Monday, May 27, 2019

অধ্যায় - ৫১ - মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) - ৩ ( হাদিস নং - ৩৮৪০-৩৯৩৩ = মোট ৯৩ টি হাদিস )

বুখারী শরীফ সব খণ্ড


بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

অধ্যায় - ৫১ - মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) - ৩
( হাদিস নং - ৩৮৪০-৩৯৩৩ = মোট ৯৩ টি হাদিস )


হাদিস নং - ৩৮৪০
বিশর ইবনু খালিদ (রহঃ) মাসরুক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশা (রাঃ) এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তাঁর কাছে হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ) তাঁকে তাঁর নিজের রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিলেন। তিনি আয়িশা (রাঃ)-এর প্রশংসা করে বলেছেন, “তিনি সতী, ব্যাক্তিত্বসম্পন্না ও জ্ঞানবতী, তাঁর প্রতি কোনো সন্দেহই আরোপ করা যায় না। তিনি অভুক্ত থাকেন, তবুও অনুপস্থিত লোকের গোশত খান না বা গীবত করেন না। এ কথা শুনে আয়িশা (রাঃ) বললেন, কিন্তু আপনি তো এরুপ নন। মাসরুক (রহঃ) বলেছেন যে, আমি আয়িশা (রাঃ) কে বললাম যে, আপনি কেন তাকে আপনার কাছে আসতে অনুমতি দেন? অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার জন্য আছে কঠিন শাস্তি”। আয়িশা (রাঃ) বললেন, অন্ধত্ব থেকে কঠিন শাস্তি আর কি হতে পারে? তিনি তাকে আরো বলেন যে, হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পক্ষ হয়ে কাফেরদের সাথে মুকাবিলা করতেন অথবা কাফেরদের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক কবিতা রচনা করতেন।

হাদিস নং - ৩৮৪১
খালিদ ইবনু মাখলাদ (রহঃ) যায়িদ ইবনু খালি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার যুদ্ধের বছর আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে বের হলাম। এক রাতে খুব বৃষ্টি হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। এরপরে আমাদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা জানো কি তোমাদের রব কি বলেছেন? আমরা বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ই অধিক জানেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন (এ বৃষ্টির কারণে) আমার কতিপয় বান্দা আমার প্রতি ঈমান এনে মু’মিন হয়েছে, আবার কেউ কেউ আমাকে অমান্য করে কাফের হয়েছে। যারা বলেছে, আল্লাহর রাহমাত, আল্লাহর করুণা এবং আল্লাহর রিযিক প্রদানের পূর্বাভাস হিসাবে আমাদের প্রতি বৃষ্টি হয়েছে, তারা আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী মু’মিন এবং নক্ষত্রের প্রভাব অস্বীকারকারী। আর যারা বলেছে যে, অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে, তারা তারকার প্রতি ঈমান আনয়নকারী এবং আমাকে অস্বীকারকারী কাফের।

হাদিস নং - ৩৮৪২
হুদবা ইবনু খালিদ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি উমরা পালন করেছেন। তিনি হাজ্জের (হজ্জ) সাথে যে উমরাটি পালন করেছিলেন সেটি ব্যতীত সবকটই যিলকাদাহ্‌ মাসে পালন করেছেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে যে উমরাটি পালন করেছিলেন, সেটি ছিল যিলকাদাহ মাসে এবং হুনায়নের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যে জিঈরানা নামক স্থানে বন্টন করেছিলেন, সেখান থেকে যে উমরাটি করা হয়েছিল তাও ছিল যিলকাদাহ মাসে, আর তিনি হাজ্জের (হজ্জ) সাথে একটি উমরা পালন করেন।

হাদিস নং - ৩৮৪৩
সাঈদ ইবনু রাবী (রহঃ) আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার যুদ্ধের বছর আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে রওয়ানা করেছিলাম। এ সময় তাঁর সাহাবীগণ ইহরাম বেঁধেছিলেন কিন্তু আমি ইহ্‌রাম বাঁধিনি।

হাদিস নং - ৩৮৪৪
উবায়দুল্লাহ ইবনু মূসা (রহঃ) বারআ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়কে তোমরা মৌল বিজয় মনে করেছ। অথচ মক্কা বিজয়ও একটি বিজয়। কিন্তু হুদায়বিয়ার দিনে অনুষ্ঠিত বায়আতে রিদওয়ানকে আমরা মৌল বিজয় বলে মনে করি। সে সময় আমরা চৌদ্দ’শ সাহাবী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে ছিলাম। হুদায়বিয়া একটি কূপ। আমরা তা’ থেকে পানি উঠাতে উঠাতে তার মধ্যে এক বিন্দুও অবশিষ্ট রাখিনি। আর এ সংবাদ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে পৌঁছালে তিনি এসে সে কূপের পাড়ে বসলেন। এরপর এক পাত্র পানি আনিয়ে উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন এবং কুল্লি করলেন। পরিশেষে দোয়া করে অবশিষ্ট পানি কূপের মধ্যে ফেলে দিলেন। আমরা অল্প কিছুক্ষণ পর্যন্ত কূপের পানি উঠানো বন্ধ রাখলাম। এরপর আমরা আমাদের নিজেদের ও আরোহী পশুর জন্য প্রচুর পানি কূপ থকে বের করলাম।

হাদিস নং - ৩৮৪৫
ফাজল ইবনু ইয়াকূব (রহঃ) আবূ ইসহাক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে বারা ইবনু আযিব (রাঃ) সংবাদ দিয়েছেন যে, হুদায়বিয়ার যুদ্ধের দিন তাঁরা চৌদ্দশ কিংবা তার চেয়ে অধিক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে ছিলেন। তখন তারা একটি কূপের পার্শ্বে অবতরণ করেন এবং তা থেকে পানি উত্তোলন করতে থাকেন। (এতে সব পানি নিঃশেষ হয়ে যায়) তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর কাছে এসে এ সংবাদ জানালেন। তখন তিনি কূপটির কাছে এসে এর পাড়ে বসলেন। এরপর বললেন, আমার কাছে এই কূপের এক বালতি পানি নিয়ে আস। তখন তা নিয়ে দেয়া হল। তিনি এতে থুথু ফেললেন এবং দোয়া করলেন। এরপর তিনি বললেন, এ থেকে কিছুক্ষণের জন্য তোমরা পানি উঠানো বন্ধ রাখো। এরপর সকলেই নিজেদের ও আরোহী জীবসমূহের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি সংগ্রহ করলেন এবং পরে চলে গেলেন।

হাদিস নং - ৩৮৪৬
ইউসুফ ইবনু ঈসা (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার দিন লোকেরা পিপাসার্ত হয়ে পড়লেন। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট একটি চর্মপাত্র ভর্তি পানি ছিল মাত্র। তিনি তা দিয়ে উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন। তখন লোকেরা তাঁর প্রতি এগিয়ে আসলে তিনি তাদের কে বললেন, কি হয়েছে তোমাদের? তারা বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার চর্মপাত্রের পানি ব্যতীত আমাদের কাছে এমন কোনো পানি নেই যার দ্বারা আমরা উযূ (ওজু/অজু/অযু) করব এবং যা আমরা পান করব। বর্ণনাকারী জাবির (রাঃ) বলেন, এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মুবারাক হাতখানা ঐ চর্মপাত্রে রাখলেন। অমনি তার আঙ্গুলগুলোর মধ্যস্থল থেকে ঝরণাধারার মত পানি উথলিয়ে উঠতে লাগলো। জাবির (রাঃ) বলেন, আমরা সে পানি পানি করলাম এবং তা দিয়ে উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলাম। [সালিম (রাঃ) বলেন] আমি জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা সেদিন কতজন লোক ছিলেন? তিনি বললেন, আমাদের সংখ্যা এক লাখ হলেও এ পানই আমাদের জন্য যথেষ্ট হত। আমরা ছিলাম তখন পনেরশ লোক মাত্র। (১) ১) হুদায়বিয়ার যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে অংশগ্রহণকারী সাহাবাদের সংখ্যা কোন হাদীসে পনেরশ আবার কোনো হাদীসে তেরশ’র কথা উল্লেখ আছে। আসলে সংখ্যা কত এ প্রশ্নের জবাবে আল্লামা কিরমানী (রহঃ) বলেছেন, যারা বৃদ্ধ, যুবক ও কিশোর সকলকে গণনা করেছেন তাঁরা বলেছেন পনেরশ, আর যারা বৃদ্ধ ও যুবকদের গণনা করেনি তারা বলেছেন তেরশ। মূলত এ কথার মধ্যে কোন সংঘাত নেই। এর জবাবে আল্লামা নববী (রহঃ) বলেছেন, সাহাবাদের সংখ্যা চৌদ্দশ’র কিছু বেশি ছিল। কেউ ভগ্নাংশ সহ পনেরশ উল্লেখ করেছেন। আমার কেউ ভগ্নাংশ বাদ দিয়ে চৌদ্দশ বর্ণনা করেছেন। আর যারা তেরশ উল্লেখ করেছেন, মূলত তাদের সংখ্যা জানাছিল না।

হাদিস নং - ৩৮৪৭
সালত ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাঈদ ইবনু মূসা য়্যিব (রাঃ)-কে বললাম, আমি শুনতে পেয়েছি যে, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলতেন, তাঁরা (হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাদের সংখ্যা চৌদ্দশ ছিল। সাঈদ (রাঃ) আমাকে বললেন, জাবির (রাঃ) আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, হুদায়বিয়ার যুদ্ধে যারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন, তাদের সংখ্যা ছিল পনেরশ। আবূ দাউদ কুরবা (রহঃ)-এর মাধ্যমে কাতাদা (রহঃ) থেকে অনুরুপ বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ)- ও অনুরুপ বর্ণনা করেছেন। আবূ দাউদ (রহঃ) (অন্য সনদে) শু’বা (রহঃ) থেকেও অনুরুপ বর্ণনা করেছেন।

হাদিস নং - ৩৮৪৮
আলী (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার যুদ্ধের দিন আমাদের কে বলেছেন, পৃথিবীবাসিদের মধ্যে তোমরাই সর্বোত্তম। সেদিন আমরা ছিলাম চৌদ্দশ। আজ আমি যদি দেখতাম, তাহলে আমি তোমাদেরকে সে বৃক্ষ-স্থানটি দেখিয়ে দিতাম। আমাশ (রহঃ) হাদীসটি সালিম (রাঃ)-এর মাধ্যমে জাবির (রাঃ) থেকে সুফিয়ান (রহঃ)-এর অনুরুপ বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ হুদায়বিয়ার সন্ধির দিন সাহাবীদের সংখ্যা ছিল চৌদ্দশ। উবায়দুল্লাহ ইবনু মুআয (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আউফা (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, গাছের নিচে বায়আত গ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল তেরশ। সৈন্যদের মধ্যে আসলাম গোত্রের সাহাবীগণের সংখ্যা ছিল মুহাজিরগনের মোট সংখ্যার এক-অষ্টমাংশ।

হাদিস নং - ৩৮৪৯
ইবরাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) কায়েস (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিন বৃক্ষের নিচে বায়আত গ্রহণকারী সাহাবী মিরদাস আসলামীকে বলতে শুনেছেন যে, পুণ্যবাদ লোকদেরকে একের পর এক উঠিয়ে নেওয়া হোবে। এরপর অবশিষ্ট থাকবে খেজুর ও যবের ছালের মত কতিপয় নিম্নস্তরের লোক, যাদের কোনো পরওয়া আল্লাহ করবেন না।

হাদিস নং - ৩৮৫০
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) মারওয়ান এবং মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ) বর্ণিত। তাঁরা উভয়েই বলেছেন যে, হুদায়বিয়ার বছর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাজারের অধিক সাহাবী সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করলেন। যুল-হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি কুরবানীর পশুর গলায় কিলাদা বাঁধালেন, (কুরবানীর পশুর)কুজ কাটলেন এবং সেখান থেকে ইহরাম বাঁধলেন। (বর্ণনাকারী) বলেন, এ হাদীস সুফিয়ান থেকে কতবার শুনেছি তার সংখ্যা আমি নির্ণয় করতে পারছি না। পরিশেষে তাঁকে বলতে শুনেছি, যুহরী থেকে কুরবানীর পশুর গলায় কিলাদা বাঁধা এবং ইশআর করার কথা আমার স্মরণ নেই। রাবী আলী ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, সুফিয়ান এ কথা বলে কি বোঝাতে চেয়েছেন তা আমি জানিনা। তিনি কি এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, যুহরী থেকে ইশআর ও কিলাদা কথা তাঁর স্মরণ নেই, না পুরা হাদীসটি স্মরণ না থাকার কথা বলতে চেয়েছেন?

হাদিস নং - ৩৮৫১
হাসান ইবনু খালাফ (রহঃ) কাব ইবনু উজরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এমতাবস্থায় দেখলেন যে, উকুন (তার মাথা থেকে) মুখমন্ডলে ঝরে পড়ছে। তখন তিনি বললেন, কীটগুলো কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ায় অবস্থানকালে তাঁর মাথা মুন্ডিয়ে ফেলার জন্য নির্দেশ দেন। তখন সাহাবীগণ মক্কা প্রবেশ করার জন্য খুবই উদ্গ্রীব হয়ে উঠছিলেন। হুদায়বিয়াতেই তাদেরকে হালাল হয়ে যেতে হবে এ কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের কাছে বর্ণনা করেননি। তাই আল্লাহ ফিদইয়ার হুকুম নাযিল করলেন। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ছয়জন মিসকিনকে এক ফারাক (প্রায় বার সের) খাদ্য খাওয়ানোর অথবা একটি বকরী কুরবানী করার অথবা তিনদিন রোযা পালন করার নির্দেশ দিলেন।

হাদিস নং - ৩৮৫২
ইসমাইল ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আসলাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, একদা আমি উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে বাজারে বের হলাম। সেখানে একজন যুবতী মহিলা তাঁর সাথে সাক্ষাত করে বলল, হে আমীরুল মু’মিনীন, আমার স্বামী ছোট একটা বাচ্ছা রেখে ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহর কসম, তাদের আহারের জন্য পাকানোর মত কোন বকরীর খুরাও নেই এবং নেই কোন ফসলের ব্যবস্থা ও দুধের উঠ, বকরী। পোকা তাদেরকে খেয়ে ফেলবে বলে আমার আশঙ্কা হচ্ছে অথচ আমি হলাম খুফাফ ইবনু আয়মা গিফারীর কন্যা। আমার পিতা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এ কথা শুনে উমর (রাঃ) তাঁকে অতিক্রম না করে পার্শ্বে দাঁড়ালেন। এরপর বললেন, তোমার গোত্রকে ধন্যবাদ। তারা তো আমার খুবই নিকটের মানুষ। এরপর তিনি বাড়িতে এসে আস্তাবলে বাঁধা উটের থেকে একটি মোটা তাজা উট এনে দুই বস্তা খাদ্য এবং এর মধ্যে কিছু নগদ অর্থ ও বস্ত্র রেখে এগুলো উক্ত উটের পৃষ্ঠে উঠিয়ে দিয়ে মহিলার হাতে এর লাগাম দিয়ে বললেন, তুমি এটি টেনে নিয়ে যাও। এগুলো শেষ হওয়ার পূর্বেই হয়তো আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। তখন একব্যাক্তি বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন, আপনি তাকে খুব বেশি দিলেন। উমর (রাঃ) বললেন, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। ১ আল্লাহর কসম, আমি দেখেছি এ মহিলার আব্বা ও ভাই দীর্ঘদিন পর্যন্ত একটি দূর্গ অবরোধ করে রেখেছিলেন এবং পরে তা জয় ও করেছিলেন। এরপর ওই দুর্গ থেকে অর্জিত তাঁদের অংশ থেকে আমরাও যুদ্ধলব্দ সম্পদের দাবি করি (এবং কিছু অংশ আমরা নিজেরা গ্রহণ করি এবং কিছু অংশ তাদেরকে দেই। )

হাদিস নং - ৩৮৫৩
মুহাম্মদ ইবনু রাফি (রহঃ) মূসা য়্যিব ইবনু হুযন) (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, (যে বৃক্ষের নিচে বায়াত গ্রহণ করা হয়েছিল) আমি সে বৃক্ষটি দেখেছিলাম। কিন্তু এরপর যখন সেখানে আসলাম তখন আর তা চিনতে পারলাম না। মাহমুদ (রহঃ) বলেন, (মূসা য়্যিব ইবনু হুযন বলেছেন) পরে তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। ১ এটি একটি প্রবাদ বাক্য। এর বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়।

হাদিস নং - ৩৮৫৪
মাহমুদ (রহঃ) তারিক ইবনু আব্দুর রহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমি হাজ্জ (হজ্জ) করতে যাওয়ার পথে সালাত (নামায/নামাজ)রত এক কাওমের নিকট দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করার সময় তাদেরকে বললাম, এ জায়গাটি কিরুপ সালাত (নামায/নামাজ)-এর স্থান? তাঁরা বললেন, এটা সেই বৃক্ষ যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাহাবীদের থেকে) বায়াতে রিদওয়ান গ্রহণ করেছিলেন। এর পর আমি সাঈদ ইবনু মূসা য়্যিব (রহঃ) এর কাছে গেলাম এবং এ ব্যাপারে এ ব্যাপারে তাঁকে সংবাদ দিলাম। তখন সাঈদ ইবনু মূসা য়্যিব) (রহঃ) বললেন, আমার পিতা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, বৃক্ষটির নিচে যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। মূসা য়্যিব (রাঃ) বলেছেন, পরবর্তী বছর আমরা যখন সেখানে গেলাম তখন আমরা আর ওই বৃক্ষটিকে নির্দিষ্ট করতে পারলাম না। আমাদেরকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সাঈদ (রহঃ) বললেন, মুহাম্মদ এর সাহাবীগণ (এখানে উপস্থিত হয়ে বায়াত গ্রহণ করা সত্ত্বেও) তা চিনতে পারলেন না আর তোমরা তা চিনে ফেলেছ? তাহলে তোমরা কি তাদের চেয়েও অধিক বিজ্ঞ?

হাদিস নং - ৩৮৫৫
মূসা (রহঃ) মূসা য়্যিব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, বৃক্ষের নিচে যারা বায়াত গ্রহণ করেছিলেন তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি বলেন, পরবর্তী বছর আমরা আবার সে গাছের স্থানে উপস্থিত হলে আমরা গাছটি চিনতে পারলাম না। গাছটি আমাদের কাছে সন্দেহপূর্ণ হয়ে গেল।

হাদিস নং - ৩৮৫৬
কাবীস (রহঃ) তারিক (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, সাঈদ ইবনু মূসা য়্যিব (রাঃ) এর কাছে সে গাছটির কথা উল্লেখ করা হলে তিনি হেসে বললেন, আমার পিতা আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি বৃক্ষের নিচে বায়াতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

হাদিস নং - ৩৮৫৭
আদম ইবনু আবূ ইয়াস (রহঃ) আমর ইবনু মুররা (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমি বৃক্ষের নিচে বায়াতকারী সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আউফাকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বর্ণনা করেছেন, কোন কওম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে সা’দকার অর্থ নিয়ে আসলে তিনি তাঁদের জন্য দোয়া করে বলতেন, “হে আল্লাহ আপনি তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন”। এ সময় আমার পিতা তাঁর কাছে সা’দকার অর্থ নিয়ে আসলে তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! আপনি আবূ আউফার বংশধরদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন”।

হাদিস নং - ৩৮৫৮
ইসমাইল (রহঃ) আব্বাদ ইবনু তামীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, হাররার ঘটনার দিন যখন লোকজন আবদুল্লাহ ইবনু হানযালা (রাঃ) এর হাতে বায়াত গ্রহণ করছিলেন, তখন ইবনু যায়দ (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ইবনু হানযালা (রাঃ) লোকদেরকে কিসের উপর বায়াত গ্রহণ করছেন? তখন তাঁকে বলা হল, মৃত্যুর উপর বায়াত গ্রহণ করেছেন। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে এ ব্যাপারে আমি আর কারো হাতে বায়াত গ্রহণ করব না। তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

হাদিস নং - ৩৮৫৯
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ালা মুহারিবী (রহঃ) ইয়াস ইবনু সালামা ইবনু আকওয়া (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বৃক্ষের নিচে অনুষ্ঠিত বায়াতে অংশগ্রহণকারী আমার পিতা আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে জুম্মার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে যখন বাড়ি ফিরতাম তখনও প্রাচীরের নিচে ছায়া পড়ত না, যার ছায়ায় বসে আরাম করা যায়।

হাদিস নং - ৩৮৬০
কুতাইবা ইবনু সাইড (রহঃ) ইয়াযীদ ইবনু আবূ উবাইদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সালামা ইবনু আকওয়া (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, হুদায়বিয়ার দিন আপনারা কিসের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বায়াত করেছিলেন। তিনি বললেন, মৃত্যুর উপর।

হাদিস নং - ৩৮৬১
আহমদ ইবনু আশকা (রহঃ) মূসা য়্যিব (রাঃ) বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি বারা ইবনু আযিব (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বললাম, আপনার জন্য সুসংবাদ, আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচর্য লাভ করেছেন এবং বৃক্ষের নিচে তাঁর হাতে বায়াতও করেছেন। তখন তিনি বললেন, ভাতিজা, তুমি তো জানো না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর আমরা কি করেছি।

হাদিস নং - ৩৮৬২
ইসহাক (রহঃ) আবূ কিলাবা (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু দাহহাক (রাঃ) তাঁকে জানিয়েছেন, তিনি গাছের নিচে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বায়াত করেছেন।

হাদিস নং - ৩৮৬৩
আহমাদ ইবনু ইসিহাক (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, “ইন্না ফাতাহনা লাকা ফাতহাম মুবিনা” নিশ্চয়ই আমি আপনাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়”। তিনি বলেনঃ এ আয়াতটিতে “ফাতহাম মুবিনা” (সুস্পষ্ট বিজয়)(১) বলে হুদায়বিয়ার সন্ধিকেই বোঝানো হয়েছে। (আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ বললেন, (আপনার জন্য তো) এটা খুশী ও আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের জন্য কিছু আছে কি? তখন আল্লাহ তা’লা নাযিল করলেন, ‘লিউদখিলাল মু’মিনীনা ওয়াল মু’মিনাতি’ এটা এ জন্য যে, তিনি মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীগণকে দাখিল করবেন জান্নাতে। শু’বা (রাঃ) বলেন, এরপর আমি কুফায় পৌছালাম এবং কাতাদা থেকে বর্ণিত হাদিসটির সবটুকু বর্ণনা করলাম, এরপর কুফা থেকে ফিরে সে কাতাদাকে সবকিছু জানালে তিনি বললেন, ‘ইন্না ফাতাহনা লাকা’ (এর অর্থ হুদায়বিয়ায় অনুষ্ঠিত বায়াতে রিদওয়ান) আয়াতখানা আনাস থেকে বর্ণিত। আর “হানি-আম মারি’আ” কথাটি ইকরামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ১ ৬ হিজরী মোতাবেক ৬২৮ খ্রীস্টাব্দে ১৪০০ সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কাভিমুখে রাওয়ানা হন। মক্কার মুশরিকরা তাঁদেরকে উমরা করতে বাঁধা দিবে, এ আশঙ্কায় তাঁরা মক্কার তিন মাইল উত্তরে হুদায়বিয়ার শিবির স্থাপন করেন। এরপর আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের সাথে সন্ধি হয়। সন্ধির শর্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে মুসলিমদের জন্য অবমাননাকর মনে হলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাস্তির খাতিরে তা মেনে নিয়েছিলেন। সন্ধির শর্তানুযায়ী উমরা না করেই তাঁরা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। পথিমধ্যে সুরাটি অবতীর্ণ হয়। অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এ সন্ধিকে আল্লাহ স্পষ্ট বিজয় বলে ঘোষণা করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, কেবল জাহিরী বিজয়ই প্রকৃত বিজয় নয়। বরং জাহিরের বিপরীত অবস্থাতেও বিজয় নিহিত থাকে কখনো।

হাদিস নং - ৩৮৬৪
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) মাজযা ইবনু যাহির আসলামী (রহঃ) এর পিতা “যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে হুদায়বিয়ার গাছের নিচে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন” তাঁর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি হাঁড়িতে গাধার গোশত রান্না করছিলাম, এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে তাঁর মুনাদী (ঘোষক আবূ তালহা) ঘোষণা দিয়ে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। (অন্য এক সনদে) মাজযা (রহঃ) অপর এক ব্যাক্তি থেকে অর্থাৎ বৃক্ষের নিচে অনুষ্ঠিত বায়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবী উহবান আউস (রাঃ) থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাঁর [উহবান ইবনু আউস (রাঃ)] এর হাঁটুতে আঘাত লেগেছিল। তাই তিনি সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করার সময় হাঁটুর নিচে বালিশ রাখতেন।

হাদিস নং - ৩৮৬৫
মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) গাছের নিচে অনুষ্ঠিত বায়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবী সুওয়াইদ ইবনু নুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের জন্য ছাতু আনা হতো। তাঁরা পানিতে গুলিয়ে তা খেয়ে নিতেন। মুআয (রহঃ) শুবা (রহঃ) থেকে ইবনু আবূ আদী (রহঃ) বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

হাদিস নং - ৩৮৬৬
মুহাম্মদ বিন হাতিম ইবনু বাযী (রহঃ) আবূ জামরা (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, গাছের নিচে অনুষ্ঠিত বায়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী আয়েয ইবনু আমর (রাঃ) কে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বিতর সালাত (নামায/নামাজ) কি দ্বিতীয়বার আদায় করা যাবে? তিনি বললেন, রাতের প্রথম ভাগে একবার বিতর আদায় করে থাকলে দ্বিতীয়বার রাতের শেষে আর আদায় করবে না।

হাদিস নং - ৩৮৬৭
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আসলাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক সফরে রাত্রিকালে চলছিলেন। এ সফরে উমর (রাঃ) ও তাঁর সাথে চলছিলেন। এক সময় উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) তাঁকে কোন এক বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোন উত্তর করলেন না। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তবুও তিনি তাঁকে কোন জবাব দিলেন না। এরপর আবার তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, এবারও তার কোন উত্তর দিলেন না। তখন উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) নিজেকে লক্ষ করে মনে মনে বললেন, হে উমর! তোমাকে তোমার মা হারিয়ে ফেলুক। তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তিনবার পিড়াপীড়ি করলে। কিন্তু কোনবারই তিনি তোমাকে উত্তর দেননি। উমর (রাঃ) বললেন, এরপর আমি আমার উটকে তাড়া দিয়ে মুসলমানদের সামনে চলে যাই। কারন আমি আশঙ্কা করছিলাম যে, হয়ত আমার সম্পর্কে কোরআন শরীফের কোন আয়াত অবতীর্ণ হতে পারে। এ কথা বলে আমি বেশি দেরি করিনি এমতাবস্থায় শুনতে পেলাম এক ব্যাক্তি চিৎকার করে আমাকে ডাকতে শুরু করলেন। উমর (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, আমার সম্পর্কে হয়তো কুরআন নাযিল হয়েছে। এ মনে করে আমি ভীত হয়ে পড়লাম। এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে তাঁকে সালাম দিলাম। তখন তিনি বললেন, আজ রাতে আমার প্রতি এমন একটি সুরা নাযিল হয়েছে যা আমার কাছে সূর্য উদিত পৃথিবী থেকেও অধিক প্রিয়। তারপর তিনি “ইন্না ফাতাহনা লাকা ফাতহাম মুবিনা” তিলাওয়াত করেন।

হাদিস নং - ৩৮৬৮
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) মিসওয়ার ইবনু মাখরামা ও মারওয়ান ইবনু হাকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁরা একে অন্যের চেয়ে অধিক বর্ণনা করেছেন। তারা উভয়ে বলেন, হুদায়বিয়ার বছর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাজারের অধিক সাহাবী সঙ্গে নিয়ে বের হলেন। তাঁরা যুল হুলায়ফা পৌঁছে কুরবানীর পশুর গলায় কিলাদা বাঁধলেন, ইশ’আর করলেন। ১ সেখান থেকে উমরার জন্য ইহরাম বাঁধলেন এবং খুযাআ গোত্রের এক ব্যাক্তিকে গোয়েন্দা হিসেবে পাঠালেন। পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সেই দিকে রওয়ানা হলেন। যেতে যেতে গাদীরুল আশতাত নামক স্থানে পৌঁছার পর প্রেরিত গোয়েন্দা এসে তাঁকে বলল, কুরাইশরা বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে প্রস্তুত হয়ে আছে। তারা আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বিভিন্ন গোত্র থেকে এসে আশতাত নামক স্থানে জমায়েত হয়েছে। তারা আপনার বিরুদ্ধের লড়াই করবে এবং বায়তুল্লাহ জিয়ারতে বাঁধা দিবে ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। তখন তিনি বললেন, হে লোক সকল, তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও এবং বল, যারা আমাদেরকে বায়তুল্লাহর জিয়ারতে বাঁধা দেয়ার ইচ্ছা করছে, আমি কি তাদের পরিবারবর্গ এবং সন্তান-সন্ততিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ব? তারা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সংকল্প করে থাকলে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন, যিনি মুশরিকদের থেকে একজন গোয়েন্দাকে নিরাপদে ফিরিয়ে এনেছেন। আর যদি তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে তাহলে আমরা তাদের পরিবার এবং অর্থ-সম্পদ থেকে বিরত থাকব এবং তাদেরকে তাদের পরিবার ও অর্থ সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেব। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি তো বায়তুল্লাহর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন, কাউকে হত্যা করা এবং কারো সাথে লড়াই করার উদ্দেশ্যে তো এখানে আসেননি। তাই বায়তুল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন। যে আমাদেরকে তা থেকে বাঁধা দিবে আমরা তাঁর সাথে লড়াই করবো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ঠিক আছে) চলো আল্লাহর নামে। ১ কুরবানীর পশু জখম করতঃ প্রবাহিত রক্ত দ্বারা তা কুরবানীর পশু হিসেবে চিহ্নিত করাকে ইশ’আর বলা হয়।

হাদিস নং - ৩৮৬৯
ইসহাক (রহঃ) উরওয়া ইবনু যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি মারওয়ান ইবনু হাকাম এবং মিসওয়াক ইবনু মাখরামা (রাঃ) উভয়ের থেকে হুদায়বিয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উমরা আদায় করার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছেন। তাঁদের থেকে উরওয়া (রাঃ) আমার (মুহাম্মদ ইবনু মুসলিম ইবনু শিহাব) নিকট যা বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছে এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুহায়ল ইবনু আমরকে হুদায়বিয়ার দিন সন্ধিনামায় যা লিখিয়েছিলেন তার মধ্যে সুহায়ল ইবনু আমরের আরোপিত শর্তসমুহের মধ্যে একটি শর্ত এই ছিলঃ আমাদের থেকে যদি কেউ আপনার কাছে চলে আসে তবে সে আপনার দ্বীনে বিশ্বাসী হলেও তাকে আমাদের কাছে ফেরত দিয়ে দিতে হবে এবং তার ও আমাদের মধ্যে আপনি কোন বাঁধা সৃষ্টি করতে পারবেন না। এ শর্ত মেনে না নিলে সুহায়ল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সন্ধি করতেই অস্বীকৃতি প্রকাশ করে। এ শর্তটিকে মু’মিনগণ অপছন্দ করলেন এবং এতে তারা অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হলেন ও এর বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করলেন। কিন্তু যখন সুহায়ল এ শর্ত ব্যতীত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে চুক্তি সম্পাদনে অস্বীকৃতি জানাল তখন এ শর্তের উপরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সন্ধিপত্র লেখালেন এবং আবূ জানো্দাল ইবনু সুহায়ল (রাঃ) কে এ মুহুর্তেই তার পিতা সুহায়ল আমরের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। সন্ধির মেয়াদকালে পুরুষদের মধ্যে যারাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে চলে আসতেন, মুসলমান হলেও তিনি তাদেরকে ফিরিয়ে দিতেন। এ সময় কিছু সংখ্যক মুসলিম মহিলা হিজরত করে চলে আসেন। উম্মে কুলসুম বিনত উকবা আবূ মু’আইত (রাঃ) ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি হিজরতকারিণী একজন যুবতী মহিলা। তিনি হিজরত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে পৌঁছলে তাঁর পরিবারের লোকেরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে তাঁকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানালো। এসময় আল্লাহ পাক মু’মিন মহিলাদের সম্পর্কে যা নাযিল করার তা নাযিল করলেন। বর্ণনাকারী ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, আমাকে উরওয়া উবন যুবায়র (রাঃ) বলেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী হিজরতকারিণী মু’মিন মহিলাদেরকে পরীক্ষা করতেন। আয়াতটি হল এইঃ হে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! মু’মিন মহিলাগণ যখন আপনার নিকট আসে [শেষ পর্যন্ত (৬০ : ১২)]। (অন্য সনদে) ইবনু শিহাব (রহঃ) তাঁর চাচা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদের কাছে এ বিবরণও পৌঁছেছে যে, যখন আল্লাহ তা’লা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুশরিক স্বামীর তরফ থেকে হিজরতকারী মুসলমান স্ত্রীকে দেওয়া মুহরানা মুশরিক স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর আবূ বাসীর (রাঃ) এর ঘটনা সম্বলিত হাদীসও আমাদের নিকট পৌঁছেছে। এরপর তিনি আবূ বাসীর (রাঃ) এর ঘটনা সম্বলিত হাদিসটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন।

হাদিস নং - ৩৮৭০
কুতায়বা (রহঃ) নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, ফিতনার যমানায় (হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের মক্কা আক্রমনের সময়) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) উমরা পালনের নিয়তে রওয়ানা হয়ে বললেন, যদি আমাকে বায়তুল্লাহর যিয়ারতে বাঁধা প্রদান করা হয় তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আমরা যা করেছিলাম এ ক্ষেত্রেও আমরা তাই করবো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু হুদায়বিয়ার বছর উমরার ইহরাম বেঁধে যাত্রা করেছিলেন তাই তিনিও উমরার ইহরাম বেঁধে যাত্রা করলেন।

হাদিস নং - ৩৮৭১
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ফিতনার বছর তিনি (উমরার) ইহরাম বেঁধে বললেন, যদি আমার আর তার (যিয়ারতে বায়তুল্লাহর) মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় তাহলে কুরাইশ কাফিররা বায়তুল্লাহর যিয়ারতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেছিলেন আমিও ঠিক তাই করবো এবং তিনি তিলাওয়াত করলেন, “তোমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”।

হাদিস নং - ৩৮৭২
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আসমা ও মূসা ইবনু ইসমাইল (রহঃ) নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ (রাঃ) এর কোন ছেলে তাঁকে [আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে] লক্ষ করে বলেন, এ বছর আপনি মক্কা শরীফ যাওয়া স্থগিত রাখলেই উত্তম হত। কারণ আমি আশঙ্কা করছি যে, আপনি বায়তুল্লাহ শরীফ যেতে পারবেন না। তখন আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওয়ানা হয়েছিলাম। পথে কুরাইশ কাফেররা বায়তুল্লাহর যিয়ারতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কুরবানীর পশুগুলো যবেহ করে মাথা কামিয়ে ফেললেন। সাহাবীগণ চুল ছাঁটলেন। (এরপর তিনি বললেন) আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমার জন্য উমরা আদায় করা আমি ওয়াজিব করে নিয়েছি। যদি আমার ও বায়তুল্লাহর মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা না হয় তাহলে আমি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবো। আর যদি আমার ও বায়তুল্লাহর মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেছেন আমি তাই করবো। এরপর তিনি কিছুক্ষন পথ চলে বললেন, আমি হাজ্জ (হজ্জ) এবং উমরার বিষয়টি একই মনে করি। আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার হাজ্জ (হজ্জ)কেও উমরার সাথে আমার জন্য ওয়াজিব করে নিয়েছি। এরপর তিনি উভয়ের জন্য একই তওয়াফ এবং একই সায়ী করলেন এবং হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার ইহরাম খুলে ফেললেন।

হাদিস নং - ৩৮৭৩
শুজা ইবনু ওয়ালীদ (রহঃ) নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকজন বলে থাকে যে, ইবনু উমর (রাঃ) উমর (রাঃ) এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অথচ ব্যাপারটি এমন নয়। তবে (মূল ঘটনা ছিল এই যে) হুদায়বিয়ার দিন উমর (রাঃ) (তাঁর পুত্র) আবদুল্লাহ (রাঃ) কে এক আনসারী সাহাবার কাছে রাখা তাঁর ঘোড়াটি আনার জন্য পাঠিয়েছিলেন, যাতে তিনি এর উপর আরোহণ করে লড়াই করতে পারেন। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃক্ষের কাছে (লোকদের) বায়াত গ্রহণ করছিলেন। বিষয়টি উমর (রাঃ) জানতেন না। আবদুল্লাহ (রাঃ) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে পরে ঘোড়াটি আনার জন্য গেলেন এবং ঘোড়াটি নিয়ে উমর (রাঃ) এর কাছে আসলেন। এ সময় উমর (রাঃ) যুদ্ধের পোশাক পরিধান করছিলেন। তখন আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁকে জানালেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাছের নিচে বায়াত গ্রহণ করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন উমর (রাঃ) তাঁর {আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ)} এর সাথে গেলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বায়াত গ্রহণ করলেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই লোকেরা এ কথা বলাবলি করছিল যে, ইবনু উমর (রাঃ) উমর (রাঃ) এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। (অন্য সনদে) হিশাম ইবনু আম্মার (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে যে লোকজন ছিলেন তাঁরা সকলেই ছায়া লাভের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন বৃক্ষের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। একসময় তাঁরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ঘিরে দাঁড়ালে উমর (রাঃ) তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ (রাঃ) কে বললেন, হে আবদুল্লাহ! দেখতো মানুষের কি হয়েছে? তাঁরা এভাবে ভিড় করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কেন? ইবনু উমর (রাঃ) দেখতে পেলেন যে, তাঁরা বায়াত গ্রহণ করছেন। তাই তিনিও বায়াত গ্রহণ করলেন। এরপর উমর (রাঃ) এর কাছে ফিরে গিয়ে বললেন। তিনিও রাওয়ানা করে এসে বায়াত গ্রহণ করলেন।

হাদিস নং - ৩৮৭৪
ইবনু নুমাইর (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন উমরাতুল কাযা আদায় করেন; তখন আমরাও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তাওয়াফ করলে আমরাও তাঁর সঙ্গে তাওয়াফ করলাম। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলে আমরাও তাঁর সঙ্গে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলাম। তিনি সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করলেন। মক্কাবাসীদের কেউ যাতে কোন কিছুর দ্বারা তাঁকে আঘাত করতে না পারে সেজন্য সর্বদা আমরা তাঁকে আড়াল করে রাখতাম।

হাদিস নং - ৩৮৭৫
হাসান ইবনু ইসহাক (রহঃ) আবূ হাসীন (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ ওয়াইল (রহঃ) বলেছেন যে, সাহল ইবনু হুনাইফ (রাঃ) যখন সিফফীন যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন তখন যুদ্ধের খবরাখবর জানার জন্য আমরা তাঁর কাছে আসলে তিনি বললেন, নিজেদের মতামতকে সন্দেহযুক্ত মনে করবে। আবূ জানোদাল (রাঃ) এর ঘটনার দিন আমি আমাকে (আল্লাহর পথে) দেখতে পেয়েছিলাম। সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশ আমি উপেক্ষা করতে পারলে উপেক্ষা করতাম। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) ই সর্বাধিক জ্ঞাত। আর কোন দুঃসাধ্য কাজের জন্য আমরা যখন তরবারি হাতে নিয়েছি তখন তা আমাদের জন্য অত্যন্ত সহজবোধ্য হয়ে গিয়েছে। এ যুদ্ধের পূর্বে আমরা যত যুদ্ধ করেছি তার সবগুলোকে আমরা নিজেদের জন্য কল্যাণকর মনে করেছি। কিন্তু এ যুদ্ধের অবস্থা এই যে, আমরা একটি সমস্যা সামাল দিতে না দিতেই আরেকটি নতুন সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু কোন সমাধানের পথ আমাদের জানানেই।

হাদিস নং - ৩৮৭৬
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) কা’ব ইবনু উজরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসলেন। সে সময় আমার মাথার চুল থেকে উকুন ঝরে ঝরে আমার মুখমণ্ডলে পড়ছিল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মাথার এ উকুন তোমাকে কি কষ্ট দিচ্ছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, তুমি মাথা মুন্ডিয়ে ফেল। আর এ জন্য তিন দিন রোযা পালন কর অথবা ছয়জন মিসকীনকে খাবার খাওয়াও অথবা একটি পশু কুরবানী কর। আইয়ুব (রহঃ) বলেন, এ তিনটি থেকে কোনটির কথা আগে বলেছিলেন তা আমি জানিনা।

হাদিস নং - ৩৮৭৭
মুহাম্মদ ইবনু হিশাম আবূ আবদুল্লাহ (রহঃ) কা’ব ইবনু উজরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ায় অবস্থানকালে মুহরিম অবস্থায় আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলাম। মুশরিকরা আমাদেরকে আটকে রেখেছিল। কা’ব ইবনু উজরা (রাঃ) বলেন, আমার কান পর্যন্ত মাথায় বাবরী চুল ছিল। (মাথার চুল থেকে) উকুন গুলো আমার মুখমণ্ডলের উপর ঝরে ঝরে পড়ছিল। এ সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, তোমার মাথার এ উকুন গুলো তোমাকে কি কষ্ট দিচ্ছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। কা’ব ইবনু উজরা (রাঃ) বলেন, এরপর আয়াত নাযিল হল, ‘তোমাদের মধ্যে যদি কেউ পীড়িত হয় কিংবা মাথায় ক্লেশ থাকে তবে রোযা কিংবা সা’দকা অথবা কুরবানীর দ্বারা তাঁর ফিদইয়া আদায় করবে’। (২ : ১৯৬)

হাদিস নং - ৩৮৭৮
আবদুল আ’লা ইবনু হাম্মাদ (রহঃ) কাতাদা (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আনাস (রাঃ) তাদেরকে বলেছেন, উকল এবং উরায়না গোত্রের কতিপয় লোক মদিনাতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করল। এরপর তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলল, হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা দুগ্ধপানে অভ্যস্ত লোক, আমরা কৃষক নই। তারা মদিনার আবহাওয়ায় তাদের নিজেদের জন্য অনুকূল বলে মনে করল না। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে একজন রাখালসহ কতগুলো উট দিয়ে মদিনার বাইরে মাঠে চলে যেতে এবং ওইগুলোর দুধ ও পেশাব পান করার নির্দেশ দিলেন। তাঁরা যেতে যেতে হাররা নামক স্থানে পৌঁছে ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় কাফের হয়ে যায়। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছালে তিনি তাদের অনুসন্ধানে তাদের পিছনে লোক পাঠিয়ে দেন। (তাদের পাকড়াও করে আনা হলে) তিনি তাদের প্রতি কঠিন দণ্ডাদেশ প্রদান করলেন। সাহাবীগণ লৌহ শলাকা দিয়ে তাদের চক্ষু উৎপাটিত করে দিলেন এবং তাদের হাত কেটে দিলেন। এরপর হাররা এলাকার এক প্রান্তে তাদেরকে ফেলে রাখা হল। অবশেষে এ অবস্থায়ই তারা মারা গেল। কাতাদা (রাঃ) বলেন, এ ঘটনার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই লোকজনকে সা’দকা প্রদান করার জন্য উৎসাহিত করতেন এবং মুসলা থেকে বিরত রাখতেন। শুবা, আবান এবং হাম্মাদ (রহঃ) কাতাদা (রহঃ) থেকে উরায়না গোত্রের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনু আবূ কাসীর ও আইয়ুব (রহঃ) আবূ কিলাবা (রহঃ) এর মাধ্যমে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উকল গোত্রের কতিপয় লোক নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসেছিল।

হাদিস নং - ৩৮৭৯
মুহাম্মদ ইবনু আব্দুর রহীম (রহঃ) উমর ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, একদিন তিনি লোকদের কাছে কাসামাত সম্পর্কে পরামর্শ জানতে চেয়ে বললেন, তোমরা এ কাসামা সম্পর্কে কি বল? তাঁরা বললেন, এটা সত্য এবং হোক। আপনার পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খলীফাগণ সকলেই কাসামাতের ১ নির্দেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় আবূ কিলাবা (রহঃ) উমর ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) এর পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন আম্বাসা ইবনু ইবনু সাঈদ (রহঃ) বললেন, উরায়না গোত্র সম্পর্কে আনাস (রাঃ) এর হাদীসটি কোথায় এবং কে জানো? তখন আবূ কিলাবা (রহঃ) বললেন, হাদিসটি আমার জানা আছে। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) আমার কাছেই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। আবদুল আযীয ইবনু সুহায়ব (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে উকল গোত্রের কথা উল্লেখ করে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। ১ কোন জনপদে কোন নিহত ব্যাক্তির লাশ এবং হত্যার আলামত পাওয়া গেলে এবং হত্যাকারীকে নির্দিষ্ট করা না গেলে তখন ঐ জনপদের লোকদের মধ্য থেকে হত্যাকারীকে চিহ্নিত করার জন্য যে শপথ নেয়া হয়ে থাকে তাকে কাসামা বলা হয়।

হাদিস নং - ৩৮৮০
কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) সালমা ইবনু আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা) আমি ফজরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর আযানের পূর্বে (মদিনার বাইরে মাঠের দিকে) বের হলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুগ্ধবতী উটগুলোকে যি-কারাদ নামক স্থানে চরানো হতো। সালমা (রাঃ) বলেন, তখন আমার সাথে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এর গোলামের সাক্ষাৎ হল। সে বলল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুগ্ধবতী উটগুলো লুণ্ঠিত হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কে ওগুলো লুণ্ঠন করেছে? সে বলল, গাতফানের লোকজন। তিনি বলেন, তখন আমি ইয়া সাবাহা বলে তিনবার উচ্চস্বরে চিতকার দিলাম। আর মদিনার উভয় পর্বতের মধ্যবর্তী সকল অধিবাসীর কানে আমার এ চীৎকার শুনিয়ে দিলাম। তারপর দ্রুতপদে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদের (শ্ত্রুদের) কাছে পৌঁছে গেলাম। এ সময় তাঁরা উটগুলোকে পানি পান করাতে আরম্ভ করেছিল। আমি ছিলাম একজন দক্ষ তীরন্দাজ, তাই তখন তাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করছিলাম আর বলছিলাম, আমি হলাম আকওয়া এর পুত্র, আজকের দিনটি তোদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট। এভাবে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের কাছ থেকে উটগুলোকে কেড়ে নিলাম এবং সে সঙ্গে তাদের ত্রিশখানা চাঁদরও কেড়ে নিলাম। তিনি বলেন, এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য লোক সেখানে পৌঁছালে আমি বললাম, হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কাফেলাটি পিপাসার্ত ছিলো, আমি তাদেরকে পানি পান করতেও দেইনি। আপনি এখনই এদের পিছু ধাওয়া করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনুল আকওয়া! তুমি (তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে) সক্ষম হয়েছ, এখন একটু শান্ত হও। সালমা (রাঃ) বলেন, এরপর আমরা (মদিনার দিকে) ফিরে আসলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর উটনীর পেছনে বসালেন এবং এ অবস্থায় আমরা মদিনায় প্রবেশ করলাম।

হাদিস নং - ৩৮৮১
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) সুওয়াইদ ইবনু নু’মান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি (সুওয়াইদ ইবনু নু’মান) খায়বারের বছর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে খায়বার অভিযানে বেরিয়েছিলেন। [সুওয়াইদ ইবনু নু’মান (রাঃ) বলেন] যখন আমরা খায়বারের ঢালু এলাকার ‘সাহবা’ নামক স্থানে পৌঁছলাম, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। তারপর সাথে করে আনা খাবার পরিবেশন করতে হুকুম দিলেন। কিন্তু ছাতু ব্যতীত আর কিছুই দেওয়া সম্ভব হল না। তাই তিনি ছাতুগুলোকে গুলতে বললেন। ছাতুগুলোকে গুলানো হল। এরপর (তা থেকে) তিনিও খেলেন, আমরাও খেলাম। তারপর তিনি মাগরিবের সালাত (নামায/নামাজ)-এর জন্য উঠে পড়লেন এবং কুল্লি করলেন। আমরাও কুল্লি করলাম। তারপর তিনি নতুন ওযু না করেই সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন।

হাদিস নং - ৩৮৮২
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) সালমা ইবনু আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে খায়বার অভিযানে বের হলাম। আমরা রাতের বেলা পথ অতিক্রম করছিলাম, এমন সময় কাফেলার জনৈক ব্যাক্তি আমির (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলল, হে আমির! তোমার সমর সংগীত থেকে আমাদেরকে কিছু শোনাবে কি? আমির (রাঃ) ছিলেন একজন কবি। তখন তিনি সওয়ারী থেকে নেমে গেলেন এবং সংগীতের তালে তালে গোটা কাফেলা হাঁকিয়ে চললেন। সংগীতে তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনার তওফীক না হলে আমরা হেদায়েত লাভ করতাম না, সা’দকা দিতাম না আর সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতাম না। তাই আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। যতদিন আমরা বেঁচে থাকব ততদিন আপনার জন্য সমর্পিত-প্রাণ হয়ে থাকব। আর আমরা যখন শত্রুর মুকাবিলায় যাব তখন আপনি আমাদের কে দৃঢ়পদ রাখুন এবং আমাদের উপর ‘সাকিনা’ (শান্তি) বর্ষণ করুন। আমাদের যখন (কুফরের দিকে) সজোরে আওয়াজে ডাকা হয় আমরা তখন তা প্রত্যাখ্যান করি। আর এ কারণে তারা চীৎকার দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে লোক-লষ্কর জমা করে। (কবিতাগুলো শুনে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ সংগীতের গায়ক কে? তাঁরা বললেন, আমির ইবনুল আকওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন। কাফেলার একজন বললোঃ হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তার জন্য (শাহাদাত) নিশ্চিত হয়ে গেলো। (আহ) আমাদেরকে যদি তার কাছ থেকে আরো উপকার হাসিল করার সুযোগ দিতেন। এরপর আমরা এসে খায়বার পৌঁছলাম এবং তাদেরকে অবরোধ করলাম। অবশেষে এক পর্যায়ে আমাদেরকে কঠিন ক্ষুধার জ্বালাও বরণ করতে হল। কিন্তু পরেই মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করলেন। বিজয়ের দিন সন্ধ্যায় মুসলমানগণ (রান্নাবান্নার জন্য) অনেক আগুন জ্বালালেন। (তা দেখে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এ সব কিসের আগুন? তোমরা কি পাকাচ্ছ? তারা জানালেন , গোশত পাকাচ্ছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিসের গোশত? লোকজন উত্তর করলেন, গৃহপালিত গাধার গোশত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এগুলি ঢেলে দাও এবং ডেকচি গুলো ভেঙ্গে ফেল। একজন বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! গোশতগুলো ঢেলে দিয়ে যদি পাত্রগুলো ধুয়ে নেই তাতে যথেষ্ট হবে কি? তিনি বললেন, তাও করতে পারো। এরপর যখন সবাই যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন, আর আমির ইবনুল আকওয়া (রাঃ)-এর তরবারিখানা ছিলো খাটো, তা দিয়ে তিনি জনৈক ইহুদীর পায়ের গোছায় আঘাত করলে তরবারীর তীক্ষ্ম ভাগ ঘুরে গিয়ে তাঁর নিজের হাঁটুতে লেগে পড়ে। তিনি এ আঘাতের কারণে মারা যান। সালমা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) বলেনঃ তারপর সব লোক খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তন শুরু করলে এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বললেন, কি খবর? আমি বললামঃ আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক! লোকজন ধারণা করেছে যে, (স্বীয় হস্তের আঘাতে মারা যাওয়ার কারণে) আমির (রাঃ) এর আমল বাতিল হয়ে গিয়েছে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ কথা যে বলেছে সে ভুল বলেছে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুটি আঙ্গুল একত্রিত করে সেদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, বরং আমিরের রয়েছে দ্বিগুন সওয়াব। অবশ্যই সে একজন কর্মতৎপর ব্যাক্তি এবং আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ। তাঁর মত গুণসম্পন্ন আরবী খুব কম আছে।

হাদিস নং - ৩৮৮৩
আবদুল্লাহ‌ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত্রিতে খায়বারে পৌঁছলেন। আর তাঁর নিয়ম ছিল, তিনি যদি (কোনো অভিযানে) কোন গোত্রের এলাকায় রাত্রিকালে গিয়ে পৌঁছতেন, তা হলে ভোর না হওয়া পর্যন্ত তাদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতেন না (বরং অপেক্ষা করতেন)। ভোর হলে ইহুদীরা তাদের কৃষি সরঞ্জামাদি ও টুকরি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলো, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে যখন (সসৈন্য) দেখতে পেলো, তখন তারা (ভীত হয়ে) বলতে লাগলো, মুহাম্মদ, আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ তার সেনাদলসহ এসে পড়েছে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খায়বার ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা যখনই কোনো গোত্রের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছি তখন সেই সতর্ককৃত গোত্রের রাত পোহায় অশুভভাবে।

হাদিস নং - ৩৮৮৪
সাদাকা ইবনু ফাযল (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা প্রত্যূষে খায়বার এলাকায় গিয়ে পৌঁছোলাম। তখন সেখানকার অধিবাসীরা কৃষি সরঞ্জামাদি, নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তারা যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দেখতে পেলো তখন বলতে শুরু করল্‌ মুহাম্মদ, আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ তার সেনাদলসহ এসে পড়েছে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এ কথা শুনে) আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারন করে বললেন, খায়বার ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা যখনই কোনো গোত্রের এলাকায় গিয়ে পৌঁছি, তখন সেই সতর্কিকৃত গোত্রের রাত পোহায় অশুভভাবে। [আনাস (রাঃ) বলেন] এ যুদ্ধে আমরা (গনীমত হিসেবে) গাধার গোশত লাভ করে ছিলাম। (আর তা পাকানো হচ্ছিল)। এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পক্ষ থেকে জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষনা করলেন, আল্লাহ ও তারঁ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। কেননা তা নাপাক।

হাদিস নং - ৩৮৮৫
আবদুল্লাহ ইবনুুব আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে একজন আগন্তুক এসে বললো, (গনীমতের) গাধাগুলো খেয়ে ফেলা হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ রইলেন। এরপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসে বলল, গাধাগুলো খেয়ে ফেলা হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও চুপ থাকলেন। লোকটি তৃতীয়বার এসে বলল, গৃহপালিত গাধাগুলো খতম করে দেয়া হচ্ছে। তখন তিনি একজন ঘোষণাকারীকে হুকুম দিলেন, সে লোকজনের সামনে গিয়ে ঘোষনা দিলো, আল্লাহ এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রাঃ) তোমাদেরকে গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। (ঘোষণা শুনে) ডেকচিগুলো উল্টিয়ে দেয়া হল। অথচ ডেকচিগুলোতে গাধার গোশত তখন টগবগ করে ফুটছিল।

হাদিস নং - ৩৮৮৬
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের নিকটবর্তী এক স্থানে প্রত্যুষে সামান্য অন্ধকার থাকতেই ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। তারপর আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করে বললেন, খায়বার ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা যখনই কোনো গোত্রের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছি তখনই সতর্ককৃত সেই গোত্রের সকাল হয় অশুভ রুপ নিয়ে। এ সময়ে খায়বার অধিবাসীরা (ভয়ে) বিভিন্ন অলি-গলিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে আরম্ভ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্যেকার যুদ্ধে সক্ষম লোকদের হত্যা করলেন। আর শিশু (ও মহিলাদের)-দের কে বন্দী করলেন। বন্দীদের মধ্যে ছিলেন সাফিয়্যা [বিনত হুইয়াই (রাঃ)] প্রথমে তিনি দাহইয়াতুল কালবীর অংশে এবং পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অংশে বন্টিত হন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আযাদ করত এই আযাদীকে মোহর ধার্য করেন (এবং বিবাহ করে নেন)। আবদুল আযীয ইবনু সুহায়ব (রহঃ) সাবিত (রহঃ) কে বললেন, হে আবূ মুহাম্মদ! আপনি কি আনাস (রাঃ)—কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর [সাফিয়্যা (রাঃ)-এর] মোহর ধার্য করেছেন? তখন সাবির (রাঃ) ‘হাঁ-সূচক’ ইঙ্গিত করে মাথা নাড়লেন।

হাদিস নং - ৩৩৮৭
আদম (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খায়বারের যুদ্ধে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা (রাঃ)-কে (প্রথমত) বন্দী করেছিলেন। পরে তিনি তাঁকে আযাদ করে বিয়ে করেছিলেন। সাবিত (রহঃ) আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মোহর কত ধার্য করেছিলেন? আনাস (রাঃ) বললেনঃ স্বয়ং সাফিয়্যা (রাঃ)-কেই মোহর ধার্য করছিলেন এবং তাঁকে আযাদ করে দিয়েছিলেন।

হাদিস নং - ৩৮৮৮
কুতায়বা (রহঃ) সাহল ইবনু সা’দ সাঈদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, (খায়বার যুদ্ধে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুশরিকরা মুখোমুখি হলেন। পরস্পরের মধ্যে তুমুল লড়াই হল। (দিনের শেষে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছাউনিতে ফিরে আসলেন আর অন্যরাও (মুশরিকরা) তাদের ছাউনিতে ফিরে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণের মধ্যে এমন এক ব্যাক্তি ছিল , যে তার তরবারি থেকে একাকী কিংবা দলবন্ধ কোনো শত্রু সৈন্যকেই রেহাই দেয়নি। বরং পিছু ধাওয়া করে তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা হয়েছে। (সাহাবাগণের মধ্যে তার আলোচনা উঠলো) তাদের কেউ বললেন, অমুক ব্যাক্তি আজ যা করেছে আমাদের মধ্যে তার অন্য কেউ এমনটি করতে পারেনি। তখন রাসুলূল্লাহ বললেন, কিন্তু সে তো জাহান্নামী। (সকলের কাছে কথাটি আশ্চর্য মনে হল) সাহাবীগণের একজন বললেন, (ব্যাপারটি) দেখার জন্য আমি তার সঙ্গী হব। সাহল ইবনু সা’দ সাঈদী (রাঃ) বলেন, পরে তিনি ঐ লোকটির সাথে বের হলেন, লোকটি যখন থেমে যেতো তিনিও তার সাথে থেমে যেতেন, আর যখন লোকটি দ্রুত চলতো তিনিও তার সাথে দ্রুত চলতেন। বর্ণনাকারী বলেন, এক সময়ে লোকটি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল এবং (যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে) সে দ্রুত মৃত্যু কামনা করল। তাই সে (এক পর্যায়ে) তার তরবারির গোড়ার অংশ মাটিতে রেখে এর তীক্ষ্ম ভাগ বুকের বরাবর রাখলো। এরপর সে তরবারির উপর নিজেকে সজোরে চেপে ধরে আত্মহত্যা করলো। এ অবস্থা দেখে অনুসরণকারী সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছুটে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কি ব্যাপার? তিনি বললেন, একটু পূর্বে আপনি যে লোকটির ব্যাপারে মন্তব্য করেছিলেন যে, লোকটি জাহান্নামী, আর তার সম্পর্কে এরুপ কথা সকলের কাছে আশ্চর্যকর অনুভূত হয়েছিল। তখন আমি তাদেরকে বলেছিলাম, আমি লোকটির অনুসরণ করে ব্যাপারটি দেখে আসব। কাজেই আমি ব্যাপারটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। এরপর (এক সময়ে দেখলাম) লোকটি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল এবং দ্রুত নিজের মৃত্যু কামনা করল, তাই সে নিজের তরবারির উপর নিজেকে সজোরে চেয়ে ধরে আত্মহত্যা করল। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অনেক সময় মানুষ (বাহ্যত) জান্নাতীদের ন্যায় আমল করতে থাকে, যা দেখে অন্যরা তাকে জান্নাতীই মনে করে। অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জাহান্নামী। আবার অনেক সময় মানুষ (বাহ্যত) জাহান্নামীদের মত আমল করতে থাকে যা দেখে লোকজনও সেইরুপই মনে করে থাকে, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতী।

হাদিস নং - ৩৮৮৯
আবূল ইয়ামান (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর সংগীদের মধ্যে থেকে এক ব্যাক্তি যে মুসলমান বলে দাবি করতো, তার সম্পর্কে বললেন, লোকটি জাহান্নামী। এরপর যুদ্ধ আরম্ভ হলে লোকটি ভীষণভাবে যুদ্ধ চালিয়ে গেল, এমনকি তার দেহের অনেক স্থান ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। এতে কারো কারো (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভবিষ্যতবাণীর উপর) সন্দেহের উপক্রম হল। (কিন্তু তারপরেই দেখা গেল) লোকটি আঘাতের যন্ত্রণায় তুণীরের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে সেখান থেকে তীর বের করে আনল। আর তীরটি নিজের বক্ষদেশে ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করল। তা দেখে কতিপয় মুসলমান দ্রুত ছুটে এসে বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ আপনার কথা সত্য বলে প্রমাণিত করেছেন। ঐ লোকটি নিজেই নিজের বক্ষে আঘাত করে আত্মহত্যা করেছে। তখন তিনি বললেন, হে অমুক! দাঁড়াও, এবং ঘোষণা দাও যে, মু’মিন ব্যাতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা। অবশ্য আল্লাহ (কখনো কখনো) ফাসিক ব্যাক্তি দ্বারাও দ্বীনের সাহায্য করে থাকেন। মা’মার (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকে উক্ত হাদীস বর্ণনায় শুআয়ব (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। শাবীব (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম (আবদুল্লাহ) ইবনু মুবারাক হাদীসটি ইউনুস-যুহতী-সাঈদ [ইবনুল মূসা ইয়্যাব (রাঃ)] সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। সালিহ (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকে ইবনু মূবারাক (রাঃ)-এর মতই বর্ণনা করেছেন। আর যুবায়দি (রহঃ) হাদীসটি যুহরী, আবদুর রহমান ইবনু কাআব, উবায়দুল্লাহ ইবনু কাআব (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে খায়বারে অংশগ্রহণকারী জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। (যুবায়দী আরো বলেন) যুহরী (রহঃ) এ হাদিসটিতে আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ এবং সাঈদ ইবনুল মূসা ইয়্যাব) (রহঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন।

হাদিস নং - ৩৮৯০
মূসা ইবনু ঈসমাঈল (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খায়বার যুদ্ধের জন্য বের হলেন কিংবা রাবী বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার অভিমুখে যাত্রা করলেন, তখন সাথী লোকজন একটি উপত্যকায় পৌঁছে এই বলে উচ্চস্বরে তাকবীর দিতে শুরু করলে- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, না ইলাহা ইল্লাল্লাহু! (আল্লাহ মহান , আল্লাহ মহান, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হও। কারণ তোমরা এমন কোন সত্তাকে ডাকছ না যিনি বধির বা অনুপস্থিত। বরং তোমরা তো ডাকছ সেই সত্তাকে যিনি শ্রবণকারী ও অতি নিকটে অবস্থানকারী, যিনি তোমাদের সাথেই আছেন। [ আবূ মূসা] আশআরী (রাঃ) বলেন] আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সওয়ারীর পেছনে ছিলাম। তিনি আমাকে লা’ হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’ বলতে শুনে বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবনু কায়েস! আমি বললাম, আমি হাযির ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তিনি বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি কথা শিখিয়ে দেব কি যা জান্নাতের ভান্ডারসমূহের মধ্যে একটি ভান্ডার? আমি বললাম, হ্যাঁ! ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কথাটি হল ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।

হাদিস নং - ৩৮৯১
মাক্কী ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ইয়াযীদ ইবনু আবূ উবায়দ (রহঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি সালমা ইবনু আকওয়া) (রাঃ)-এর পায়ের নলায় আঘাতের চিহ্ন দেখে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম , সে আবূ মুসলিম! এ আঘাতটি কিসের? তিনি বললেন, এটি খায়বার যুদ্ধে প্রাপ্ত আঘাত। (যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে আঘাতটি মারার পর) লোকজন বলাবলি শুরু করে দিল যে, সালমা মারা যাবে। কিন্তু এরপর আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসলাম। তিনি ক্ষতস্থানটিতে তিনবার ফুঁ দিয়ে দিলেন। ফলে আজ পর্যন্ত আমি এতে কোনো ব্যথা অনুভব করিনি।

হাদিস নং - ৩৮৯২
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) সাহল ইবনু সা’দ) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো এক যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুশরিকরা মুখোমুখি হলেন। পরস্পরের মধ্যে তুমুল লড়াই হল। (শেষে) সকলেই নিজ নিজ সেনা ছাউনিতে ফিরে গেল। মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে এমন এক ব্যাক্তি ছিল, যে মুশরিকদের কোনো একাকী কিংবা দলবদ্ধ কোন শত্রুকেই তার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে দেয়নি বরং সবাইকেই তাড়া করে তার তরবারির আঘাতে হত্যা করেছে। তখন (তার ব্যপারে) বলা হলঃ হে আল্লাহর রাসূল! অমুক ব্যাক্তি আজ যে পরিমাণ আমল করেছে অন্য কেউ আজ সে পরিমাণ করতে পারেনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে ব্যাক্তি তো জাহান্নামী। তারা বললো, তা হলে আমাদের মধ্যে আর কে জান্নাতবাসী হতে পারবে যদি এ ব্যাক্তই জাহান্নামী হয়? তখন কাফেলার মধ্যে থেকে একজন বলল, অবশ্যই আমি তাকে অনুসরণ করে দেখব (যে তার পরিণাম কি ঘটে) (তিনি বলেন) লোকটি যখন দ্রুত চলতো আর ধীরে চলতো সর্বাবস্থায় আমি তার সাথে থাকতাম। পরিশেষে লোকটি আঘাতপ্রাপ্ত হলে আর (আঘাতের যন্ত্রণায়) সে দ্রুত মৃত্যু কামনা করে তার তরবারির বাট মাটিতে স্থাপন করল এবং ধারালো ভাগ নিজের বুক বরাবর রেখে এর উপর সজোরে ঝুঁকে পড়ে আত্মহত্য করলো। তখন (অনুসরণকারী) সাহাবী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )জিজ্ঞেস করলেন কি ব্যাপার? তিনি তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সব ঘটনা জানালেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেউ কেউ (দৃশ্যত) জান্নাতবাসীদের মত আমল করতে থাকে আর লোকজন তাকে অনুরুপই মনে করে থাকে প্রকৃতপক্ষে সে জাহান্নামী। আবার কেউ কেউ জাহান্নামীর মত আমল করে থাকে আর লোকজনও তাকে তাই মনে করে অথচ সে জান্নাতী।

হাদিস নং - ৩৮৯৩
মুহাম্মাদ ইবনু সাঈদ খুযাই (রহঃ) আবূ ইমরান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো এক জুম’আর দিনে আনাস (রাঃ) লোকজনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তাদের (মাথায়) তায়ালিসা চাঁদর। তখন তিনি বললেন, এ মুহুর্ত্বে এদেরকে যেন খায়বারের ইহুদীদের মতো দেখাচ্ছে। ১ ১ তায়ালিস শব্দটি তায়ালসান শব্দটির বহুবচন। মূল শব্দটি ফারসী। পরবর্তীতে এটি সামান্য বিকৃত হয়ে আরবী ভাষায় রুপান্তরিত হয়। এটি এক প্রকার চাঁদরের নাম। খায়বারের ইহুদি সম্প্রদায় এ চাঁদর অধিক ব্যবহার করতো। তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে এ চাঁদর ব্যবহার করতে আনাস (রাঃ) কখনো দেখেননি। তাই তিনি যখন বসরায় আসলেন আর খুতবা দিতে দাঁড়িয়ে মুসল্লিদের গায়ে ঐ চাঁদর দেখে খায়বারের ইহুদিদের তুলনা দিয়ে নিজ অনুভুতি প্রকাশ করেছেন।

হাদিস নং - ৩৮৯৪
আবদুল্লাহ ইবনু মাসায়লামা (রহঃ) সালমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, চক্ষু রোগে আক্রান্ত থাকার দরুণ আলী (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর থেকে খায়বার অভিযাবে পেছনে ছিলেন। [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা থেকে রওয়ানা দিয়ে এসে পড়লে] আলী (রাঃ) বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে (যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে) আমি পেছনে বসে থাকবো! সুতরাং তিনি গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হলেন। [সালমা (রাঃ) বলেন] খায়বার বিজিত হওয়ার পূর্ব রাতে তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, আগামী কাল সকালে আমি এমন একজন ব্যাক্তির হাতে ঝান্ডা অর্পন করব অথবা তিনি বলেছিলেন, আগামীকাল সকালে এমন এক ব্যাক্তি ঝান্ডা গ্রহণ করবে যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) ভালোবাসেন। আর তাঁর হাতেই খায়বার বিজিত হবে। কাজেই আমরা সবাই তা পাওয়ার আকাংক্ষা করছিলাম। তখন বলা হল, ইনি তো আলী (রাঃ)! এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ঝান্ডা প্রদান করলেন এবং তাঁর হাতেই খায়বার বিজিত হল।

হাদিস নং - ৩৮৯৫
কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বারের যুদ্ধে একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আগামীকাল সকালে আমি এমন এক ব্যাক্তির হাতে ঝান্ডা অর্পণ করব যার হাতে আল্লাহ খায়বারে বিজয় দান করবেন এবং আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল) ভালবাসেন আর সেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল) কে ভালোবাসে। সাহল (রাঃ) বলেন, (ঘোষণাটি শুনে মুসলমানগণ এ জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই রাত কাটালো যে, তাদের মধ্যে কাকে অর্পন করা হবে এই ঝান্ডা। সকাল হল, সবাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে আসলেন, আর প্রত্যেকেই মনে মনে এ ঝান্ডা লাভ করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) কোথায়? সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তিনি তো চক্ষুরোগে আক্রান্ত অবস্থায় আছেন। তিনি বললেন, তাকে লোক পাঠিয়ে সংবাদ দাও। সে মতে তাঁকে আনা হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উভয় চোখে থু থু লাগিয়ে তাঁর জন্য দোয়া করলেন। ফলে তাঁর চোখ এরুপ সুস্থ হয়ে উঠলো যে, যেন কখনো চোখে কোনো রোগই ছিলনা। এরপর তিনি তাঁর হাতে ঝান্ডা অর্পণ করলেন। তখন আলী (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তারা আমাদের মত (মুসলমান) না হওয়া পর্যন্ত আমি তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বর্তমান অবস্থায়ই তাদের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে উপনিত হও, এরপর তাদের কে ইসলাম গ্রহণের প্রতি আহবান করো (যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে) ইসলামী বিধানে ওদের উপর যেসব হক বর্তায় সেসব সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করে দাও। কারণ আল্লাহর কসম! তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হেদায়েত দেন তা হলে তা তোমার জন্য লোহিত বর্ণের (মূল্যবান) উটের মালিক হওয়া অপেক্ষা অনেক উত্তম।

হাদিস নং - ৩৮৯৬
আবদুল গাফফর ইবনু দাঊদ ও আহমদ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা খায়বারে এসে পৌঁছলাম। এরপর যখন আল্লাহ তাঁকে খায়বার দুর্গের বিজয় দান করলেন তখন তাঁর কাছে (ইহুদী দলপতি) হুয়াঈ ইবনু আখতাবের কন্যা সাফিয়্যা (রাঃ)-এর সৌন্দর্য্যের কথা আলোচনা করা হল। তার স্বামী (কেনানা ইবনুুর রাবী এ যুদ্ধে) নিহত হয়। সে ছিল নববধূ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্য মনোনীত করেন এবং তাঁকে সংগে করে (খায়বার থেকে) রওয়ানা হন। এরপর আমরা যখন সা’দ্দুস সাহবা নামক স্থান পর্যন্ত দিয়ে পৌঁছলাম তখন সাফিয়্যা (রাঃ) তাঁর মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্রতা লাভ করলেন। এ সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে বাসরঘরে সাক্ষাৎ করলেন। তারপর একটি ছোট দস্তরখানে (খেজুর-ঘি ও ছাতু মেশানো এক প্রকার) হায়স নামক খাদ্য সাজিয়ে আমাকে বললেন, তোমার আশেপাশে যারা আছে সবাইকে ডাকো। আর এটই ছিল সাফিয়্যা (রাঃ)-এর সাথে বিয়ের ওয়ালীমা। তারপর আমরা মদিনার দিকে রওয়ানা হলাম, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তাঁর পেছনে (সাওয়ারীর পিঠে) সাফিয়্যা (রাঃ)-এর জন্য একটি চাঁদর বিছাতে দেখেছি। এরপর তিনি তাঁর সাওয়ারীর উপর হাঁটুদয় মেলে বসতেন আর সাফিয়্যা (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাঁটুর উপর পা রেখে সাওয়ারীতে আরোহণ করতেন।

হাদিস নং - ৩৮৯৭
ইসমাঈল (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তন করার পথে সাফিয়্যা (রাঃ) বিনতে হুয়াঈ-এর কাছে তিনি দিন অবস্থান করে তাঁর সাথে বাসর যাপন করেছেন। আর সাফিয়্যা (রাঃ) ছিলেন সে সব মহিলাদের একজন যাদের জন্য পর্দার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। (১) ১) পর্দার ব্যবস্থার কারণে বোঝা গেল যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উম্মুল মু’মিনীণো হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কেননা মিলকে ইয়ামীন বা ক্রীতদাসী হিসেবে গ্রহণ করে থাকলে তার মৌলিক সতর ছাড়া অন্যান্য অংগের পর্দার ব্যবথা করার প্রয়োজন হত না।

হাদিস নং - ৩৮৯৮
সাঈদ ইবনু আবূ মারয়াম (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার ও মদিনার মধ্যবর্তী এক জায়গায় তিনি দিন অবস্থান করেছিলেন আর এ সময় তিনি সাফিয়্যা (রাঃ)-এর সঙ্গে বাসর যাপন করেছেন। আমি মুসলমানগণকে তাঁর ওয়ালীমার জন্য দাওয়াত দিলাম। অবশ্য এ ওয়ালীমাতে গোশত রুটির ব্যবস্থা ছিল না, কেবল এতটুকু ছিল যে, তিনি বিলাল (রাঃ)-কে দস্তরখান বিছাতে বললেন। দস্তরখান বিছানো হল। এরপর তাতে কিছু খেজুর, পনির ও ঘি রাখা হল। এ অবস্থা দেখে মুসলিমগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো যে, তিনি [সাফিয়্যা (রাঃ)] কি উম্মাহাতুল মু’মীনিনেরই একজন, না ক্রীতদাসীদের একজন? তাঁরা (আরো) বললেন, যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য পর্দার ব্যবস্থা করেন তাহলে তিনি উম্মাহাতুল মু’মিনীনেরই একজন বোঝা যাবে। তার পর্দার ব্যবস্থা না করলে ক্রীতদাসী হিসেবেই বুঝতে হবে। এরপর যখন তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] রওয়ানা দিলেন তখন তিনি নিজের পেছনে সাফিয়্যা (রাঃ)-এর জন্য বসার জায়গা করে দিয়ে পর্দা টানিয়ে দিলেন।

হাদিস নং - ৩৮৯৯
আবূল ওয়ালীদ ও আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা খায়বারের দুর্গ অবরোধ করে রাখলাম, এমন সময়ে এক ব্যাক্তি একটি থলে নিক্ষেপ করল। তাতে ছিল কিছু চর্বি। আমি সেটি কুড়িয়ে নেয়ার জন্য দ্রুত এগিয়ে আসলাম, হঠাৎ পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখলাম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমার দিকে তাকিয়ে আছেন) তাই আমি লজ্জিত হয়ে গেলাম।

হাদিস নং - ৩৯০০
উবায়দ ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রসুন এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। তিনি রসুন খেতে নিষেধ করেছেন কথাটি কেবল নাফি’ থেকে বর্ণিত হয়েছে, আর গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন কথাটি সালিম [ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ)] থেকে বর্ণিত হয়েছে।

হাদিস নং - ৩৯০১
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু কাযাআ (রহঃ) আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার যুদ্ধের দিন মহিলাদের মুতআ (মেয়াদী বিয়ে) করা থেকে এবং গৃহপালিত গাধার গোশ্‌ত খেতে নিষেধ করেছেন। [১] [১ ] মুত্আ বা মেয়াদী বিয়ে বলতে কোন মহিলাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে কোন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বিয়ে করাকে বোঝায়। ইসলামের প্রাথমিককালে এ প্রকারের বিয়ে বৈধ থাকলেও খায়বার যুদ্ধের সময় তা হারাম করে দেয়া হয়। এরপর অষ্টম হিজরীর মক্কা বিজয়ের সময় কেবল তিন দিনের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। এ তিন দিন পর আবার তা চিরকালের জন্য হারাম ঘোষিত হয়।

হাদিস নং - ৩৯০২
মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধার গোশ্‌ত খেতে নিষেধ করেছেন।

হাদিস নং - ৩৯০৩
ইসহাক ইবনু নাসর (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহপালিত গাধার গোশ্‌ত খেতে নিষেধ করেছেন।

হাদিস নং - ৩৯০৪
সুলায়মান ইবনু হার্‌ব (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাসূলুল্লাহ্ খায়বারের যুদ্ধের দিন (গৃহপালিত)গাধার গোশ্‌ত খেতে নিষেধ করেছেন এবং ঘোড়ার গোশ্‌ত খেতে অনুমতি দিয়েছেন।

হাদিস নং - ৩৯০৫
সাঈদ ইবনু সুলায়মান (রহঃ) ইবনু আবী আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) খায়বার যুদ্ধে আমরা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলাম, আর তখন আমাদের ডেকচিগুলোতে (গাধার গোশ্‌ত) টগবগ করে ফুটছিলো। রাবী বলেন, কোন কোন ডেকচির গোশ্‌ত পাকানো হয়ে গিয়েছিল এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পক্ষ থেকে এক ঘোষণাকারী এসে ঘোষণা দিলেন, তোমরা (গৃহপালিত) গাধার গোশ্‌ত থেকে সামান্য পরিমাণও খাবে না এবং তা ঢেলে দেবে। ইবনু আবী আওফা (রাঃ) বলেন, ঘোষণা শুনে আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম যে, যেহেতু গাধাগুলো থেকে খুমুছ (এক-পঞমাংশ) আদায় করা হয়নি এ কারণেই তিনি সেগুলো খেতে নিষেধ করেছেন। আর কেউ কেউ মন্তব্য করলেন, না, তিনি চিরদিনের জন্যই গাধার গোশ্‌ত খেতে নিষেধ করেছেন। কেননা গাধা অপবিত্র জিনিস খেয়ে থাকে।

হাদিস নং - ৩৯০৬
হাজ্জাজ ইবনু মিনহাল (রহঃ) বারাআ এবং আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, (খায়বার যুদ্ধে) তাঁরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলেন। (খাবারের জন্য তাঁরা) গাধার গোশ্‌ত পেলেন। তাঁরা তা রান্না করলেন। এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পক্ষ থেকে একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করলেন, ডেকচিগুলো সব উল্টিয়ে ফেল।

হাদিস নং - ৩৯০৭
ইসহাক (রহঃ) আদী ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, (তিনি বলেন) আমি বারাআ এবং ইবনু আবূ আওফা (রাঃ)-কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি যে, খায়বারের দিন তাঁরা গাধার গোশ্‌ত পাকানোর জন্য ডেকচি বসিয়েছিলেন, এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ডেকচিগুলো উল্টিয়ে ফেল।

হাদিস নং - ৩৯০৮
মুসলিম (রহঃ) বারাআ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে খায়বারে অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলাম । পরে তিনি উপরোল্লিখিত বর্ণনা অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

হাদিস নং - ৩৯০৯
ইব্‌রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) বারাআ ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধের সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে কাঁচা ও রান্না করা সকল প্রকারের গৃহপালিত গাধার গোশ্‌ত ঢেলে দিতে হুকুম করেছেন। এরপরে আর কখনো তা খেতে অনুমতি দেননি।

হাদিস নং - ৩৯১০
মুহাম্মদ ইবনু আবূল হুসায়ন (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ঠিক জানিনা যে, গৃহপালিত গাধাগুলো মানুষের মাল-সামান আনা-নোয়ার কাজে ব্যবহার হতো, কাজেই এর গোশ্‌ত খেলে মানুষের বোঝা বহনকারী পশু নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং লোকজনের চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়বে, এ জন্য কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা খেতে নিষেধ করেছিলেন, না-খায়বারের দিনে এর গোশ্‌ত (আমাদের জন্য) স্থায়ীভাবে হারাম ঘোষণা দিয়েছেন।

হাদিস নং - ৩৯১১
হাসান ইবনু ইসহাক (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়ার জন্য দুই অংশ এবং পদাতিক যোদ্ধার জন্য এক অংশ হিসেবে (গনীমতের) সম্পদ বন্টন করেছেন। বর্ণনাকারী [উবায়দুল্লাহ্ ইবনু উমর (রাঃ)] বলেন, নাফি হাদীসটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, (যুদ্ধে) যার সঙ্গে ঘোড়া থাকে তার জন্য তিন অংশ এবং যার সঙ্গে ঘোড়া থাকে না, তার জন্য এক অংশ।

হাদিস নং - ৩৯১২
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) জুবায়র ইবনু মুতঈম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এবং উসমান ইবনু আফ্‌ফান (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গিয়ে বললাম, আপনি খায়বারের প্রাপ্ত খুমুস থেকে বনী মুত্তালিবকে অংশ দিয়েছেন, আমাদেরকে দেননি। অথচ আপনার সাথে বংশের দিক থেকে আমরা এবং বনী মুত্তালিব একই পর্যায়ের। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিঃসন্দেহে বনী হাশিম এবং বনী মুত্তালিব সম-মর্যাদার অধিকারী। যুবায়র (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী আবদে শাম্‌স ও বনী নাওফিলকে (খায়বার যুদ্ধের খুমুস থেকে) কিছুই দেননি।

হাদিস নং - ৩৯১৩
মুহাম্মদ ইবনুল আলা (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইয়ামানে থাকা অবস্থায় আমাদের কাছে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হিজরতের খবর পৌছলো। তাই আমি ও আমার দু’ভাই আবূ বুরদা ও আবূ রুহম এবং আমাদের কাওমের আরো মোট বায়ান্ন কি তিপ্পান্ন কিংবা আরো কিছু লোকজনসহ আমরা হিজরতের জন্য বেরিয়ে পরলাম। আমি ছিলাম আমার দু’ ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট। আমরা একটি জাহাজে আরোহণ করলাম। জাহাজটি আমাদেরকে আবিসিনিয়া দেশের (বাদশাহ্) নাজ্জাশীর নিকট পৌছেয়ে দিল। সেখানে আমরা জা’ফর ইবনু আবূ তালিবের সাক্ষাৎ পেলাম এবং তাঁর সাথেই আমরা রয়ে গেলাম। অবশেষে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর খায়বার বিজয়কালে সকলে (হাসশা থেকে) প্রত্যাবর্তন করে এসে তাঁর সঙ্গে একত্রিত হলাম। এ সময়ে মুসলমানদের কেউ কেউ আমাদেরকে অর্থৎ জাহাজযোগে আগমনকারীদেরকে বললো, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের অপেক্ষা অগ্রগামী। আমাদের সাথে আগমনকারী আসমা বিন্‌ত উমায়স একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণী হাফসার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। অবশ্য তিনিও (তাঁর স্বামী জা’ফরসহ) নাজ্জাশী বাদশাহর দেশের হিজরতকারীদের সাথে হিজরত করেছিলেন। আসমা (রাঃ) হাফসার কাছেই ছিলেন। এ সময়ে উমর (রাঃ) তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। উমর (রাঃ) আসমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে? হাফসা (রাঃ) বললেন, তিনি আসমা বিনত উমায়স (রাঃ)। উমর (রাঃ) বললেন, ইনই কি হাবশা দেশে হিজরতকারিণী আসমা? ইনই কি সমুদ্র ভ্রমণকারিণী? আসমা (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ! তখন উমর (রাঃ) বললেন, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে আগে আছি। সুতরাং তোমাদের তুলনায় আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বেশি ঘনিষ্ঠ। এতে আসমা (রাঃ) রেগে গেলেন এবং বললেন, কখনো হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আপনারা তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের আহারের ব্যবস্থা করতেন, আপনাদের মধ্যকার অবুঝ লোকদেরকে সুদুপদেশ দিতেন। আর আমরা ছিলাম এমন এক এলাকায় অথবা তিনি বলেছেন এমন এক দেশে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বহুদূর এবং সর্বদা শত্রু কবলিত-হাবশা দেশে। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল) -এর উদ্দেশ্যেই ছিলো আমাদের এ কুরবানী। আল্লাহর কসম, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত কোন খাবার গ্রহণ করবো না এবং পানিও পান করবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যা বলেছেন তা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে না জানাব। সেখানে আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হতো, ভয় দেখানো হতো। অচিরেই আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এসব কথা বলবো। এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করবো। তবে আল্লাহর কসম, আমি মিথ্যা বলবো না, ঘুরিয়ে কিংবা এর উপর বাড়িয়েও কিছু বলবো না। এরপর যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলেন, তখন আসমা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! উমর (রাঃ) এসব কথা বলেছেন, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তাঁকে কি উত্তর দিয়েছ? আসমা (রাঃ) বললেনঃ আমি তাঁকে এরূপ এরূপ বলেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (এ ব্যাপারে) তোমাদের তুলনায় উমর (রাঃ) আমার বেশি ঘনিষ্ঠ নয়। কারণ উমর (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদের তো মাত্র একটই হিজরত লাভ হয়েছে, আর তোমরা যারা জাহাজে আরোহণকারী ছিলে তাদের দু’টি হিজরত অর্জিত হয়েছে। আসমা (রাঃ) বলেন, এ ঘটনার পর আমি আবূ মূসা (রাঃ) এবং জাহাজযোগে আগমনকারী অন্যদেরকে দেখেছি যে, তাঁরা দলে দলে এসে আমার নিকট থেকে এ হাদীসখানা শুনতেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সম্পর্কে যে কথাটি বলেছিলেন এ কথাটি তাদের কাছে এতই প্রিয় ছিল যে, তাঁদের কাছে দুনিয়ার অন্য কোন জিনিস এত প্রিয় ছিল না। আবূ বুরদা (রাঃ) বলেন যে, আসমা (রাঃ) বলেছেন, আমি আবূ মূসা [আশ্‌আরী (রাঃ)]-কে দেখেছে, তিনি বারবারই আমার কাছ থেকে এ হাদীসটি শুনতে চাইতেন। আবূ বুরদা (রাঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে আরো বর্ণনা করেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আশআরী গোত্রের লোকজন রাতের বেলায় এলেও আমি তাদেরকে তাদের কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ থেকেই চিনতে পারি। এবং রাতের বেলায় তাদের কুরআন তিলাওয়াত শুনেই আমি তাদের বাড়িঘর চিনে নিতে পারি। যদিও আমি দিনের বেলায় তাদেরকে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে দেখিনি। হাকীম ছিলেন আশআরীদের একজন। যখন তিনি কোন দল কিংবা (বর্ণনাকারী বলেছেন) কোন শত্রুর মুকাবিলায় আসতেন তখন তিনি তাদেরকে বলতেন, আমার বন্ধুরা তোমাদের বলেছেন, যেন তোমরা তাঁদের জন্য অপেক্ষা কর।

হাদিস নং - ৩৯১৪
ইসহাক ইবনু ইব্‌রাহীম (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার জয় করার পরে আমরা তাঁর কাছে গিয়ে পৌছলাম। তিনি আমাদের জন্য গনীমতের মাল বন্টন করেছেন। আমাদেরকে ছাড়া বিজয়ে অংশগ্রহণ করেনি এমন কারুর জন্য তিনি (খায়বারের গনীমতের মাল) বন্টন করেননি।

হাদিস নং - ৩৯১৫
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ করেছি কিন্তু গনীমত হিসেবে আমরা সোনা, রূপা কিছুই লাভ করিনি। আমরা যা পেয়েছিলাম তা ছিল গরু, উট, বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রী এবং ফলের বাগান। (যুদ্ধ শেষ করে) আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ওয়াদিউল কুরা নামক স্থান পর্যন্ত ফিরে আসলাম। তাঁর [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] সঙ্গে ছিল মিদআম নামক একটি গোলাম। বনী যুবায়র-এর জনৈক ব্যাক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এটি হাদিয়া দিয়েছিল। এক সময়ে সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাওদা নামানোর কাজে ব্যস্ত ছিল আর ঐ মুহূর্তে এক অজ্ঞাত স্থান থেকে একটি তীর ছুটে এসে তার গায়ে পড়লো। ফলে গোলামটি মারা গেল। এ অবস্থা দেখে লোকজন বলাবলি শুরু করলো যে, কি আনন্দদায়ক তার এ শাহাদত! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাই নাকি? সেই মহান সত্তার কসম, তাঁর হাতে আমার প্রাণ, বন্টনের আগে খায়বার যুদ্ধলব্ধ গনীমত থেকে সে যে চাঁদরখানা তুলে নিয়েছিল সেটি আগুন হয়ে অবশ্যই তাকে দগ্ধ করবে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ কথাটি শোনার পর আরেক ব্যাক্তি একটি অথবা দু’টি জুতার ফিতা নিয়ে এসে বললো, এ জিনিসটি আমি বন্টনের আগেই নিয়েছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ একটি অথবা দু’টি ফিতাও আগুনের ফিতায় রূপান্তরিত হতো।

হাদিস নং - ৩৯১৬
সাঈদ ইবনু আবূ মারিয়াম (রহঃ) উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মনে রেখো! সেই সত্তর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি পরবর্তী বংশধরদের নিঃস্ব ও রিক্ত-হস্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত তা হলে আমি আমার সমদয় বিজিত এলাকা সেভাবে বন্টন করে দিতাম যেভাবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার বন্টন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি তা তাদের জন্য গচ্ছিত আমানত হিসাবে রেখে যাচ্ছি যেন পরবর্তী বংশধরগণ তা নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিতে পারে।

হাদিস নং - ৩৯১৭
মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পরবর্তী মুসলমানদের উপর আমার আশংকা না থাকলে আমি তাদের (মুজাহিদগণের) বিজিত এলাকাগুলো তাঁদের মধ্যে সেভাবে বন্টন করে দিতাম যেভাবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার বন্টন করে দিয়েছিলেন।

হাদিস নং - ৩৯১৮
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আমবাসা ইবনু সাঈদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর কাছে এসে (খায়বার যুদ্ধের গনীমতের) অংশ চাইলেন। তখন বনূ সাঈদ ইবনু আস গোত্রের জনৈক ব্যাক্তি বলে উঠলো, না, তাকে (খায়বারের গনীমতের অংশ) দিবেন না। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বললেন, এ লোক তো ইবনু কাওকালের হত্যাকারী (কাজেই তাকে না দেওয়া হোক)। কথাটি শুনে সে ব্যাক্তি বললো, বাঃ! দান পাহাড় থেকে নেমে আসা অদ্ভুত বিড়ালের কথায় আশ্চর্য বোধ করছি। যুবায়দী-যুহরী-আমবাসা ইবনু সাঈদ (রহঃ)- আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি সাইদ ইবনু আস (রাঃ) সম্পর্কে বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবান [ইবনু সাঈদ (রাঃ)]-এর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল মদিনা থেকে নাজদের দিকে পাঠিয়েছিলেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খায়বার বিজয় করে সেখানে অবস্থানরত ছিলেন তখন আবান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ সেখানে এসে তাঁর [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর] সাথে মিলিত হলেন। তাদের ঘোড়াগুলোর লাগাম ছিল খেজুরের ছালের বানানো। (অর্থাৎ তাঁরা ছিলেন রড়ই নিঃস্ব) আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাদেরকে কোন অংশ দিবেন না। তখন আবান (রাঃ) বললেন, আরে বুনো বিড়াল, দান পাহাড় থেকে নেমে আসছ বরং তুমই না পাওয়ার যোগ্য। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবান, বসো। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে (আবান ও তার সঙ্গীদেরকে) অংশ দিলেন না। [১] [১ ] উহুদের যুদ্ধে আবান ইবনু সাঈদ কাফের ছিলেন এবং কাফেরদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করে নুমান ইবনু কাওকাল (রাঃ)-কে শহীদ করেন। এরপর তিনি খায়বারের যুদ্ধের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হন। বিতর্কের মুহূর্তে আবূ হুরায়রা (রাঃ) সে দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। ‘দান’ আরবের দাওস এলাকার একটি পাহাড়ের নাম। আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর গোত্র সেখানেই বাস করতো। এ জন্যই আবান (রাঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে তাঁর উপনামের অর্থ ও ঐ পাহাড়ের সাথে মিলিয়ে বলেছেন, বুনো বিড়াল, দান পাহাড় থেকে এসেছে।

হাদিস নং - ৩৯১৯
মূসা ইবনু ইস্‌মাঈল (রহঃ) আমর ইবনু ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু সাঈদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার দাদা [সাঈদ ইবনু আমর ইবনু সাঈদ ইবনুল আস (রাঃ)] আমাকে জানিয়েছেন যে, আবান ইবনু সাঈদ (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে সালাম দিলেন। তখন আবূ হুরায়রা (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ লোক তো ইবনু কাওকাল (রাঃ)-এর হত্যাকারী! তখন আবান (রাঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে বললেন, আশ্চর্য! দান পাহাড়ের চূড়া থেকে অকস্মাৎ নেমে আসা বুনো বিড়াল! সে এমন এক ব্যাক্তির সম্পর্কে আমাকে দোষারোপ করছে যাকে আল্লাহ্ আমার হাত দ্বারা সম্মানিত করেছেন (শাহাদত দান করেছেন)। আর তাঁর হাত দ্বারা অপমানিত হওয়া থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন। ১ কেননা উহুদের যুদ্ধে তিনি কাফের ছিলেন। আর সে অবস্থায় তিনি যদি কাওকাল (রাঃ)-এর হাতে নিহত হতেন তাহলে অবশ্যই তিনি পরকালে আল্লাহর আযাবের উপযুক্ত হতেন এবং চিরকাল লাঞ্ছিত থাকতেন।

হাদিস নং - ৩৯২০
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ত্যাজ্য সম্পত্তি মদিনা ও ফাদকে অবস্থিত ফাই (বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ) এবং খায়বারের খুমুসের (পঞ্চমাংশ) অবশিষ্টাংশ থেকে মিরাসী স্বত্ব চেয়ে পাঠালেন। তখন আবূ বকর (রাঃ) উত্তরে বললেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন, আমাদের (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দের) কোন ওয়ারিস হয় না, আমরা যা রেখে যাবো তা সা’দকা হিসেবে পরিগণিত হবে। অবশ্য মুহাম্মদ -এর বংশধরগণ এ সম্পত্তি কেবল ভোগ করতে পারেন। আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সা’দ্‌কা তাঁর জীবদ্দশায় যে অবস্থায় ছিল আমি সে অবস্থা থেকে সামান্যতমও পরিবর্তন করবো না। এ ব্যাপারে তিনি যে নীতিতে ব্যবহার করে গেছেন আমিও ঠিক সেই নীতিতেই কাজ করবো। এ কথা বলে আবূ বকর (রাঃ) ফাতিমা (রাঃ)-কে এ সম্পদ থেকে কিছু প্রদান করতে অস্বীকার করলেন। এতে ফাতিমা (রাঃ) (মানবোচিত কারণে) আবূ বকর (রাঃ)-এর উপর নারাজ হয়ে গেলেন এবং তাঁর থেকে নিস্পৃহ হয়ে রইলেন। পরে তাঁর ওফাত পর্যন্ত তিনি (মানসিক সংকোচের দরুন) আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে কথা বলেননি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওফাকের পর তিনি ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এরপর তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর স্বামী আলী (রাঃ) রাতের বেলা তাঁর দাফন কার্য শেষ করে নেন। আবূ বকর (রাঃ)-কেও এ সংবাদ দেননি। এবং তিনি তার জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে নেন। ১ ফাতিমা (রাঃ) জীবিত থাকা পর্যন্ত লোকজনের মনে আলী (রাঃ)-এর বেশ সম্মান ও প্রভাব ছিল। এরপর যখন ফাতিমা (রাঃ) ইন্তেকাল করলেন, তখন আলী (রাঃ) লোকজনের চেহারায় অসন্তুষ্টির চিহৃ দেখতে পেলেন। তাই তিনি আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে সমঝোতা ও তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণের ইচ্ছা করলেন। [ফাতিমা (রাঃ)-এর অসুস্থতা ও অন্যান্য] ব্যস্ততার দরুন এ ছয় মাসে তাঁর পক্ষে বায়আত গ্রহণে অবসর হয়নি। তাই তিনি আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে জানালেন যে, আপনি আমার কাছে আসুন। তবে অন্য কেউ যেন আপনার সঙ্গে না আসে। কারণ আবূ বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে উমর (রাঃ)-ও উপস্থিত হোক-তিনি তা পছন্দ করেননি। (বিষয়টি শোনার পর) উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, আপনি একা একা তাঁর কাছে যাবেন না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, তাঁরা আমার সাথে খারাপ আচরণ করবে বলে তোমরা আশংকা করছ? আল্লাহর কসম, আমি তাঁদের কাছে যাব। তারপর আবূ বকর (রাঃ) তাঁদের কাছে গেলেন। আলী (রাঃ) তাশাহ্‌হুদ পাঠ করে বললেন, আমরা আপনার মর্যাদা এবং আল্লাহ্ আপনাকে যা কিছু দান করেছেন সে সম্পর্কে অবগত আছি। আর যে কল্যাণ (অর্থাৎ খিলাফত) আল্লাহ্ আপনাকে দান করেছেন সে ব্যাপারেও আমরা আপনার সাথে হিংসা রাখি না। তবে খিলাফতের ব্যাপারে আপনি আমাদের উপর নিজের মতের প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছেন অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকটাত্মীয় হিসেবে খিলাফতের কাজে (পরামর্শ দেওয়াতে) আমাদেরও কিছু অধিকার রয়েছে। এ কথায় আবূ বকর (রাঃ)-এর চোখ-যুগল থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলো। এরপর তিনি যখন আলোচনা আরম্ভ করলেন কখন বললেন, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে আমার নিকটাত্মীয় অপেক্ষাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আত্মীয়বর্গ বেশি প্রিয়। আর এ সম্পদগুলোতে আমার এবং আপনাদের মধ্যে যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যাপারেও আমি কল্যাণকর পথ অনুসরণে কোন কসুর করিনি। বরং এ ক্ষেত্রেও আমি কোন কাজ পরিত্যাগ করিনি যা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে করতে দেখেছি। তারপর আলী (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে বললেনঃ যুহরের পর আপনার হাতে বায়আত গ্রহণের ওয়াদা রইল। যুহরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের পর আবূ বকর (রাঃ) মিম্বরে বসে তাশাহ্‌হুদ পাঠ করলেন, তারপর আলী (রাঃ)-এর বর্তমান অবস্থা এবং বায়আত গ্রহণে তার দেরি করার কারণ ও তাঁর (আবূ বকরের) কাছে পেশকৃত আপত্তিগুলো তিনি বর্ণনা করলেন। এরপর আলী (রাঃ) দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাশাহ্‌হুদ পাঠ করলেন এবং আবূ বকর (রাঃ)-এর মর্যাদার কথা উল্লেখ করে বললেন, তিনি বিলম্বজনিত যা কিছু করেছেন তা আবূ বকর (রাঃ)-এর প্রতি হিংসা কিংবা আল্লাহ্ প্রদত্ত তাঁর এ সম্মানের অস্বীকার করার মনোবৃত্তি নিয়ে করেননি। (তিনি বলেন) তবে আমরা ভেবেছিলাম যে, এ ব্যাপারে আমাদের পরামর্শও দেওয়ার অধিকার থাকবে। অথচ তিনি [ আবূ বকর (রাঃ)] আমাদের পরামর্শ ত্যাগ করে স্বাধীন মতের উপর রয়ে গেছেন। তাই আমরা মানসিকভাবে ব্যথা পেয়েছিলাম। (উভয়ের এ আলোচনা শুনে) মুসলমানগণ আনন্দিত হয়ে বললেন, আপনি ঠিকই করেছেন। এরপর আলী (রাঃ) আমল বিল মা’রূফ (অর্থাৎ রায়আত গ্রহণ)-এর দিকে ফিরে এসেছেন দেখে সব মুসলমান আবার তাঁর প্রতি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। ১ ওফাতের পূর্বে ফাতিমা (রাঃ)-এর ওয়াসিয়াত ছিল যে, মৃত্যুর সাথে সাথেই যেনো তার কাফন-দাফন শেষ করা হয়, কারণ লোকজন ডাকাডাকি করলে তাতে পর্দার ব্যাঘাত ঘটনের আশংকা আছে। সেমতে আলী (রাঃ) রাতের ভিতরই সব কাজ সেরে নিয়েছেন। আর সংবাদ তো নিশ্চয়ই আবূ বকর (রাঃ) পর্যন্ত পৌছে যাবে এ ধারণায় তিনি নিজে গিয়ে সংবাদ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। অবশ্য এ ছয় মাস যাবত তিনি আবূ বকর (রাঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ না করায় মুসলমানদের মনে প্রশ্ন উদয় হলেও যেহেতু তিনি রোগে শয্যাশায়ী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তনয়ার খিদমতে ব্যস্ত থাকতেন, সেহেতু লোকজন তাঁর প্রতি কোন অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেনি। কিন্তু ফাতিমা (রাঃ)-এর ওফাত হওয়ার পর সেই কারণ অবশিষ্ট না থাকায় আলী (রাঃ) পরবর্তীকালে মানুষের চেহারায় অসন্তুষ্টির ভান দেখতে পেয়েছেন।

হাদিস নং - ৩৯২১
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার বিজয় হওয়ার পর আমরা (পরস্পর) বললাম, এখন আমরা পরিতৃপ্ত হয়ে খেজুর্ খেতে পারবো।

হাদিস নং - ৩৯২২
হাসান (রাঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার বিজয় লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত আমরা তৃপ্তি সহকারে খেতে পাইনি।

হাদিস নং - ৩৯২৩
ইসমাঈল (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার অধিবাসীদের জন্য (সাওয়াদ ইবনু গাযিয়া নামক) এক ব্যাক্তিকে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। এরপর এক সময়ে তিনি (প্রশাসক) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে উন্নত জাতের কিছু খেজুর নিয়ে উপস্থিত হলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খায়বারের সব খেজুরই কি এরূপ হয়ে থাকে? প্রশাসক উত্তর করলেন, জী না, আল্লাহর কসম ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তবে আমরা এরূপ খেজুরের এক সা’ সাধারণ খেজুরের দু’ সা’-এর বিনিময়ে কিংবা এ প্রকারের খেজুরের দু’ সা’ সাধারণ খেজুরের তিন সা’র বিনিময়ে সংগ্রহ করে থাকি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরূপ করো না। দিরহামের বিনিময়ে সব খেজুর বিক্রয় করে ফেলবে। তারপর দিরহাম দিয়ে উত্তম খেজুর খরিদ করবে। [১] আবদুল আযীয ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) সাঈদ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) তাঁকে বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের বনী আদী গোত্রের এক ব্যাক্তিকে খায়বার পাঠিয়েছেন এবং তাঁকে খায়বার অধিবাসীদের জন্য প্রশাসক নিযুক্ত করে দিয়েছেন। অন্য সনদে আবদুল মাজীদ- আবূ সালিহ সাম্মান (রহঃ)- আবূ হুরায়রা ও আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। [১ ] কেননা খেজুরের বিনিময়ে খেজুরের বেচা-কেনা যদি ক্রেতা বিক্রেতার উভয় দিক থেকে সম পরিমাণের না হয় তা হলে বর্ধিত অংশ সুদের পর্যায়ে চলে যায়। দিরহামের মাধ্যমে বিনিময় করলে আর ঐ আশংকা থাকে না।

হাদিস ৩৯২৪
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের কৃষিভূমি সেখানকার অধিবাসী ইহুদীদেরকে এ চুক্তিতে প্রদান করেছিলেন যে, তারা ভূমি চাষ করবে এবং ফসল উৎপাদন করবে। বিনিময়ে তার উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক তারা লাভ করবে।

হাদিস নং - ৩৯২৫
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, যখন খায়বার বিজয় হয়ে গেলো তখন (ইহুদীদের পক্ষ থেকে) একটি বকরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে হাদিয়া দেওয়া হয়। সেই বকরীটি বিষ মেশানো ছিলো। [১] [১] খায়বার যুদ্ধে যখন ইহুদীদের জন্য মুসলমানদের আনুগত্য স্বীকার ব্যতীত অন্য কোন পথ বাকী রইল না তখন তারা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ইহুদী হারিসের কন্যা ও সালাম ইবনু মুশফিমের স্ত্রী যয়নাব একটি বকরীর গোশতে বিষ মিশিয়ে তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জন্য হাদিয়া পাঠালো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরীটির গোশত খেলেও বিষ তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারেনি বটে, কিন্তু তাঁর সাহাবী বারআ ইবনু মা’রূর (রাঃ) বিষক্রিয়ার ফলে শহীদ হন। ষড়যন্ত্রকারী মহিলা ধরা পড়ার পর প্রথমে তাকে মাফ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে যখন বারাআ (রাঃ) মারা গেলেন তখন ‘কিসাস’ হিসেবে তাকে হত্যা করা হয়। তবে মা’মার (রহঃ) বর্ণনা করেছেন যে, ঐ মহিলা পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এ জন্য তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল। (কাসতুলানী)

হাদিস নং - ৩৯২৬
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামা ইবনু যায়িদ) (রাঃ)-কে (নেতৃস্থানীয় মুহাজির ও আনসারদের সমন্বয়ে গঠিত) একটি বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করেছিলেন। লোকজন তাঁর আমীর নিযুক্ত হওয়ার উপর সমালোচনা শুরু করলে তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, আজ তোমরা তার আমীর নিযুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সমালোচনা করছো, অবশ্য ইতিপূর্বে তোমরা তার পিতার আমীর নিযুক্ত হওয়ার ব্যাপারেও সমালোচনা করেছিলে। আল্লাহর কসম, তিনি (উসামার পিতা যায়িদ ইবনু হারিসা) ছিলেন আমীর হওয়ার জন্য যথাযোগ্য এবং আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তার মৃত্যুর পর এ (উসামা ইবনু যায়িদ) আমার নিকট বেশি প্রিয় ব্যাক্তি।

হাদিস নং - ৩৯২৭
উবায়দুল্লাহ্ ইবনু মূসা (রহঃ) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলকা’দা মাসে উমরা আদায় করার ইচ্ছায় মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করেন। মক্কাবাসীরা তাঁকে মক্কা নগরীতে প্রবেশের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালো। অবশেষে তিনি তাদের সঙ্গে এ কথার উপর সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করেন যে, (আগামী বছর উমরা পালন করতে এসে) তিনি মাত্র তিন দিন মক্কায় অবস্থান করবেন। মুসলিমগণ সন্ধিপত্র লেখার সময় এভাবে লিখেছিলেন, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ আমাদের সঙ্গে এ চুক্তি সম্পাদন করেছেন। ফলে তারা (কথাটির উপর আপত্তি উঠিয়ে) বললো, আমরা তো এ কথা (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল)স্বীকার করিনি। যদি আমরা আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকারই করতাম তা হলে মক্কা প্রবেশে মোটেই বাধা দিতাম না। বরং আপনি তো মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ। তখন তিনি বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল এবং মুহাম্মদ ইবনু ‘আবদুল্লাহ (উভয়টই)। তারপর তিনি আলী (রাঃ)-কে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শব্দটি মুছে ফেল। আলী (রাঃ) উত্তর করলেন, আল্লাহর কসম, আমি কখনো এ কথা মুছতে পারবো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন নিজেই চুক্তিপত্রটি হাতে নিলেন। তিনি (আক্ষরিকভাবে) লিখতে জানতেন না, তিনি লিখিয়ে দিলেন যে, মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ এ চুক্তিপত্র সম্পাদন করে দিয়েছে যে, তিনি কোষবদ্ধ তরবারি ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করবেন না। মক্কার অধিবাসীদের কেউ তাঁর সাথে যেতে চাইলেও তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন না। তাঁর সাথীদের কেউ মক্কায় (পুনরায়) অবস্থান করতে চাইলে তিনি তাকে বাধা দেবেন না। (পরবর্তী বছর সন্ধি অনুসারে) যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ অতিক্রম হল তখন মুশরিকরা আলীর কাছে এসে বললো, আপনার সাথী [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ]-কে বলুন যে, নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তাই তিনি যেন আমাদের নিকট থেকে চলে যান। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মতে প্রত্যাবর্তন করলেন। এ সময়ে হামযা (রাঃ)-এর কন্যা চাচা চাচা বলে ডাকতে ডাকতে তার পেছনে ছুটলো। আলী (রাঃ) তার হাত ধরে তুলে নিয়ে ফাতিমা (রাঃ)-কে দিয়ে বললেন, তোমার চাচার কন্যাকে নাও। ফাতিমা (রাঃ) বাচ্চাটিকে তুলে নিলেন। (কাফেলা মদিনা পৌঁছার পর) বাচ্চাটি নিয়ে আলী, যায়িদ ইবনু হারিসা) ও জা’ফর [ইবনু আবূ তালিব (রাঃ)]-এর মধ্যে ঝগড়া আরম্ভ হয়ে গেল। আলী (রাঃ) বললেন, আমি তাকে (প্রথমে) কোলে নিয়েছি এবং সে আমার চাচার কন্যা (তাই সে আমার কাছে থাকবে)! জা’ফর দাবি করলেন, সে আমার চাচার কন্যা এবং তার খালা হল আমার স্ত্রী। যায়িদ [ইবনু হারিসা (রাঃ)] বললেন, সে আমার ভাইয়ের কন্যা (অর্থাৎ সবাই নিজ নিজ সম্পর্কের ভিত্তিতে নিজের কাছে রাখার অধিকার পেশ করলো)। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেয়েটিকে তার খালার জন্য (অর্থাৎ জা’ফরের পক্ষে) ফায়সালা দিয়ে বললেন (আদর ও লালন-পালনের ব্যাপারে) খালা মায়ের সমপর্যায়ের। এরপর তিনি আলীর দিকে লক্ষ্য করে করে বললেন, তুমি আমার এবং আমি তোমার। জা’ফর (রাঃ)-কে বললেন, তুমি দৈহিক গঠন এবং চারিত্রিক গুণে আামার মতো। আর যায়িদ (রাঃ)-কে বললেন, তুমি আমাদের ঈমানী ভাই ও আযাদকৃত গোলাম। আলী (রাঃ) [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে] বললেন, আপনি হামযার মেয়েটিকে বিয়ে করছেন না কেন? তিনি [নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] উত্তরে বললেন, সে আমার দুধ-ভাই (হামযা)-এর মেয়ে।

হাদিস নং - ৩৯২৮
মুহাম্মদ ইবনু রাফি’ ও মুহাম্মদ ইবনু হুসাইন ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উমরা পালনের উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মক্কা অভিমুখে) রওয়ানা করলে কুরায়শী কাফেররা তাঁর এবং বায়তুল্লাহর মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। কাজেই তিনি হুদায়বিয়া নামক স্থানেই কুরবানীর জন্তু যবেহ্ করলেন এবং মাথা মুন্ডন করলেন (হালাল হয়ে গেলেন), আর তিনি তাদের সঙ্গে এই মর্মে চুক্তি সম্পাদন করলেন যে, আগামী বছর তিনি উমরা পালনের জন্য আসবেন। কিন্তু তরবারি ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র সাথে আনবেন না এবং মক্কাবাসীরা যে ক’দিন ইচ্ছা করবে এর বেশি দিন তিনি সেখানে অবস্থান করবেন না। সে মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (পরবর্তী বছর উমরা পালন করতে আসলে) সম্পাদিত চুক্তিনামা অনুসারে তিনি মক্কায় প্রবেশ করলেন। তারপর তিন দিন অবস্থান করলে মক্কাবাসীরা তাঁকে চলে যেতে বলল। তাই তিনি (মক্কা থেকে) চলে গেলেন।

হাদিস নং - ৩৯২৯
উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এবং উরওয়া ইবনু যুবায়র (রাঃ) মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেই দেখলাম আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) আয়িশা (রাঃ)-এর হুজরার কিনারেই বসে আছেন। উরওয়া (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক’টি উমরা আদায় করেছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন, চারটি। এ সময় আমরা (ঘরের ভিতরে) আয়িশা (রাঃ)-এর মিসওয়াক করার আওয়াজ শুনতে পেলাম। উরওয়া (রাঃ) বললেন, হে উম্মুল মু’মিনীন! আবূ আবদুর রহমান [ইবনু উমর (রাঃ)] কি বলছেন, তা আপনি শুনেছেন কি যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি উমরা করেছেন? আয়িশা (রাঃ) উত্তর দিলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কয়টি উমরা আদায় করেছিলেন তার সবটিতেই তিনি ইবনু উমর) তাঁর সাথে ছিলেন। [তাই ইবনু উমর (রাঃ) ঠিকই বলবেন] তবে তিনি রজব মাসে কখনো উমরা আদায় করেননি।

হাদিস নং - ৩৯৩০
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন উমরাতুল কাযা আদায় করছিলেন তখন আমরা তাঁকে মুশরিক ও তাদের যুবকদের থেকে (তাঁর চতুর্দিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে) আড়াল করে রেখেছিলাম যেন তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কোন প্রকার কষ্ট বা আঘাত দিতে না পারে।

হাদিস নং - ৩৯৩১
সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ (উমরাতুল ‘কাযা আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কা) আগমন করলে মুশরিকরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল যে, তোমাদের সামনে এমন একদল লোক আসছে, ইয়াসরিবের জ্বর যাদেরকে দুর্বল করে দিয়েছে। এজন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে প্রথম তিন সাওত বা চক্করে দেহ হেলিয়ে দুলিয়ে চলার জন্য এবং দু’ রুকনের মধ্যবর্তী স্থানে স্বভাবিকভানে চলতে নির্দেশ দেন। অবশ্য তিনি তাঁদেরকে সবকটি চক্করেই হেলে দুলে চলার আদেশ করতেন। কিন্তু তাঁদের প্রতি তাঁর অনুভূতই কেবল তাঁকে এ হুকুম দেওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। অন্য এক সনদে ইবনু সালমা (রহঃ) আইয়ূব ও সাঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)-এর মাধ্যমে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, সন্ধি সম্পাদনের মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভের পরবর্তী বছর যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মক্কায়) আগমন করলেন তখন মুশরিকরা যেন সাহাবীদের দৈহিক-বল অবলোকন করতে পারে এজন্য তিনি তাঁদের বলেছেন, তোমরা হেলেদুলে তাওয়াফ করো। এ সময় মুশরিকরা কুআয়কিআন পাহাড়ের দিক থেকে মুসলমানদেরকে দেখছিল। [১] [১ ] ইয়াসরিব মদিনার পুরাতন নাম। এ এলাকায় দীর্ঘদিন পূর্ব থেকেই এক প্রকার জ্বরের প্রাদুর্ভাব লেগে থাকত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মদিনায় আগমনের পর তাঁর দোয়ার বরকতে সেটি মদিনা তেকে দূর হয়ে গেল। মুশরিকরা ঐ জ্বরের প্রতি ইঙ্গিত করেই বলেছিল মুসলমানরা দুর্বল হয়ে গিয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে রমল করার আদেশ দিলেন যেন তাঁদের শৌর্য-বীর্য অবলোকন করে মুশরিকরা হতভম্ব হয়ে পড়ে। আর যেহেতু তারা কুআয়কিআন পর্বত থেকেই মুসলমানদের দিকে তাকিয়েছিল আর সেখান থেকে দু’ রুকনের মধ্যবর্তী স্থানটি দেখা যেতো না, এ কারণে তিনি সাহাবাদেরকে এ স্থান স্বভাবিক ভাবে হেঁটে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন।

হাদিস নং - ৩৯৩২
মুহাম্মদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বায়তুল্লাহ্ এবং সাফা ও মারওয়া-এর মধ্যখানে এ জন্যই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সায়ী’ করেছিলেন, যেন মুশরিকদেরকে তাঁর শৌর্য-বীর্য অবলোকন করাতে পারেন।

হাদিস নং - ৩৯৩৩
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় মায়মূনা (রাঃ) -কে বিয়ে করেছেন এবং (ইহরাম খোলার পরে) হালাল অবস্থায় তিনি তাঁর সাথে বাসর যাপন করেন। মায়মূনা (রাঃ) (মক্কার নিকটেই) সারিফ নামক স্থানে ইন্তেকাল করেছেন। [ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন] অপর একটি সনদে ইবনু ইসহাক-ইবনু আবূ নাজীহ্ ও আবান ইবনু সালিহ-আতা ও মুজাহিদ (রহঃ)-ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে অতিরিক্ত এতটুকু বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরাতুল কাযা আদায়ের সফরে মায়মূনা (রাঃ) -কে বিয়ে করেছিলেন।

No comments:

Post a Comment

Most Recent Post :-

🌹🌻কেমন_হবে_জান্নাত🌺🌻