Monday, May 27, 2019

অধ্যায় - ৫০ - আম্বিয়া কিরাম (আ.) - ৬ ( হাদিস নং - ৩৬০১-৩৬৬৩ = মোট ৬৪ টি হাদিস)

বুখারী শরীফ সব খণ্ড


بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

অধ্যায় - ৫০ - আম্বিয়া কিরাম (আ.) - ৬
( হাদিস নং - ৩৬০১-৩৬৬৩ = মোট ৬৪ টি হাদিস)


হাদিস নং - ৩৬০১
যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) আব্দুর রাহমান ও ইবনুল মূসা ইয়ার (রহঃ) বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) তাদেরকে বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে হাবাশা (ইথিওপিয়া)-এর বাদশাহ নাজাশীর মৃত্যু সংবাদ সেদিন শোনালেন, যেদিন তিনি মারা গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের (দ্বীনী) ভাই এর জন্য মাগফিরাত কামনা কর। আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে এরূপও বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবা কেরামকে নিয়ে ঈদগাহে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন এবং নাজাশীর উপর জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন এবং তিনি চারবার তাকবীরও উচ্চারণ করলেন।

হাদিস নং - ৩৬০২
আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়ন যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি বললেন, আমরা আগামীকাল খায়েফে বনী কেনানায় অবতরন করব ‘ইনশা আল্লাহ’ যেখানে তারা (কুরাইশ) সকলে কুফর ও শিরক্‌ এর উপর অটল থাকার শপথ গ্রহণ করেছিল।

হাদিস নং - ৩৬০৩
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) বলেন, আমি একদিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি আপনার চাচা আবূ তালিবের কি উপকার করলেন অথচ তিনি (জীবিত থাকাবস্থায়) আপনাকে দুশমনের সকল আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে হিফাজত করেছেন। (আপনাকে যারা কষ্ট দিয়েছে) তাদের বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হতেন। তিনি বললেন, সে জাহান্নামে পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত আগুনে আছে। যদি আমি না হতাম তবে সে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করত।

হাদিস নং - ৩৬০৪
মাহমূদ (রহঃ) ইবনু মূসা ইয়্যাব তার পিতা মূসা ইয়্যাব (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবূ তালিবের মুমূর্ষু অবস্থা তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজানো, ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ কলেমাটি এরবার পড়ুন, তাহলে আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট কথা বলতে পারব। তখন আবূ জেহেল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবূ তালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তাহল, আমি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হলঃ আত্মীয় স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মু’মিনদের পক্ষে সংগত নয়-যখন তা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামী। (৯ তওবা ১১৩) আরো নাযিল হলঃ আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছা করলেই সৎপথে আনতে পারবেন না। (২৮ কাসাস ৫৬)।

হাদিস নং - ৩৬০৫
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছেন, যখন তাঁরই সামনে তাঁর চাচা আবূ তালিবের আলোচনা করা হল, তিনই বললেন, আশা করি কিয়ামতের দিনে আমার সুপারিশ তার উপকারে আসবে। অর্থাৎ আগুনের হালকা স্তরে তাকে নিক্ষেপ করা হবে, যা তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পোঁছাবে এবং তাতে তার মগজ বলকাবে।

হাদিস নং - ৩৬০৬
ইব্‌রাহীম ইবনু হামযা (রহঃ) ইয়াযিদ (রহঃ)-ও এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং আরো বলেছেন, এর তাপে মস্তিষ্কের কেন্দ্র পর্যন্ত বলকাবে।

হাদিস নং - ৩৬০৭
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকায়ের (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছেন, যখন (মিরাজের ব্যাপারে) কুরাইশরা আমাকে অস্বীকার করল, তখন আমি কা’বা শরীফের হিজর অংশের দাঁড়ালাম। আল্লাহ তাআলা তখন আমার সম্মুখে বায়তুল মুকাদ্দাসকে প্রকাশ করে দিলেন, যার ফলে আমি দেখে দেখে বায়তুল মুকাদ্দাসের সমূহ নিদর্শনগুলো তাদের কাছে বর্ণনা করছিলাম।

হাদিস নং - ৩৬০৮
হুদবা ইবনু খালিদ (রহঃ) মালিক ইবনু সা’সা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে যে রাতে তাঁকে ভ্রমণ করানো হয়েছে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদা আমি কা’বা ঘরের হাতিমের অংশে ছিলেম। কখনো কখনো রাবী (কাতাদা) বলেছেন, হিজরে শুয়েছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট এলেন এবং আমার এস্থান থেকে সে স্থানের মধ্যবর্তী অংশটি চিরে ফেললেন। রাবী কাতাদা বলেন, আনাস (রাঃ) কখনো কাদ্দা(চিরলেন) শব্দ আবার কখনো শাক্‌কা (বিদীর্ণ) শব্দ বলেছেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ দ্বারা কী বুঝিয়েছেন? তিনি বললেন, হলকুমের নিম্নদেশ থেকে নাভী পর্যন্ত। কাতাদা (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ)কে এ-ও বলতে শুনেছি বুকের উপরিভাগ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত। তারপর (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আগন্তুক আমার হৃদপিণ্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার হৃদপিণ্ডটি (যমযমের পানি দ্বারা) ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে পুনরায় রেখে দেয়া হল। তারপর সাদা রং এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হল। যা আকারে খচ্চর থেকে ছোট ও গাধা থেকে বড় ছিল? জারূদ তাকে বলেন, হে আবূ হামযা, ইহাই কি বুরাক? আনাস (রাঃ) বললেন, হাঁ। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ প্রান্তে। আমাকে তার উপর সাওয়ার করানো হল। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরাঈলআলাইহি ওয়া সাল্লাম চললেন, প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খোলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, ইনি কে? তিনি বললেন জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। তখন বলা হল, তার জন্য খোশ-আমদেদ, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হল।

আমি যখন পোঁছালাম, তখন তথায় আদম আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাক্ষাত পেলাম। জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর উপরের দিকে চলে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল কে? তিনি বললেন জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তারপর বলা হল- তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর খুলে দেওয়া হল। যখন তথায় পৌঁছালাম। তখন সেখানে ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসাআলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাক্ষাত পেলাম। তাঁরা দু’জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। তিনি(জিবরাঈল) বললেন, এরা হলেন ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসাআলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁদের প্রতি সালাম করুন। তখন আমি সালাম দিলাম। তাঁরা জবাব দিলেন, তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি খোশ-আমদেদ।

এরপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন, সেখানে পৌঁছে জিবরাঈল বললেন খুলে দাও। তাঁকে বলা হল কে? তিনি উত্তর দিলেন, জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর দরজা খুলে দেওয়া হল। আমি তথায় পৌঁছে ইউসুফআলাইহি ওয়া সাল্লাম কে দেখতে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি ইউসুফ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি খোশ-আমদেদ।

তারপর জিবরাঈলআলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করলেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। আর (ফিরিশ্‌তাকে)দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তখন বলা হল- তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তখন খুলে দেওয়া হল।আমি ইদ্রীসআলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে পৌঁছলে জিবরাঈল বললেন, ইনি ইদ্রীস আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি খোশ-আমদেদ।

এরপর তিনি (জিবরাঈল) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করে পঞ্চম আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হল। তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তথায় পৌঁছে হারূন আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি হারূন আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনিও জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি খোশ-আমদেদ।

তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। ফিরিশ্‌তা বললেন, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগন্তুক এসেছেন। তথায় পৌঁছে আমি মূসাআলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পেলাম। জিবরাঈলআলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইনি মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনি জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি খোশ-আমদেদ। আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন? তিনি বললেন আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার উম্মত আমার উম্মত থেকে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।

তারপর জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে নিয়ে আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞাসা করা হল, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছে কি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। আমি সেখানে পৌঁছে ইব্‌রাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে দেখতে পেলাম। জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইনি আপনার পিতা। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি খোশ-আমদেদ।

তারপর আমাকে সিদ্‌রাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম, উহার ফল হাজার অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং তার পাতাগুলি এই হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, এ হল সিদরাতুল মুন্‌তাহা (জড় জগতের শেষ প্রান্ত)। সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দু’টি ছিল অ্যপ্রকাশ্য দু’টি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিব্‌রাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করলাম, এ নহর গুলো কী? অ্যপ্রকাশ্য দু’টি হল জান্নাতের দুইটি নহর। আর প্রকাশ্য দুটি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী। তারপর আমার সামনে ‘আল-বায়তুল মামুর’ প্রকাশ করা হল, এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র পরিবেশন করা হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরাঈল বললেন, এ-ই হচ্ছে ফিতরাত (দ্বীন-ই-ইসলাম)। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর আমার উপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত সালাম ফরয করা হল।

এরপর আমি ফিরে আসলাম। মূসাআলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কী আদেশ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ)-এর আদেশ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে সমর্থ হবে না। আল্লাহর কসম। আমি আপনার আগে লোকদের পরীক্ষা করেছি এবং বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের (বোঝা) হাল্কা করার জন্য আবেদন করুন।

আমি ফিরে গেলাম। ফলে আমার উপর থেকে দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) হ্রাস করে দিলেন। আমি আবার মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ফিরে এলাম তিনি আবার আগের মত বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম।
ফলে আল্লাহ তা’আলা আরও দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। ফিরার পথে মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পৌঁছালে, তিনি আবার পূর্বোক্ত কথা বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম।
আল্লাহ তা’আলা আরও দশ ওয়াক্ত হ্রাস করলেন। আমি মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বললেন আমি আবার ফিরে গেলাম।
তখন আমাকে দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ)-এর আদেশ দেওয়া হয়। আমি (তা নিয়ে) ফিরে এলাম। মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ কথাই আগের মত বললেন।
আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আমাকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ)-এর আদেশ করা হয়। তারপর মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কী আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আমি বললাম, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেও সমর্থ হবে না। আপনার পূর্বে আমি লোকদের পরীক্ষা করেছি। বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরো সহজ করার আবেদন করুন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আমার রবের নিকট (অনেকবার) আবেদন করেছি, এতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এরপর তিনি বললেন, আমি যখন (মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অতিক্রম করে) অগ্রসর হলাম, তখন জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, আমি আমার অবশ্য পালনীয় আদেশটি জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর লঘু করে দিলাম।

হাদিস নং - ৩৬০৯
আল হুমাইদী (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আল্লাহ তা’আলার বানী “আর আমি যে দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি তা কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্য” এর তাফসীরে বলেন, এটি হল চোখের দেখা চাক্ষুস যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সে রাতে দেখানো হয়েছে। যে রাতে তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়েছিল। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) আরো বলেন, কুরআন শরীফে যে আভিশপ্ত বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে, তা হল যাক্‌কুম বৃক্ষ।

হাদিস নং - ৩৬১০
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকায়ের (রহঃ) ‘আবদুল্লাহ ইবনু কা’ব (রহঃ) যিনি কা’ব এর পথ প্রদর্শক ছিলেন যখন কা’ব অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি বলেন, আমি কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ)-কে তাবুক যুদ্ধকালে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাঁর পশ্চাতে থেকে যাওয়ার ঘটনাটি সবিস্তরে বর্ণনা করতে শুনেছি। ইবনু বুকায়র তাঁর বর্ণনায় এ কথাটিও বলেন যে, কা’ব (রাঃ) বলেছেন, আমি ‘আকাবার রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। যখন আমরা ইসলামের উপর অটল থাকার অঙ্গীকার করেছিলাম। সে রাত্রের পরিবর্তে বদর যুদ্ধে উপস্থিত হওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয় নয়, যদিও বদর যুদ্ধ জনগণের মধ্যে ‘আকাবার তুলনায় অধিক আলোচিত ছিল।

হাদিস নং - ৩৬১১
’আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আকাবার রাতে আমার দু’জন মামা আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, ইবনু উয়ায়না বলেন, দু’জন মামার একজন হলেন বারা‘ ইবনু মারূর (রাঃ)।

হাদিস নং - ৩৬১২
ইব্‌রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) ’আতা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জাবির (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা আবদুল্লাহ এবং আমার মামা ‘আকাবায় (বায়’আতে) অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলাম।

হাদিস নং - ৩৬১৩
ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) আবূ ইদরীস আইযুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে বদর যুদ্ধে এবং আকাবার রাতে উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে ছিলেন- তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের একটি দলকে লক্ষ্য করে বললেন, এস তোমরা আমার কাছে একথার উপর বায়’আত কর যে, তোমরা আল্লাহ তা’আলার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, তোমরা চুরি করবেনা, তোমরা ব্যাভিচার করবেনা; তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবেনা, তোমরা (কারো প্রতি) অপবাদ আরোপ করবেনা যা তোমরা নিজে থেকে বানিয়ে নাও, তোমরা নেক কাজে আমার নাফরমানী করবেনা, তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি এসব শর্ত পূরণ করে চলবে সে আল্লাহর পাকের নিকট তার প্রতিদান অবশ্যই পাবে। আর যে এসবের কোন কিছুতে লিপ্ত হয় এবং তাকে এ কারণে দুনিয়াতে আইনানুগ শাস্তি দেয়া হবে, তবে এ শাস্তি তার কাফ্‌ফারা হয়ে যাবে। আর যে ব্যাক্তি এ সবের কোনটিতে লিপ্ত হল আর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে তার ব্যাপারটি আল্লাহ পাকের ওপর ন্যাস্ত। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি দিবেন আর ইচ্ছে করলে মাফ করবেন। উবাদা (রাঃ) বলেন, আমিও এসব শর্তের উপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতে বায়’আত করেছি।

হাদিস নং - ৩৬১৪
কুতায়বা (রহঃ) উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ঐ মনোনীত প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে বায়‘আত গ্রহণ করেছিল। তিনি আরও বলেন, আমরা তাঁর কাছে বায়‘আত গ্রহণ করেছিলাম জান্নাত লাভের জন্য যদি আমরা এই কাজগুলু করি এই শর্তে যে, আমরা আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকেই শরীক করবনা, ব্যাভিচারে লিপ্ত হব না, চুরি করবনা। আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে না হক হত্যা করব না এবং নাফরমানী করব না। আর যদি আমরা এর মধ্যে কোনটিতে লিপ্ত হই, তবে এর ফয়সালা আল্লাহ তা‘আলার উপর ন্যাস্ত।

হাদিস নং - ৩৬১৫
ফারওয়া ইবনু আবূ মাগরা (রহঃ) আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাকে বিবাহ করেন, তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। তারপর আমরা মদিনায় এলাম এবং বনু হারিস গোত্রে অবস্থান করলাম। সেখানে আমি জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এতে আমার চুল পড়ে গেল। (সুস্থ হওয়ার) পরে যখন আমার মাথার চুল জমে উঠল। সে সময় আমি একদিন আমার বান্ধবীদের সাথে দলনায় খেলা করছিলাম। তখন আমার মাতা উম্মে রূমান আমাকে উচ্চস্বরে ডাকলেন। আমি তাঁর কাছে এলাম। আমি বুঝতে পারিনি তার উদ্দেশ্য কি? তিনি আমার হাত ধরে ঘরের দরজায় এসে আমাকে দাড় করালেন। আর আমি হাফাচ্ছিলাম। অবশেষে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা স্থির হল। এরপর তিনি কিছু পানি নিলেন এবং এর দ্বারা আমার মুখমণ্ডল ও মাথা মাসেহ করে দিলেন। তারপর আমাকে ঘরের ভিতর প্রবেশ করালেন। সেখানে কয়েকজন আনসারী মহিলা ছিলেন। তাঁরা বললেন, (তোমার আগমন) কল্যাণময়, বরকতময় এবং সৌভাগ্যময় হউক। আমাকে তাদের কাছে সোপর্দ করে দিলেন। তাঁরা আমার অবস্থান ঠিকঠাক করে দিলেন, তখন ছিল পূর্বাহ্ণ। হঠাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আগমন আমাকে সচকিত করে তুলল। তাঁরা আমাকে তাঁর কাছে সোপর্দ করে দিলেন। সে সময় আমি নয় বছরের বালিকা।

হাদিস নং - ৩৬১৬
মু‘আল্লা (রহঃ) আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন, দু’বার তোমাকে আমায় স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম, তুমি একটি রেশমী বস্ত্রে বেষ্টিত এবং আমাকে বলছে ইনি আপনার স্ত্রী আমি তাঁর ঘুমটা সরিয়ে দেখলাম, সে মহিলা তুমই। তখন আমি(মনে মনে) বলছিলাম, যদি তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তবে তিনি তা কার্যকর করবেন।

হাদিস নং - ৩৬১৭
উবায়েদ ইবনু ইসমাইল (রহঃ) হিশাম এর পিতা থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মদিনার দিকে বেরিয়ে আসার তিন বছর আগে খাদীজা (রাঃ)-এর ওফাত হয়। তারপর দু’বছর অথবা এর কাছাকাছি সময় করে তিনি আয়শা (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। যখন তিনি ছিলেন ছয় বছরের বালিকা, তারপর নয় বছর বয়সে বাসর উদ্‌যাপন করেন।

হাদিস নং - ৩৬১৮
হুমায়দী (রহঃ) আবূ ওয়াইল (রাঃ) বলেন, আমরা পীড়িত খাব্বাব (রাঃ)-কে দেখতে গেলাম। তিনি আমাদেরকে বললেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে হিজরত করেছিলাম- আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। আল্লাহর নিকট আমাদের সাওয়াব রয়েছে। তবে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কোন প্রতিদানের কিছু না নিয়েই চলে গেছেন। এদের মধ্যে ছিলেন মুন‘আব ইবনু উমায়ের (রাঃ)। তিনি ওহোদের দিন শহীদ হন। তিনি একখানা চাঁদর রেখে যান। আমরা যখন (কাফন) হিসেবে এটি দিয়ে তাঁর মাথা ঢেকে দিতাম তখন তাঁর পা বেরিয়ে পড়ত, আর যখন আমরা পা ঢেকে দিতাম, তখন তাঁর মাথা বেরিয়ে পড়ত। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিলেন যে, আমরা যেন তাঁর মাথা ঢেকে দই এবং তাঁর পায়ের উপর কিছু ইয্‌খির(ঘাস) রেখে দই। আর আমাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ রয়েছেন, যাদের ফল পরিপক্ক হয়েছে এবং তাঁরা তা পেড়ে খাচ্ছেন।

হাদিস নং - ৩৬১৯
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) উমর (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, আমলের ফলাফল নির্ভর করে নিয়্যাতের উপর। সুতরাং যার হিজরত হয় দুনিয়া লাভের জন্য কিংবা কোন স্ত্রীলোককে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে, তবে তার হিজরত হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে তার। আর যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এর উদ্দেশ্যে, তবে তাঁর হিজরত হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এরই জন্য।

হাদিস নং - ৩৬২০
ইসহাক ইবনু ইয়াযীদ দামেশ্‌কী (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলতেন, (মক্কা) বিজয়ের পর হিজরতের কোন প্রয়োজন নেই। আওযায়ী ‘আতা (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি উবায়দা ইবনু উমায়র লাইসী (রাঃ)-এর সঙ্গে আয়িশা (রাঃ) এর সাথে সাক্ষত করলাম। তারপর তাঁকে হিজরত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এখন হিজরতের কোন প্রয়োজন নেই। অতীতে মু’মিনদের কেউ তার দ্বীনের জন্য তার প্রতি ফিত্‌নার ভয়ে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি হিজরত করতেন আর আজ আল্লাহ ইসলামকে বিজয়ী করেছেন। এখন কোন মু’মিন তার রবের ইবাদাত যেখানে ইচ্ছে (নির্বিঘ্নে) করতে পারে। তবে জিহাদ ও নিয়্যাত(কল্যাণ ও ফজিলতের) রয়েছে।

হাদিস নং - ৩৬২১
যাকারিয়্যা ইবনু ইয়াহ্‌ইয়া (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খন্দকের যুদ্ধে মারাত্নকভাবে আহত হওয়ার পর) সা’দ (রাঃ) দু’য়া করলেন, ইয়া আল্লাহ আপনি ত জানেন, আমার নিকট আপনার রাহে এ কওমের বিরুদ্ধে, যারা আপনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবিশ্বাস করেছে ও তাঁকে (মাতৃভূমি থেকে) বিতাড়িত করেছে জিহাদ করা এত প্রিয় যতটুকু অন্য কারো বিরুদ্ধে নয়। ইয়া আল্লাহ আমার ধারণা আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যকার লড়াই খতম করে দিয়েছেন। আবান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, সে কাওম যারা তোমের নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – কে অবিশ্বাস করেছে এবং তাকে(স্বদেশ থেকে) বের করে দিয়েছে, তারা কুরাইশ গোত্রেই।

হাদিস নং - ৩৬২২
মাতার ইবনু ফাযল (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে নবুওয়াত দেওয়া হয় চল্লিশ বছর বয়সে, এরপর তিনি তের বছর মক্কায় অবস্থান করেন। এ সময় তাঁর প্রতি ওহী নাযিল হচ্ছিল। তারপর হিজরতের নির্দেশ পান। এবং হিজরতের পর দশ বছর (মদিনায়) অবস্থান করেন। আর তিনি তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

হাদিস নং - ৩৬২৩
মাতার ইবনু ফাযল (রহঃ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় তের বছর অবস্থান করেন। আর তিনি তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

হাদিস নং - ৩৬২৪
ইসমাইল ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে দুটি বিষয়ের একটির ইখতিয়ার দিয়েছেন। তাঁর একটি হল- দুনিয়ার ভোগ-সম্পদ আর একটি হল আল্লাহর নিকট যা রক্ষিত রয়েছে। তখন সে বান্দা আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তাই পছন্দ করলেন। একথা শুনে, আবূ বকর (রাঃ) কেঁদে ফেললেন, এবং বললেন, আমাদের পিতা-মাতাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করলাম। তাঁর অবস্থা দেখে আমরা বিস্মিত হলাম। লোকেরা বলতে লাগল, এ বৃদ্ধের অবস্থা দেখ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বান্দার সম্বন্ধে খবর দিলেন যে, তাকে আল্লাহ পার্থিব ভোগ-সম্পদ দেওয়ার এবং তাঁর কাছে যা হয়েছে, এ দু’য়ের মধ্যে ইখতিয়ার দিলেন আর এই বৃদ্ধ বলছে, আপনার জন্য আমাদের মাতাপিতা উৎসর্গ করলাম। (প্রকৃতপক্ষে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ই হলেন সেই ইখতিয়ার প্রাপ্ত বান্দা। আর আবূ বকর (রাঃ)ই হলেন আমাদের মধ্যে সবচাইতে বিজ্ঞ ব্যাক্তি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যাক্তি তার সহচর্য ও মাল দিয়ে আমার প্রতি সর্বাধিক ইহসান করেছেন তিনি হলেন আবূ বকর (রাঃ)। যদি আমি আমার উম্মতের কোন ব্যাক্তিকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম তাহলে আবূ বকরকেই করতাম। তবে তার সঙ্গে আমার ইসলামী ভ্রাতৃত্বের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মসজিদের দিকে আবূ বকর (রাঃ) এর দরজা ছাড়া অন্য কারো দরজা খোলা থাকবে না।

হাদিস নং - ৩৬২৫
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মাতা পিতাকে কখনো ইসলাম ব্যাতীত অন্য কোন দ্বীন পালন করতে দেখিনি এবং এমন কোন দিন অতিবাহিত হয়নি যেদিন সকালে কিংবা সন্ধ্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়ীতে আসেন নি। যখন মুসলমানগণ (মুশ্‌রিকদের নির্যাতনে) অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন, তখন আবূ বকর (রাঃ) হিজরত করে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। অবশেষে বারকুল গিমাদ (নামক স্থানে) পোঁছালে ইবনু দাগিনার সাথে তাঁর সাক্ষ্যাত হয়। সে ছিল তার গোত্রের নেতা। সে বলল, হে আবূ বকর, কথায় যাচ্ছেন? উত্তরে আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমার স্ব-জাতি আমাকে বের করে দিয়েছে। তাই আমি মনে করছি পৃথিবী ঘুরে বেড়াব এবং আমার প্রতিপালকের ইবাদত করব। ইবনু দাগিনা বলল, হে আবূ বকর (রাঃ) আপনার মত ব্যাক্তি (দেশ থেকে) বের হতে পারে না। আপনি তো নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমদের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানদের মেহমানদারী করে থাকেন, এবং সত্য পথের পথিকদের বিপদ আপদে সাহায্য করেন। সুতরাং আমি আপনাকে আশ্রয় দিচ্ছি, আপনাকে সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতার অঙ্গীকার করছি। আপনি ফিরে যান এবং নিজ শহরে আপনার রবের ইবাদত করুন। আবূ বকর (রাঃ) ফিরে এলেন। তাঁর সঙ্গে ইবনু দাগিনাও এল। ইবনু দাগিনা বিকেল বেলা কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিবর্গের নিকট গেল এবং তাদের বলল, আবূ বকরের মত লোক দেশ থেকে বের হতে পারে না এবং তাকে বের করে দেওয়া যায় না। আপনারা কি এমন ব্যাক্তিকে বের করবেন, যে নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমদের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করন এবং ন্যায়ের উপর থাকার দরুন বিপদ এলে সাহায্য করেন। ইবনু দাগিনার আশ্রয়দান কুরাইশগণ মেনে নিল, এবং তারা ইবনু দাগিনাকে বলল, তুমি আবূ বকরকে বলে দাও, তিনি যেন তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করেন। সালাত (নামায/নামাজ) তথায়ই আদায় করেন, ইচ্ছামাফিক কুরাআন তিলাওয়াত করেন। কিন্তু এর দ্বারা আমাদের যেন কষ্ট না দেন। আর এসব যেন প্রকাশ্যে না করেন। কেননা, আমরা আমাদের মেয়েদের ও ছেলেদের ফিত্‌নায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করি। ইবনু দাগিনাকে আবূ বকরকে (রাঃ)-কে এসব কথা বলে দিলেন। সে মতে কিছুকাল আবূ বকর (রাঃ) নিজের ঘরে তাঁর রবের ইবাদত করতে লাগলেন। সালাত (নামায/নামাজ) প্রকাশ্যে আদায় করতেন না এবং ঘরেই কোরআন তিলওয়াত করতেন।

এরপর আবূ বকরের মনে (একটি মসজিদ নির্মাণের কথা) উদিত হল। তাই তিনি তাঁর ঘরের পাশেই একটি মসজিদ তৈরী করে নিলেন। এতে তিনি সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন এবং কোরআন তিলওয়াত করতেন। এতে তার কাছে মুশরিক মহিলা ও যুবকগণ ভীড় জমাতে লাগল। তারা আবূ বকর (রাঃ)-এর একাজে বিস্মিত হত এবং তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত। আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন একজন ক্রন্দনশীল ব্যাক্তি, তিনি যখন কুরআন পড়তেন তখন তাঁর চোখের অশ্রু সামলিয়ে রাখতে পারতেন না। এ ব্যাপারটি মুশরিকদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের আতঙ্কিত করে তুলল এবং তারা ইবনু দাগিনাকে ডেকে পাঠাল। সে এলে তারা তাকে বলল, তোমার আশ্রয় প্রদানের কারণে আমরাও আবূ বকর কে আশ্রয় দিয়েছিলাম, এই শর্তে যে, তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করবেন কিন্তু সে শর্ত তিনি লংঘন করেছেন। আমাদের ভয় হচ্ছে, আমাদের মহিলা ও সন্তানরা ফিতনায় পড়ে যাবে। কাজেই তুমি তাঁকে নিষেধ করে দাও। তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর গৃহে সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করলে, তিনি তা করতে পারেন। আর যদি তিনি তা অস্বীকার করে প্রকাশ্যে তা করতে চান তবে তাঁকে তোমার আশ্রয় প্রদান ও দায় দায়িত্বকে প্রত্যার্পণ করতে বল। আমরা তোমার আশ্রয় প্রদানের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করাকে অত্যন্ত অপছন্দ করি, আবার আবূ বকরকেও এভাবে প্রকাশ্যে ইবাদত করার জন্য ছেড়ে দিতে পারিনা। আয়শা (রাঃ) বলেন, ইবনু দাগিনা এসে আবূ বকর (রাঃ)-কে বলল, আপনি অবশ্যই জানেন যে, কী শর্তে আমি আপনার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলাম। আপনি হয়ত তাতে সীমিত থাকবেন অন্যথায় আমার জিম্মাদারী আমাকে ফিরত দিবেন। আমি এ কথা আদৌ পছন্দ করিনা যে আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং আমার আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যাক্তির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অপবাদ আরববাসীর নিকট প্রকাশিত হউক। আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, আমি তোমার আশ্রয় তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার আল্লাহর আশ্রয়ের উপরই সন্তুষ্ট আছি। এ সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় ছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের বললেন, আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান (স্বপ্নে) দেখান হয়েছে। সে স্থানে খেজুর বাগান রয়েছে এবং তা দুইটি প্রস্তরময় প্রান্তরে অবস্থিত। এরপর যারা আবিশিনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন, তাদেরও অধিকাংশ সেখান থেকে ফিরে মদিনায় চলে আসলেন।

আবূ বকর (রাঃ) ও মদিনায় দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর। আশা করছি আমাকেও অনুমতি দেওয়া হবে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান! আপনিও কি হজরতের আশা করছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন আবূ বকর (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর সহচর্য লাভের জন্য নিজেকে হিজরত থেকে বিরত রাখলেন এবং তাঁর নিকট যে দু’টি উট ছিল এ দুটি চার মাস পর্যন্ত (ঘরে রেখে) বাবলা গাছের পাতা (ইত্যাদি) খাওয়াতে থাকেন। ইবনু শিহাব উরওয়া (রাঃ) সূত্রে আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ইতিমধ্যে একদিন আমরা ঠিক দুপুর বেলায় আবূ বকর (রাঃ) এর ঘরে বসাছিলাম। এমন সময় এক ব্যাক্তি এসে আবূ বকরকে সংবাদ দিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা ঢাকা অবস্থায় আসছেন। তা এমন সময় ছিল যে সময় তিনি পূর্বে কখনো আমাদের এখানে আসেননি। আবূ বকর (রাঃ) তাঁর আগমন বার্তা শুনে বললেন, আমার মাতাপিতা তাঁর প্রতি কুরবান। আল্লাহর কসম, তিনি এ সময় নিশ্চয় কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কারনেই আসছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৌঁছে (প্রবেশের) অনুমতি চাইলেন। তাঁকে অনুমতি দেওয়া হল। প্রবেশ করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকরকে বললেন, এখানে অন্য যারা আছে তাদের বের করে দাও। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান! এখানেতো আপনারই পরিবার। তখন তিনি বললেন, আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ , আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান! আমি আপনার সফরসঙ্গী হতে ইচ্ছুক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঠিক আছে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার পিতামাতা কুরবান! আমার এ দু’টি উট থেকে আপনি যে কোন একটি গ্রহণ করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ঠিক আছে) তবে মূল্যের বিনিময়ে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমরা তাঁদের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা দ্রুততার সহিত সম্পন্ন করলাম এবং একটি থলের মধ্যে, তাঁদের খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুত করে দিলাম। আমার বোন আসমা বিনতে আবূ বকর (রাঃ) তার কোমর বন্ধের কিছু অংশ কেটে সে থলের মুখ বেঁধে দিলেন। এ কারনেই তাঁকে ‘জাতুন নেতাক’ (কোমর বন্ধ বিশিষ্ট) বলা হত।

আয়শা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ) (রওনা হয়ে) সাওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। তাঁরা সেখানে তিনটি রাত অবস্থান করলেন। আবদুল্লাহ ইবনু আবূ বকর (রাঃ) তাঁদের পাশেই রাত্রি যাপন করতেন। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ। তিনি শেষ রাত্রে ওখান খেকে বেরিয়ে মক্কায় রাত্রি যাপনকারী কুরাইশদের সহিত ভোর বেলায় মিলিত হতেন এবং তাঁদের দু’জনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হত তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, ও স্মরণ রাখতেন। যখন আঁধার ঘনিয়ে আসত তখন তিনি সংবাদ নিয়ে তাঁদের উভয়ের কাছে যেতেন। আবূ বকর (রাঃ)-এর গোলাম আমির ইবনু যুহাইরা তাঁদের কাছেই দুধালো বকরীর পালচড়িয়ে বেড়াত। রাত্রের কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে বকরীর পাল নিয়ে তাঁদের নিকটে যেত এবং তাঁরা দু’জন দুধ পান করে আরামে রাত্রি যাপন করতেন। তাঁরা বকরীর দুধ দোহন করে সাথে সাথেই পান করতেন। তারপর শেষ রাতে আমির ইবনু ফুহাইরা বকরীগুলি হাঁকিয়ে নিয়ে যেত। এ তিনটি রাতের প্রত্যেক রাতে সে এরুপই করল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ) বনী আবদ ইবনু গোত্রের এক ব্যাক্তিকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ‘খির্‌রীত’ পথ প্রদর্শক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। পারদর্শী পথ প্রদর্শককে ‘খির্‌রীত’ বলা হয়।

আদী গোত্রের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। সে ছিল কাফির কুরাইশের ধর্মাবলম্বী। তাঁরা উভয়ে তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাঁদের উট দু’টি তার হাতে দিয়ে দিলেন এবং তৃতীয় রাত্রের পরে সকালে উট দু’টি সাওর গুহার নিকট নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন। আর সে যথা সময়ে তা পৌঁছিয়ে দিল। আর আমির ইবনু ফুহাইরা ও পথ প্রদর্শক তাঁদের উভয়ের সঙ্গে চলল। প্রদর্শক তাঁদের নিয়ে উপকূল পথ ধরে চলতে লাগল। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, আবদুর রাহমান ইবনু মালিক মুদলেজী আমাকে বলেছেন, তিনি সুরাকা ইবনু মালিকের ভ্রাতুষ্পুত্র। তার পিতা তাকে বলেছেন, তিনি সুরাকা ইবনু জু’শুমকে বলতে শুনেছেন যে, আমাদের নিকট কুরাইশ কাফিরদের দূত আসল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ) এ দুই জনের যে কোন একজনকে যে হত্যা অথবা বন্দী করতে পারবে তাকে (একশ উট) পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিল। আমি আমার কওম বনী মুদলীজের এক মজলিসে বসা ছিলাম। তখন তাদের নিকট থেকে এক ব্যাক্তি এসে আমাদের নিকটে দাঁড়াল। আমরা বসাই ছিলাম। সে বলল, হে সুরাকা, আমি এই মাত্র উপকুলের পথে কয়েকজন মানুষকে যেতে দেখলাম। আমার ধারণা এরা মুহাম্মদ ও তাঁর সহগামীগণ হবেন। সুরাকা বললেন, আমি বুঝতে পারলাম যে এঁরা তাঁরাই হবেন। কিন্তু তাকে বললাম, এরা তারা নয়, বরং তুমি অমুক অমুককে দেখেছ। এরা এই মাত্র আমাদের সম্মুখ দিয়ে চলে গেল।

তারপর আমি কিছুক্ষন মজলিসে অবস্থান করে (বাড়ী) চলে এলাম এবং আমার দাসীকে আদেশ করলাম, তুমি আমার ঘোড়াটি বের করে নিয়ে যাও এবং অমুক টিলার আড়ালে ঘোড়াটি ধরে দাঁড়িয়ে থাক। আমি বর্শা হাতে নিলাম এবং বাড়ির পিছন দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বর্শাটির এক প্রান্ত হাতে ধরে অন্য প্রান্ত মাটি সংলগ্ন অবস্থায় আমি টেনে নিয়ে চলছিলাম ঐ অবস্থায় মাটি সংলগ্ন অংশ দ্বারা মাটির উপর রেখাপাত করতে করতে আমার ঘোড়ার নিকট নিয়ে পৌঁছলাম এবং ঘোড়ায় আরোহণ করে তাঁকে খুব দ্রুত ছুটালাম। সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। আমি প্রায় তাঁদের নিকট পৌঁছে গেলাম, এমন সময় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে আমাকে নিয়ে পড়ে গেল। আমিও তাঁর পিঠ থেকে ছিটকে পড়লাম। তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং তুণের দিকে হাত বাড়ালাম এবং তা থেকে তীরগুলু বের করলাম ও তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করে নিলাম যে আমি তাঁদের কোন ক্ষতি করতে পারব কিনা। তখন তীরগুলি দুর্ভাগ্যবশতঃ এমনভাবে বেরিয়ে এল যে, ভাগ্য নির্ধারণের বেলায় এমনটি হওয়া পছন্দ করিনা। আমি পুনরায় ভাগ্য পরীক্ষার ফলাফল অমান্য করে অশ্বারোহণ করে সম্মুখ দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এত নিকটবর্তী হয়ে গেলাম যে তাঁর তিলয়াতের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি (আমার দিকে) ফিরে তাকাচ্ছিলেন কিন্তু আবূ বকর (রাঃ) বার বার তাকিয়ে দেখছিলেন। এমন সময় আমার ঘোড়ার সামনের পা দু’টি হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে গেড়ে গেল এবং আমি তার উপর থেকে পড়ে গেলাম। তখন আমি ঘোড়াকে ধমক দিলাম, সে দাঁড়াতে ইচ্ছা করল, কিন্তু পা দু’টি বের করতে পারছিলনা। অবশেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দু’টি যেস্থানে গেড়ে ছিল সেস্থান থেকে থেকে ধুঁয়ার ন্যায় ধূলি আকাশের দিকে উঠতে লাগল। তখন আমি তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করলাম। এবারও যা আমার অপছন্দনীয় তা-ই প্রকাশ পেল। তখন উচ্চস্বরে তাঁদের নিরাপত্তা চাইলাম। এতে তাঁরা থেমে গেলেন এবং আমি আমার ঘোড়ায় আরোহণ করে এলাম। আমি যখন ইত্যাকার অবস্থায় বার বার বাধাপ্রাপ্ত ও বিপদে পতিত হচ্ছিলাম তখনই আমার অন্তরে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এ মিশনটি অচিরেই প্রভাব বিস্তার করবে।

তখন আমি তাঁকে বললাম আপনার কওম আপনাকে ধরে দিলে পারলে একশ উট পুরষ্কার ঘোষণা করেছে। মক্কায় কাফিরগণ তাঁর সম্পর্কে যে ইচ্ছা করেছে তা তাঁকে জানালাম। এবং আমি তাঁদের জন্য কিছু খাবার ও অন্যানা সামগ্রী পেশ করলাম। তাঁরা তা থেকে কিছুই নিলেননা। আর আমার কাছে এ কথা ছাড়া কিছুই চাইলেন না, আমাদের সংবাদটি গোপন রেখ। এরপর আমি আমাকে একটি নিরাপত্তা লিপি লেখে দেওয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করলাম। তখন তিনি আমের ইবনু ফুহাইরাকে আদেশ করলেন। তিনি একখণ্ড চামড়ায় তা লিখে দিলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা দিলেন।

ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, উরওয়া ইবনু যুবায়র (রাঃ) আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবায়েরর সঙ্গে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাত হয়। তিনি মুসলমানদের একটি বানিজ্যিক কাফেলার সাথে সিরিয়া থেকে ফিরছিলেন। তখন জুবায়ের (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ) কে সাদা রঙের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদিনায় মুসলমানগণ শুনলেন যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনার পথে রওয়ানা হয়েছেন। তাই তাঁরা প্রত্যহ সকালে মদিনার (বাইরে) হার্‌রা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করে থাকতেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তাঁরা ঘরে ফিরে আসেতেন। একদিন তাঁরা পূর্বাপেক্ষা অধিক সময় অপেক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। এমন সময় একজন ইয়াহুদী তার নিজ প্রয়োজনে একটি টিলায় আরোহন করে এদিক ওদিক কি যেন দেখছিল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথী সঙ্গীদেরকে সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় মরীচিকাময় মরুভুমির উপর দিয়ে আগমন করতে দেখতে পেল। ইয়াহুদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে চীৎকার করে বলে উঠল, হে আরব সম্প্রদায়! এইতো সে ভাগ্যবান ব্যাক্তি- যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছ। মুসলমানগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে এবং মদিনার হাররার উপকন্ঠে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে বনী আমর ইবনু আউফ গোত্রে অবতরন করলেন।

এদিনটি ছিল রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার। আবূ বকর (রাঃ) দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরব রইলেন। আনসারদের মধ্য থেকে যাঁরা এ পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দেখেননি তাঁরা আবূ বকর (রাঃ) এর কাছে সমবেত হতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রত্তাপ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামজীর উপর পড়তে লাগল এবং আবূ বকর (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তাঁর চাঁদর দিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপর ছায়া করে দিলেন। তখন লোকেরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে চিনতে পারল।

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনু আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশী সময় অতিবাহিত করলেন, এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা (কুরআনের ভাষায়) তাক্‌ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উঠে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন। লোকেরাও তাঁর সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদিনায় (বর্তমান) মসজিদে নব্বীর স্থানে পৌঁছে উটটি বসে পড়ল। সে সময় ঐ স্থানে কপিতয় মুসলিম সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইবনু যুরারার আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহায়েল নামক দু’জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটটি যখন এস্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন, ইনশাল্লাহ, এ স্থানটিই হবে মানযিল।

তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বালক দু’টিকে ডেকে পাঠালেন এবং মসজিদ নির্মাণের জন্য তাদের নিকট জায়গাটির মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তাঁরা বলল ইয়া রাসুলুল্লাহ! বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনামুল্যে দিচ্ছি। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ থেকে বিনামুল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের থেকে খরিদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মসজিদ নির্মাণ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ নির্মাণ কালে সাহাবাকেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন এবং ইট বহনের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেন এ বোঝা খায়বারের (খাদ্যদ্রব্য) বোঝা নয়। ইয়া রব, এর বোঝা অত্যন্ত পুন্যময় ও পবিত্রে। তিনি আরো বলছিলেন, ইয়া আল্লাহ! পরকালের প্রতিদানই প্রকৃত প্রতিদান। সুরতাং আনসার ও মুজাহিরদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক মুসলিম কবির কবিতা আবৃত্তি করেন, যার নাম আমাকে বলা হয়নি। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কবিতাটি ছাড়া অপর কোন পূর্ণাঙ্গ কবিতা পাঠ করেছেন বলে, কোন বর্ণনা আমার কাছে পৌঁছেনি।

হাদিস নং - ৩৬২৬
আবদুল্লাহ ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) আসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবূ বকর (রাঃ) যখন মদিনায় যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন আমি তাঁদের জন্য সফরের খাদ্য সামগ্রী প্রস্তুত করলাম। আর আমার পিতাকে বললাম, থলের মুখ বেঁধে দেয়ার জন্য আমার কোমরবন্দ ব্যতীত অন্য কিছু পাচ্ছিনা(এখন কি করি) তিনি বললেন, এটি তুমি টুকরো করে নাও। আমি তাই করলাম। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেল, ‘যাতুন্‌ নেতাকাইন’ (কোমরবন্দ দুই ভাগে বিভক্তকারিনী)।

হাদিস নং - ৩৬২৭
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার (রহঃ) বারা‘ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার দিকে যাচ্ছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জুশাম তাঁর পশ্চাঁদ্ধাবন করে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বদ্‌দু‘আ করলেন। ফলে তার ঘোড়াটি তাকেসহ মাটিতে দেবে গেল। তখন সে বলল, আপনি, আল্লাহর কাছে আমার জন্য দু’আ করুন। আমি আপনার কোন ক্ষতি করব না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দু’আ করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিপাসার্ত হলেন। তখন তিনি এক রাখালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন, তখন আমি একটা পেয়ালা নিয়ে এতে কিছু দুধ দোহন করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে নিয়ে এলাম, তিনি এমনভাবে তা পান করলেন যে, আমি তাতে খুশী হলাম।

হাদিস নং - ৩৬২৮
যাকারিয়্যা ইবনু ইয়াহ্‌ইয়া (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তখন তাঁর গর্ভে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়ের, তিনি বলেন, আমি এমন সময় হিজরত করি যখন আমি আসন্ন প্রসবা। আমি মদিনায় এসে কুবাতে অবতরণ করি। এ কুবায়ই আমি পুত্র সন্তানটি প্রসব করি। এরপর আমি তাকে নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে তাঁর কোলে দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনলেন এবং তা চিবিয়ে তার মুখে দিলেন। কাজেই সর্বপ্রথম যে বস্তুটি আবদুল্লাহর পাকস্থলীতে প্রবেশ করল তা হল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর থুথু। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিবান খেজুরের সামান্য অংশ নবজাতকের মুখের ভিতর-এর তালুর অংশে লাগিয়ে দিলেন। এরপর তার জন্য দু’আ করলেন এবং বরকত কামনা করলেন। তিনি হলেন প্রথম নবজাতক সন্তান যিনি(হিজরতের পর) মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। খালিদ ইবনু মাখলদ (রহঃ) উক্ত রেওয়াত বর্ণনায় যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্‌ইয়া (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। এতে রয়েছে যে, আস্মা (রাঃ) গর্ভাবস্থায় হিজরত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে আসেন।

হাদিস নং - ৩৬২৯
কুতায়বা (রহঃ) আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মদিনায় হিজরতের পর) মুসলিম পরিবারে সর্বপ্রথম আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়েরই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা তাকে নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এলেন। তিনি একটি খেজুর নিয়ে তা চিবিয়ে তার মুখে দিলেন। সুতরাং সর্বপ্রথম যে বস্তুটি তার পেটে প্রবেশ করল তা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর থুথু।

হাদিস নং - ৩৬৩০
মুহাম্মদ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় এলেন তখন উঠের পিঠে আবূ বকর (রাঃ) তাঁর পেছনে ছিলেন। আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ ও পরিচিত। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন (দেখতে) জাওয়ান ও অপরিচিত তখন বর্ণনাকারী বলেন, যখন আবূ বকরের সঙ্গে কারো সাক্ষাত হত, সে জিজ্ঞাসা করত হে আব বকর (রাঃ) তোমার সম্মুখে বসা ঐ ব্যাক্তি কে? আবূ বকর (রাঃ) বলতেন তিনি আমার পথ প্রদর্শক। রাবী বলেন, প্রশ্নকারী সাধারণ পথ মনে করত এবং তিনি (আবূ বকর) সত্যপথ উদ্দেশ্যে করতেন। তারপর একবার আবূ বকর (রাঃ) পিছনে তাকিয়ে হটাৎ দেখতে পেলেন একজন অশ্বারোহী তাঁদের প্রায় নিকটে এসে পড়েছে। তখন তিনি বললেন ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এই যে একজন অশ্বারোহী আমাদের পিছনে প্রায় নিকটে পৌঁছে গেছে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনের দিকে তাকিয়ে দু’আ করলেন, ইয়া আল্লাহ! আপনি ওকে পাকড়াও করুন। তৎক্ষণাৎ ঘোড়াটি তাকে নীচে ফেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে হ্রেষা রব করতে লাগল। তখন অশ্বারোহী বলল, ইয়া নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ! আপনার যা ইচ্ছা আমাকে আদেশ করুন।

তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সেখানেই থেমে যাও। কেউ আমাদের দিকে আসতে চাইলে তুমি তাকে বাঁধা দিবে। বর্ণনাকারী বলেন, দিনের প্রথম ভাগে ছিল সে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র বিরুদ্ধে সংগ্রামকারী আর দিনের শেষ ভাগে হয়ে গেল তাঁর পক্ষ থেকে অস্ত্রধারণকারী। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার হারারায় একপাশে অবতরণ করলেন। এরপর আনসারদের সংবাদ দিলেন। তাঁরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন এবং উভয়কে সালাম করে বললেন, আপনারা নিরাপদ এবং মান্য হিসেবে আরোহণ করুন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ) উটে আরোহণ করলেন আর আনসারগণ অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁদের বেষ্টন করে চলতে লাগলেন। মদিনায় লোকেরা বলতে লাগল, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন, লোকজন উচু যায়গায় উঠে তাঁদের দেখতে লাগল। আর বলতে লাগল আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন।

তিনি সামনের দিকে চলতে লাগলেন। অবশেষে আবূ আইয়ুব (রাঃ) এর বাড়ীর পাশে গিয়ে অবতরণ করলেন। আবূ আইয়ুব (রাঃ) ঐ সময় তাঁর পরিবারের লোকদের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। ইতিমধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু সালাম তাঁর আগমনের কথা শুনলেন তখন তিনি তাঁর নিজের বাগানে খেজুর আহরণ করছিলেন। তখন তিনি তাড়াতাড়ি ফল আহরণ করা থেকে বিরত হলেন এবং আহরিত খেজুরসহ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাযির হলেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু কথাবার্তা শুনে নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাদের লোকদের মধ্যে কার বাড়ী এখান থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী? আবূ আইয়ুব (রাঃ) বললেন, ইয়া নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই তো বাড়ী, এই যে তার দরজা। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে চল, আমাদের বিশ্রামের ব্যাবস্থা কর। তিনি বললেন আপনারা উভয়েই চলুন। আল্লাহ বরকত দানকারী।

যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়ী আসলেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) এসে হাযির হলেন এবং বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল আপনি সত্য নিয়ে এসেছেন। ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ইয়াহূদী সম্প্রদায় জানে যে আমি তাদের সর্দার এবং আমি তাঁদের সর্দারের পুত্র। আমি তাদের মধ্যে বেশী জ্ঞানী এবং তাদের বড় জ্ঞানীর সন্তান। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি একথাটা জানাজানি হওয়ার পূর্বে আপনি তাদের ডাকুন এবং আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুণ, আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা অবগত হউন। কেননা তারা যদি জানতে পারে যে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তবে আমার সম্বন্ধে তারা এমন সব অলিক উক্তি করবে যে সব আমার মধ্যে নেই। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইয়াহূদী সম্প্রদায়কে) ডেকে পাঠালেন। তারা এসে তার কাছে হাযির হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়, তোমাদের উপর অভিশাপ! তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, তিনি ছাড়া মাবুদ নেই। তোমরা নিচ্ছয়ই জানো যে আমি সত্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সত্য নিয়েই তোমাদের নিকট এসেছি। সুতরাং তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। তারা উত্তর দিল, আমরা এসব জানিনা। তারা তিনবার একথা বলল। তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) কেমন লোক? তারা উত্তর দিল, তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের নেতার সন্তান। তিনি আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আলিম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আলিমের সন্তান। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমাদের মতামত কি হবে? তারা বলল, আল্লাহ হেফাজত করুন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন তা কিছুতেই হতে পারেনা। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, আচ্ছা বলতো, তিনি যদি মুসলমান হয়েই যান তবে তোমরা কী মনে করবে? তারা বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন, তিনি মুসলমান হয়ে যাবেন ইহা কিছুতেই সম্ভব নয়। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনু সালাম, তুমি এদের সামনে বেরিয়ে আস। তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়! আল্লাহকে ভয় কর। ঐ আল্লাহর কসম, যিনি ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জানো তিনি সত্য রাসুল, হক নিয়েই আগমন করেছেন। তখন তারা বলে উঠল, তুমি মিথ্যা বলছ। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বের করে দিলেন।

হাদিস নং - ৩৬৩১
ইব্‌রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে মুহাজিরদের জন্য চার কিস্তিতে বাৎসরিক চার হাজার দেরহাম ধার্য করলেন, এবং (তাঁর ছেলে) ইবনু উমরের জন্য ধার্য করলেন তিন হাজার পাঁচশ। তাঁকে বলা হল, তিনিও তো মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর জন্য চার হাজার থেকে কম কেন করলেন? তিনি বললেন। সে তো তাঁর পিতামাতার সাথে হিজরত করেছে। কাজেই ঐ ব্যাক্তির সমকক্ষ হতে পারেনা যে একাকী হিজরত করেছে।

হাদিস নং - ৩৬৩২
মুহাম্মদ ইবনু কাসীর ও মূসা’দ্দাদ (রহঃ) খাববাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে হিজ্রত করেছি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য। আমাদের প্রতিদান আল্লাহর নিকটই নির্ধারিত। আমাদের মধ্যে অনেকেই তাঁদের ত্যাগ ও কুরবানীর ফল কেহই ইহজগতে ভোগ না করে আখিরাতে চলে গিয়েছেন; তন্মধ্যে মুসহাব ইবনু উমায়ের (রাঃ) অন্যতম। তিনি ওহোদ যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁকে কাফন দেয়ার জন্য তার একটি চাঁদর চাঁদর ব্যতীত আর অন্য কিছুই আমরা পাচ্ছিলাম না।। আমরা চাঁদরটি দিয়ে তাঁর মাথা আবৃত করলাম তাঁর পা বের হয়ে গেল আর যখন আমরা তাঁর পা ঢেকতে গেলাম তখন তাঁর মাথা বের হয়ে গেল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করলেন, চাঁদরটি দিয়ে তাঁর মাথা ঢেকে দাও এবং পা দু’টির উপর ইয্‌খির ঘাস রেখে দাও। আর আমাদের মধ্যে রয়েছেন যাদের ফল পেকে গেছে এবং এখন তাঁরা তা আহরণ করছেন।

হাদিস নং - ৩৬৩৩
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বিশর (রহঃ) আবূ বুরদা ইবনু আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) আমাকে বললেন, তুমি কি জানো আমার পিতা তোমার পিতাকে কি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আমার পিতা তোমার পিতাকে বলেছিলেন, হে আবূ মূসা, তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট আছ যে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি, তাঁর সঙ্গে হিজরত করেছি, তাঁর সঙ্গে জিহাদ করেছি এবং তাঁর জীবদ্দশায় কৃত আমাদের প্রতিটি আমল যা করেছি তা আমাদের জন্য সঞ্চিত থাকুক। তাঁর ওফাতের পর, আমরা যে সব আমল করেছি, তা (জবাবদিহি) আমাদের জন্য সমান হউক। অর্থাৎ সওয়াবও না হউক আযাবও না হউক। তখন তোমার পিতা আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, না (আমি এতে সন্তুষ্ট নই) কেননা, আল্লাহর কসম, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পর জিহাদ করেছি, সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করেছি এবং বহু নেক আমল করেছি। আমাদের হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গরহণ করেছে। আমরা এসব কাজের সওয়াব-এর আশা রাখিি। তখন আমার পিতা (উমর (রাঃ)) বললেন, কিন্তু আমি ঐ সত্তার কসম, যার হাতে উমরের প্রাণ, এতেই সন্তুষ্ট যে, (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জীবদ্দশায় তাঁর সাথে কৃত আমল)আমাদের জন্য সঞ্চিত থাকুক আর তাঁর ওফাতের পর আমরা যে সব আমল করেছি তা থেকে যেন আমরা অব্যাহতি পাই সমান সমান ভাবে। তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম নিশ্চয়ই তোমার পিতা আমার পিতা থেকে উত্তম।

হাদিস নং - ৩৬৩৪
মুহাম্মদ ইবনু সাব্‌বাহ (রহঃ) আবূ উসমান (রহঃ) বলেন, আমি ইবনু উমর (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তাঁকে বলা হলে, “আপনি আপনার পিতার আগে হিজরত করেছেন” তিনি রাগ করতেন। ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, (প্রকৃত ঘটনা এই যে,)আমি এবং উমর (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খেদমতে হাযির হলাম। তখন তাঁকে কায়লুলা অবস্থায়(দুপুরের বিশ্রাম) পেলাম। কাজেই আমরা আমাদের আবাসস্থলে ফিরে এলাম। কিছুক্ষন পর উমর (রাঃ) আমাকে পাঠালেন এবং বললেন যাও; গিয়ে দেখ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগেছেন কিনা? আমি এসে তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম এবং তাঁর কাছে বায়‘আত করলাম। তারপর উমর (রাঃ) এর কাছে এসে তাঁকে খবর দিলাম যে, তিনি জেগে গেছেন। তখন আমরা তাঁর নিকট গেলাম দ্রুতবেগে। তিনি তাঁর কাছে প্রবেশ করে বায়‘আত করলেন। তারপর আমিও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাতে (দ্বিত্বীয় বার উমর (রাঃ)) বায়‘আত করলাম।

হাদিস নং - ৩৬৩৫
আহমদ ইবনু উসমান (রহঃ) আবূ ইসহাক (রহঃ) বলেন, আমি বারা (রাঃ) –কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) আমার পিতা আযিব (রাঃ) –এর নিকট হাওদা খরিদ করলেন। আমি আবূ বকরের সাথে খরীদা হওদাটি বহন করে নিয়ে চললাম। তখন আমার পিতা আযিব (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর সহিত তাঁর হিজরতের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমাদের অনুসন্ধান করার জন্য মুশরিকরা লোক নিয়োগ করেছিল। অবশেষে আমরা রাত্রিকালে বেরিয়ে পড়লাম এবং একরাত ও একদিন অবিরাম চলতে থাকলাম। যখন দুপুর হয়ে গেল, তখন একটি বিরাটকায় পাথর নযরে পড়ল। আমরা সেটির কাছে এলাম, পাথরটির কিছু ছায়া পড়ছিল। আমি সেখানে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর জন্য আমার সঙ্গের চামড়াখানি বিছিয়ে দিলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর উপর শুয়ে পড়লেন। আমি এদিক-ওদিক পর্যবেক্ষণ করার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। হঠাত্‌ এক বকরী রাখালকে দেখতে পেলাম। সে তার বকরীগুলো নিয়ে আসছে। সেও আমাদের মত পাথরের (ছায়ায়) আশ্রয় নিতে চায়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কার গোলাম? সে বলল, আমি ওমুকের। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বকরীর পালে দুধ আছে কি? সে বলল, হাঁ। আমি বললাম, তুমি কি (আমাদের জন্য) কিছু দোহন করে দিবে? সে বলল, হাঁ। সে তার পাল থেকে একটি বকরী ধরে নিয়ে এল। আমি বললাম, বকরীর স্তন দু’টি ঝেড়ে মুছে সাফ করে নাও। সে একপাত্র ভর্তি দুধ দোহন করল। আমার সাথে একটি পানির পাত্র ছিল। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর জন্য কাপড় দিয়ে তার মুখ বেধে রেখেছিলাম। আমি তা থেকে দুধের মধ্যে কিছু পানি ঢেলে দিলাম। ফলে পাত্রের তলা পর্যন্ত শীতল হয়ে গেল। আমি তা নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর কাছে এসে বললাম, পান করুন ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতখানি পান করলেন যে, আমি সন্তুষ্ট হলাম। এরপর আমরা রওয়ানা হলাম এবং অনুসন্ধানকারী আমাদের পিছনে ছিল। বারা (রাঃ) বলেন, আমি আবূ বকরের সঙ্গে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলাম। তখন দেখলাম তাঁর মেয়ে আয়িশা (রাঃ) বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর জ্বর হয়েছে। তাঁর পিতা আবূ বকর (রাঃ) –কে দেখলাম তিনি মেয়ের গালে চুমু খেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, মা তুমি কেমন আছ?

হাদিস নং - ৩৬৩৬
সুলায়মান ইবনু আবদুর রাহমান (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর খাদেম আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মদিনায়) আগমন করলেন। এই সময় তাঁর সাহাবীদের মধ্যে সাদা কাল চুল বিশিষ্ট আবূ বকর (রাঃ) ব্যতীত অন্য কেউ ছিলেন না। তিনি তাঁর চুলে মেহেদী ও কতম একত্র করে কলপ(এক প্রকার কালো ঘাস) লাগিয়েছিলেন। দোহায়েম অন্য সূত্রে আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এলেন, তখন তাঁর সাহাবীদের মধ্যে আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন সব চাইতে বয়স্ক। তিনি মেহেদী ও কতম একত্র করে কলপ লাগিয়েছিলেন। এতে তাঁর চুল (ও দাঁড়ি) টকটকে লাল রং ধারণ করেছিল।

হাদিস নং - ৩৬৩৭
আসবাগ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) কালব গোত্রের উম্মে বাকর নামে একজন মহিলাকে শাদী করলেন। যখন আবূ বকর (রাঃ) হিজরত করেন, তখন তাকে তালাক দিয়ে যান। তারপর ঐ মহিলাকে তার চাচাত ভাই শাদী করে নিল। এই ব্যাক্তিটই হল সেই কবি যে বদর যুদ্ধে নিহত কুরাইশ কাফিরদের শোকগাঁথা রচনা করেছিল। “বদর প্রান্তে কালীব নামক কূপে নিক্ষিপ্ত ঐ সব কাফিরগণ আজ কোথায় যাদের শিযা নামক কাঠের তৈরী খাদ্য-পাত্রে উটের কুঁজের গোশতে সুসজ্জিত থাকত। বদরের কালীব কূপে নিক্ষিপ্ত ব্যাক্তিগণ আজ কোথায় যারা গায়িকা ও সম্মানিত মদ্যপানকারী নিয়ে নিমগ্ন ছিল। উম্মে বাকর শান্তির স্বাগত জানোাচ্ছে। আর আমার কাওমের(ধবংস হয়ে যাওয়ার) পর আমার জন্য শান্তি কোথায়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেছেন যে, অচিরেই আমাদের জীবিত করা হবে। কিন্তু উড়ে যাওয়া আত্মা ও মাথার খুলীর জীবন কেমন করে?”

হাদিস নং - ৩৬৩৮
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আবূ বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর সঙ্গে (সাওর পর্বতের)গুহায় ছিলাম। আমি আমার মাথা তুলে উপরের দিকে তাকালাম এবং লোকের পা দেখতে পেলাম। তখন আমি বললাম, ইয়া নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ! তাদের কেউ নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবূ বকর! নীরব থাক। আমরা দু’জন আল্লাহ হলেন যাদের তৃতীয়।

হাদিস নং - ৩৬৩৯
আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন বেদুঈন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এল এবং তাঁকে হিজরত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, ওহে! হিজরত বড় কঠীন ব্যাপার। এরপর বললেন তোমার কি উট আছে? সে বলল, হাঁ। তিনি বললেন, তুমি কি উটের সা’দকা আদায় কর? সে বলল হাঁ। তিনি বললেন, তুমি কি উটনীর দুধ অন্যকে পান করতে দাও। সে বলল হাঁ। তিনি বললেন, যেদিন পান করানোর উদ্দেশ্যে উটগুলি ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিন কি তুমি দোহন করে(ফকির মিসকিনদের) দান কর? সে বলল হাঁ। তিনি বললেন, তবে তুমি সমুদ্রের ওপার থেকেই নেক আমল করতে থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার আমলের কিছুই হ্রাস করবেন না।

হাদিস নং - ৩৬৪০
আবূল ওয়ালিদ (রহঃ) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আমাদের মধ্যে (মদিনায়) আগমন করেন মুস’আব ইবনু উমায়ের ও ইবনু উম্মে মাকতুম (রাঃ)। তারপর আমাদের কাছে আসেন, আম্মার ইবনু ইয়াসির ও বিলাল (রাঃ)।

হাদিস নং - ৩৬৪১
মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার (রহঃ) বারা‘ইবনু আযিয (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আমাদের মধ্যে (মদিনায়) আগমন করলেন মুস’আব ইবনু উমায়ের ও ইবনু উম্মে মাকতুম। তারা লোকদের কুরআন পড়াতেন। তারপর আসেলন, বিলাল, সা’দ ও আম্মার ইবনু ইয়াসির এরপর উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বিশজন সাহাবীসহ মদিনায় আসলেন। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন। তাঁর আগমনে মদিনাবাসী যে পরিমাণ আনন্দিত হয়েছিল সে পরিমান আনন্দ হতে কখনো দেখিনি। এমনকি দাসীগণও বলছিল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুভাগমন করেছেন। বারা (রাঃ) বলেন, তাঁর আগমনের আগেই মুফাস্‌সালের কয়েকটি সূরাসহ আমি (আরবি) সূরা পর্যন্ত পড়ে ফেলেছিলাম।

হাদিস নং - ৩৬৪২
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন আবূ বকর ও বিলাল (রাঃ) ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাদেরকে দেখতে গেলাম এবং বললাম, আব্বাজান কেমন আছেন? হে বিলাল, আপনি কেমন আছেন? আবূ বকর (রাঃ) জ্বরাক্রান্ত হলেই এ পংক্তিগুলু আবৃত্তি করতেন। “প্রতিটি ব্যাক্তিকে নিজ পরিবারে সুপ্রভাত বলা হয় অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও অধিক নিকটবর্তী। ” আর বিলাল (রাঃ) এর অবস্থা ছিল এই যখন তাঁর জ্বর ছেড়ে যেত তখন কণ্ঠস্বর উঁচু করে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতেনঃ “হায়, আমি যদি জানতাম আমি ঐ মক্কা উপত্যাকায় পুনরায় রাত্রি যাপন করতে পারব কিনা যেখানে ইয্‌খির ও জলীল ঘাস আমার চারপাশে বিরাজমান থাকত। হায়, আর কি আমার ভাগ্যে জিতবে যে, আমি মাজানো্না নামক কূপের পানি পান করতে পারব! এবং শামা ও তাফিল পাহাড় কি আর আমার দৃষ্টিগোচর হবে!” আয়শা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট গিয়ে এ সংবাদ জানালাম। তখন তিনি দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! মদিনাকে আমাদের প্রিয় করে দাও যেমন প্রিয় ছিল আমাদের মক্কা বরং তার চেয়েও অধিক প্রিয় করে দাও। আমাদের জন্য মদিনাকে স্বাস্থ্যকর বানিয়ে দাও। মদিনার সা ও মুদ এর বরকত দান কর। আর এখাঙ্কার জ্বর রোগকে স্থানান্তর করে জুহ্‌ফায় নিয়ে যাও।

হাদিস নং - ৩৬৪৩
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ‘উহায়দুল্লাহ ইবনু ‘আদী (রহঃ) বলেন, আমি ‘উসমান (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করলাম। তিনি আমার বক্তব্য শোনার পর তাশাহ্‌হুদ পাঠের পর বললেন, আম্মা বা’দু। আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মদ -কে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এর আহবানে সাড়া দিয়েছিলেন, মুহাম্মদ -কে যে সত্যসহ প্রেরণ করে হয়েছিল তৎপ্রতি ঈমান এনেছিলেন আমিও তাঁদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। উভয় হিজরতের(হাবাশায় ও মদিনায়) অংশ গ্রহণ করেছি। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জামাতা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি। আমি তাঁর হাতে বায়‘আত করেছি, আল্লাহর কসম আমি কখনো তাঁর নাফরমানী করিনি তাঁর সাথে প্রতারণামূলক কোন কিছু করিনি। এমতাবস্থায় তাঁর ওফাত হয়েছে। ইসহাক কাল্বী শু‘য়ায়বের অনুসরণ করতঃ যুহরী সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

হাদিস নং - ৩৬৪৪
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু সুলায়মান (রহঃ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, যে বছর উমর (রাঃ) শেষ হাজ্জ (হজ্জ) আদায় করেন সে বছর আবদুর রহমান ইবনু ‘আউফ (রাঃ) মিনায় তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে আসেন এবং সেখানে আমার সাথে তাঁর সাক্ষাত ঘটে। ‘(উমর (রাঃ) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে চাইলে) আবদুল রাহ্মান (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন হাজ্জ (হজ্জ) মওসুমে বুদ্ধিমান ও নিরবোধ সব রকমের মানুষ একত্রিত হয়। তাই আমার বিবেচনায় আপনি ভাষণ দান থেকে বিরত থাকুন। এবং মদিনা গমন করে ভাষণ দান করুন। মদিনা হল দারুল হিজরত, (হিজরতের স্থান) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাতের পবিত্র ভূমি। সেখানে আপনি অনের জ্ঞানী, গুনী ও বুদ্ধিমান লোককে একান্তে পাবেন। ‘উমর (রাঃ) বললেন, মদিনায় গিয়েই সর্বপ্রথম আমার ভাষণটি অবশ্যই প্রদান করব।

হাদিস নং - ৩৬৪৫
মূসা ইবনু ইসমা‘ঈল (রহঃ) খারিজা ইবনু যায়েদ ইবনু সাবিত (রাঃ) বলেন, উম্মুল ‘আলা’ (রাঃ) নামক জনৈক আনসারী মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাতে বায়‘আত করেন। তিনি বর্ণনা করেন, যখন মুহাজিরদের অবস্থানের ব্যাপারে আনসারদের মধ্যে লটারী অনুষ্ঠিত হল তখন উসমান ইবনু মায‘উনের বসবাস আমাদের ভাগে পড়ল। উম্মুল ‘আলা’ (রাঃ) বলেন, এরপর তিনি আমাদের এখানে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি তার সেবা শুশ্রূষা করলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর ওফাত হয়ে গেল। আমরা কাফনের কাফড় পরিয়ে দিলাম। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এখানে তশরীফ আনলেন। ঐ সময় আমি ‘উসমান (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলছিলাম। হে আবূ সায়িব! তোমার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তোমার ব্যাপারে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাকে সম্মানিত করেছেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কেমন করে জানলে যে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, আমার মাতা-পিতা আপনার উপর কুরবান হোক। ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি তো জানিনা। (তবে তাকে যদি সম্মানিত করা না হয়) তবে কাকে আল্লাহ সম্মানিত করবেন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! ‘উসমানের মৃত্যু হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! আমি তার সম্বন্ধে কল্যাণের আশা পোষণ করছি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্তেও জানিনা আল্লাহ তাঁর সাথে কি ব্যাবহার করবেন। উম্মুল ‘আলা’ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, আমি এ কথা শোনার পর আর কাউকে (দৃঢ়তার সহিত) পূত-পবিত্র বলব না। উম্মুল ‘আলা’ (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এ কথা আমাকে চিন্তিত করল। এরপর আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে, ‘উসমান ইবনু মায‘উন (রাঃ) এর জন্য একটি নহর প্রবাহিত রয়েছে। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর নিকট গিয়ে আমার স্বপ্নটি ব্যক্ত করলে তিনি বললেন, এ হচ্ছে তার (নেক) আমল।

হাদিস নং - ৩৬৪৬
উবায়দুল্লাহ ইবনু সা‘ঈদ (রহঃ) আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বু‘আস যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ ছিল যা আল্লাহ তাঁর রাসূল) -এর অনুকূলের তাঁর হিজরতের পূর্বেই সংঘটিত করিয়েছিলেন, যা তাদের (মদিনাবাসীদের) ইসলাম গ্রহণের পক্ষে সহায়ক হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন তাদের গোত্রগুলো ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এবং তাদের অনেক নেতৃবৃন্দ নিহত হয়েছিল।

হাদিস নং - ৩৬৪৭
মূহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবূ বকর (রাঃ) ঈদুল ফিত্‌র অথবা ঈদুল আযহার দিনে তাঁকে দেখতে এলেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশা (রাঃ)-এর গৃহে অবস্থান করছিলেন। ঐ সময় দু‘জন অল্প বয়সী বালিকা এ কবিতাটি উচ্চঃস্বরে আবৃত্তি করছিল যা আন্সারগণ বু‘আস যুদ্ধে আবৃত্তি করেছিল। তখন আবূ বকর (রাঃ) দু‘বার বললেন, এ হল শয়তানের বাদ্যযন্ত্র। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবূ বকর, তাদেরকে ছেড়ে দাও। কেননা প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই ‘ঈদ রয়েছে আর আজকের দিন হল আমাদের ‘ঈদের দিন।

হাদিস নং - ৩৬৪৮
মূসা’দ্দাদ ও ইসহাক ইবনু মানসুর (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন তখন মদিনার উঁচু এলাকার ‘আমর ইবনু ‘আউফ গোত্র অবস্থান করলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, সেখানে তিনি চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি বানু নাজ্জারের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিদের নিকট সংবাদ পাঠালেন। তারা সকলেই তরবারী ঝুলিয়ে উপস্থিত হলেন। আনাস (রাঃ) বলেন সেই দৃশ্য এখনো যেন আমি দেখতে পাচ্ছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবূ বকর (রাঃ) তাঁর পিছনে উপবিষ্ট রয়েছেন, আর বনু নাজ্জারের প্রধানগণ রয়েছেন তাদের পার্শ্বে। অবশেষে আবূ আইয়ুব (রাঃ)-এর বাড়ীর চত্বরে উটটি বসে পড়ল। রাবী বলেন, ঐ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই সালাত (নামায/নামাজ)-এর সময় হত সেখানেই সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে নিতেন। এবং তিনি কোন কোন সময় ছাগল-ভেড়ার খোয়াড়েও সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন। রাবী বলেন, তারপর তিনি মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিলেন। তিনি বনী নাজ্জারের নেতাদের ডাকলেন এবং তারা এলে তিনি বললেন, তোমাদের এ বাগানটি আমার নিকট বিক্রি করে দাও। তারা বলল, আল্লাহর কসম, আমরা বিক্রি করবনা। আল্লাহর কসম-এর বিনিময় আল্লাহর নিকটই চাই। রাবী বলেন এই স্থানে তখন ছিল মুশরিকদের পুরাতন কবর, বাড়ী ঘরের কিছু ভগ্নাবশেষ কয়েকটি খেজুরের গাছ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আদেশে মুশরিকদের কবরগুলি নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হল। ভগ্নাবশেষ সমতল করা হল, খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলা হল। রাবী বলে, কর্তিত খেজুর গাছের কান্ডগুলি মসজিদের কেব্লার দিকে এর খুঁটি হিসেবে এক লাইনে স্থাপন করা হল এবং খুঁটির ফাঁকা স্থানে রাখা হল পাথর। তখন সাহাবায়ে কেরাম পাথর বহন করে আনছিলেন এবং ছন্দ যুক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেনঃ আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদের সঙ্গে ছিলেন এবং বলছেন, হে আল্লাহ! প্রকৃত কল্যাণ একমাত্র আখিরাতের কল্যানই। হে আল্লাহ! তুমি মুহাজির ও আনসারদের সাহায্য কর।

হাদিস নং - ৩৬৪৯
ইব্‌রাহীম ইবনু হামযা (রহঃ) ‘উমর ইবনু আবদুল আযীয (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি সাইব ইবনু উখতে নাম্‌র (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি(মুহাজিরদের হাজ্জ (হজ্জ) সম্পাদানান্তে) মক্কায় অবস্থান সম্পর্কে কি শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি ‘আলা ইবনুল হাযরামী (রাঃ)-এর নিকট শুনেছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুহাজিরদের জন্য তাওয়াফে সদর আদায় করার পর তিন দিন মক্কায় অবস্থান করার অনুমতি রয়েছে।

হাদিস নং - ৩৬৫০
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) বর্ণনা করেন, লোকেরা বছর গণনা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নবুওয়াত লাভের দিন থেকে করেনি এবং তাঁর ওফাত দিবস থেকেও করেনি বরং তাঁর মদিনায় হিজরত থেকে বছর গণনা করা হয়েছে।

হাদিস নং - ৩৬৫১
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) ‘আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রথম অবস্থায় দু‘ দু‘ রাক‘আত করে সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়েছিল। আতঃপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করলেন, ঐ সময় সালাত (নামায/নামাজ) চার রাক‘আত করে দেয়া হয়। এবং সফরকালে পূর্বাবস্থায় অর্থাৎ দু‘রাক‘আত বহাল রাখা হয়। আব্দুর রাজ্জাক (রহঃ) মা‘মর সূত্রে রেওয়াত বর্ণনায় যাদীদ ইবনু যুবার-এর অনুসরণ করেছেন।

হাদিস নং - ৩৬৫২
ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু কায‘আ (রহঃ) সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেন, বিদায় হাজ্জের (হজ্জ) বছর আমি মারাত্নক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে পড়ি তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে আসেন। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার রোগ কি পর্যায়ে পৌছেছে তা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আমি একজন বিত্তবান লোক। আমার ওয়ারিশ হচ্ছে একটি মাত্র কন্যা। আমি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ আল্লাহর রাস্তায় সা’দকা দিব? তিনি বললেন না। আমি বললাম, তবে কি অর্ধেক? তিনি বললেন, হে সা‘দ এক-তৃতীয়াংশ দান কর। এ তৃতীয়াংশই অনেক বেশী। তুমি তোমার সন্তান-সন্ততিদেরকে বিত্তবান রেখে যাও ইহাই উত্তম, এর চাইতে যে তুমি তাদেরকে নিঃস্ব রেখে গেলে যে তারা অন্যের নিকট হাত পেতে ভিক্ষা করে। আহ্‌মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ইব্‌রাহীম (রহঃ) থেকে এ কথাগুলুও বর্ণনা করেছেন। তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের সম্পদশালী রেখে যাবে আর তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা ব্যয় করবে, আল্লাহ তাঁর প্রতিদান তোমাকে দেবে। তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোক্মাটি তুলে দিবে এর প্রতিদানও আল্লাহ তোমাকে দেবে। আমি বললাম, ইয়া আল্লাহ! আমি কি আমার সাথী সঙ্গীদের থেকে পিছনে পড়ে থাকব? তিনি বললেন, তুমি কখনই পিছনে পড়ে থাকবেনা আর এ অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তুমি যে কোন নেক ‘আমল করবে তাহলে তোমার সম্মান ও মর্যাদা আরো বেড়ে যাবে। সম্ভবতঃ তুমি পিছনে থেকে যাবে এবং এর ফলে তোমার দ্বারা অনেক মানুষ উপকৃত এবং অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। হে আল্লাহ! আমার সাহাবীদের হিজরতকে অক্ষুন্ন রাখুন। তাদেরকে পশ্চাৎমুখি করে ফিরিয়ে নিবেন না। কিন্তু অভাবগ্রস্থ সা‘দ ইবনু খওলার মক্কায় মৃত্যুর কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। আহমদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) ও মূসা (রহঃ) ইব্রাহীম সূত্রে বর্ণনা করেছেন, (আরবি)তোমরা উত্তরাধিকারীদের রেখে যাওয়া ।

হাদিস নং - ৩৬৫৩
মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আবদুর রাহমান ইবনু ‘আউফ (রাঃ) যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও সা‘দ ইবনু রাবী‘ আনসারী (রাঃ) এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিলেন। সা‘দ (রাঃ) তাঁর সম্পত্তি ভাগ করে অর্ধেক সম্পত্তি এবং দু‘জন স্ত্রীর যে কোন একজন নিয়ে যাওয়ার জন্য আবদুর রাহমানকে অনুরোধ করলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহ আপনার পরিবারবর্গ ও ধন-সম্পদে বরকত দান করুন। আমাদের স্থানীয় বাজারের রাস্তাটি দেখিয়ে দিন। তিনি (বাজারে গিয়ে ব্যাবসা আরম্ভ করলেন এবং) মুনাফা স্বরূপ কিছু ঘি ও পনীর লাভ করলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাত হল। তিনি তখন তার গায়ে ও কাপড়ে হলুদ রং –এর চিহ্ন দেখতে পেয়ে বললেন, হে আবদুর রাহমান, ব্যাপার কি! তিনি বললেন, আমি একজন আনসারী মহিলাকে বিবাহ করেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তাকে কি পরিমাণ মোহর দিয়েছ? তিনি বললেন, তাকে নাওয়াত(খেজুর বিচি) পরিমাণ স্বর্ণ দিয়েছি। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একটি বকরী দিয়ে হলেও ওয়ালীমা করে নাও।

হাদিস নং - ৩৬৫৪
হামীদ ইবনু ‘উমর (রহঃ) আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ)-এর নিকট নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মদিনায় আগমনের সংবাদ পৌছালে তিনি এসে তাঁকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি। এগুলোর সঠিক উত্তর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কেউ জাননা। (১) কিয়ামতের সর্বপ্রথম ‘আলামত ও লক্ষণ কি? (২) জান্নাতবাসীদের সর্বপ্রথম আহার্য কি? (৩) কি কারণে সন্তান আকৃতিতে কখনও পিতার আনুরূপ কখনো বা মায়ের অনুরূপ হয়? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এবিষয়গুলি সম্পর্কে এইমাত্র জিব্‌রাঈলআলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে জানিয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) একথা শুনে বললেন, তিনই ফিরিশ্‌তাদের মধ্যে ইয়াহূদীদের শত্রু। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (১) কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সর্বপ্রথম লক্ষণ হল লেলীহান আগুন যা মানুষকে পুর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে ধাওয়া করে নিয়ে যাবে এবং সবাইকে সমবেত করবে। (২) সর্বপ্রথম আহার্য যা জান্নাতবাসী ভক্ষণ করবে তা হল মাছের কলীজার অতিরিক্ত অংশ (৩) যদি নারীর আগে পুরুষের বীর্যপাত ঘটে তবে সন্তান পিতার আনুরূপ হয় আর যদি পুরুষের আগে নারীর বির্যপাত ঘটে তবে সন্তান মায়ের অনুরূপ হয়। ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালাম বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , ইয়াহূদীগণ এমন একটি সম্প্রদায় যারা অন্যের কুৎসা রটনায় অত্যন্ত পটু। আমার ইসলাম গ্রহণ প্রকাশ হওয়ার পূর্বে আমার অবস্থা সম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ডাকলেন, তারা হাযির হল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালাম কেমন লোক? তারা বলল, তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সর্বোত্তম ব্যাক্তির সন্তান। তিনি আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাক্তি এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাক্তির পুত্র। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আচ্ছা বলত, যদি ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালাম ইসলাম গ্রহণ কর তবে কেমন হবে? তারা বলল, আল্লাহ একাজ থেকে রক্ষা করুন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার একথাটি বললেন, তারাও পূর্বরূপ উত্তর দিল। তখন ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালাম বেরিয়ে আসলেন, এবং বললেন, (আরবি) ইহা শুনে ইয়াহূদীগণ বলতে লাগল, সে আমাদের মধ্যে মন্দ লোক এবং মন্দ লোকের ছেলে। অতঃপর তারা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে আরো অনেক কথাবার্তা বলল। ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ইহাই আশংকা করছিলাম।

হাদিস নং - ৩৬৫৫
‘আলী ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) ‘আবদুর রাহমান ইবনু মুত্‌‘ঈম (রাঃ) বলেন, আমার ব্যবসায়ের একজন অংশীদার কিছু দিরহাম(রৌপ্য মুদ্রা) বাজারে নিয়ে বাকীতে বিক্রি করে। আমি বললাম, সুবাহানাল্লাহ। এরূপ ক্রয়-বিক্রয় কি জায়িয? তিনিও বললেন, সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহর কসম, আমি ইহা খোলা বাজারে বিক্রি করেছি তাতে কেউ ত আপত্তি করেন নি। এরপর বারা‘ ইবনু ‘আযিব (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন তখন আমরা এরূপ বাকীতে ক্রয়-বিক্রয় করতাম; তখন তিনি বললেন যদি নগদ হয় তবে তাতে কোন বাঁধা নেই। আর যদি ধারে হয় তবে যায়িয হবে না। তুমি যায়েদ ইবনু আরকাম (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞাসা করে নাও। কেননা তিনি আমাদের মধ্যে বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। এরপর আমি যায়েদ ইবনু আরকামকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনিও অনুরূপ বললেন। সুফিয়ান (রহঃ) রাবী হাদীসটি কখনও এরূপ বর্ণনা করেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আমাদের নিকট আসেন, তখন আমরা হাজ্জের (হজ্জ) মৌসুম পর্যন্ত মিয়াদে বাকীতে ক্রয়-বিক্রয় করতাম।

হাদিস নং - ৩৬৫৬
মুসলিম ইবনু ইব্‌রাহীম (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যদি আমার উপর দশজন ইয়াহূদী ঈমান আনত তবে সমগ্র ইয়াহূদী সম্প্রদায়ই ঈমান গ্রহণ করত।

হাদিস নং - ৩৬৫৭
আহ্‌মদ অথবা মুহাম্মদ ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ আল-গুদানী (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের কিছু লোক আশূরা (আশুরা/আসুরা/আসূরা) দিবসকে অত্যন্ত সম্মান করত এবং সেদিন তারা সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করত। এতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইয়াহূদী অপেক্ষা ঐ দিন সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করার আমরা অধিক হকদার। তারপর তিনি সকলকে সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করার আদেশ দিলেন।

হাদিস নং - ৩৬৫৮
যিয়াদ ইবনু আইয়ুব (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্নণা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন দেখতে পেলেন ইয়াহূদীগণ ‘আশূরা (আশুরা/আসুরা/আসূরা) দিবসে সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করে। তাদেরকে সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালনের কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলল, এদিনই আল্লাহ তা‘আলা মূসাআলাইহি ওয়া সাল্লাম ও বনী ইসরাঈলকে ফিরাউনের উপর বিজয় দান করেছিলেন। তাই আমা ঐ দিনের সম্মানার্থে সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করে থাকি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের চাইতে আমরা মূসাআলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালনের আদেশ দেন।

হাদিস নং - ৩৬৫৯
‘আবদান (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুলে সিঁথি না কেটে সোজা পিছনের দিকে ছেড়ে দিতেন। আর মুশরিকগণ তাদের চুলে সিঁথি কাটত। আহলে কিতাব সিঁথি কাটত না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন আদেশ না আসা পর্যন্ত আহলে কিতাবের আনুকরণকে পছন্দ করতেন। তারপর (আদেশ আসলে) তাঁর মাথায় সিঁথি কাটলেন।

হাদিস নং - ৩৬৬০
যিয়াদ ইবনু আইয়ুব (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এরাই তো সেই আহলে কিতাব যারা(তাওরাত ও কুরআনকে) ভাগাভাগি করে ফেলেছে, কিছু অংশের উপর ঈমান এনেছে এবং কিছু অংশকে অস্বীকার করেছে।

হাদিস নং - ৩৬৬১
হাসান ইবনু ‘উমর ইবনু শাকীক (রহঃ) সালমান ফারসী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি(অন্যায়ভাবে) দশজনের অধিক মালিকের হাত বদল হয়েছি।

হাদিস নং - ৩৬৬২
মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ ‘উসমান (রাঃ) বলেন, আমি সালমান (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি; তিনি বলেন, আমি (পারস্যের) রাম হুরমুয শহরের অধিবাসী।

হাদিস নং - ৩৬৬৩
হাসান ইবনু মুদরিক (রহঃ) সালমান ফারসী (রাঃ) বলেন, ‘ঈসা এবং মুহাম্মদ -এর আগমনের মধ্যে ছয়শ’ বছরের ব্যবধান ছিল।

No comments:

Post a Comment

Most Recent Post :-

🌹🌻কেমন_হবে_জান্নাত🌺🌻