Monday, May 27, 2019

অধ্যায় - ৫০ - আম্বিয়া কিরাম (আ.) -৩ ( হাদিস নং - ৩২৯৫-৩৩৯৬ = মোট ১০২ টি হাদিস)

বুখারী শরীফ সব খণ্ড


بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

অধ্যায় - ৫০ - আম্বিয়া কিরাম (আ.) -৩
( হাদিস নং - ৩২৯৫-৩৩৯৬ = মোট ১০২ টি হাদিস)


হাদিস নং - ৩২৯৫
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) রাবী'আ ইবনু আবূ আবদুর রাহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর (দৈহিক গঠন) বর্ণনা দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের মধ্যে মাঝারি গড়নের ছিলেন-- বেমানান লম্বাও ছিলেন না বা বেঁটেও ছিলেন না। তাঁর শরীরের রং গোলাপী ধরনের ছিল, ধবধবে সাদাও নয় কিংবা তামাটে বর্ণেরও নয়। মাথার চুল কুঁকড়ানোও ছিল না আবার সম্পূর্ণ সোজাও ছিল না। চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর উপর ওহী নাযিল হওয়া আরম্ভ হয়। প্রথম দশ বছর মক্কায় অবস্থানকালে ওহী যথারীতি নাযিল হতে থাকে। এরপর দশ বছর মদিনায় অতিবাহিত করেন। অতঃপর তাঁর ওফাত হয় তখন তাঁর মাথা ও দাঁড়িতে কুড়িটি সাদা চুলও ছিল না। রাবি'আ (রহঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একটি চুল দেখেছি উহা লাল রং-এর ছিল। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বলা হল যে অধিক সুগন্ধী লাগানোর কারণে উহার রং লাল হয়ে গিয়েছিল।

হাদিস নং - ৩২৯৬
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেমানান লম্বাও ছিলেন না এবং বেঁটেও ছিলেন না। ধবধবে সাদাও ছিলেন না, আবার তামাটে রং এরও ছিলেন না। কেশরাজি একেবারে কুঞ্চিত ছিল না, একেবারে সোজাও ছিলনা। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুওয়্যাত প্রাপ্ত হন। তাঁর নবুওয়্যাত কালের প্রথম দশ বছর মক্কায় এবং পরের দশ বছর মদিনায় অতিবাহিত করেন। যখন তাঁর ওফাত হয় তখন মাথা ও দাঁড়িতে কুড়িটি চুলও সাদা ছিলনা।

হাদিস নং - ৩২৯৭
আহমেদ ইবনু সা'ঈদ (রহঃ) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেহারা মুবারক ছিল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এবং তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি অতিরিক্ত লম্বাও ছিলেন না এবং বেমানান বেঁটেও ছিলেন না।

হাদিস নং - ৩২৯৮
আবূ নু'আয়ম (রহঃ) কাতাদা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুলে খেযাব ব্যবহার করেছেন কি? তিনি বললেন, না (তিনি তা ব্যবহার করেননি)। তাঁর কানের পাশে গুটি কয়েক চুল সাদা হয়েছিল মাত্র। (কাজেই চুলে খেযাব ব্যবহারের আবশ্যক হয় নাই)।

হাদিস নং - ৩২৯৯
হাফ্‌সা ইবনু 'উমর (রহঃ) বারা ইবনু 'আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝারি গড়নের ছিলেন। তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল। তাঁর মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। আমি তাঁকে লাল ডোরাকাটা জোড় চাঁদর পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। তাঁর চেয়ে অধিক সুন্দর কাউকে আমি কখনো দেখিনি। ইউসুফ ইবনু আবূ ইসহাক তাঁর পিতা থেকে হাদীস বর্ণনায় বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল।

হাদিস নং - ৩৩০০
আবূ নু'আয়ম (রহঃ) আবূ ইসহাক তাবে-ই (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারা (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেহারা মুবারক কি তরবারীর ন্যায় (চকচকে) ছিল? তিনি বলেন, না, বরং চাঁদের মত (স্নিগ্ধ ও মনোরম) ছিল।

হাদিস নং - ৩৩০১
হাসান ইবনু মনসুর আবূ আ’লী (রহঃ) হাকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি আবূ জুহায়ফা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেনঃ একদিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুপুর বেলায় বাতাহার দিকে বেরিয়ে গেলেন। সে স্থানে উযূ (ওজু/অজু/অযু) যুহরের দু’রাকাত ও আসরের দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। তাঁর সম্মুখে একটি বর্শা পোতা ছিল। বর্শার বাহির দিক দিয়ে নারীগণ যাতায়াত করছিল। সালাত (নামায/নামাজ) শেষে লোকজন দাঁড়িয়ে গেল এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উভয় হাত ধরে তারা নিজেদের মাথা ও চেহারায় বুলাতে লাগলেন। আমিও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাত মুবারক ধারণ করতঃ আমার চেহারায় বুলাতে লাগলাম। তাঁর হাত তুষার চেয়ে স্নিদ্ধ শীতল ও কস্তুরীর চেয়ে অধিক সুগন্ধ ছিল।

হাদিস নং - ৩৩০২
আবদান (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন। তাঁর বদান্যতা অধিক বেড়ে যেতো রমযাদ মোবারকের পবিত্র দিনে যখন জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সাক্ষাতে আসতেন। জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতিরাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কুরআনুল ের দাওর করতেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণ বিতরণে প্রবাহিত বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন।

হাদিস নং - ৩৩০৩
ইয়াহ্ইয়া ইবনু মূসা (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একদিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আনন্দিত ও প্রফুল্ল চিত্তে তাঁর কাছে প্রবেশ করলেন। খুশীর আমাজে তাঁর চেহারার খুশীল চিহ্ন ঝলমল করছিল। তিনি তখন আয়িশাকে বললেন, হে আয়িশা! তুমি শুননি, মুদলাজী ব্যাক্তিটি (চেহারার ও আকৃতির গননায় পারদর্শী) যায়েদ ও উসামা সম্পর্কে কি বলেছে? পিতা-পুত্রের শুধু পা দেখে (শরীরের বাকী অংশ ঢাকা ছিল) বলল, এ পাগুলো একটা অন্যটির অংশ (অথ্যাৎ তাদের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের)।

হাদিস নং - ৩৩০৪
ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু কা’ব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতা কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ)-কে তার তাবূক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সালাম দিলাম, খুশী ও আনন্দে তাঁর চেহারা মুবারক ঝলমল করে উঠলো। তাঁর চেহারা এমনি-ই খুশী ও আনন্দে ঝলমল করতো। মনে হতো যেন চাঁদেঁর একটি টুক্রা। তাঁর চেহারা মুবারকের এ অবস্থা থেকে আমরা তা বুঝতে সক্ষম হতাম।

হাদিস নং - ৩৩০৫
কুতায়বা ইবনুু্ সাইদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি মানব জাতির সবোত্তম যুগে আবির্ভূত হয়েছি। যুগের পর যুগ হয়ে আমি সেই যুগেই জন্মেছি যে যুগ আমার জন্য নির্ধারিত ছিল।

হাদিস নং - ৩৩০৬
ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চুল পেছনের দিকে আঁচড়িয়ে রাখতেন আর মুশরিকগণ তাদের চুল দু’ভাগ করে সিঁতি কেটে রাখত। আহলে কিতাব তাদের চুল পেছনের দিকে আঁচড়িয়ে রাখত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোন বিষয়ে আল্লাহর আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত আহলে কিতাবের অনুকরণকে ভালোবাসতেন। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চুল দু’ভাগ করে সিঁতি কেটে রাখতে লাগলেন।

হাদিস নং - ৩৩০৭
আবদান (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনুু্ আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্লীল ভাষী ও অসদাচারী ছিলেন না। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যাক্তই সর্বশ্রেষ্ঠ যে নৈতিকতায় সবো্ত্তম।

হাদিস নং - ৩৩০৮
আবদুল্লাহ ইবনুু্ ইউসুফ (রহঃ)আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে (জাগতিক বিষয়ে) যখনই দু’টি জিনিসের একটি গ্রহণের ইখ্তিয়ার দেয়া হত, তখন তিনি সহজ সরলটি গ্রহণ করতেন যদি তা গোনাহ না হত। যদি গোনাহ হত তবে তা থেকে তিনি অনেক দূরে সরে থাকতেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাক্তিগত কারনে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহ্কে রাযী ও সন্তুষ্ট করার মানসে প্রতিশোধ করতেন।

হাদিস নং - ৩৩০৯
সুলায়মান ইবনু হারব (রাঃ)… আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাতের তালু অপেক্ষা মোলায়েম কোন রেশম ও গরদকেও স্পর্শ করি নাই। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শরীর মোবারকের খুশ্বু অপেক্ষা অধিকতর সুঘ্রাণ আমি কখনো পাই নাই।

হাদিস নং - ৩৩১০
মূসা’দ্দাদ (রাঃ)… আবূ সাইদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তপুরবাসিনী পর্দানশীল কুমারীদের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। মুহাম্মদ (রহঃ) শুবা (রহঃ) থেকে অনুরুপ রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। (তবে এ বাক্যটি অতিরিক্ত রয়েছে যে,)যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কিছু অপছন্দ করতেন তখর তাঁর চেহারা মুবারকে তা (বিরক্তি ভাব) দেখা যেত।

হাদিস নং - ৩৩১১
আলী ইবনু জা’দ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাদ্যবস্তুকে মন্দ বলতেন না। রুচি হলে খেয়ে নিতেন নতুবা ত্যাগ করতেন।

হাদিস নং - ৩৩১২
কুতায়বা ইবনুু্ সাইদ (রহঃ) ইবনু বুহায়না আবদুল্লাহ ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিজদা করতেন, তখন উভয় বাহুকে শরীর থেকে এমনভাবে পৃথক করে রাখতেন যে, আমরা তার বগল দেখতে পেতাম। অন্য রেওয়ায়াতে আছে, বগলের শুভ্রতা দেখতে পেতাম।

হাদিস নং - ৩৩১৩
আবদুল আলা ইবনু হাম্মাদ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ্ ইস্তিস্কা (বৃষ্টির জন্য সালাত (নামায/নামাজ) আর দু’আ) ব্যতীত অন্য কোন দু’আয় তাঁর বাহুদ্বয় এতটা ঊর্দ্ধে উঠাতেন না ইস্তিস্কা ব্যতীত কেননা এতে হাত এত ঊর্দ্ধে উঠাতেন যে তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখা যেত। আবূ মূসা (রহঃ) হাদীস বর্ণনায় বলেন, আনাস (রাঃ) বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আর মধ্যে দু’ হাত উপরে উঠিয়েছেন; এবং আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখেছি।

হাদিস নং - ৩৩১৪
হাসান ইবনু সাব্বাহ (রহঃ) আবূ জুহায়ফা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (একদা) আমাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে নেয়া হল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আবতাহ নামক স্থানে দুপুর বেলায় একটি তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। বেলাল (রাঃ) তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে যুহরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর আযান দিলেন এবং (তাঁবুতে) পুনঃপ্রবেশ করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উযূ (ওজু/অজু/অযু)ব অবশিষ্ট পানি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। লোকজন ইহা নেয়ার জন্য ঝাপিয়ে পড়ল। অতঃপর তিনি আবার তাঁবুতে ঢুকে একটি ছোট্ট বর্শা নিয়ে বেরিয়ে এলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও (এবার) বেরিয়ে আসলেন। আমি যেন তাঁর পায়ের গোছার ঔজ্জ্বল্য এখনো দেখতে পাচ্ছি। বর্শাটি সম্মুখে পুতে রাখলেন। এরপর যুহরের দু’রাকাত এবং পরে আসরের দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। বর্শার বাহির দিয়ে গাধা ও মহিলা চলাফেরা করছিল।

হাদিস নং - ৩৩১৫
হাসান ইবনু সাব্বাহ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে (থেমে থেমে) কথা বলতেন যে, কোন গণনাকারী গণনা করতে চাইলে, তাঁর কথাগুলো গণনা করতে পারত। লায়স (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তুমি অমুকের (আবূ হুরায়রা (রাঃ)) অবস্থা দেখে কি অবাক হও না? তিনি এসে আমার হুজরার পাশে বসে আমাকে শুনিয়ে হাদীস বর্ণনা করেন। আমি তখন (নফল) সালাত (নামায/নামাজ) ছিলাম। আমার সালাত (নামায/নামাজ) শেষ হওয়ার পূর্বেই তিনি উঠে চলে যান। তাকে যদি আমি পেতাম তবে অবশ্যই তাকে সতর্ক করে দিতাম যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মত দ্রুত কথা বলতেন না (বরং তিনি ধীরস্থির ও স্পষ্টভাবে কথা বলতেন।

হাদিস নং - ৩৩১৬
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) আবূ সালমা ইবনু আবদুর রাহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি আয়িশা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, রমযান মাসে (রাতে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সালাত (নামায/নামাজ) কিভাবে ছিল? আয়িশা (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে ও অন্যান্য সব মাসের রাতে এগারো রাকা’তের বেশী সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন না। প্রথমে চার রাকা’আত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন। এ চার রাকা’আত আদায়ের সৌন্দর্য ও দৈঘ্যের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না (ইহা বর্ণনাতীত)। তারপর আরো চার রাকা’আত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন। তারপর তিন রাকা’আত (বিতর) আদায় করতেন। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি বিত্র সালাত (নামায/নামাজ) আদয়ের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার চক্ষু ঘুমায় তবে আমার অন্তর ঘুমায় না।

হাদিস নং - ৩৩১৭
ইসমাঈল (রহঃ)আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি মসজিদে কা’বা থেকে রাতে অনুষ্ঠিত ইসরা-এর ঘটনা বর্ণনা করছিলেন যে, তিন ব্যাক্তি (ফিরিস্তা) তাঁর নিকট হাজির হলেন মি’রাজ সম্পর্কে ওহী অবতরণের পূর্বে। তখন তিনি মাসজিদুল হারামে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তাদেঁর প্রথমজন বলল, তাদেঁর (তিন জনের) কোন জন তিনি? (যেহেতু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীর পাশে হামযা ও জাফর শুয়ে ছিলেন) মধ্যম জন উত্তর দিল, তিনই (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )তাদেঁর শ্রেষ্ঠ জন। আর শেষ জন বলল, শ্রেষ্ঠ জনকে নিয়ে চল। এ রাত্রে এতটুকুই হল, এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাদেরকে আর দেখেন নাই। অতঃপর আরেক রাতে তাঁরা আগমন করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তর তা দেখতে পাচ্ছিল। যেহেতু, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চোখ ঘুমাত কিন্তু তাঁর অন্তর সদা জাগ্রত থাকত। সকল আম্বিয়াকেরামের অবস্থা এরুপই ছিল যে, তাঁদের চোখ ঘুমাত কিন্তু তাঁর অন্তর সদা জাগ্রত থাকত। তারপর জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (ভ্রমণের) দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে নিয়ে আকাশের দিকে চড়তে লাগলেন।

হাদিস নং - ৩৩১৮
আবূল ওয়ালিদ (রহঃ) ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক সফরে (খায়বার যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন কালে) তাঁরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলেন। সারারাত পথ চলার পর যখন ভোর নিকটবর্তী হল, তখন বিশ্রাম গ্রহণের জন্য থেমে গেলেন এবং গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লেন। অবশেষে সূর্য উদিত হয়ে অনেক উপরে উঠে গেল (কিন্তু কেউই জাগলেন না)। (ইমরান (রাঃ)) বলেন, যিনি সর্বপ্রথম ঘুম থেকে জাগলেন তিনি হলেন আবূ বকর (রাঃ)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বেচ্ছায় জাগ্রত না হলে তাকেঁ জাগানো হত না। তারপর উমর (রাঃ) জাগলেন। আবূ বকর (রাঃ) তাঁর শিয়রের নিকট গিয়ে বসে উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে লাগলেন। অবশেষে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলেন এবং অন্যত্র চলে গিয়ে অবতরণ করে আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। তখন একব্যাক্তি আমাদের সঙ্গে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় না করে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাত (নামায/নামাজ) শেষ করলেন তখন বললেন, হে অমুক, আমাদের সাথে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে কিসে বাধা দিল? লোকটি বলল, আমি অপবিত্র হয়েছি (গোসলের প্রয়োজন হয়েছিল)। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পাক মাটি দিয়ে তৈয়াম্মুম করার আদেশ দিলেন, তারপর সে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করল। (ইমরান (রাঃ)) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অগ্রগামী দলের সাথে পাঠিয়ে দিলেন এবং আমরা ভীষণ তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লাম। এমতাবস্থায় আমরা পথ চলছি। হঠাৎ এক উষ্ট্রারোহিণী মহিলা আমাদের নযরে পড়লো। সে পানি ভর্তি দু’টি মশকের মধ্যে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম পানি কোথায়? সে বলল, (আশেপাশে) কোথায়ও পানি নেই। আমরা বললাম, তোমার ও পানির জায়গার মধ্যে দূরত্ব কতটুকু? সে বলল একদিন ও একরাতের দূরত্ব। আমরা তাকে বললাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট চল। সে বলল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি? আমরা তাকে যেতে না দিয়ে তাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খেদমতে নিয়ে গেলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খেদমতে এসেও ঐ জাতীয় কথাবার্তাই বলল যা সে আমাদের সঙ্গে বলেছিল। তবে সে তাঁর নিকট বলল সে কয়েকজন ইয়াতীম সন্তানের মাতা। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মশক দু’টি নামিয়ে ফেলতে আদেশ করলেন। তারপর তিনি মশক দু’টির মুখে হাত বুলালেন। আমরা তৃষ্ণাকাতর চল্লিশজন মানুষ পানি পান করে পিপাসা নিবারণ করলাম। তারপর আমাদের সকল মশক, বাসনপত্র পানি ভর্তি করে নিলাম। তবে উটগুলোকে পানি পান করানো হয় নাই। এত সবের পরও মহিলার মশকগুলি এত পানি ভর্তি ছিল যে তা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের নিকট (খাবার জাতীয়) যা কিছু আছে উপস্থিত কর। কিছু খেজুর আর রুটির টুকরা জমা করে তাকে দেয়া হল। এ নিয়ে মহিলা আনন্দের সাথে তার গৃহে ফিরে গেল। গৃহে গিয়ে সে সকলের কাছে বলল, আমার সাক্ষাত হয়েছিল এক মহাযাদুকরের সাথে অথবা মানুষ যাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে ধারণা করে তার সাথে। আল্লাহ্ এই মহিলার মাধ্যমে এ বস্তিবাসীকে হেদায়াত দান করলেন। মহিলাটি নিজেও ইসলাম গ্রহণ করল এবং বস্তিবাসী সকলেই ইসলাম গ্রহণে ধন্য হল।

হাদিস নং - ৩৩১৯
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ)আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট একটি পানির পাত্র আনা হল, তখন তিনি (মদিনার নিকটবর্তী) যাওরা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত মোবারক ঐ পাত্রে রেখে দিলেন আর তখনই পানি আঙ্গলির ফাঁক দিয়ে উপচে পড়তে লাগল। ঐ পানি দিয়ে উপস্থিত সকলেই উযূ (ওজু/অজু/অযু) করে নিলেন। কাতাদা (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনাদের লোক সংখ্যা কত ছিল? আমরা তিনশ’ অথবা তিনশ’ এর কাছাকাছি ছিলাম।

হাদিস নং - ৩৩২০
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে (এমন অবস্থায়) দেখতে পেলাম যখন আসরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর সময় নিকটবর্তী। সকলেই পেরেশান হয়ে পানি খুঁজছেন কিন্তু পানি পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উযূ (ওজু/অজু/অযু)র পানি (একটি পাত্রসহ আনা হল)। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পাত্রে তাঁর হাত মোবারক রেখে দিলেন এবং সকলকে এ পাত্রের পানি দ্বারা উযূ (ওজু/অজু/অযু) করতে আদেশ দিলেন। আমি দেখলাম তাঁর হাত মোবারকের নীচ হতে সজোরে উথ্লে পড়ছিল। কাফিলার শেষ ব্যাক্তিটি পর্যন্ত সকলেই এই পানি দিয়ে উযূ (ওজু/অজু/অযু) করে নিলেন।

হাদিস নং - ৩৩২১
আবদুর রাহমান ইবনু মুবারক (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক সফরে বের হয়েছিলেন। তাঁর সাথে সাহাবায়ে কেরামও ছিলেন। তাঁরা চলতে লাগলেন তখন সালাত (নামায/নামাজ)-এর সময় হয়ে গেল কিন্তু উযূ (ওজু/অজু/অযু) করার জন্য কোথাও পানি পাওয়া গেল না। কাফিলার এক ব্যাক্তি (আনাস (রাঃ) নিজেই) সামান্য পানিসহ একটি পেয়ালা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত করলেন। তিনি পেয়ালাটি হাতে নিয়ে তার-ই পানি দিয়ে উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন এবং তাঁর হাতের চারটি আঙ্গুল পেয়ালার মধ্যে সোজা করে ধরে রাখলেন। আর বললেন, উঠ তোমরা সকলে উযূ (ওজু/অজু/অযু) কর। সকলেই ইচ্ছামত উযূ (ওজু/অজু/অযু) করে নিলন। তাদেঁর সংখ্যা সত্তর বা এর কাছাকাছি ছিল।

হাদিস নং - ৩৩২২
আবদুল্লাহ ইবনু মুনীর (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালাত (নামায/নামাজ)-এর সময় উপস্থিত হল (কিন্তু পানির ব্যবস্থা ছিল না)যাদের বাড়ী মসজিদের নিকটে ছিল তাঁরা উযূ (ওজু/অজু/অযু) করার জন্য নিজ নিজ বাড়ীতে চলে গেলেন। কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক থেকে গেলেন (যাদের উযূ (ওজু/অজু/অযু)র কোন ব্যবস্থা ছিল না)। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট প্রস্তর নির্মিত একটি (ছোট্ট) পাত্র আনা হল। এতে সামান্য পানি ছিল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পাত্রে তাঁর হাত মোবারক রাখলেন। কিন্তু পাত্রটি ছোট্ট বিধায় হাতের আঙ্গুল প্রসারিত করতে পারলেন না বরং একত্রিত করে রেখে দিলেন। তারপর উপস্থিত সকলেই ঐ পানি দ্বারাই উযূ (ওজু/অজু/অযু) করে নিলেন। হুমাইদ (একজন রাবী) (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা কতজন ছিলেন, তিনি বললেন, আশি জন।

হাদিস নং - ৩৩২৩
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদাবিয়ায় অবস্থান কালে একদিন সাহাবায়ে কেরাম পানির পীপাসায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সম্মুখে একটি (চামড়ার) পাত্রে অল্প পানি ছিল। তিনি উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন। তাঁর নিকট পানি আছে মনে করে সকলে ঐ দিকে ধাবিত হলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কি হয়েছে? তাঁরা বললেন, আপনার সম্মুখস্থ পাত্রের সামান্য পানি ব্যতীত উযূ (ওজু/অজু/অযু) ও পান করার মত পানি আমাদের নিকট নাই। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পাত্রে তাঁর হাত রাখলেন। তখনই তাঁর হাত উপচিয়ে ঝর্ণা ধারার ন্যায় পানি ছুটিয়ে বের হতে লাগলো। আমরা সকলেই পানি পান করলাম আর উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলাম। সালিম (রহঃ) (একজন রাবী)বলেন, আমি জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা কতজন ছিলেন? আমরা যদি এক লক্ষও হতাম, তবুও আমারদের জন্য পানি যথেষ্ট হত। তবে আমরা ছিলাম মাত্র পনেরশ’।

হাদিস নং - ৩৩২৪
মালিক ইবনু ইসমাইল (রহঃ) বারা’আ ইবনু আযির) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে হুদাবিয়ায় চৌদ্দশ লোক ছিলাম। হুদায়বিয়া একটি কুপ, আমরা তা হতে পানি এমন ভাবে উঠিয়ে নিলাম যে তাতে এক ফোঁটা পানিও বাকী থাকলো না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কূপের কিনারায় বসে কিছু পানি আনার জন্য আদেশ করলেন। (সামান্য পানি আনা হল) তিনি কুল্লি করে ঐ পানি কূপে নিক্ষেপ করলেন। কিছু সময় অপেক্ষা করলাম। তখন কূপটি পানিতে ভরে গেল। আমরা পান করে তৃপ্তি লাভ করলাম, আমাদের উটগুলোও পানি পানে তৃপ্ত হল। অথবা বলেছেন আমাদের উটগুলো পানি পান করে প্রত্যাবর্তন করল।

হাদিস নং - ৩৩২৫
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ তালহা (রাঃ) তদীয় (পত্নী) উম্মে সুলায়মকে বললেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্ঠস্বর দুর্বল শুনেছি। আমি তাঁর মধ্যে ক্ষুদা বুঝতে পেরেছি। তোমার নিকট খাবার কিছু আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ আছে। এই বলে তিনি কয়েকটা যবের রুটি বের করলেন। তারপর তাঁর একখানা ওড়না বের করে এর কিয়দংশ দিয়ে রুটিগুলো মুড়ে আমার হাতে গোপন করে রেখে দিলেন ও ওড়নার উপর অংশ আমার শরীর জড়িয়ে দিলেন এবং আমাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পাঠালেন। রাবী আনাস বলেন, আমি তাঁর নিকট গেলাম। ঐ সময় তিনি কতিপয় লোকসহ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমি গিয়ে তাদের সম্মুখে দাঁড়ালাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখে বললেন, তোমাকে আবূ তালহা পাঠিয়েছে? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছে? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গীদেরকে বললেন, চলো, আবূ তালহা আমাদেরকে দাওয়াত করেছে। আমি তাঁদের আগেই চলে গিয়ে আবূ তালহা (রাঃ) কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমন বার্তা শোনালাম। ইহা শুনে আবূ তালহা (রাঃ) বলেন, হে উম্মে সুলাইম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে আসছেন। তাঁদেরকে খাওয়ানোর মত কিছু আমাদের নিকট নেই। উম্মে সুলাইম (রাঃ) বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) ই ভালো জানেন। আবূ তালহা (রাঃ) তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বাড়ী হতে কিছুদূর অগ্রসর হলেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ করলেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ তালহাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর ঘরে আসলেন, আর বললেন, হে উম্মে সুলায়ম। তোমার নিকট যা কিছু আছে নিয়ে এসো। তিনি যবের ঐ রুটিগুলো হাযির করলেন এবং তাঁর নির্দেশে রুটিগুলো টুকরা টুকরা করা হল। উম্মে সুলায়ম ঘিয়ের পাত্র ঝেড়ে মুছে কিছু ঘি বের করে তা তরকারী স্বরুপ পেশ করলেন। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করে তাতে ফুঁ দিলেন এরপর দশজনকে নিয়ে আসতে বললেন। তাঁরা দশজন আসলেন এবং রুটি খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। তারপর আরো দশজনকে আসতে বলা হল। তাঁরাও আসলেন এবং পেটভরে খেয়ে নিলেন। অনুরূপভাবে সমবেত সকলেই রুটি খেয়ে পরিতৃপ্ত হলেন। লোকজন সর্বমোট সত্তর বা আশিজন ছিলেন।

হাদিস নং - ৩৩২৬
মুহাম্মদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা (সাহাবাগণ) অলোকিক ঘটনাসমূহকে বরকত ও কল্যাণকর মনে করতাম আর তোমরা (যারা সাহাবী নও) ঐ সব ঘটনাকে ভীতিকর মনে কর। আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সফরে ছিলাম। আমাদের পানি কমিয়ে আসল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অতিরিক্ত পানি তালাশ কর। (তালাশের পর) সাহাবাগণ একটি পাত্র নিয়ে আসলেন যার ভেতর সামান্য পানি ছিল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত মোবারক ঐ পাত্রের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন এবং ঘোষণা করলেন, বরকতময় পানি নিতে সকলেই এসো। এ বরকত আল্লাহ তা’লার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। তখন আমি দেখতে পেলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পানি উপচে পড়ছে। সময় বিশেষে আমরা খাদ্য-দ্রব্যের তাসবীহ পাঠ শুনতাম আর তা খাওয়া হতো।

হাদিস নং - ৩৩২৭
আবূ নু’আইম (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তাঁর পিতা {আবদুল্লাহ (রাঃ) উহুদ যুদ্ধে} ঋণ রেখে শাহাদাত বরণ করেন। তখন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললাম, আমার পিতা অনেক ঋণ রেখে গেছেন। আমার নিকট বাগানের উৎপন্ন কিছু খেজুর ব্যতীত অন্য কোন সম্পদ নেই। কয়েক বছরের উৎপাদিত খেজুর একত্রিত করলেও তদ্বারা তাঁর ঋণ শোধ হবে না। আপনি দয়া করে আমার সাথে চলুন, যাতে পাওনাদারগণ (আপনাকে দেখে) আমার প্রতি কঠোর মনোভাব গ্রহণ না করে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে গেলেন এবং খেজুরের একটি স্তূপের চারদিক ঘুরে দোয়া করলেন। এরপর অন্য স্তূপের নিকটে গেলেন এবং এর নিকটে বসে পড়লেন এবং জাবির (রাঃ) কে বললেন, খেজুর বের করে দিতে থাক। অতঃপর সকল পাওনাদারের প্রাপ্য শোধ করে দিলেন অথচ পাওনাদারদের যা দিলেন তাঁর সমপরিমাণ রয়ে গেল।

হাদিস নং - ৩৩২৮
মূসা ইবনু ইসমাইল (রহঃ) আব্দুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ) বর্ণনা করেন, আসহাবে সুফফায় কতিপয় অসহায় দরিদ্র লোক ছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বললেন, যার ঘরে দু’জনের পরিমান খাওয়ার আছে সে যেন এদের মধ্য থেকে তৃতীয় একজন নিয়ে যায়। আর যার ঘরে চার জনের পরিমান খাওয়ার আছে সে এদের মধ্য থেকে পঞ্চম একজন বা ষষ্ঠ একজনকে নিয়ে যায় অথবা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন। আবূ বকর (রাঃ) তিনজন নিলেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিলেন দশজন। আব্দুর রহমান বলেন, (আমরা বাড়ীতে ছিলাম তিনজন)। আমি আমার আব্বা ও আম্মা। আবূ উসমান (রাঃ) বলেন, আমার মনে নাই আব্দুর রহমান (রাঃ) কি ইহাও বলেছিলেন যে আমার স্ত্রী ও আমাদের পিতা-পুত্রের একজন গৃহভৃত্যও ছিল। আবূ বকর (রাঃ) ঐ রাতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জির বাড়ীতেই খেয়ে নিলেন এবং ইশার সালাত (নামায/নামাজ) পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন। ইশার সালাত (নামায/নামাজ)-এর পর পুনরায় তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গৃহে গমন করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাতের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তথায়ই অবস্থান করলেন। অনেক রাতের পর গৃহে ফিরলেন। তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, মেহমান পাঠিয়ে দিয়ে আপনি এতক্ষন কোথায় ছিলেন? তিনি বললেন, তাদের কি এখনও রাতের আহার দাওনি? স্ত্রী বললেন, আপনার না আসা পর্যন্ত তারা আহার খেতে রাযী হননি। তাদেরকে ঘরের লোকজন আহার দিয়েছিল। কিন্তু তাদের অসম্মতির নিকট আমাদের লোকজনকে হার মানতে হয়েছে। আব্দুর রহমান (রাঃ) বলেন, আমি (অবস্থা বেগতিক দেখে) তাড়াতাড়ি কেটে পড়লাম। আবূ বকর (রাঃ) (আমাকে উদ্দেশ্য করে) বললেন, ওরে বেওকুফ! আহম্মক! আরো কিছু কড়া কথা বলে ফেললেন। তারপর মেহমান পক্ষকে সম্বোধন করে বললেন, আপনারা খেয়ে নিন। আমি কিছুতেই খাবো না। (মধ্যে আরো কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেল অবশেষে সকলেই খেতে বসলেন।)আব্দুর রহমান (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, আমরা যখন গ্রাস তুলে নেই তখন দেখি পাত্রের খাবার অনেক বেড়ে যায়। খাওয়ার শেষে আবূ বকর (রাঃ) লক্ষ করলেন যে, পরিতৃপ্তভাবে আহারের পরও পাত্রে খাবার পূর্বাপেক্ষা অধিক রয়ে গেছে। তখন স্ত্রীকে লক্ষ করে বললেন, হে বনী ফিরাস গোত্রের বোন, ব্যাপার কি? তিনি বললেন, হে আমার নয়নমণি। খাদ্যের পরিমান এখন তিনগুণের চেয়ে অধিক রয়েছে। আবূ বকর (রাঃ) তা থেকে কয়েক গ্রাস খেলেন এবং বললেন, আমার কসম শয়তানের প্ররোচনায় ছিল। তারপর অবশিষ্ট খাদ্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট নিয়ে গেলেন এবং ভোর পর্যন্ত ঐ খাদ্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হেফাযতে রইল। রাবী বলেন, আমাদের (মুসলমানদের) ও অন্য একটি গোত্রের মধ্যে সন্ধি ছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াতে তাদের মোকাবেলা করার জন্য আমাদের বার জনকে নেতা মনোনীত করা হল। প্রত্যেক নেতার অধীনে আবার কয়েকজন করে লোক ছিল। আল্লাহই ভালো জানেন তাদের প্রত্যেকের সাথে কতজন করে দেয়া হয়েছিল! আব্দুর রহমান (রাঃ) বলেন, এদের প্রত্যেকেই এ খাবার থেকে খেয়ে নিলেন। অথবা তিনি যা বলেছেন।

হাদিস নং - ৩৩২৯
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে একবার মদিনাবাসী অনাবৃষ্টির দরুন (দুর্ভিক্ষে) পতিত হল। ঐ সময় কোন এক জুম্মার দিনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবা দিয়েছিলেন, তখন এক ব্যাক্তি উঠে দাঁড়ালো, এবং বলল ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! (অনাবৃষ্টির কারণে) ঘোড়াগুলো নষ্ট হয়ে গেল, বকরীগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্য দু’আ করুন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ দু’হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, তখন আকাশ স্ফটিক সদৃশ্য নির্মল ছিল। হঠাৎ মেঘ সৃষ্টিকারী বাতাস বইতে শুরু করল এবং মেঘ ঘনীভূত হয়ে গেল। তারপর শুরু হল প্রবল বারিপাত যেন আকাশ তার দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। আমরা (সালাত (নামায/নামাজ) শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে) পানি ভেঙ্গে বাড়ি পৌঁছলাম। পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত অনবরত বৃষ্টিপাত হল। ঐ শুক্রবারে জুম্মার সময় ঐ ব্যাক্তি বা অন্য কেউ দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , (অতিবৃষ্টির কারণে) গৃহগুলো বিধ্বস্ত হয়ে গেল। বৃষ্টি বন্ধের জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করুন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাঁর কথা শুনে) মুচকি হাঁসলেন এবং বললেন, (হে আল্লাহ!) আমাদের আশে পাশে বৃষ্টি হউক। আমাদের উপর নয়। {আনাস (রাঃ) বলেন, } তখন আমি দেখলাম, মদিনার আকাশ থেকে মেঘমালা চতুর্দিক সরে গেছে আর মদিনা (যেন মেঘমুক্ত হয়ে) মুকুটের ন্যায় শোভা পাচ্ছে।

হাদিস নং - ৩৩৩০
মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মসজিদে) খেজুরের একটি কাণ্ডের সাথে (হেলান দিয়ে) খুৎবা প্রদান করতেন। যখন মিম্বার তৈরি করে দেয়া হল, তখন তিনি মিম্বারে উঠে খুৎবা দিতে লাগলেন। কাণ্ডটি তখন {নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরহে} কাঁদতে শুরু করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাণ্ডটির নিকটে গিয়ে হাত বুলাতে লাগলেন। (তখন স্তম্ভটি শান্ত হল।)উপরোক্ত হাদীসটি আবদুল হামীদ ও আবূ ‘আসিম (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

হাদিস নং - ৩৩৩১
আবূ নু’আইম (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বৃক্ষের উপর কিংবা একটি খেজুর বৃক্ষের কাণ্ডের উপর (হেলান দিয়ে) শুক্রবারে খুৎবা প্রদানের জন্য দাঁড়াতেন। এমতাবস্থায় একজন আনসারী মহিলা অথবা একজন পুরুষ বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার জন্য একটি মিম্বার তৈরি করে দেব কি? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের ইচ্ছা হলে দিতে পার। অতঃপর তাঁরা একটি কাঠের মিম্বার তৈরি করে দিলেন। যখন শুক্রবার এল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে আসন গ্রহণ করলেন, তখন কাণ্ডটি শিশুরু ন্যায় চীৎকার করে কাঁদতে লাগল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বার হতে নেমে এসে উহাকে জড়িয়ে ধরলেন। রাবী বলেন, কিন্তু কান্ডটি এজন্য কাঁদছিল যেহেতু সে খুতবাকালে অনেক যিকর শুনতে পেত।

হাদিস নং - ৩৩৩২
ইসমাইল (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, প্রথম দিকে খেজুরের কয়েকটি কাণ্ডের উপর মসজিদে নববীর ছাদ করা হয়েছিল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই খুৎবা প্রদানের ইচ্ছা প্রদান করতেন, তখন একটি কান্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন। অতঃপর তাঁর জন্য মিম্বার তৈরি করে দেওয়া হলে তিনি সেই মিম্বারে উঠে দাঁড়াতেন। ঐ সময় আমরা কাণ্ডটির ভেতর থেকে দশমাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীর স্বরের ন্যায় কান্নার আওয়াজ শুনলাম। অবশেষে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকটে এসে তাকে হাত বুলিয়ে সোহাগ করলেন। তারপর কান্ডটি শান্ত হল।

হাদিস নং - ৩৩৩৩
মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) ও বিশর ইবনু খালিদ উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর (ভবিষ্যতের) ফিতনা সম্পর্কীয় হাদীস স্মরণ রেখেছ? যেমনভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন। হুযায়ফা (রাঃ) বললেন, আমই সর্বাধিক স্মরণ রেখেছি। উমর (রাঃ) বললেন, বর্ণনা কর, তুমি তো, অত্যন্ত সাহসী ব্যাক্তি। হুযায়ফা (রাঃ) বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ এবং প্রতিবেশী দ্বারা সৃষ্ট ফিতনা-ফাসা’দর ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে সালাত (নামায/নামাজ), সা’দকা এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদানের দ্বারা। উমর (রাঃ) বললেন, আমি এ জাতীয় ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিনি বরং উদ্বেলিত সাগর তরঙের ন্যায় ভীষণ আঘাত হানে ঐ জাতীয় ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এ জাতীয় ফিতনা সম্পর্কে আপনার শঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। আপনার এবং এ জাতীয় ফিতনার মধ্যে একটি সুদৃঢ় কপাট বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। উমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, এ কপাটটি কি (সাধারণ নিয়মে) খোলা হবে, না (জোরপূর্বক) ভেঙ্গে ফেলা হবে? হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, (জোরপূর্বক) ভেঙ্গে ফেলা হবে। উমর (রাঃ) বললেন, তা হলে এ কপাটটি আর সহজে বন্ধ করা যাবে না। আমরা (সাহাবীগণ) হুযায়ফাকে জিজ্ঞাসা করলাম, উমর (রাঃ) কি জানতেন, ঐ কপাট দ্বারা কাকে বুঝানো হয়েছে? তিনি বললেন, অবশ্যই; যেমন নিশ্চিতভাবে জানতেন আগামী দিনের পূর্বে, অদ্য রাতের আগমন অনিবার্য। আমি তাঁকে এমন একটি হাদীস শুনিয়েছি, যাতে ভুলভ্রান্তির অবকাশ নেই। আমরা (সাহাবীগণ) হুযায়ফাকে ভয়ে জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাইনি, তাই মাসরুককে বললাম, (তুমি জিজ্ঞাসা কর) মাসরুক (রহঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ বন্ধ কপাট দ্বারা উদ্দেশ্য কি? হুযায়ফা (রাঃ) বললেন, উমর (রাঃ) স্বয়ং।

হাদিস নং - ৩৩৩৪
আবূল ইয়ামান (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামত সঙ্ঘটিত হবে না ততক্ষণ, যতক্ষণ না তোমাদের যুদ্ধ হবে এমন এক জাতির সঙ্গে যাদের পায়ের জুতা হবে পশমের এবং যতক্ষণ না তোমাদের যুদ্ধ হবে তুর্কিদের সহিত যাদের চক্ষু ক্ষুদ্রাকৃতি, নাক চ্যাপটা, চেহারা লাল বর্ণ যেন তাদের চেহারা পেটানো ঢাল। তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হবে যারা নেতৃত্বে ও শাসন ক্ষমতায় জড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত একে অত্যন্ত ঘৃণা ও অপছন্দ করবে। মানুষ খনির ন্যায় (এতে ভালো মন্দ সবই আছে) যারা জাহিলিয়াতের যুগে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম, ইসলাম গ্রহণের পরও তাঁরা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। তোমাদের নিকট এমন যুগ আসবে যখন তোমাদের পরিবার-পরিজনরা, ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়ার চাইতেও আমার সাক্ষাৎ লাভ তার কাছে অত্যন্ত প্রিয় মনে হবে।

হাদিস নং - ৩৩৩৫
ইয়াহইয়া (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামত সংগঠিত হবে না যে পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ না হবে খুয ও কিরমান নামক স্থানে (বসবাসরত) অনারব জাতিগুলোর সাথে, যাদের চেহারা লালবর্ণ, চেহারা যেন পিটানো ঢাল, নাক চ্যাপটা, চক্ষু ক্ষুদ্রাকৃতি এবং জুতা পশমের। ইয়াহইয়া ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ ও আব্দুর রাজ্জাক (রহঃ) থেকে পূর্বের হাদীস বর্ণনায় তার অনুসরণ করেছেন।

হাদিস নং - ৩৩৩৬
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহচার্যে তিনটি বছর কাটিয়েছি। আমার জীবনে হাদীস মুখস্ত করার আগ্রহ এ তিন বছরের চেয়ে অধিক আর কখনো ছিল না। আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হাত দ্বারা এভাবে ইশারা করে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের পূর্বে তোমরা (পরবর্তীরা) এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করবে যাদের জুতা হবে পশমের। এরা হবে পারস্যবাসী অথবা পাহাড়বাসী অনারব।

হাদিস নং - ৩৩৩৭
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আমর ইবনু তাগলিব (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা কিয়ামতের পূর্বে এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করবে যারা পশমের জুতা ব্যবহার করে এবং তোমরা এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করবে যাদের চেহারা হবে পিটানো ঢালের ন্যায়।

হাদিস নং - ৩৩৩৮
হাকাম ইবনু নাফে (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ইয়াহুদীরা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। তখন বিজয়ী হবে তোমরাই। (এমনকি পাথরের আড়ালে কোন ইয়াহুদী আত্মগোপন করে থাকলে) স্বয়ং পাথরই বলবে, হে মুসলিম, এই তো ইয়াহুদী; আমার পেছনে আত্মগোপন করেছে, একে হত্যা কর।

হাদিস নং - ৩৩৩৯
কুতায়বা (রহঃ) আবূ সা’ঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (ভবিষ্যতে) মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে যে, তাঁরা জিহাদ করবে। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যাক্তি আছেন কি? যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচার্য লাভ করেছেন? তখন তারা বলবে, হ্যাঁ (আছেন)। তখন (ঐ সাহাবীর বরকতে) তাদেরকে জয়ী করা হবে। এরপরও তারা আরো জিহাদ করবে। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি সাহাবা কেরামের সাহচার্য লাভ করেছেন? তখন তারা বলবে, হ্যাঁ (আছেন)। তখন (ঐ তাবেয়ীর তুফায়েলে) তাদেরকে জয়ী করা হবে।

হাদিস নং - ৩৩৪০
মুহাম্মদ ইবনুল হাকাম (রহঃ) আদি ইবনু হাতিম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মজলিসে বসা ছিলাম। তখন এক ব্যাক্তি এসে দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করল। তারপর আর এক ব্যাক্তি এসে ডাকাতের উৎপাতের কথা বলে অনুযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আদী, তুমি কি হীরা নামক স্থানটি দেখেছ? আমি বললাম, দেখি নাই, তবে স্থানটি আমার জানা আছে। তিনি বললেন, তুমি যদি দীর্ঘজীবি হও তবে দেখতে পাবে একজন উট সওয়ার হাওদানশীল মহিলা হীরা থেকে রওয়ানা হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে তাওয়াফ করে যাবে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করবেন না। আমি মনে মনে বলতে লাগলাম তাঈ গোত্রের ডাকাতগুলো কোথায় থাকবে যারা ফিতনা ফাসা’দর আগুন জ্বালিয়ে দেশকে ছারখার করে দিচ্ছে। তিনি বললেন, তুমি যদি দীর্ঘজীবি হও, তবে নিশ্চয়ই দেখতে পাবে যে, কিসরার (পারস্য সমরাট) ধনভাণ্ডার কবজা করা হয়েছে। আমি বললাম, কিসরা ইবনু হুরমুযের? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, কিসরা ইবনু হুরমুযের। তোমার আয়ু যদি দীর্ঘ হয় তবে অবশ্যই তুমি দেখতে পাবে, লোকজন মুষ্টিভরা যাকাতের স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়ে বের হবে এবং এমন ব্যাক্তিকে তালাশ করে বেড়াবে যে তাদের এ মাল গ্রহণ করে। কিন্তু গ্রহণকারী একটি মানুষও পাবেনা। তোমাদের প্রত্যেকটি মানুষ কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করবে। তখন তার ও আল্লাহর মাঝে অন্য কোন দোভাষী থাকবেনা যিনি ভাষান্তর করে বলবেন। আল্লাহ্ বলবেন, আমি কি (দুনিয়াতে) তোমার নিকট আমার বাণী পৌঁছানোর জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরণ করিনি? সে বলবে, হ্যাঁ। প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাকে ধন-সম্পদ, সন্তানসন্ততি দান করিনি এবং দয়া মেহেরবানী করিনি? তখন সে বলবে, হ্যাঁ, দিয়েছেন। তারপর সে ডান দিকে নজর করবে, জাহান্নাম ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাবে না। আবার সে বাম দিকে নজর করবে, তখনো সে জাহান্নাম ব্যতীত কিছুই দেখবে না। আদী (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, অর্ধেকটি খেজুর দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা কর আর যদি তাও করার তৌফিক না হয় তবে মানুষের জন্য মঙ্গলজনক সৎ ও ভাল কথা বলে নিজেকে আগুন থেকে রক্ষা কর। আদী (রাঃ) বলেন, আমি নিজে দেখেছি, এক উট সাওয়ার মহিলা হীরা থেকে একাকী রওয়ানা হয়ে কা’বাহ শরীফ তাওয়াফ করেছে। সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করে না। আর পারস্য সমরাট কিসরা ইবনু হুরমুযের ধনভাণ্ডার যারা দখল করেছিল, তাদের মধ্যে আমি একজন ছিলাম। যদি তোমরা দীর্ঘজীবি হও, তবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, তা স্বচক্ষে দেখতে পাবে। (অর্থাৎ মুষ্টিভরা স্বর্ণ দিতে চাইবে কিন্তু কেউ নিতে চাইবে না। )

হাদিস নং - ৩৩৪১
সাঈদ ইবনু শুরু াহবিল (রহঃ) উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে মৃত ব্যাক্তির সালাত (নামায/নামাজ) জানাযার ন্যায় উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী সাহাবায়ে কেরামের কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। তারপর ফিরে এসে মিম্বারে আরোহণ করে বললেন, আমি তোমাদের জন্য আগ্রগামী ব্যাক্তি, আমি তোমাদের পক্ষে আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য প্রদান করবো। আল্লাহর কসম, আমি এখানে বসে থেকেই আমার হাউজে কাওসার দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি আমার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম আমার ওফাতের পর তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে এ আশঙ্কা আমার নেই। তবে আমি তোমাদের সম্পর্কে এ ভয় করি যে পার্থিব ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ও মোহ তোমাদেরকে আত্মকলহে লিপ্ত করে তুলবে।

হাদিস নং - ৩৩৪২
আবূ নু’আইম (রহঃ) উসামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মদিনায় একটি উচু টিলায় আরোহণ করলেন, তারপর (সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ করে) বললেন, আমি যা দেখেছি, তোমরা কি তা দেখতে পাচ্ছ? আমি দেখছি বাড়ি ধারার ন্যায় ফাসা’দ ঢুকে পড়ছে তোমাদের ঘরে ঘরে।

হাদিস নং - ৩৩৪৩
আবূল ইয়ামান (রহঃ) যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে পড়তে তাঁর গৃহে প্রবেশ করলেন এবং বলতে লাগলেন, অচিরেই একটি দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হবে। এতে আরবের ধ্বংস অনিবার্য। ইয়াজুজ ও মাজুজের দেয়ালে এতটুকু পরিমাণ ছিদ্র হয়ে গিয়েছে, এ কথা বলে দু’টি আঙ্গুল গোলাকৃতি করে দেখালেন। যায়নাব (রাঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি ধ্বংস হয়ে যাব? অথচ আমাদের মাঝে অনেক নেক লোক রয়েছে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যখন অশ্লীলতা (ফিসক ও কুফর এবং ব্যাভিচার) বেড়ে যাবে। অন্য একটি বর্ণনায় উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলেন এবং বলতে লাগলেন, সুবাহানাল্লাহ, আজ কী অফুরন্ত ধনভাণ্ডার অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তারই সাথে অগণিত ফিতনা-ফাসা’দ নাযিল করা হয়েছে।

হাদিস নং - ৩৩৪৪
আবূ নু’আইম (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আবূ সা’সা’আতকে বললেন, তোমাকে দেখছি তুমি বকরীকে অত্যন্ত পছন্দ করে এদেরকে সর্বদা লালন-পালন কর, তাই তোমাকে বলছি, এদের যত্ন কর এবং রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা কর। আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, এমন এক জামানা আসবে, যখন বকরীই হবে মুসলমানদের সর্বোত্তম সম্পদ। ইহাকে নিয়ে পর্বত শিখরে বাড়ি বর্ষণের স্থানে চলে যাবে এবং রক্ষা করবে তাদের দ্বীনকে ফিতনা ফাসা’দ থেকে।

হাদিস নং - ৩৩৪৫
আবদুল আযীয ওয়াইসী (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ে বলেছেন, অচিরেই অসংখ্য সর্বগ্রাসী ফিতনা ফাসা’দ আসতে থাকবে। ঐ সময় বসা ব্যাক্তি দাঁড়ানো ব্যাক্তির চেয়ে উত্তম (নিরাপদ), দাঁড়ানো ব্যাক্তি চলমান ব্যাক্তি হতে অধিক রক্ষিত আর চলমান ব্যাক্তি ধাবমান ব্যাক্তির চেয়ে অধিক বিপদমুক্ত। যে ব্যাক্তি ফিতনার দিকে চোখ তুলে তাকাবে ফিতনা তাকে গ্রাস করবে। তখন যদি কোন ব্যাক্তি তাঁর দ্বীন রক্ষার জন্য কোন ঠিকানা ঠিকানা অথবা নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করাই উচিৎ হবে। ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ) নাওফাল ইবনু মু’আবিয়া (রাঃ) হতে আবূ হুরায়রা (রাঃ) এর হাদীসের অনুরূপই বর্ণনা করেছেন। তবে অতিরিক্ত আর একটি কথাও বর্ণনা করেছেন যে এমন একটি সালাত (নামায/নামাজ) রয়েছে (আসর) যে ব্যাক্তির ঐ সালাত (নামায/নামাজ) কাযা হয়ে গেল, তার পরিবার পরিজন ধন-সম্পদ সবই যেন ধ্বংস হয়ে গেল।

হাদিস নং - ৩৩৪৬
মুহাম্মদ ইবনু কাসীর (রহঃ) ইবনু মাসউদ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, অচিরেই স্বজনপ্রীতি প্রকাশ পাবে এবং এমন সব কর্মকান্ড ঘটবে যা তোমরা পছন্দ করতে পারবে না। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তদাবস্থায় আমাদের কী করতে বলেন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন কর তোমাদের প্রাপ্যের জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ কর।

হাদিস নং - ৩৩৪৭
মুহাম্মদ ইবনু আব্দুর রহিম (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কুরাইশ গোত্রের এ লোকগুলো (যুবকগণ) জনগণকে ধ্বংস করে দিবে। সাহাবা কেরাম আরয করলেন, তখন আমাদেরকে আপনি কি করতে বলেন? তিনি বললেন, জনগণ যদি এদের সংশ্রব ত্যাগ করে দিত তবে ভালই হতো। আহমদ ইবনু মুহাম্মদ মাক্কী (রাঃ) সাঈদ উমাব্বী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ) এবং মারওয়ানের (রাঃ) কাছে ছিলাম (তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও বিশ্বস্থ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলতে লাগলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের ধ্বংস কুরাইশের কতিপয় অল্প বয়স্ক ছেলেদের হাতে এবং মারওয়ানের বললেন, অল্প বয়স্ক ছেলেদের হাতে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি ইচ্ছা করলে তাদের নামও বলতে পারি, অমুকের ছেলে অমুক, অমুকের ছেলে অমুক।

হাদিস নং - ৩৩৪৮
ইয়াহইয়া ইবনু মূসা (রহঃ) হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকজন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন আর আমি তাঁকে অকল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম; এ আশঙ্কায় যেন আমি ঐ সবের মধ্যে নিপাতিত না হই। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আমরা জাহিলিয়াতে অকল্যাণকর পরিস্থিতিতে জীবন যাপন করতাম এরপর আল্লাহ আমাদের এ কল্যাণ দান করেছেন। এ কল্যাণকর অবস্থার পর কোন প্রকার অমঙ্গলের আশঙ্কা আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ঐ অমঙ্গলের পর কোন কল্যাণ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ আছে। তবে তা মন্দ মিশ্রিত। আমি বললাম যে, মন্দ মিশ্রিত কি? তিনি বললেন, এমন একদল লোক যারা আমরা আদর্শ ত্যাগ করে অন্যপথে পরিচালিত হবে। তাদের কাজে ভালো-মন্দ সবই থাকবে। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, এরপর কি আরো অমঙ্গল আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ তখন জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারীদের আগমন ঘটবে। যারা তাদের ডাকে সাড়া দিবে তাকেই তাঁরা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এদের পরিচয় বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, তাঁরা আমাদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত এবং কথা বলবে আমাদেরই ভাষায়। আমি বললাম, আমি যদি এ অবস্থায় পতিত হই তবে আপনি আমাকে কি করতে আদেশ দেন? তিনি বললেন, মুসলমানদের (বৃহৎ) দল ও তাঁদের ইমামকে আঁকড়িয়ে ধরবে। আমি বললাম, যদি মুসলমানদের এহেন দল ও ইমাম না থাকে? তিনি বলেন, তখন তুমি তাদের সকল দল উপদলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং মৃত্যু না আসা পর্যন্ত বৃক্ষমূল দাঁতে আঁকড়িয়ে ধরে থাকবে এবং তোমার দ্বীনকে রক্ষা করবে।

হাদিস নং - ৩৩৪৯
মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার সঙ্গীগণ কল্যাণ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন আর আমি জানতে চেয়েছি ফিতনা ফাসা’দ সম্পর্কে।

হাদিস নং - ৩৩৫০
হাকাম ইবনু নাফি (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত এমন দুটি দলের মধ্যে যুদ্ধ না হবে যাদের দাবী হবে এক অর্থাৎ উভয় পক্ষ নিজেদেরকে সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে দাবী করবে।

হাদিস নং - ৩৩৫১
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত দুটি দলের মধ্যে যুদ্ধ না হবে। তাদের মধ্যে হবে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। তাদের দাবী হবে অভিন্ন। আর কিয়ামত কায়েম হবেনা যে পর্যন্ত প্রায় ত্রিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাব না হবে। এরা সবাই নিজ নিজকে আল্লাহর রাসূল বলে দাবী করবে।

হাদিস নং - ৩৩৫২
আবূল ইয়ামান (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। তিনি কিছু গণিমতের মাল বন্টন করছিলেন। তখন বানু তামীম গোত্রের জুলখোয়াইসিরাহ নামে এক ব্যাক্তি এসে হাযির হল এবং বলল, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি (বন্টনে) ইনসাফ করুন। তিনি বললেন, তোমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি ইনসাফ না করি, তবে ইনসাফ করবে কে? আমি তো নিষ্ফল ও ক্ষতিগ্রস্ত হব যদি আমি ইনসাফ না করি। উমর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমাকে অনুমতি দিন আমি এর গর্দান উড়িয়ে দেই। তিনি বললেন, একে যেতে দাও। তার এমন কিছু সঙ্গী সাথী রয়েছে তোমাদের কেউ তাদের সালাত (নামায/নামাজ)-এর তুলনায় নিজের সালাত (নামায/নামাজ) এবং সিয়াম তুচ্ছ বলে মনে করবে। এরা কোরআন পাঠ করে, কিন্তু কোরআন তাদের কণ্ঠনালীর নিম্নদেশে প্রবেশ করে না। তারা দ্বীন থেকে এমন ভাবে (দ্রুত) বেরিয়ে যাবে যেমন তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তীরের অগ্রভাগের লোহা দেখা যাবে কিন্তু (শিকারের) কোন চিহ্ন পাওয়া যাবে না। কাঠের অংশটুকু দেখলে তাতেও কিছু পাওয়া যাবে না। মধ্যবর্তী অংশটুকু দেখলে তাতেও কিছু পাওয়া যাবে না। তার পালক দেখলে তাতেও কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না। অথচ তীরটি শিকারী জন্তুর নাড়িভুঁড়ি ভেদ করে রক্তমাংস অতিক্রম করে বেরিয়ে গেছে। এদের নিদর্শন হল এমন একটি কাল মানুষ যার একটি বাহু মেয়ে লোকের স্তনের ন্যায় অথবা মাংস টুকরার ন্যায় নড়াচড়া করবে। তারা লোকদের মধ্যে বিরোধ কালে আত্মপ্রকাশ করবে। আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেন, আমি সাক্ষ দিচ্ছি যে আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে একথা শুনেছি। আমি এ-ও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) এদের সাথে যুদ্ধ করেছেন। আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তখন আলী (রাঃ) ঐ ব্যাক্তিকে তালাশ করে বের করতে আদেশ দিলেন। তালাশ করে যখন আনা হল, আমি মনোযোগের সহিত লক্ষ করে তাঁর মধ্যে ঐ সব চিহ্নগুলি দেখতে পেলাম, যা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন।

হাদিস নং - ৩৩৫৩
মুহাম্মদ ইবনু কাসীর (রাঃ) সুয়াইদ ইবনু গাফালা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রাঃ) বলেছেন, আমি যখন তোমাদের নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন হাদিস বর্ণনা করি, তখন আমার এ অবস্থা হয় যে তাঁর উপর মিথ্যা আরোপ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় এবং আমরা পরস্পরে যখন আলোচনা করি তখন কথা হল এই যে, যুদ্ধ ছলচাতুরী মাত্র। আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, শেষ যামানায় একদল তরুণের আবির্ভাব ঘটবে যারা হবে স্থুলবুদ্ধির অধিকারী। তারা নীতিবাক্যগুলো আওড়াতে থাকবে। তারা ইসলাম থেকে (এমন দ্রুত গতিতে ও চিহ্নহীনভাবে) বেরিয়ে যাবে যেভাবে তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তাদের ঈমান গলদেশ অতিক্রম করে (অন্তরে প্রবেশ) করবে না। সেখানেই এদের সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাৎ হবে, এদেরকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে। এদের হত্যাকারীদের জন্য এই হত্যার প্রতিদান রয়েছে কিয়ামতের দিন।

হাদিস নং - ৩৩৫৪
মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রাঃ) খাব্বার ইবনু আরত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে (কাফিরদের পক্ষ থেকে যে সব নির্যাতন ভোগ করছিলাম এসবের) অভিযোগ করলাম। তখন তিনি নিজের চাঁদরকে বালিশ বানিয়ে কা’বা শরীফের ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। আমরা তাঁকে বললাম, আপনি কি আমাদের জন্য (আল্লাহর নিকট) সাহায্য প্রার্থনা করবেন না? আপনি কি আমাদের (দুঃখ দুর্দশা লাঘবের) জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করবেন না? তিনি বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী (ঈমানদার) গণের অবস্থা ছিল এই, তাদের জন্য মাটিতে গর্ত খনন করা হত এবং ঐ গর্তে তাকে পুঁতে রেখে করাত দিয়ে তাঁর মস্তক দ্বিখণ্ডিত করা হত। এ (অমানুষিক নির্যাতনেও) তাদেরকে দ্বীন থেকে বিচ্যুত করতে পারত না। লোহার চিরুনী দিয়ে আঁছড়িয়ে শরীরের হাঁড় পর্যন্ত মাংস ও শিরা উপশিরা সব কিছু ছিন্নভিন্ন করে দিত। এ (লোমহর্ষক নির্যাতন) তাদেরকে দ্বীন থেকে বিমুখ করতে পারেনি। আল্লাহর কসম, আল্লাহ এ দ্বীনকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন (এবং সর্বত্র নিরাপদ ও শান্তিময় অবস্থা বিরাজ করবে।)তখনকার দিনের একজন উষ্ট্রারোহী সান’আ থেকে হাযারামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করবে না। অথবা তাঁর মেঘপালের জন্য নেকড়ে বাঘের আশঙ্কাও করবে না। কিন্তু তোমরা (ঐ সময়ের অপেক্ষা না করে) তাড়াহুড়া করছ।

হাদিস নং - ৩৩৫৫
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবিত ইবনু কায়েস (রাঃ) কে (কয়েকদিন) তাঁর মজলিসে অনুপস্থিত পেলেন। তখন এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তার সম্পর্কে জানি। তিনি গিয়ে দেখলেন সাবিত (রাঃ) তাঁর ঘরে নত মস্তকে (গভীর চিন্তায়মগ্ন অবস্থায়) বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে সাবিত, কি অবস্থা তোমার? তিনি বললেন, অত্যন্ত করুণ। বস্তুতঃ তার গলার স্বর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গলার স্বর থেকে উঁচু হয়েছিল। কাজেই (কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী) তাঁর সব নেক আমল বরবাদ হয়ে গেছে। সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। ঐ ব্যাক্তি ফিরে এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানালেন সাবিত (রাঃ) এমন এমন বলেছে। মূসা ইবনু আনাস (রহঃ) (একজন রাবী) বলেন, ঐ সাহাবী পুনরায় এ মর্মে এক মহাসুসংবাদ নিয়ে হাজির হলেন (সাবিতের খেদমতে) যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি যাও সাবিতকে বল, নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত নও বরং তুমি জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত।

হাদিস নং - ৩৩৫৬
মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) বার’আ ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সাহাবী (উসায়দ ইবনু হুযায়ব) (রাত্রি কালে) সূরা কাহফ তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর বাড়িতে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। ঘোড়াটি তখন (আতঙ্কিত হয়ে) লাফালাফি করতে লাগল। তখন ঐ সাহাবী শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করলেন। তারপর তিনি দেখতে পেলেন, একখন্ড মেঘ এসে তাকে ঢেকে ফেলেছে। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে বিষয়টি আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, হে অমুক! তুমি এভাবে তিলাওয়াত করতে থাকবে। ইহা তো সাকীনা (প্রশান্তি) ছিল, যা কুরআন তিলাওয়াতের কারণে নাযিল হয়েছিল।

হাদিস নং - ৩৩৫৭
মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) বারা ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আবূ বকর (রাঃ) আমার পিতার নিকট আমাদের বাড়িতে আসলেন। তিনি আমার পিতার নিকট থেকে একটি হাওদা ক্রয় করলেন এবং আমার পিতাকে বললেন, তোমার ছেলে বারাকে আমার সাথে হাওদাটি বয়ে নিয়ে যেতে বল। আমি হাওদাটি বহন করে তাঁর সাথে চললাম। আমার পিতাও উহার মূল্য গ্রহণ করার জন্য আমাদের সঙ্গী হলেন। আমার পিতা তাঁকে বললেন, হে আবূ বকর, দয়া করে আপনি আমাদেরকে বলুন, আপনারা কি করেছিলেন, যে রাতে (হিজরতের সময়) আপনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথী ছিলেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা (সাওর গুহা থেকে বের হয়ে) সারারাত চলে পরদিন দুপুর পর্যন্ত চললাম। যখন রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ল, রাস্তায় কোন মানুষের যাতায়াত ছিল না। হঠাৎ একটি লম্বা ও চওড়া পাথর আমাদের নযরে পড়লো, যার পতিত ছায়ায় সূর্যের তাপ প্রবেশ করছিল না। আমরা সেখানে গিয়ে অবতরণ করলাম। আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য নিজ হাতে একটি জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিলাম, যাতে সেখানে তিনি ঘুমাতে পারেন। আমি ঐ স্থানে একটি চামড়ার বিছানা পেতে দিলাম এবং বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি শুয়ে পড়ুন। আমি আপনার নিরাপত্তার জন্য পাহারায় নিযুক্ত রইলাম। তিনি শুয়ে পড়লেন। আর আমি চারপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম, একজন মেষ রাখাল তার মেষপাল নিয়ে পাথরের দিকে ছুটে আসছে। সেও আমাদের মত পাথরের ছায়ায় আশ্রয় নিতে চায়। আমি বললাম, হে যুবক, তুমি কার অধীনস্থ রাখাল? সে মদিনার কি মক্কার এক ব্যাক্তির নাম বলল, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার মেষপালে কি দুগ্ধবতী মেষ আছে? সে বলল, হ্যাঁ আছে। আমি বললাম, তুমি কি দোহন করে দিবে? সে বলল, হ্যাঁ। তারপর সে একটি বকরী ধরে নিয়ে এল। আমি বললাম, এর স্তন ধুলা-বালু, পশম ও ময়লা থেকে পরিষ্কার করে নাও। রাবী আবূ ইসহাক (রহঃ) বলেন, আমি বারা’কে দেখলাম এক হাত অপর হাতের উপর রেখে ঝাড়ছেন। তারপর ঐ যুবক একটি কাঠের বাটিতে কিছু দুধ দোহন করল। আমার সাথেও একটি চামড়ার পাত্র ছিল। আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উযূ (ওজু/অজু/অযু)র পানি ও পান করার পানি রাখার জন্য নিয়েছিলাম। আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। (তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন) তাঁকে জাগানো উচিৎ মনে করলাম না। কিছুক্ষণ পর তিনি জেগে উঠলেন। আমি দুধ নিয়ে হাজির হলাম। আমি দুধের মধ্যে সামান্য পানি ঢেলেছিলাম তাতে দুধের নীচ পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি দুধ পান করুন। তিনি পান করলেন, আমি তাতে সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখনও কি আমাদের যাত্রা শুরুর সময় হয়নি? আমি বললাম, হ্যাঁ হয়েছে। পুনরায় শুরু হল আমাদের যাত্রা। ততক্ষণে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সুরাকা ইবনু মালিক (অশ্বারোহণে) আমাদের পশ্চাঁদ্ধাবন করছিল। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের অনুধাবনে কে যেন আসছে। তিনি বললেন, চিন্তা করোনা, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিরুদ্ধে দু’আ করলেন। তৎক্ষণাৎ আরোহীসহ ঘোড়া তাঁর পেট পর্যন্ত মাটিতে ধেবে গেল, শক্ত মাটিতে। রাবী যুহায়র এই শব্দটি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, আমার ধারণা এরূপ শব্দ বলেছিলেন। সুরাকা বলল, আমার বিশ্বাস আপনারা আমার বিরুদ্ধে দু’আ করেছেন। আমার (উদ্ধারের) জন্য আপনারা দোয়া করে দিন। আল্লাহর কসম আপনাদের আপনাদের অনুসন্ধানকারীদেরকে আমি ফিরিয়ে নিয়ে যাব। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দোয়া করলেন। সে রেহাই পেল। ফিরে যাওয়ার পথে যার সাথে তার সাক্ষাৎ হতো, সে বলত (এদিকে গিয়ে পশুশ্রম করো না।)আমি সব দেখে এসেছি। যাকেই পেয়েছে, ফিরিয়ে নিয়েছে। আবূ বকর (রাঃ) বলেন, সে আমাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করেছে।

হাদিস নং - ৩৩৫৮
মু’আল্লা ইবনু আসা’দ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন অসুস্থ একজন বেদুঈনকে দেখতে (তার বাড়িতে) গেলেন। রাবী বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অভ্যাস ছিল যে, পীড়িত ব্যাক্তিকে দেখতে গেলে বলতেন, কোন দুশ্চিন্তার কারণ নেই, ইনশাআল্লাহ (পীড়াজনিত দুঃখ কষ্টের কারণে) গুনাহ থেকে তুমি পবিত্র হয়ে যাবে। ঐ বেদুঈনকেও তিনি বললেন, চিন্তার কারণ নেই গুনাহ থেকে তুমি পবিত্র হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। বেদুঈন বলল, আপনি বলছেন গুনাহ থেকে তুমি পবিত্র হয়ে যাবে। তা তো নয়। বরং এতো এমন এক জ্বর যা বয়োবৃদ্ধের উপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তাকে কবরের সাক্ষাৎ ঘটিয়ে ছাড়বে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাই হউক (পরদিন অপরাহ্নে সে মারা গেল।)

হাদিস নং - ৩৩৫৯
আবূ মামার (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক খৃস্টান ব্যাক্তি মুসলমান হল এবং সুরা বাকারা ও সুরা আলে ইমরান শিখে নিল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য সে অহী লিপিবদ্ধ করত। তারপর সে পুনরায় খৃস্টান হয়ে গেল। সে বলতে লাগল, আমি মুহাম্মদ কে যা লিখতে দিতাম তার চেয়ে অধিক কিছু তিনি জানেন না। (নাউযূ (ওজু/অজু/অযু)বিল্লাহ) কিছুদিন পর আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু দিলেন। খৃস্টানরা তাকে যথারীতি দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। তা দেখে খৃস্টানরা বলতে লাগল – এটা মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবীদের কাজ। যেহেতু আমাদের এ সাথী তাদের থেকে পালিয়েএসেছিল। এ জন্যই তারা আমাদের সাথীকে কবর থেকে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। তাই যতদুর সম্ভব গভীর করে কবর খুঁড়ে তাতে তাকে দাফন করা হল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাঁকে (গ্রহণ না করে) আবার বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবারও তারা বলল, এটা মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবীদের কাণ্ড। তাদের নিকট থেকে পালিয়েআসার কারণে তারা আমাদের সাথীকে কবর থেকে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবার আরো গভীর করে কবর খনন করে সমাহিত করল। পরদিন ভোরে দেখা গেল কবরের মাটি এবারও তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তারাও বুঝতে পারল, এটা মানুষের কাজ নয়। কাজেই তারা শবদেহটি বাইরেই ফেলে রাখল।

হাদিস নং - ৩৩৬০
ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কিসরা (পারস্য সমরাটের উপাধি) ধ্বংস হবে, তারপর অন্য কোন কিসরার আবির্ভাব হবে না। যখন কায়সার (পারস্য সমরাটের উপাধি) ধ্বংস হবে তখন আর কোন কায়সারের আবির্ভাব হবে না। {নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এও বলেছেন} ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ নিশ্চয়ই এ দুই সামরাজ্যের ধনভাণ্ডার তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।

হাদিস নং - ৩৩৬১
কাবীসা (রহঃ) জাবির ইবনু সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিসরা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আর কোন কিসরা আগমন হবে না এবং কায়সার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আর কোন কায়সারের আগমন হবে না। রাবী উল্লেখ করেন যে, (তিনি আরো বলেছেন) নিশ্চয়ই তাদের ধনভাণ্ডার আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হবে।

হাদিস নং - ৩৩৬২
আবূল ইয়ামান (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায় মূসা য়লামাতুল কাযযাব আসল এবং (সাহাবা কেরামের নিকট) বলতে লাগল, মুহাম্মদ যদি তাঁর পর আমাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন, তাহলে আমি তাঁর অনুসরণ করব। তার স্বজাতির এক বিরাট বাহিনী সঙ্গে নিয়ে সে এসেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকট আসলেন। আর তার সাথী ছিলেন সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাম (রাঃ)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে খেজুরের একটি ডাল ছিল। তিনি সাথী দ্বারা বেষ্টিত মূসা য়লামার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন, তুমি যদি আমার নিকট খেজুরের এই ডালটিও চাও, তবুও আমি তা তোমাকে দিবো না। তোমার সম্বন্ধে আল্লাহর যা ফায়সালা তা তুমি লঙ্ঘন করতে পারবেনা। যদি তুমি কিছু দিন বেঁচেও থাক তবুও আল্লাহ তোমাকে অবশ্যই ধ্বংস করে দিবেন। নিঃসন্দেহে তুমি ঐ ব্যাক্তি যার সম্বন্ধে স্বপ্নে আমাকে সব কিছু দেখানে হয়েছে। {ইবনু আব্বাস (রহঃ) বলেন, } আবূ হুরায়রা (রাঃ) আমাকে জানিয়েছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (একদিন) আমি ঘুমিয়েছিলাম। স্বপ্নে দেখতে পেলাম আমার দু’হাতে সোনার দু’টি বালা শোভা পাচ্ছে। বালা দু’টি আমাকে ভাবিয়ে তুলল। স্বপ্নেই আমার নিকট অহি এলো, আপনি ফুঁ দিন। আমি তাই করলাম। বালা দুটি উড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা এভাবে করলাম, আমার পর দুজন কাযযাব (চরম মিথ্যাবাদী) আবির্ভূত হবে। এদের একজন আসওয়াদ আনসী, অপরজন ইয়ামামার বাসিন্দা মূসা য়লামাতুল কাযযাব।

হাদিস নং - ৩৩৬৩
মুহাম্মদ ইবনু আলা (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, আমি মক্কা থেকে হিজরত করে এমন এক স্থানে যাচ্ছি যেখানে প্রচুর খেজুর গাছ রয়েছে। তখন আমার ধারণা হল, এ স্থানটি ইয়ামামা অথবা হাযর হবে। পরে বুঝতে পেলাম, স্থানটি মদিনা ছিল। যার পূর্বনাম ইয়াসরিব। স্বপ্নে আমি আরো দেখতে পেলাম যে আমি একটি তরবারী হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। হঠাৎ তার অগ্রভাগ ভেঙ্গে গেল। উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের যে বিপর্যয় ঘটেছিল এটা তা-ই। তারপর দ্বিতীয় বার তরবারীটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম তখন তরবারীটি পূর্বাবস্থার চেয়েও অধিক উত্তম হয়ে গেল। এর তাৎপর্য হল যে, আল্লাহ মুসলমানগনকে বিজয়ী ও একত্রিত করে দেবেন। আমি স্বপ্নে আরো দেখতে পেলাম, একটি গরু (যা জবাই করা হচ্ছে) এবং শুনতে পেলাম আল্লাহ যা করেন সবই ভালো। এটাই হল উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের শাহাদাত বরণ। আর খায়ের হল – আল্লাহর তরফ হতে আগত ঐ সকল কল্যাণই কল্যাণ এবং সত্যবাদিতার পুরষ্কার যা আল্লাহ আমাদেরকে বদর যুদ্ধের পর দান করেছেন।

হাদিস নং - ৩৩৬৪
আবূ নু’আইম (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চলার ভঙ্গিতে চলতে চলতে ফাতিমা (রাঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন। তাঁকে দেখে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার স্নেহের কন্যাকে অনেক অনেক মোবারকবাদ। তারপর তাঁকে তাঁর ডানপাশে অথবা বামপাশে (রাবির সন্দেহ) বসালেন এবং তাঁর সাথে চুপিচুপি (কি যেন) কথা বললেন। তখন তিনি (ফাতিমা) (রাঃ) কেঁদে দিলেন। আমি আয়িশা (রাঃ) কে বললাম কাঁদছেন কেন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , পুনরায় চুপিচুপি তাঁর সাথে কথা বললেন। তিনি {ফাতিমা (রাঃ)} এবার হেঁসে উঠলেন। আমি {আয়িশা (রাঃ)} বললাম, আজকের মত দুঃখ ও বেদনার সাথে সাথে আনন্দ ও খুশী আমি আর কখনো দেখিনি। আমি তাঁকে {ফাতিমা (রাঃ)} কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম } কি বলেছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোপন কথাকে প্রকাশ করবো না। পরিশেষে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকাল হয়ে যাওয়ার পর আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কি বলেছিলেন? তিনি বললেন, তিনি {নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম } প্রথমবার আমাকে বলেছিলেন, জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতিবছর একবার আমার সঙ্গে পরস্পর কোরআন পাঠ করতেন, এ বছর দু’বার এরূপ পড়ে শুনিয়েছেন। আমার মনে হয় আমার বিদায় কাল ঘনিয়ে এসেছে এবং এরপর আমার পরিবারের মধ্যে তুমই সর্বপ্রথম আমার সাথে মিলিত হবে। তা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। দ্বিতীয়বার বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, জান্নাতবাসি মহিলাদের অথবা মু’মিন মহিলাদের তুমি সরদার (নেত্রী) হবে। এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম।

হাদিস নং - ৩৩৬৫
ইয়াহইয়া ইবনু কাযা’আ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তিম রোগকালে তাঁর কন্য ফাতিমা (রাঃ) কে ডেকে পাঠালেন। এরপর চুপিচাপি কি যেন বললেন। ফাতিমা (রাঃ) তা শুনে কেঁদে ফেললেন। তারপর আবার ডেকে তাঁকে চুপিচাপি আরো কি যেন বললেন। এতে ফাতিমা (রাঃ) হেঁসে উঠলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি হাঁসি-কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, (প্রথম বার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে চুপে চুপে বলেছিলেন, যে রোগে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন এ রোগেই তাঁর ওফাত হবে; তাই আমি কেঁদে দিয়েছিলাম। এরপর তিনি চুপিচাপি আমাকে বলেছিলেন, তার পরিবার পরিজনের মধ্যে আমই সর্বপ্রথম তাঁর সাথে মিলিত হব, এতে আমি হেঁসে দিয়েছিলেন।

হাদিস নং - ৩৩৬৬
মুহাম্মদ ইবনু আর’আরা (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) (তাঁর সভাসদদের মধ্যে) ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বিশেষ মর্যাদা দান করতেন। একদিন আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) তাঁকে বললেন, তাঁর মত ছেলে তো আমাদেরও রয়েছে। এতে তিনি বললেন, এর কারণ তো আপনি নিজেও জানেন। তখন উমর (রাঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে ডেকে “ইজা যা আ নাসরুল্লহি ওয়াল ফাতহ” আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) উত্তর দিলেন, এ আয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাঁর ওফাত নিকটবর্তী বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। উমর (রাঃ) বললেন, আমিও এ আয়াতের ব্যাখ্যা জানি, যা তুমি জানো।

হাদিস নং - ৩৩৬৭
আবূ নু’আইম (রহঃ) আব্বাস (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তিম রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর (একদিন বৃহস্পতিবার) একটি চাঁদর পরিধান করে এবং মাথায় একটি কাল কাপড় দিয়ে পট্টি বেঁধে ঘর থেকে বের হয়ে সোজা মিম্বারের উপর গিয়ে বসলেন। আল্লাহ তা’লার হামদ ও সানা পাঠ করার পর বললেন, আম্মা বাদ। লোক সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, আর আনসারদের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকবে। ক্রমান্বয়ে তাদের অবস্থা লোকের মাঝে এ রকম দাঁড়াবে যেমন খাদ্যের মধ্যে লবণ। তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি মানুষকে উপকার বা ক্ষতি করার মত ক্ষমতা লাভ করবে তখন সে যেন আনসারদের ভাল কার্যাবলি কবুল করে এবং তাদের ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমার চোখে দেখে। এটাই ছিল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সর্বশেষ মজলিশ।

হাদিস নং - ৩৩৬৮
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আবূ বাকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন হাসান (রাঃ) কে নিয়ে বেরিয়ে এলেন এবং তাঁকে সহ মিম্বারে আরোহণ করলেন। তারপর বললেন, আমার এ ছেলেটি (নাতি) সাইয়েদ (সরদার)। নিশচই আল্লাহ তা’লা এর মাধ্যমে বিবাদমান দু’দল মুসল্মানের আপোস (সমঝোতা) করিয়ে দিবেন।

হাদিস নং - ৩৩৬৯
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মূতার যুদ্ধের শাহাদাত বরণকারী) জাফর এবং যায়েদ ইবনু হারিস (রাঃ)} এর শাহাদাত লাভের সংবাদ (আমাদেরকে) জানিয়ে দিয়েছিলেন, (যুদ্ধক্ষেত্র থেকে) তাদের উভয়ের শাহাদাত লাভের সংবাদ আসার পূর্বেই। তখন তাঁর চক্ষুযুগল অশ্রু বর্ষণ করছিল।

হাদিস নং - ৩৩৭০
আমর ইবনু আব্বাস (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের নিকট আনমাত (গালিচার কার্পেট) আছে কি? আমি বললাম আমরা তা পাব কোথায়? তিনি বললেন, অচিরেই তোমরা আনমাত লাভ করবে। (আমার স্ত্রী যখন শয্যায় তা বিছিয়ে দেয়) তখন আমি তাকে বলি, আমার বিছানা থেকে এটা সরিয়ে নাও। তখন সে বলল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তা বলেন নাই যে, অচিরেই তোমার আনমাত পেয়ে যাবে? তখন আমি তো (বিছান অবস্থায়) থাকতে দেই।

হাদিস নং - ৩৩৭১
আহমদ ইবনু ইসহাক (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ) (আনসারী) ওমরা আদায় করার জন্য (মক্কা) গমন করলেন এবং সাফওয়ানের পিতা উমাইয়া ইবনু খালাফ এর বাড়িতে তিনি অতিথি হলেন। উমাইয়াও সিরিয়ায় গমনকালে (মদিনায়) সা’দ (রাঃ) এর বাড়িতে অবস্থান করত। উমাইয়া সা’দ (রাঃ) কে বলল, অপেক্ষা করুন, যখন দুপুর হবে এবং যখন চলাফেরা কমে যাবে, তখন আপনি যেয়ে তাওয়াফ করে নিবেন। (অবসর মুহূর্তে) সা’দ (রাঃ) তাওয়াফ করছিলেন। এমতাবস্থায় আবূ জেহেল এসে হাজির হল। সা’দ (রাঃ) কে দেখে জিজ্ঞাসা করল, এ ব্যাক্তি কে? যে কাবার তাওয়াফ করছে? সা’দ (রাঃ) বললেন, আমি সা’দ। আবূ জেহেল বলল, তুমি নির্বিঘ্নে কাবার তাওয়াফ করছ? অথচ তোমরাই মুহাম্মদ ও তাঁর সাথীদেরকে আশ্রয় দিয়েছে? সা’দ (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ। এভাবে দু’জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। তখন উমাইয়া সা’দ (রাঃ) কে বলল, আবূল হাকওমের সাথে উচ্চস্বরে কথা বল না, কেননা সে মক্কাবাসীদের (সর্বজন মান্য) নেতা। এরপর সা’দ (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যদি আমাকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে বাঁধা প্রদান কর, তবে আমিও তোমার সিরিয়ার সাথে ব্যবসা বানিজ্যের রাস্তা বন্ধ করে দিব। উমাইয়া সা’দ (রাঃ) কে তখন বলতে লাগল, তোমার স্বর উচু করো না এবং সে তাঁকে বিরত করতে চেষ্টা করতে লাগল। তখন সা’দ (রাঃ) ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি মুহাম্মদ কে বলতে শুনেছি, তারা তোমাকে হত্যা করবে। উমাইয়া বলল, আমাকেই? তিনি বলেলন, হ্যাঁ (তোমাকেই) উমাইয়া বলল, আল্লাহর কসম মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা কথা বলেন না। এরপর উমাইয়া তাঁর স্ত্রীর কাছে ফিরে এসে বলল, তুমি কি জানো, আমার ইয়াসরিবী ভাই (মদিনা) আমাকে কি বলেছে? স্ত্রী জিজ্ঞাসা করল কি বলছে? উমাইয়া বলল, সে মুহাম্মদ কে বলতে শুনেছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে। তার স্ত্রী বলল, আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ তো মিথ্যা বলেন না। যখন মক্কার মুশরিকরা বদরের উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হল এবং আহ্বানকারী আহ্বান চালাল। তখন উমাইয়ার স্ত্রী তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিল, তোমার ইয়াসরিবী ভাই তোমাকে যে কথা বলছিল সে কথা কি তোমার স্মরণ নেই? তখন উমাইয়া (বদরের যুদ্ধে) না যাওয়াই সিদ্ধান্ত নিল। আবূ জেহেল তাকে বলল, তুমি এ অঞ্চলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। (তুমি যদি না যাও তবে কেউ-ই যাবে না) আমাদের সাথে দুই একদিনের পথ চলো। (এরপর না হয় ফিরে আসবে।)উমাইয়া তাদের সাথে চলল। আল্লাহ তা’লার ইচ্ছায় (বদর প্রান্তে মুসলমানদের হাতে) সে নিহত হল।

হাদিস নং - ৩৩৭২
আব্দুর রহমান ইবনু শায়বা (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একদা (স্বপ্নে) লোকজনকে একটি মাঠে সমবেত দেখতে পেলাম। তখন আবূ বকর (রাঃ) উঠে দাঁড়ালেন এবং (একটি) কুপ থেকে এক অথবা দুই (রাবির সন্দেহ) বালতি পানি উঠালেন। পানি উঠাতে তিনি দুর্বলতা বোধ করছিলেন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুণ। তারপর উমর (রাঃ) বালতিটি হাতে নিলেন। বালতিটি তখন বৃহদাকার হয়ে গেল। আমি মানুষের মধ্যে পানি উঠাতে উমরের মত দক্ষ ও শক্তিশালী ব্যাক্তি কখনো দেখিনি। অবশেষে উপস্থিত লোকেরা তাদের উটগুলোকে পানি পান করিয়ে উটশালায় নিয়ে গেল। হাম্মাম (রহঃ) (একজন রাবী) বলেন, আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ) কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি আবূ বকর দু’বালতি পানি উঠালেন।

হাদিস নং - ৩৩৭৩
আব্বাস ইবনু ওয়ালীদ (রহঃ) আবূ উসমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে জানানো হল যে, একবার জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন। তখন উম্মে সালামা (রাঃ) তার নিকট ছিলেন। তিনি এসে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলেন। তারপর উঠে গেলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামাকে জিজ্ঞাসা করলেন, লোকটিকে চিনতে পেরেছ কি? তিনি বললেন, এইতো দেহইয়া। উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম। আমি দেহইয়া বলেই বিশ্বাস করছিলাম কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাঁর খুতবায় জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আগমনের কথা বলতে শুনলাম। (সুলায়মান (রাবী) বলেন) আমি আবূ উসমানকে জিজ্ঞাসা করলাম এ হাদীসটি আপনি কার কাছে শুনেছেন? তিনি বললেন, উসামা ইবনু যায়েদ এর নিকট শুনেছি।

হাদিস নং - ৩৩৭৪
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ইয়াহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে এসে বলল, তাদের একজন পুরুষ ও একজন মহিলা ব্যভিচার করেছে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা সম্পর্কে তাওরাতে কি বিধান পেয়েছে? তারা বলল, আমরা এদেরকে লাঞ্ছিত করবো এবং তাদের বেত্রাঘাত করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার বিধান রয়েছে। তারা তাওরাত নিয়ে এসে বাহির করল এবং প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা সংক্রান্ত আয়াতের উপর হাত রেখে তার পূর্বে ও পরের আয়াতগুলি পাঠ করল। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) বললেন, তোমার হাত সরাও। সে হাত সরাল। তখন দেখা গেল তথায় প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার বিধান রয়েছে। তখন ইয়াহুদিরা বলল, হে মুহাম্মদ! তিনি (আবদুল্লাহ ইবনু সালাম) সত্যই বলেছেন। তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার বিধান রয়েছে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্তর নিক্ষেপে দু’জনকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি (প্রস্তর নিক্ষেপকালে) ঐ পুরুষটিকে মেয়েটির দিকে ঝুঁকে পড়তে দেখেছি। সে মেয়েটিকে প্রস্তরের আঘাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছিল।

হাদিস নং - ৩৩৭৫
সাদাকা ইবনু ফাযল (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক।

হাদিস নং - ৩৩৭৬
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ ও খালিফা (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক) (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কাবাসী কাফিররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট মুজিযা দেখানোর জন্য দাবী জানালেন তিনি তাদেরকে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করে দেখালেন।

হাদিস নং - ৩৩৭৭
খালাফ ইবনু খালিদ আল-কুরায়শী (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল।

হাদিস নং - ৩৩৭৮
মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দু’জন সাহাবী (আব্বাদ ইবনু বিশর ও উসাইদ ইবনু হুযাইর (রাঃ) অন্ধকার রাতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবার হতে বের হলেন, তখন তাদের সাথে দু’টি বাতির ন্যায় কিছু তাদের সম্মুখভাগ আলোকিত করে চলল। যখন তারা পৃথক হয়ে গেলেন তখন প্রত্যকের সাথে এক একটি বাতি চলতে লাগল। অবশেষে তাঁরা নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে গেলেন।

হাদিস নং - ৩৩৭৯
আবদুল্লাহ ইবনু আবূল আসওয়াদ (রহঃ) ইবনু শু’বা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা বিজয়ী থাকবে। এমনকি কিয়ামত আসবে তখনো তারা বিজয়ী থাকবে।

হাদিস নং - ৩৩৮০
হুমায়দী (রহঃ) মু’আবিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা আল্লাহর দ্বীনের উপর অটল থাকবে। তাদেরকে যারা সাহায্য না করবে অথবা তাদের বিরোধীতা করবে, তারা তাদের কোন প্রকার ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি কিয়ামত আসা পর্যন্ত তাঁরা তাদের অবস্থার উপর মজবুত থাকবে। উমাইর ইবনু হানী (রহঃ) মালিক ইবনু ইউখামিরের (রহঃ) বরাত দিয়ে বলেন, মু’আয (রাঃ) বলেছেন, ঐ দলটি সিরিয়ায় অবস্থান করবে। মু’আবিয়া (রহঃ) বলেন, মালিক (রহঃ) এর ধারণা যে, ঐ দলটি সিরিয়ায় অবস্থান করবে বলে মু’আয (রাঃ) বলেছেন।

হাদিস নং - ৩৩৮১
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) উরওয়া বারিকী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বকরী ক্রয় করে দেয়ার জন্য তাঁকে একটি দিনার (স্বর্ণ মুদ্রা) দিলেন। তিনি ঐ দীনার দিয়ে দুটি বকরী ক্রয় করলেন। তারপর এক দীনার মূল্যে একটি বকরী বিক্রি করে দিলেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে একটি বকরী ও একটি দীনার নিয়ে হাযির হলেন। তা দেখে তিনি তার ব্যবসা বাণিজ্যে বরকত হওয়ার জন্য দু’আ করে দিলেন। এরপর তার অবস্থা এমন হল যে, ব্যবসার জন্য যদি মাটিও তিনি খরীদ করতেন তাতেও তিনি লাভবান হতেন। সুফিয়ান (রহঃ) শাবীব (রহঃ) (একজন রাবী) বলেন, আমি উরওয়া (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ঘোড়ার কপালের কেশগুচ্ছে বরকত ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত। রাবী বলেন, আমি তাঁর গৃহে সত্তরটি ঘোড়া দেখেছি। সুফিয়ান (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য যে বকরীটি ক্রয় করা হয়েছিল, তা ছিল কুরবানীর উদ্দেশ্যে।

হাদিস নং - ৩৩৮২
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঘোড়ার কপালের কেশগুচ্ছে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ ও বরকত নিহিত রয়েছে।

হাদিস নং - ৩৩৮৩
কায়স ইবনু হাফস (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঘোড়ার কপালে কল্যাণ ও বরকত নিহিত রয়েছে।

হাদিস নং - ৩৩৮৪
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিন বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঘোড়া তিন প্রকার। (ঘোড়া পালন) একজনের জন্য পুন্য, আর একজনের জন্য (দারিদ্র ঢেকে রাখার) আবরণ ও অন্য আর একজনের জন্য পাপের কারণ। সে ব্যাক্তির জন্য পুণ্য, যে আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদ করার উদ্দেশ্যে) ঘোড়াকে সদা প্রস্তুত রাখে এবং সে ব্যাক্তি যখন লম্বা দড়ি দিয়ে ঘোড়াটি কোন চারণভূমি বা বাগানে বেঁধে রাখে তখন ঐ লম্বা দড়ির মধ্যে চারণভূমি অথবা বাগানের যে অংশ পড়বে তত পরিমাণ সাওয়াব সে পাবে। যদি ঘোড়াটি দড়ি ছিড়ে ফেলে এবং দুই একটি টিলা পার হয়ে কোথাও চলে যায় তার পরে তার লেদাগুলিও নেকী বলে গণ্য হবে। যদি কোন নদী নালায় গিয়ে পানি পান করে, মালিক যদিও পানি পান করানোর ইচ্ছা করে নাই তাও তার নেক আমলে গণ্য হবে। আর যে ব্যাক্তি নিজের স্বচ্ছলতা দারিদ্রের গ্লানি ও পরমুখাপেক্ষীতা থেকে নিজকে রক্ষা করার জন্য ঘোড়া পালন করে এবং তার পর্দান ও পিঠে আল্লাহর যে হক রয়েছে তা ভুলে না যায়। (অর্থাৎ তার যাকাত আদায় করে) তবে এই ঘোড়া তার জন্য আযাব থেকে আবরণ স্বরূপ। অপর এক ব্যাক্তি যে অহংকার, লোক দেখানো এবং আহলে ইসলামের সাথে শত্রুতার কারণে ঘোড়া লালন-পালন করে এ ঘোড়া তার জন্য পাপের বোঝা হবে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে গাধা (পালন) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, তিনি বললেন, এ সম্বন্ধে নির্দিষ্ট কোন আয়াত আমার নিকট অবতীর্ণ হয়নি। তবে ব্যাপক অর্থবোধক অনুপম আয়াতটি আমার নিকট নাযিল হয়েছেঃ যে ব্যাক্তি অনু পরিমাণ নেক আমল করবে সে তার প্রতিফল অবশ্যই দেখতে পাবে। আর যে ব্যাক্তি অনু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে সেও তার প্রতিফল দেখতে পাবে। (৯৯:৭৮)

হাদিস নং - ৩৩৮৫
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভোরে খায়বার পৌছালেন। তখন খায়বারবাসী কোদাল নিয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিল। তাঁকে {রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম } কে দেখে তাঁরা বলতে লাগল, মুহাম্মদ পুরা সৈন্য বাহিনী নিয়ে এসে পড়েছে। (এ বলে) তাঁরা দৌড়াদৌড়ি করে তাদের সুরক্ষিত কিল্লায় ঢুকে পড়ল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’হাত উপরে উঠিয়ে বললেন, “আল্লাহু আকবার” খায়বার ধ্বংস হোক, আমরা যখন কোন জাতির (বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে), তাদের আঙ্গিনায় অবতরণ করি তখন এসব আতঙ্কগ্রস্ত লোকদের প্রভাতটি অত্যন্ত অশুভ হয়। আবূ আবদুল্লাহ (বুখারী) (রহঃ) বলেন, “ফারাফা’আ ইয়াদাইহি” শব্দটি বর্জন করুন। কেননা আমার ধারণা যে, এ শব্দটি বিশুদ্ধ বর্ণনায় পাওয়া যায় না। যদিও পাওয়া যায় তবে তা নিশ্চয়ই অপ্রসিদ্ধ হবে।

হাদিস নং - ৩৩৮৬
ইবরাহিম ইবনু মুনযির (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার থেকে অনেক হাদীস আমি শুনেছি, তবে তা আমি ভুলে যাই। তিনি (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার চাঁদরটি বিছাও। আমি চাঁদরটি বিছিয়ে দিলাম। তিনি তার হাত দিয়ে চাঁদরের মধ্যে কি যেন রাখলেন এবং বললেন, চাঁদরটি (গুঁটিয়ে তোমার বুকে) চেপে ধর। আমি (বুকের সাথে) চেপে ধরলাম, তারপর আমি আর কোন হাদীস ভুলি নাই।

হাদিস নং - ৩৩৮৭
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জনগনের উপর এমন এক সময় আসবে যখন তাদের বিরাট সৈন্যবাহিনী জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচার্য লাভ করেছেন? (অর্থাৎ সাহাবী) তাঁরা বলবেন, হ্যাঁ আছেন। তখন (ঐ সাহাবীর বরকতে) তাদেরকে জয়ী করা হবে। তারপর জনগনের উপর পুনরায় এমন এক সময় আসবে যখন তাদের বিরাট সৈন্যবাহিনী (শত্রুদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধে লিপ্ত থাকবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচার্য লাভে ধন্য কিংবা কোন ব্যাক্তির (সাহাবীর) সাহচার্য লাভ করেছেন? (অর্থাৎ তাবেয়ী) তখন তাঁরা বলবেন, হ্যাঁ আছেন। তখন (ঐ তাবেয়ীর বরকতে) তাদেরকে জয়ী করা হবে। এরপর লোকদের উপর এমন এক সময় আসবে, যখন তাদের বিরাট বাহিনী জিহাদে অংশগ্রহণ করবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কি কেউ আছেন, যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণের সাহচার্য লাভকারী কোন বক্তির (তাবেয়ীর) সাহচার্য লাভ করেছেন? (অর্থাৎ তাবে-তাবেয়ী) বলা হবে আছেন। তখন তাদেরকে (ঐ তাবে-তাবেয়ীর বরকতে) জয়ী করা হবে।

হাদিস নং - ৩৩৮৮
ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ (রহঃ) ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার (সাহাবীগণের) যুগ। এরপর তৎ-সংলগ্ন যুগ (তাবেয়ীদের যুগ)। এরপর তৎ-সংলগ্ন যুগ (তাবে-তাবেয়ীদের যুগ)। ইমরান (রাঃ) বলেন, তিনি তাঁর যুগের পর দু’যুগ অথবা তিনি যুগ বলেছেন তা আমার স্মরণ নেই। তারপর (তোমাদের যুগের পর) এমন লোকের আগমন ঘটবে যারা সাক্ষ্য প্রদানে আগ্রহী হবে অথচ তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করবে না। তারা মানত করবে কিন্তু পূরণ করবে না। পার্ঠিব ভোগ বিলাশের কারণে তাদের মাঝে চর্বিযুক্ত স্থূলদেহ প্রকাশ পাবে।

হাদিস নং - ৩৩৮৯
মুহাম্মদ ইবনু কাসীর আব্দুল্ললাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ)। এরপর তৎসংলগ্ন যুগ। তারপর তৎসংলগ্ন যুগ। তারপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ কেউ সাক্ষ্য প্রদানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য প্রদান করবে। (মিথ্যাকে প্রমাণিত করার জন্য সাক্ষ্য, হলফ ইত্যাদি নির্দ্বিধায় করতে থাকবে।)ইব্রাহীম (নাখয়ী;রাবী) বলেন, ছোট বেলায় আমাদের মুরুব্বীগণ আল্লাহর নামে কসম করে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য এবং ওয়াদা অঙ্গীকার করার কারণে আমাদেরকে মারধোর করতেন।

হাদিস নং - ৩৩৯০
আবদুল্লাহ ইবনু রাজা (রহঃ) বারা ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) আযিব (রাঃ) এর নিকট থেকে তের দিরহাম মূল্যের একটি হাওদা ক্রয় করলেন। আবূ বকর (রাঃ) আযিবকে বললেন, তোমার ছেলে বারাকে হাওদাটি আমার কাছে পৌঁছে দিতে বল। আযিব (রাঃ) বললেন, আমি বারাকে বলব না যতক্ষণ না আপনি আমাদেরকে (হিজরতের ঘটনা) সবিস্তার বর্ণনা করে শোনাবেন যে, আপনি ও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করছিলেন যখন আপনারা (হিজরতের উদ্দেশ্যে) মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন? আর মক্কার মুশরীকগণ আপনাদের পিছু ধাওয়া করেছিল। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমরা মক্কা থেকে বেরিয়ে সারারাত এবং পরের দিন দুপুর পর্যন্ত অবিরাম চললাম। যখন ঠিক দুপুর হয়ে গেল, এবং উত্তাপ তীব্রতর হল আমি চারিদিক চেয়ে দেখলাম কোথাও কোন ছায়া দেখা যায় কিনা, যেন আমরা সেখানে বিশ্রাম নিতে পারি। তখন একটি বৃহদাকার পাথর নযরে পড়ল। এই পাথরটির পাশে কিছু ছায়াও আছে। আমি সেখানে আসলাম এবং ঐ ছায়াবিশিষ্ট স্থানটি সমতল করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য বিছানা করে দিলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আপনি এখানে শুয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। আমি চতুর্দিকের অবস্থা পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম, আমাদের তালাশে কেউ আসছে কিনা? ঐ সময় দেখতে পেলাম, একজন মেষ রাখাল তাঁর ভেড়া ছাগল হাঁকিয়ে ঐ পাঁথরের দিকে আসছে। সেও আমাদের মত ছায়া তালাশ করছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে যুবক, তুমি কার রাখাল? সে একজন কুরাঈশের নাম বলল, আমি তাকে চিনতে পারলাম। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বকরীর পালে দুগ্ধবতী বকরী আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ আছে। আমি বললাম। তুমি কি আমাদেরকে দুধ দোহন করে দিবে? সে বলল, হ্যাঁ দিব। আমি তাকে তা দিতে বললাম। তৎক্ষণাৎ সে বকরীর পালথেকে একটি বকরী ধরে নিয়ে এলো এবং পেছনের পা দুটি বেঁধে নিল। আমি তাকে বললাম, বকরীর স্তন দুটি ঝেড়ে মুছে ধুলাবালি থেকে পরিষ্কার করে নাও এবং তোমার হাত দুটি পরিষ্কার কর। তিনি এক হাত অন্য হাতের উপর মেরে (পরিষ্কারের পদ্ধতিটিও) দেখালেন। এরপর সে আমাদিগকে পাত্রভরে দুধ এনে দিল। আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য এমন একটি চামড়ার পাত্র সাথে রেখে ছিলাম যার মুখ কাপড় দ্বারা বাঁধা ছিল। আমি দুধের মধ্যে সামান্য পানি মিশিয়ে দিলাম যেন দুধের নিম্নভাগ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এরপর আমি দুধ নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাযির হয়ে দেখলাম তিনি জেগেছেন। আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি দুধ পান করন। তিনি দুধ পান করলেন; আমি খুশি হলাম। তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাদের রাওয়ানা হয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমরা রাওয়ানা হয়ে পড়লাম। মক্কাবাসী মুশরীকরা আমাদের অনুসন্ধানে ছুটাছুট করছে। কিন্তু সুরাকা ইবনু মালিক জশাম ব্যতীত আমাদের সন্ধান তাদের অন্য কেউ পায়নি। সে ঘোড়ায় চড়ে আসছিল। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! অনুসন্ধানকারী আমাদের নিকটবর্তী। তিনি বললেন, চিন্তা করনা, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের সাথে রয়েছেন।

হাদিস নং - ৩৩৯১
মুহাম্মদ ইবনু সিনান (রহঃ) আবূ বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন (সাওর) গুহায় আত্মগোপন করেছিলাম। তখন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললাম, যদি কাফেরগণ তাদের পায়ের নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করে তবে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবূ বকর, ঐ দুই ব্যাক্তি সম্পর্কে তোমার কি ধারণা স্বয়ং আল্লাহ যাঁদের তৃতীয় জন।

হাদিস নং - ৩৩৯২
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবীদের উদ্দেশ্যে খুৎবা প্রদানকালে বললেন, আল্লাহ তাঁর এক প্রিয় বান্দাকে পার্থিব ভোগ বিলাস এবং তাঁর নিকট রক্ষিত নিয়ামতসমুহ এ দু’য়ের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করার ইখতিয়ার দান করেছেন এবং ঐ বান্দা আল্লাহর নিকট রক্ষিত নিয়ামতসমুহ গ্রহণ করেছে। রাবী বলেন, তখন আবূ বকর (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন। তাঁর কান্না দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বান্দার খবর দিচ্ছেন যাকে এভাবে ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে (তাতে কান্নার কী কারণ থাকতে পারে?) কিন্তু পরে আমরা বুঝতে পারলাম, ঐ বান্দা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এবং আবূ বকর (রাঃ) আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যাক্তি ছিলেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যাক্তি তার ধন সম্পদ দিয়ে, তার সাহচর্য দিয়ে আমার উপর সর্বাধিক ইহসান করেছে সে ব্যাক্তি হল আবূ বকর (রাঃ)। আমি যদি আমার রব ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরুপে গ্রহণ করতাম, তবে অবশ্যই আবূ বকরকে করতাম। তবে তাঁর সাথে আমার দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব, আন্তরিক মহব্বত রয়েছে। মসজিদের দিকে আবূ বকরের দরজা ব্যতীত অন্য কোন দরজা খোলা রাখা যাবে না।

হাদিস নং - ৩৩৯৩
discrip

হাদিস নং - ৩৩৯৪
মুসলিম ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি আমার উম্মতের কাউকে যদি অন্তরঙ্গ বন্ধুরুপে গ্রহণ করতাম, তবে আবূ বকরকেই গ্রহণ করতাম। তবে তিনি আমার (দ্বীনি) ভাই ও সাহাবী।

হাদিস নং - ৩৩৯৫
মু’আল্লা ইবনু আসা’দ ও মূসা ইবনু সাঈদ (রহঃ) আইয়ুব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরুপে গ্রহণ করলে তাকেই (আবূ বকরকেই) অন্তরঙ্গ বন্ধুরুপে গ্রহণ করতাম। কিন্তু ইসলামী ভ্রাতৃত্বই সর্বোত্তম। কুতায়বা (রহঃ) আইয়ুব (রহঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন।

হাদিস নং - ৩৩৯৬
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ মুলায়কা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুফাবাসীগণ দাদার (মিরাস) সম্পর্কে জানতে চেয়ে ইবনু যুবায়রের নিকট পত্র পাঠালেন, তিনি বললেন, ঐ মহান ব্যাক্তি যার সম্পর্কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ উম্মতের কাউকে যদি অন্তরঙ্গ বন্ধুরুপে গ্রহণ করতাম, তবে তাকেই করতাম, (অর্থাৎ আবূ বকর (রাঃ)) তিনি দাদাকে মিরাসের ক্ষেত্রে পিতার সমপর্যায়ভুক্ত করেছেন।

No comments:

Post a Comment

Most Recent Post :-

🌹🌻কেমন_হবে_জান্নাত🌺🌻