সুসংবাদের মাধ্যমে উৎসাহ সৃষ্টি করবে। কখনো তাদের মনে অনীহা আসতে দিবেনা এবং একে অপরকে মেনে চলবে। হযরত আবূ মূসা বললেন, হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের এলাকায় মিযর নামের এক প্রকার শরাব যব থেকে তৈরী হয় আর বিত্উ নামের এক প্রকার শরাব মধু থেকে তৈরী করা হয় (অতএব এগুলোর হুকুম কি?)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নেশা উৎপাদনকারী সকল বস্তুই হারাম। এরপর দু’জনেই চলে গেলেন। মু’আয আবূ মূসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কিভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন? তিনি উত্তর দিলেন, দাঁড়িয়ে, বসে, সাওয়ারীর পিঠে সাওয়ার অবস্থায় এবং কিছুক্ষন পরপরই তিলাওয়াত করি। তিনি বললেন, তবে আমি রাতের প্রথমদিকে ঘুমিয়ে পড়ি তারপর (শেষ ভাগে তিলাওয়াতের জন্য সালাত (নামায/নামাজ)) দাঁড়িয়ে যাই। এ রকমে আমি আমার নিদ্রার সময়কেও সাওয়াবের অন্তর্ভুক্ত মনে করি, যেভাবে আমি আমার সালাত (নামায/নামাজ) দাঁড়ানোকে সাওয়াবের বিষয় মনে করে থাকি। এরপর (প্রত্যেকেই নিজ নিজ শাসন এলাকায় কার্য পরিচালনার জন্য) তাঁবু খাটালেন। এবং পরস্পরের সাক্ষাত বজায় রেখে চললেন। (সে মতে এক সময়) হযরত মু’আয (রাঃ) আবূ মূসা (রাঃ) এর সাক্ষাতে এসে দেখলেন, সেখানে এক ব্যাক্তি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ লোকটি কে? আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, লোকটি ইহুদী ছিলো, ইসলাম গ্রহন করার পর মুরতাদ হয়ে গেছে। হযরত মু’আয (রাঃ) বললেন, আমি ওর গর্দান উড়িয়ে দেবো। শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ) থেকে আফাদী এবং ওয়াহাব অনু্রুপ বর্ননা করেছে। আর ওকী (রহঃ) নযর ও আবূ দাউদ (রহঃ) এ হাদীসের সনদে শুবা (রহঃ)-সাঈদ-সাঈদের পিতা- সাঈদের দাদা - রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ননা করেছেন। হাদীসটি জারীর ইবনু আবদুল হামীদ (রহঃ) শায়বানী (রহঃ) এর মাধ্যমে আবূ বুরদার সূত্রে বর্ননা করেছেন।
হাদিস নং - ৪০০৮
হযরত আববাস ইবনু ওয়ালীদ (রহঃ) হযরত আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আমার গোত্রের এলাকায় (গভর্নর নিযুক্ত করে) পাঠালেন। (আমি সেখানেই রয়ে গেলাম। এরপর বিদায় হাজ্জের (হজ্জের) বছর আমিও হাজ্জ (হজ্জ) করার জন্য আসলাম)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবতাহ নামক স্থানে অবস্থান করার সময় আমি তাঁর সাক্ষাতে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবনু কাইস, তুমি ইহরাম বেঁধেছ কি? আমি বললাম, জী হ্যাঁ, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , তিনি বললেন, (তালবিয়া) কিরুপে বলেছিলে? আমি উত্তর দিলাম, আমি তালবিয়া এরুপ বলেছি যে, হে আল্লাহ্, আমি হাজির হয়েছি এবং আপনার [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর] ইহরামের মতো ইহরাম বাঁধলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা, তুমি কি তোমার সঙ্গে কুরবানীর পশু এনেছ? আমি জবাব দিলাম, আনিনি। তিনি বললেন, (ঠিক আছে) বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করো এবং সাফা ও মারওয়ার সায়ী আদায় করো, তারপর হালাল হয়ে যাও। আমি সে রকমই করলাম। এমন কি বনী কাইসের জনৈক মহিলা আমার চুল পর্যন্ত আঁচড়িয়ে দিয়েছিলো। আমি হযরত উমর ইবনু খাত্তাব) (রাঃ) এর খিলাফত আমল পর্যন্ত এ রকম আমলকেই অব্যাহত রেখেছি।
হাদিস নং - ৪০০৯
হযরত হিববান (রহঃ) হযরত ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’আয ইবনু জাবালকে (গভর্নর বানিয়ে) ইয়ামানে পাঠানোর সময় তাঁকে বললেন, অচিরেই তুমি আহলে কিতাবদের এক গোত্রের কাছে যাচ্ছ। যখন তুমি তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছবে তখন তাদেরকে এ দাওয়াত দেবে, তারা যেন সাক্ষ্য দেয় যে, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল ’, এরপর তারা যদি তোমার এ কথা মেনে নেয়, তখন তাদেরকে এ কথা জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ্ তোমাদের উপর দিনে ও রাতে পাঁচবার সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করে দিয়েছেন। তারা তোমার এ কথা মেনে নিলে তুমি তাদেরকে জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ্ তোমাদের উপর যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের (মুসলমানদের) সম্পদশালীদের কাছ থেকে গ্রহন করা হবে এবং তাদের অভাবগ্রস্থদের মাঝে বিতরন করা হবে। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয়, তা হলে (তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহন করার সময়) তাদের মালের উৎকৃষ্টতম অংশ গ্রহন করা থেকে বিরত থাকবে। মজলুমের বদদোয়াকে ভয় করবে, কেননা, মজলুমের বদদোয়া এবং আল্লাহর মাঝখানে কোন পর্দার আড়াল থাকেনা। আবূ আবদুল্লাহ [ইমাম বুখারী (রহঃ)] বলেন, এবং সমার্থবোধক শব্দ, এবং এর অর্থ একই।
হাদিস নং - ৪০১০
হযরত সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) হযরত আনাস ইবনু মায়মুন (রাঃ) থেকে বর্নিত, হযরত মু’আয ইবনু জাবাল) (রাঃ) ইয়ামানে পৌঁছার পর লোকজনকে নিয়ে ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে গিয়ে তিনি (অর্থাৎ, আল্লাহ্ ইবরাহীমকে বন্ধু বানিয়ে নিলেন) আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। তখন কাওমের এক ব্যাক্তি বলে উঠলো, ইবাহীমের মায়ের চোখ ঠান্ডা হয়ে গেছে। মু’আয ইবনু মু’আয বাসরী), শু’বা-হাবীব-সাঈদ (রহঃ)- আমর (রাঃ) থেকে এতটুকু অতিরিক্ত বর্ননা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’আয ইবনু জাবাল) (রাঃ) কে ইয়ামানে পাঠালেন। (সেখানে পৌঁছে) মু’আয (রাঃ) ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) সূরা নিসা তিলাওয়াত করলেন। যখন তিনি (তিলাওয়াত করতে করতে) পাঠ করলেন তখন তাঁর পেছন থেকে জনৈক ব্যাক্তি বলে উঠলো ইবরাহীমের মায়ের চোখ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
হাদিস নং - ৪০১১
হযরত আহমাদ ইবনু উসমান (রহঃ) হযরত বারা’ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) এর সঙ্গে ইয়ামানে পাঠালেন। বারা (রাঃ) বলেন, তারপর কিছুদিন পরেই তিনি খালিদ (রাঃ) এর স্থলে আলী (রাঃ) কে পাঠিয়ে বলে দিয়েছেন যে, খালিদ (রাঃ) এর সাথীদেরকে বলবে, তাদের মধ্যে যে তোমার সাথে (ইয়ামানের দিকে) যেতে ইচ্ছা করে সে যেন তোমার সাথ চলে যায়, আর যে (মদিনায়) ফিরে যেতে চায় সে যেন ফিরে যায়। (রাবী বলেন) তখন আমি আলী (রাঃ) এর সাথে ইয়ামানগামীদের মধ্যে থাকলাম। ফলে আমি গনীমত হিসেবে অনেক পরিমান আওকিয়া লাভ করলাম।
হাদিস নং - ৪০১২
হযরত মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) হযরত বুরায়দা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী (রাঃ) কে খুমুস (গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) নিয়ে আসার জন্য খালিদ (রাঃ) এর কাছে পাঠালেন। (রাবী, বুরায়দা বলেন, কোন কারনে) আমি আলী (রাঃ) এর প্রতি নারাজ ছিলাম, আর তিনি গোসলও করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ফিরে আসলে আমি তাঁর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তখন তিনি বললেন, হে বুরায়দা! তুমি কি আলীর প্রতি অসন্তুষ্ট? আমি উত্তর করলাম, জ্বী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তার উপর অসন্তুষ্ট থেকেোনা। কারন খুমসের ভিতরে তার প্রাপ্য অধিকার এ অপেক্ষাও বেশি রয়েছে। [১] [১] হযরত বুরায়দা (রাঃ) আলী (রাঃ) এর প্রতি নারাজ হয়ে যাওয়ার কারন ছিলো: তিনি দেখেছেন যে, আলী কয়েদীদের মধ্যে থেকে একজন বাঁদীকে নিজের জন্য নির্বাচন করে নিয়েছিলেন। এবং আলীর শেষ রাতের গোসল এবং বাঁদীর চুল থেকে পানির ফোঁটা টপকানো দেখে তিনি উভয়ের একত্রে রাত্রি যাপনেরও সন্দেহ করলেন। অথচ এখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই গনীমত মুজাহিদদের মধ্যে বন্টন করে দেননি। পরে বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানানো হলে তিনি বুরায়দাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, আলীকে গনীমত বন্টন করে দেয়ার হুকুমও দেয়া হয়েছিলো।
হাদিস নং - ৪০১৩
হযরত কুতায়বা (রহঃ) হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) ইয়ামান থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে সিলম বৃক্ষের পাতা দ্বারা পরিশোধিত এক প্রকার (রঙিন) চামড়ার থলে করে সামান্য কিছু তাজা স্বর্ণ পাঠিয়েছিলেন। তখনও এগুলো থেকে সংযুক্ত খনিজ মাটিও পরিষ্কার করা হয়নি। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার ব্যাক্তির মধ্যে স্বর্ণখন্ডটি বন্টন করে দিলেন। তারা হলেন, উয়ায়না ইবনু বাদর, একরা ইবনু হারিস, যায়দ আল-খায়ল এবং চতুর্থজন আলকামা কিংবা আমির ইবনু তুফাইল (রাঃ)। তখন সাহাবীগনের মধ্য থেকে একজন বললেন, এ স্বর্নের ব্যাপারে তাঁদের অপেক্ষা আমরাই অধিক হকদার ছিলাম। (রাবী) বলেন, কথাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি আমার উপর আস্থা রাখ না অথচ আমি আসমান অধিবাসীদের আস্থাভাজন, সকাল-বিকাল আমার কাছে আসমানের সংবাদ আসছে। এমন সময়ে এক ব্যাক্তি উঠে দাঁড়ালো। লোকটির চোখ দু’টি ছিল কোটরাগত, চোয়ালের হাড় যেন বেরিয়ে পড়ছে, উঁচু কপালধারী, তার দাড়ি ছিল অতিশয় ঘন, মাথাটি ন্যাড়া, পরনের লুঙ্গি ছিল উপরের দিক উঠান। সে বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ্ কে ভয় করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার জন্য আফসোস! আল্লাহ্ কে ভয় করার ব্যাপারে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে আমি কি বেশি হকদার নই? আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, লোকটি (এ কথা বলে) চলে যেতে লাগলে হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আমি কি লোকটির গর্দান উড়িয়ে দেবনা? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, হতে পারে সে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে। (বাহ্যত মুসলমান)। খালিদ (রাঃ) বললেন, অনেক সালাত (নামায/নামাজ) আদায়কারী এমন আছে যারা মুখে এমন এমন কথা উচ্চারন করে যা তাদের অন্তরে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে মানুষের দিল ছিদ্র করে, পেট ফেঁড়ে (ঈমানের উপস্থিতি) দেখার জন্য বলা হয়নি। তারপর তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তখন লোকটি পিঠ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ ব্যাক্তির বংশ থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব ঘটবে যারা শ্রুতিমধুর কন্ঠে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করবে অথচ আল্লাহর বাণী তাদের গলদেশের নিচে নামবেনা। তারা দ্বীন থেকে এভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে নিক্ষেপকৃত জন্তুর দেহ থেকে তীর বেরিয়ে যায়। (বর্ননাকারী বলেন) আমার মনে হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাও বলেছেন, যদি আমি তাদেরকে হাতে পাই, তাহলে অবশ্যই আমি তাদের সামুদ জাতির মতো হত্যা করে দেবো।
হাদিস নং - ৪০১৪
হযরত মাক্কী ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) হযরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) কে তাঁর কৃত ইহরামের উপর কায়েম থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ ইবনু বকর ইবনু জুরায়জ- আতা (রহঃ)- জাবির (রাঃ) এর সূত্রে আরও বর্ননা করেন যে, জাবির (রাঃ) বলেছেনঃ আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) (ইয়ামানে ছিলেন এরপর তিনি তাঁর) আদায়কৃত কর খুমুস নিয়ে (মক্কায়) আসলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, হে আলী! তুমি কিসের ইহরাম বেঁধেছ? তিনি উত্তর করলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেটির ইহরাম বেঁধেছেন (আমিও সেটির ইহরাম বেঁধেছি)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে তুমি কুরবানীর পশু পাঠিয়ে দাও এবং এখন যেভাবে আছ সেভাবে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় অবস্থান করতে থাক। বর্ননাকারী [জাবির (রাঃ)] বলেন, সে সময় আলী (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য কুরবানীর পশু পাঠিয়েছিলেন।
হাদিস নং - ৪০১৫
হযরত মূসা’দ্দাদ (রহঃ) হযরত বকর (রহঃ) থেকে বর্নিত, হযরত ইবনু উমর (রাঃ) এর কাছে এ কথা উল্লেখ করা হল, আনাস (রাঃ) লোকদের কাছে বর্ননা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজ্জ (হজ্জ) এবং উমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন। তখন ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজ্জের (হজ্জের) জন্য ইহরাম বেঁধেছেন, তাঁর সাথে আমরাও হাজ্জের (হজ্জের) জন্য ইহরাম বাঁধি। যখন আমরা মক্কায় উপনীত হই, তিনি বললেন, তোমাদের যার সঙ্গে কুরবানীর পশু নেই, সে যেন তার হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম উমরার ইহরামে পরিনত করে ফেলে। অবশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিলো। এরপর আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) হাজ্জের (হজ্জের) উদ্দেশ্যে ইয়ামান থেকে আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাকে) জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কিসের ইহরাম বেঁধেছ? কারন আমাদের সাথে তোমর স্ত্রী (ফাতিমা) রয়েছে। তিনি উত্তর দিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেটির ইহরাম বেঁধেছেন, আমি সেটিরই ইহরাম বেঁধেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এ অবস্থায়ই থাক, কারন আমাদের কাছে কুরবানীর জন্তু আছে।
হাদিস নং - ৪০১৬
হযরত মূসা’দ্দাদ (রহঃ) হযরত জারীর ইবনু আবদুল্লাহ বাজালী) (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, জাহিলিয়্যাতের যুগে একটি (নকল তীর্থ) ঘর ছিল, যাকে ‘যুল খালাসা’, ইয়ামানী কা’বা এবং সিরীয় কা’বা বলা হতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি যুল খালাসার পেরেশানী থেকে আমাকে স্বস্থি দেবেনা? এ কথা শুনে আমি একশত পঞ্চাশজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ছুটে চললাম। আর এ ঘরটি ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে দিলাম এবং সেখানে যাদেরকে পেলাম তাদের হত্যা করে ফেললাম। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে এই সংবাদ জানালে তিনি আমাদের জন্য এবং (আমাদের গোত্র) আহমাসের জন্য দোয়া করলেন।
হাদিস নং - ৪০১৭
হযরত মুহাম্মাদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) হযরত কায়স (রহঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, হযরত জারীর (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি কি আমাকে যুল-খালাসা থেকে স্বস্থি দেবে না? যুল-খালাসা ছিল খাসআম গোত্রের একটি (বানোয়াট তীর্থ) ঘর, যাকে বলা হত ইয়ামনী কা’বা। এ কথা শুনে আমি আহমাস্ গোত্র থেকে একশত পঞ্চাশজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে চললাম। তাঁদের সকলেই অশ্ব পরিচালনায় পারদর্শী ছিল। আর আমি তখন ঘোড়ার পিঠে শক্তভাবে বসতে পারছিলাম না। কাজেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকের উপর হাত দিয়ে আঘাত করলেন। এমন কি আমার বুকের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র আঙ্গুলগুলোর ছাপ পর্যন্ত দেখতে পেলাম। (এ অবস্থায়) তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ্! একে (ঘোড়ার পিঠে) শক্তভাবে বসে থাকতে দিন এবং তাকে হেদায়েত দানকারী ও হেদায়েত লাভকারী বানিয়ে দিন। এরপর জারীর (রাঃ) সেখানে গেলেন এবং ঘরটি ভেঙ্গে দিয়ে তা জ্বালিয়ে ফেললেন। এরপর তিনি [জারীর (রাঃ)] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দূত পাঠালেন। তখন জারীর (রাঃ) এর দূত [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে] বলল, সেই মহান সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য বাণী সহকারে পাঠিয়েছেন, আমি ঘরটিকে খুজলি-পাঁচড়া আক্রান্ত কালো উঠের মত রেখে আপনার কাছে এসেছি। রাবী বলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈনিকদের জন্য পাঁচবার বরকতের দোয়া করলেন।
হাদিস নং - ৪০১৮
হযরত ইউসুফ ইবনু মূসা (রহঃ) হযরত জারীর (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আমাকে যুল-খালাসার পেরেশানী থেকে স্বস্থি দেবেনা? আমি বললাম: অবশ্যই। এরপর আমি (আমাদের) আহমাস গোত্র থেকে একশত পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সৈনিক নিয়ে চললাম। তাদের সবাই ছিলো অশ্ব পরিচালনায় অভিজ্ঞ। কিন্তু আমি তখনো ঘোড়ার উপর স্থির হয়ে বসতে পারতাম না। তাই ব্যাপারটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানালাম। তিনি তাঁর হাত দিয়ে আমার বুকের উপর আঘাত করলেন। এমনকি আমি আমার বুকে তাঁর হাতের চিহ্ন পর্যন্ত দেখতে পেলাম। তিনি দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ্! একে স্থির হয়ে বসে থাকতে দিন এবং তাকে হেদায়েত দানকারী ও হেদায়েত লাভকারী বানিয়ে দিন’। জারীর (রাঃ) বলেন, এরপরে আর কখনো আমি আমার ঘোড়া থেকে পড়ে যাইনি। তিনি আরো বলেছেন যে, যুল-খালাসা ছিলো ইয়ামানের অন্তর্গত খাসআম ও বাজীলা গোত্রের একটি (তীর্থ) ঘর। সেখানে কতগুলো মূর্তি স্থাপিত ছিলো। লোকেরা এগুলোর পূজা করত এবং এ ঘরটিকে বলা হতো কা’বা। রাবী বলেন, এরপর তিনি সেখানে গেলেন এবং ঘরটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন আর এর ভিটামাটিও চুরমার করে দিলেন। রাবী আরো বলেন, আর যখন জারীর (রাঃ) ইয়ামানে গিয়ে উঠলেন তখন সেখানে এক লোক থাকত, সে তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্নয় করত, তাকে বলা হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিনিধি এখানে আছেন, তিনি যদি তোমাকে পাকড়াও করার সুযোগ পান তাহলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবেন। রাবী বলেন, এরপর একদা সে ভাগ্য নির্নয়ের কাজে লিপ্ত ছিল, সেই মূহুর্তে হযরত জারীর (রাঃ) সেখানে পৌঁছে গেলেন। তিনি বললেন, তীরগুলো ভেঙ্গে ফেল এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই- এ কথার সাক্ষ্য দাও, অন্যথায় তোমার গর্দান উড়িয়ে দেব। লোকটি তখন তীরগুলো ভেঙ্গে ফেলল এবং (আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, এ কথার) সাক্ষ্য দিল। এরপর জারীর (রাঃ) আবূ আরতাত নামক আহমাস গোত্রের এক ব্যাক্তিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পাঠালেন খোশখবরী শোনানোর জন্য। লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ‘‘ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! সে সত্তার (আল্লাহর) কসম করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্য বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন, ঘরটিকে ঠিক খুজলি-পাঁচড়া আক্রান্ত উটের মতো কালো করে রেখে আমি এসেছি। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈনিকদের সার্বিক কল্যাণ ও বরকতের জন্য পাঁচবার দোয়া করলেন।
হাদিস নং - ৪০১৯
হযরত ইসহাক (রহঃ) হযরত আবূ উসমান (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনুল আস (রাঃ) কে (সেনাপতি নিযুক্ত করে) যাতুস সালাসিল বাহিনীর বিরুদ্ধে পাঠিয়েছেন। আমর ইবনুল আস বলেন: (যুদ্ধ শেষ করে) আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কাছে কোন লোকটি অধিকতর প্রিয়? তিনি উত্তর দিলেন, আয়িশা (রাঃ)। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর (আয়িশার) পিতা। আমি বললাম, তারপর কে? তিনি বললেন, উমর (রাঃ), এভাবে তিনি (আমার প্রশ্নের জবাবে) একের পর এক আরো কয়েকজনের নাম বললেন। আমি চুপ হয়ে গেলাম এই আশংকায় যে, আমাকে না তিনি সকলের শেষে স্থাপন করে বসেন।
হাদিস নং - ৪০২০
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আবূ শায়বা আবসী (রহঃ) হযরত জারীর (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি ইয়ামানে ছিলাম। এ সময়ে একদা যুকালা ও যু’আমর নামে ইয়ামানের দু’ব্যাক্তির সাথে আমার সাক্ষাতহল। আমি তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস শোনাতে লাগলাম। (বর্ননাকারী বলেন) এমন সময়ে যু’আমর, (রাবী) জারীর (রাঃ) কে বললেন, তুমি যা বর্ণনা করছ তা যদি তোমার সাথীরই [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর] কথা হয়ে থাকে তা হলে মনে রেখো যে, তিন দিন আগে তিনি ইন্তেকাল করে গেছেন। (জারীর বলেন, কথাটি শুনে আমি মদিনা অভিমুখে ছুটলাম)। তারা দু’জনেও আমার সাথে সম্মুখের দিকে চললেন। অবশেষে আমরা একটি রাস্তার ধারে পৌঁছলে মদিনার দিক থেকে আসা একদল সওয়ারীর সাক্ষাত পেলাম। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত হয়ে গেছে। মুসলমানদের সম্মতিক্রমে হযরত আবূ বকর (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর তারা দু’জনে (আমাকে) বলল, (তুমি মদিনায় পৌঁছলে) তোমার সাথী (আবূ বকর) (রাঃ) কে বলবে যে, আমরা কিছুদুর পর্যন্ত এসেছিলাম। সম্ভবত আবার আসব ইনশাআল্লাহ্, এ কথা বলে তারা দু’জনে ইয়ামানের দিকে ফিরে গেল। এরপর আমি হযরত আবূ বকর (রাঃ) কে তাদের কথা জানালাম। তিনি (আমাকে) বললেন, তাদেরকে তুমি নিয়ে আসলে না কেন? পরে আরেক সময় (যু’আমরের সাথে সাক্ষাত হলে) তিনি আমাকে বললেন, হে জারীর! তুমি আমার চেয়ে অধিক সম্মানী। তবুও আমি তোমাকে একটি কথা জানিয়ে দিচ্ছি যে, তোমরা আরব জাতি ততক্ষন পর্যন্ত কল্যান ও সাফল্যের মধ্যে অবস্থান করতে থাকবে যতক্ষন পর্যন্ত তোমরা একজন আমীর মারা গেলে অপরজনকে (পরামর্শের মাধ্যম) আমীর বানিয়ে নেবে। আর তা যদি তরবারির জোরে ফায়সালা হয়, তা হলে তোমাদের আমীরগন (জাগতিক) অন্যান্য রাজা বাদশাদের মতোই হয়ে যাবে। তারা রাজাসুলভ ক্রোধ, রাজাসুলভ সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে। (খলীফা ও খিলাফত আর অবশিষ্ট থাকবে না। )
হাদিস নং - ৪০২১
হযরত ইসমাঈল (রহঃ) হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমুদ্র সৈকতের দিকে একটি সৈন্যবাহিনী পাঠালেন। আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ (রাঃ) কে তাদের আমীর নিযুক্ত করে দিলেন। তাঁরা সংখ্যায় ছিলেন তিনশত। (তন্মধ্যে আমিও ছিলাম) আমরা যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আমরা এক রাস্তা দিয়ে পথ চলছিলাম, তখন আমাদের রসদপত্র নি:শেষ হয়ে গেল, তাই আবূ উবায়দা (রাঃ) আদেশ দিলেন সমগ্র সেনাদলের অবশিষ্ট পাথেয় একত্রিত করতে। অতএব সব একত্রিত করা হল। দেখা গেল মাত্র দু’থলে খেজুর রয়েছে। এরপর তিনি অল্প অল্প করে আমাদের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ করতে লাগলেন। পরিশেষে তাও শেষ হয়ে গেল এবং কেবল তখন একটি মাত্র খেজুর আমাদের মিলত। (বর্ননাকারী বলেন) আমি জাবির (রাঃ) কে বললাম, একটি করে খেজুর খেয়ে আপনাদের কতটুকু ক্ষুধা নিবারন হতো? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, একটি খেজুর পাওয়াও বন্ধ হয়ে গেলে আমরা একটির কদরও অনুভব করতে লাগলাম। এরপর আমরা সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। তখন আমরা পাহাড়ের মতো বড় একটি মাছ পেয়ে গেলাম। সমগ্র বাহিনী আঠারো দিন পর্যন্ত তা খেল। তারপর হযরত আবূ উবায়দা (রাঃ) মাছটির পাঁজরের দু’টি হাড় আনতে হুকুম দিলেন। (দু’টি হাড় আনা হলে) সেগুলো দাঁড় করানো হল। এরপর তিনি একটি সাওয়ারী তৈয়ার করতে বললেন। সাওয়ারী তৈয়ার হল এবং হাড় দু’টির নিচে দিয়ে সাওয়ারীটি অতিক্রম করান হল। কিন্তু হাড় দু’টিতে কোন স্পর্শ লাগলোনা।
হাদিস নং - ৪০২২
হযরত আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের তিনশত সাওয়ারীর একটি সৈন্যবাহিনীকে কুরাইশের একটি কাফেলার উপর সুযোগমতো আক্রমন চালানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ (রাঃ) ছিলেন আমাদের সেনাপতি। আমরা অর্ধমাস পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে অবস্থান করলাম। (ইতিমধ্যে রসদপত্র নি:শেষ হয়ে গেল) আমরা ভীষন ক্ষুধার শিকার হয়ে গেলাম। অবশেষে ক্ষুধার যন্ত্রনায় গাছের পাতা পর্যন্ত খেতে থাকলাম। এ জন্যই এ সৈন্যবাহিনীর নাম রাখা হয়েছে জায়শুল খাবাত অর্থাৎ পাতা ওয়ালা সেনাদল। এরপর সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর নামক একটি প্রাণী নিক্ষেপ করল। আমরা অর্ধমাস ধরে তা থেকে খেলাম। এর চর্বি শরীরে লাগালাম। ফলে আমাদের শরীর পূর্বের ন্যায় হৃষ্টপুষ্ট হয়ে গেল। এরপর আবূ উবায়দা (রাঃ) আম্বরটির শরীর থেকে পাঁজর ধরে খাড়া করালেন। এরপর তাঁর সাথীদের মধ্যকার সবচেয়ে লম্বা লোকটিকে আসতে বললেন। সুফয়ান (রাঃ) আরেক বর্ননায় বলেছেন, আবূ উবায়দা (রাঃ) আম্বরটির পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্য থেকে একটি হাড় ধরে খাড়া করালেন। এবং (ঐ) লোকটিকে উটের পিঠে বসিয়ে এর নিচে দিয়ে অতিক্রম করালেন। জাবির (রাঃ) বলেন, সেনাদলের এক ব্যাক্তি (খাদ্যের অভাব দেখে) প্রথমে তিনটি উট যবেহ্ করেছিলেন। এরপর আবূ উবায়দা (রাঃ) তাকে (উট যবেহ্ করতে) নিষেধ করলেন। আমর ইবনু দীনার (রাঃ) বলতেন, আবূ সালিহ (রহঃ) আমাদের জানিয়েছেন যে, কায়স ইবনু সা’দ (রাঃ) (অভিযান থেকে ফিরে এসে) তাঁর পিতার কাছে বর্ননা করছিলেন যে, সেনাদলে আমিও ছিলাম, এক সময়ে সমগ্র সেনাদল ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ল, (কথাটি শোনামাত্র কায়সের পিতা) সা’দ বললেন, এমতাবস্থায় তুমি উট যবেহ্ করে দিতে। কায়স বললেন, (হ্যাঁ) আমি উট যবেহ্ করেছি। তিনি বললেন, তারপর আবার সবাই ক্ষুধার্ত হয়ে গেল। এবারো তার পিতা বললেন, তুমি যবেহ্ করতে। তিনি বললেন, (হ্যাঁ) যবেহ্ করেছি। তিনি বললেন, তারপর আবার সবাই ক্ষুধার্ত হল। সা’দ বললেন, এবারো উট যবেহ্ করতে। তিনি বললেন, (হ্যাঁ) যবেহ্ করেছি। তিনি বললেন, এরপরও আবার সবাই ক্ষুধার্ত হল। সা’দ (রাঃ) বললেন, উট যবেহ্ করতে। তখন কায়স ইবনু সা’দ (রাঃ) বললেন, এবার আমাকে (যবেহ করতে) নিষেধ করা হয়েছে।
হাদিস নং - ৪০২৩
হযরত মূসা’দ্দাদ (রহঃ) হযরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমরা জায়শুল খাবাতের যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলাম, আর আবূ উবায়দা (রাঃ) কে আমাদের সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়েছিল। পথে আমরা ভীষন ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি। তখন সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর নামের একটি মরা মাছ তীরে নিক্ষেপ করে দিল। এতো বড় মাছ আমরা আর কখনো দেখিনি। এরপর মাছটি থেকে আমরা অর্ধ মাস আহার করলাম। একবার আবূ উবায়দা (রাঃ) মাছটির একটি হাড় তুলে ধরলেন আর সাওয়ারীর পিঠে চড়ে একজন হাড়টির নিচ দিয়ে অতিক্রম করল (হাড়ে স্পর্শ লাগেনি)। ইবনু জুরায়জ বলেন) আবূ যুবায়র (রহঃ) আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি জাবির (রাঃ) থেকে শুনেছেন, জাবির (রাঃ) বলেন: ঐ সময় আবূ উবায়দা (রাঃ) বললেন, ‘তোমরা মাছটি আহার কর। এরপর আমরা মদিনা ফিরে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিষয়টি অবগত করলাম। তিনি বললেন, খাও। এটি তোমাদের জন্য রিযক, আল্লাহ্ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর তোমাদের কাছে কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাদেরকেও স্বাদ গ্রহন করতে দাও। একজন মাছটির কিছু অংশ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এনে দিলে তিনি তা খেলেন।
হাদিস নং - ৪০২৪
হযরত সুলায়মান ইবনু দাউদ আবূ রাবী’ (রহঃ) হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত, বিদায় হাজ্জের (হজ্জের) পূর্ববর্তী যে হাজ্জ (হজ্জ) অনুষ্ঠানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ) কে আমীরুল হাজ্জ (হজ্জ) নিযুক্ত করেছিলেন। সেই হাজ্জের (হজ্জের) সময় আবূ বকর (রাঃ) তাঁকে [ আবূ হুরায়রা (রাঃ) কে] একটি ছোট দলসহ লোকজনের মধ্যে এ ঘোষনা দেওয়ার জন্য পাঠিয়ছিলেন যে, আগামী বছর কোন মুশরিক হাজ্জ (হজ্জ) করতে পারবেনা। আর উলঙ্গ অবস্থায়ও কেউ বায়তুল্লায় তাওয়াফ করতে পারবেনা।
হাদিস নং - ৪০২৫
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু রাজা (রহঃ) হযরত বারা ইবনু আযির) (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, সর্বশেষে যে সূরাটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় অবতীর্ন হয়েছিলো, তা ছিল সূরা বারাআত। আর সর্বশেষ যে সূরার আয়াতটি সমাপ্তি রুপে অবতীর্ন হয়েছিল সেটি ছিল সূরা নিসার এ আয়াত : ‘ইয়াসতাফতূনাকা কুলিল্লাহু ইয়ুফতীকুম ফিল কালালা’। অর্থাৎ-‘লোকেরা আপনার কাছে সমাধান জানতে চায়, বলুন, পিতা-মাতাহীন নি:সন্তান ব্যাক্তি সম্বন্ধে তোমাদিগকে আল্লাহ্ তায়া’লা সমাধান জানোাচ্ছেন, (কোন পুরুষ মারা গেলে সে যদি সন্তানহীন হয় এবং তার এক বোন থাকে তাহলে বোনের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধাংশ হবে) (৪:১৭৬)
হাদিস নং - ৪০২৬
হযরত নুআইম (রহঃ) হযরত ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্নিত, বনী তামীমের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আসলে তিনি তাদেরকে বললেন, ‘হে বনী তামীম! খোশ-খবরী গ্রহন কর। তারা বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি খোশ-খবরী দিয়ে থাকেন, এবার আমাদেরকে কিছু (অর্থ-সম্পদ) দিন। কথাটি শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মুবারকে অসন্তোষের ভাব প্রকাশ পেল। এরপর ইয়ামানের একটি প্রতিনিধি দল আসলে তিনি তাঁদেরকে বললেন, বনী তামীম যখন খোশ-খবরী গ্রহন করলোই না তখন তোমরা সেটি গ্রহন কর। তারা বললেন, আমরা তা গ্রহন করলাম ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ।
হাদিস নং - ৪০২৭
হযরত যুহাইর ইবনু হারব (রহঃ) হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী তামীমের পক্ষে তিনটি কথা বলেছেন। এগুলো শোনার পর থেকেই আমি বনী তামীমকে ভালোবাসতে থাকি। (তিনি বলেছেন) তারা আমার উম্মতের মধ্যে দাজ্জালের বিরোধিতায় সবচেয়ে বেশি কঠোর থাকবে। তাদের গোত্রের একটি বাঁদি হযরত আয়িশা (রাঃ) এর কাছে ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একে আযাদ করে দাও, কারন সে হযরত ইসমাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বংশধর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তাদের সা’দকার অর্থ-সম্পদ আসলে তিনি বললেন, এটি একটি কাওমের সা’দকা বা তিনি বলেন, এটি আমার কাওমের সা’দকা।
No comments:
Post a Comment