বুখারী শরীফ সব খণ্ড
بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
অধ্যায় - ৫১ - মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) - ২
( হাদিস নং - ৩৭৪৬-৩৮৩৯ = মোট ৯৪ টি হাদিস )
হাদিস নং - ৩৭৪৬
ইব্রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধের দিন বলেছেন, এই তো জিবরাঈল, তাঁর ঘোড়ার মাথায় হাত রেখে (লাগাম হাতে) এসে পৌঁছেছেন; তাঁর পরিধানে রয়েছে সমরাস্ত্র।
হাদিস নং - ৩৭৪৭
মুহাম্মদ ইবনু আবদুর রহীম (রহঃ) উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আট বছর পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধের শহীদদের জন্য (কবরস্থানে গিয়ে) এমনভাবে দোয়া করলেন যেমন কোনো বিদায় গ্রহনকারী জীবিত ও মৃতদের জন্য দোয়া করেন। তারপর তিনি (সেখান থেকে ফিরে এসে) মিম্বরে উঠে বললেন, আমি তোমাদের অগ্রে প্রেরিত এবং আমই তোমাদের সাক্ষীদাতা। এরপর হাউযে কাওসারের পাড়ে তোমাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হবে। আমার এ জায়গা থেকেই আমি হাউযে কাওসার দেখতে পাচ্ছি। তোমরা শির্কে লিপ্ত হয়ে যাবে আমি এ আশংকা করি না। তবে আমার আশংকা হয় যে, তোমরা দুনিয়ার আরাম-আয়েশে অত্যধিক আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। বর্ণনাকারী বলেন, আমার এ দেখাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে শেষবারের মত দেখা।
হাদিস নং - ৩৭৪৮
উবায়দুল্লাহ্ ইবনু মূসা (রহঃ) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ঐ দিন (উহুদ যুদ্ধের দিন) আমরা মুশরিকদের মুকাবিলায় অবতীর্ণ হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর) (রাঃ)-কে তীরন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করে তাদেরকে (নির্ধারিত এক স্থানে) মোতায়েন করলেন এবং বললেন, যদি তোমরা আমাদেরকে দেখ যে, আমরা তাদের উপর বিজয় লাভ করেছি, তাহলেও তোমরা এখান থেকে সরবে না। অথবা যদি তোমরা তাদেরকে দেখ যে, তারা আমাদের উপর জয় লাভ করেছে, তাহলেও তোমরা এই স্থান পরিত্যাগ করে আমাদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসবে না। এরপর আমরা তাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে তারা পালাতে আরম্ভ করল। এমনকি আমরা দেখতে পেলাম যে, মহিলাগণ দ্রুত দৌড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছে। তারা বস্ত্র পায়ের গোছা থেকে টেনে তুলছে, ফলে পায়ের অলংকারগুলো পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ছে। এ সময় তারা (তীরন্দাজ বাহিনীর লোকরা) বলতে লাগলেন, এই গনীমত-গনীমত! তখন আবদুল্লাহ [ইবনু জুবাইর (রাঃ)] বললেন, তোমরা যেওন এ স্থান না ছাড় এ ব্যাপারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। তারা এ কথা অগ্রাহ্য করল। যখন তারা এ কথা অগ্রাহ্য করল, তখন তাদের রোখ ফিরিয়ে দেয়া হল এবং শহীদ হলেন তাদের সত্তর জন সাহাবী। আবূ সুফিয়ান একটি উঁচু স্থানে উঠে বলল, কাওমের মধ্যে মুহাম্মদ জীবিত আছে কি? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার কোন উত্তর দিওনা। সে আবার বলল, কাওমের মধ্যে ইবনু আবূ কুহাফা (আবূ বকর) বেঁচে আছে কি? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার কোন জবাব দিও না। সে পুনরায় বলল, কওমের মধ্যে ইবনুল খাত্তাব কি জীবিত আছে? তারপর সে বলল, এরা সকলেই নিহত হয়েছে। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই জবাব দিত। এ সময় উমর (রাঃ) নিজেকে সামলাতে না পেরে বললেন, হে আল্লাহর দুশমন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। যে জিনিসে তোমাকে লাঞ্ছিত করবে আল্লাহ তা বাকি রেখেছেন। আবূ সুফিয়ান বলল, হুবালের জয়। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা তার উত্তর দাও। তারা বললেন, আমরা কি বলব? তিনি বললেন, তোমরা বল- ‘আল্লাহ সুমন্নত ও মহান’। আবূ সুফিয়ান বলল আমাদের উয্যা আছে আছে, তোমাদের উয্যা নেই। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার জবাব দাও। তারা বললেন, আমরা কি জবাব দেব? তিনি বললেন, বল- ‘আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের তো কোনো অভিভাবক নেই’। পরিশেষে আবূ সুফিয়ান বলল, আজকের দিন বদর যুদ্ধের বিনিময়ের দিন, যুদ্ধ কূপ থেকে পানি উঠানোর পাত্রের মত (অর্থাৎ একবার এক হাতে আরেকবার অন্য হাতে) (যুদ্ধের ময়দানে) তোমরা নাক-কান কাটা কিছু লাশ দেখতে পাবে। আমি এরূপ করতে আদেশ করিনি। অবশ্য আমি এতে অসন্তুষ্টও নই। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন কিছু সংখ্যক সাহাবী সকাল বেলা শরাব পান করেছিলেন। ১ এরপর তাঁরা শাহাদাত বরণ করেন। ১/ তখন পর্যন্ত শরাব পান করা হারাম ঘোষিত হয়নি
হাদিস নং - ৩৭৪৯
আবদান (রহঃ) সা’দ ইবনু ইব্রাহীমের পিতা ইব্রাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ)- এর নিকট কিছু খাবার আনা হল। তিনি তখন রোযা ছিলেন। তিনি বললেন, মুসআব ইবনু উমাইর (রাঃ) ছিলেন আমার থেকেও উত্তম ব্যাক্তি। তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন। তাঁকে এমন একটি চাঁদরে কাফন দেয়া হয়েছিল যে, তা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় তিনি এ কথাও বলেছিলেন যে, হামযা (রাঃ) আমার চেয়েও উত্তম লোক ছিলেন। তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন। এরপর দুনিয়াতে আমাদেরকে যথেষ্ট সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেয়া হয়েছে অথবা বলেছেন পর্যাপ্ত পরিমাণে দুনিয়ার ধন-সম্পদ দেওয়া হয়েছে। আমার আশংকা হচ্ছে, হয়তো আমাদের নেকীর বদলা এখানেই (দুনিয়াতে) দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর তিনি কাঁদতে লাগলেন, এমনকি আহার্য পরিত্যাগ করলেন।
হাদিস নং - ৩৭৫০
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বললেন, আপনি কি মনে করেন, আমি যদি শহীদ হয়ে যাই তাহলে আমি কোথায় অবস্থান করব? তিনি বললেন, জান্নাতে। তারপর উক্ত ব্যাক্তি হাতের খেজুরগুলো ছুঁড়ে ফেললেন, এরপর তিনি একাই লড়াই করলেন। অবশেষে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।
হাদিস নং - ৩৭৫১
আহমাদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) খাব্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে (মদিনায়) হিজরত করেছিলাম। ফলে আল্লাহর কাছে আমাদের পুরস্কার সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। আমাদের কতক দুনিয়াতে পুরস্কার ভোগ না করেই অতীত হয়ে গিয়েছেন অথবা চলে গিয়েছেন। মাসআব ইবনু উমাইর (রাঃ) তাদের মধ্যে একজন। তিনি উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছেন। তিনি একটি ধারাদার পশমী বস্ত্র ব্যতীত আর কিছুই রেখে যাননি। এ দিয়ে আমরা তার মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত এবং পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন। ইয্খির দ্বারা তার পা আবৃত কর। আমাদের কতক এমনও আছেন, যাদের ফল পেকেছে এবং তিনি এখন তা সংগ্রহ করছেন।
হাদিস নং - ৩৭৫২
হাস্সান ইবনু হাস্সান (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেছেন), তাঁর চাচা [আনাস ইবনু নযর (রাঃ)] বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি [আনাস ইবনু নযর (রাঃ)] বলেছেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর সর্বপ্রথম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। যদি আল্লাহ তা’আলা আমাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে কোনো যুদ্ধে শরীক করেন তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দেখবেন, আমি কত প্রাণপণ চেষ্টা করে লড়াই করি। এরপর তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হওয়ার পর লোকেরা পরাজিত হলে (পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে আরম্ভ করলো) তিনি বললেন। আমি এর জন্য আপনার নিকট ওযরখাহী পেশ করেছি এবং মুশরিকগণ যা করল তা থেকে আমি আমার সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করছি। এরপর তিনি তলোয়ার নিয়ে অগ্রসর হলেন। এ সময় সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হল। তিনি বললেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ হে সা’দ? আমি উহুদের অপর প্রান্ত হতে জান্নাতের সুঘ্রান পাচ্ছি। এরপর তিনি (বীর বিক্রমে) যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করলেন। তাঁকে চেনা যাচ্ছিল না। অবশেষে তাঁর বোন তাঁর শরীরের একটি তিল অথবা অঙ্গুলীর মাথা দেখে তাঁকে চিনলেন। তাঁর শরীরে আশিটিরও বেশি বর্শা, তরবারি ও তীরের আঘাত ছিল।
হাদিস নং - ৩৭৫৩
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কুরআন মজীদকে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার সময় সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমি হারিয়ে ফেলি, যা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে পাঠ করতে শুনতাম। তাই আমরা উক্ত আয়াতটি অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে তা পেলাম খুযায়মা ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ)-এর কাছে। আয়াতটি হলঃ “মু’মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত অংগীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ রয়েছে প্রতীক্ষায়। (৩৩:২৩) এরপর এ আয়াতটিকে আমরা কুরআন মাজীদের ঐ সূরাতে (আহযাবে) সংযুক্ত করে নিলাম।
হাদিস নং - ৩৭৫৪
আবূল ওয়ালীদ (রহঃ) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদের উদ্দেশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলে যারা তাঁর সংগে বের হয়েছিল, তাদের কিছুসংখ্যক লোক ফিরে এলো। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণ তাদের সম্পর্কে দু’দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একদল বললেন, আমরা তাদের সাথে লড়াই করব। অপরদল বললেন, আমরা তাদের সাথে লড়াই করব না। এ সময় নাযিল হয় (নিম্নবর্ণিত আয়াতখানা) “তোমাদের কী হল যে, তোমরা মুনাফিকদের সম্বন্ধে দু’দল হয়ে গেলে, যখন তাদের কৃতকর্মের দরুন আল্লাহ তাদেরকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। (৪:৮৮) এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ (মদিনা) পবিত্র স্থান। আগুন যেমন রূপার ময়লা দূর করে দেয়, এমনিভাবে মদিনাও গুনাহ্কে দূর করে দেয়।
হাদিস নং - ৩৭৫৫
মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যখন তোমাদের মধ্যে দু’দলের সাহস হারাবার উপক্রম হয়েছিল” আয়াতটি আমাদের সম্পর্কে তথা বনূ সালিমা এবং বনূ হারিসা সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আয়াতটি নাযিল না হোক এ কথা আমি চাইনি। কেননা এ আয়াতেই আল্লাহ্ বলেছেন, আল্লাহ্ উভয় দলেরই সহায়ক।
হাদিস নং - ৩৭৫৬
কুতায়বা (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে জাবির! তুমি বিয়ে করেছ কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, কেমন, কুমারী না অকুমারী? আমি বললাম, না (কুমারী নয়) বরং অকুমারী। তিনি বললেন, কোনো কুমারী মেয়েকে বিয়ে করলে না কেন? সে তো তোমার সাথে আমোদ-প্রমোদ করত। আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আমার আব্বা উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছেন। এবং রেখে গেছেন নয়টি মেয়ে। এখন আমার নয় বোন। এ কারণে আমি তাদের সাথে তাদেরই মত একজন অনভিজ্ঞ মেয়েকে এনে একত্রিত করা পছন্দ করলাম না। বরং এমন একটি মহিলাকে (বিয়ে করা পছন্দ করলাম) যে তাদের চুল আঁচড়িয়ে দিতে পারবে এবং তাদের দেখাশোনা করতে পারবে। (এ কথা শুনে) তিনি বলেছেন, ঠিক করেছ।
হাদিস নং - ৩৭৫৭
আহমাদ ইবনু আবূ সুরাইজ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উহুদ যুদ্ধের দিন তার পিতা ছয়টি মেয়ে ও কিছু ঋণ তার উপর রেখে শাহাদাত বরণ করেন। এরপর যখন খেজুর কাটার সময় এল তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললাম, আপনি জানেন যে, আমার পিতা উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এবং বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা রেখে গেছেন। এখন আমি চাই, ঋণদাতাগণ আপনাকে দেখুক। তখন তিনি বললেন, তুমি যাও এবং বাগানের এক কোণে সব খেজুর কেটে জমা কর। [জাবির (রাঃ) বলেন] আমি তাই করলাম। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ডেকে আনলাম। যখন তারা (ঋণদাতাগণ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দেখলেন, সে মুহূর্তে যেন তারা আমার উপর আরো ক্ষেপে গেলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আচরণ দেখে বাগানের বড় গোলাটির চতুষ্পার্শে তিনবার চক্কর দিয়ে এর উপর বসে বললেন, তোমার ঋণদাতাদের ডাক। (তারা এলে) তিনি তাদেরকে মেপে মেপে দিতে লাগলেন। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা আমার পিতার আমানত আদায় করে দিলেন। আমিও চাচ্ছিলাম যে, একটি খেজুর নিয়ে আমি আমার বোনদের নিকট না যেতে পারলেও আল্লাহ তা’আলা যেন আমার পিতার আমানত আদায় করে দেন। অবশ্য আল্লাহ তা’আলা খেজুরের সবকটি গোলাই অবশিষ্ট রাখলেন। এমনকি আমি দেখলাম যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে গোলার উপর বসা ছিলেন তার থেকে যেন একটি খেজুরও কমেনি।
হাদিস নং - ৩৭৫৮
আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে আমি আরো দুই ব্যাক্তিকে দেখলাম, যারা সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পক্ষ হয়ে তুমুল লড়াই করেছে। আমি তাদেরকে পূর্বেও কোনোদিন দেখিনি এবং কোনোদিন দেখিনি।
হাদিস নং - ৩৭৫৯
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য তাঁর তীরদানী থেকে তীর খুলে দিয়ে বললেন, তোমার জন্য আমার মাতা- পিতা কুরবান হোক; তুমি তীর নিক্ষেপ করতে থাক।
হাদিস নং - ৩৭৬০
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উদ্দেশ্যে তাঁর পিতা-মাতাকে এক সাথে উল্লেখ করেছেন।
হাদিস নং - ৩৭৬১
কুতায়বা (রহঃ) সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধের দিন আমার জন্য তাঁর পিতা-মাতা উভয়কে একসাথে উল্লেখ করেছেন। এ কথা বলে তিনি বোঝাতে চান যে, তিনি লড়াই করেছিলেন এমতাবস্থায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছেন, তোমার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক।
হাদিস নং - ৩৭৬২
আবূ নুআয়ম (রহঃ) আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সা’দ (রাঃ) ব্যতীত অন্য কারো জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে তাঁর পিতা-মাতা (কুরবান হোক) এক সাথে উল্লেখ করতে আমি শুনিনি।
হাদিস নং - ৩৭৬৩
ইয়াসারা ইবনু সাফওয়ান (রহঃ) আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মালিক (রাঃ) ব্যতীত অন্য কারো জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তাঁর পিতা-মাতা (কুরবান হোক)’র কথা উল্লেখ করতে আমি শুনিনি। উহুদ যুদ্ধের দিন আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, হে সা’দ, তুমি তীর নিক্ষেপ কর, আমার পিতা-মাতা তোমার জন্য কুরবান হোক।
হাদিস নং - ৩৭৬৪
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আবূ উসমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে দিনগুলোতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ করেছেন তার কোনো এক সময়ে তালহা এবং সা’দ (রাঃ) ব্যতীত (অন্য কেউ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলেন না। হাদীসটি আবূ উসমাস (রাঃ) তাদেরকে উভয়ের নিকট থেকে শুনে বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৭৬৫
আবদুল্লাহ ইবনু আবূল আসওয়াদ (রহঃ) সায়েব ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনু ‘আউফ, তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ্, মিকদাদ এবং সা’দ (রাঃ)-এর সাহচর্য লাভ করেছি। তাদের কাউকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনিনি, তবে কেবল তালহা (রাঃ)-কে উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে বর্ণনা করতে শুনেছি।
হাদিস নং - ৩৭৬৬
আবদুল্লাহ ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) কায়িস (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তালহা (রাঃ)-এর হাত অবশ (অবস্থায়) দেখেছি। উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি এ হাত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৭৬৭
আবূ মা’মার (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন লোকজন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ছেড়ে যেতে আরম্ভ করলেও আবূ তালহা (রাঃ) ঢাল হাতে দাঁড়িয়ে তাঁকে আড়াল করে রাখলেন। আবূ তালহা (রাঃ) ছিলেন সুদক্ষ তীরন্দাজ, ধনুক খুব জোরে টেনে তিনি তীর ছুঁড়তেন। সেদিন (উহুদ যুদ্ধে) তিনি দু’টি অথবা তিনটি ধনুক ভেঙ্গেছিলেন। সেদিন যে কেউ ভরা তীরদানী ণীয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তাকেই তিনি বলেছেন, তীরগুলো খুলে আবূ তালহার সামনে দেখে দাও। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা উঁচু করে যখনই শত্রুদের প্রতি তাকাতেন, তখনই আবূ তালহা (রাঃ) বলতেন, আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি মাথা উঁচু করবেন না। হঠাৎ তাদের নিক্ষিপ্ত তীর আপনার শরীরে লেগে যেতে পারে। আপনার বক্ষ রক্ষা করার জন্য আমার বক্ষই রয়েছে (অর্থাৎ আপনার জন্য আমার জীবন কুরবান)। [আনাস (রাঃ) বলেন] সেদিন আমি আয়িশা বিনত আবূ বকর এবং উম্মে সুলায়ম (রাঃ)-কে দেখেছি, তাঁরা উভয়েই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাঁদের পায়ের তলা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভরে পিঠে বহন করে পানি আনতেন এবং (আহত) লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার চলে যেতেন এবং মশক ভরে পানি এনে লোকেদের মুখে ঢেলে দিতেন। সেদিন আবূ তালহা (রাঃ)-এর হাত দু’বার অথবা তিনবার তরবারিটি পড়ে গিয়েছিল।
হাদিস নং - ৩৭৬৮
উবায়দুল্লাহ্ ইবনু সাঈদ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধে মুশরিকরা পরাজিত হয়ে গেলে অভিশপ্ত ইবলীস চীৎকার করে বলল, হে আল্লাহর বান্দ্বারা, তোমাদের পেছন দিক থেকে আরেকটি দল আসছে। এ কথা শুনে তারা পেছনের দিকে ফিরে গেল। তখন অগ্রভাগ ও পশ্চাঁদভাগের মধ্যে পরস্পর সংঘর্ষ হল। এ পরিস্থিতিতে হুযায়ফা (রাঃ) দেখতে পেলেন যে, তিনি তাঁর পিতা ইয়ামন (রাঃ)-এর সাথে লড়াই করছেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ, (ইনি তো) আমার পিতা, আমার পিতা (তাকে আক্রমণ করবেন না)। বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম, এতে তাঁরা বিরত হলেন না। বরং তাঁকে হত্যা করে ফেললেন। তখন হুযায়ফা (রাঃ) বললেন, আল্লাহ আপনাদেরকে ক্ষমা করে দিন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহর সাথে মিলনের (মৃত্যুর) পূর্ব পর্যন্ত হুযায়ফা (রাঃ)-এর মনে এ ঘটনার অনুতাপ বাকি ছিল।
হাদিস নং - ৩৭৬৯
আবদান (রহঃ) উসমান ইবনু মাওহাব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাজ্জ (হজ্জ) পালনের উদ্দেশ্য এক ব্যাক্তি বায়তুল্লায় এসে সেখানে একদল লোককে বসা অবস্থায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এসব লোক কারা? তারা বললেন, এরা হচ্ছেন কুরাইশ গোত্রের লোক। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এ বৃদ্ধ লোকটি কে? উপস্থিত সকলেই বললেন, ইনি হচ্ছেন (আবদুল্লাহ) ইবনু উমর (রাঃ)। তখন লোকটি তাঁর ইবনু উমর) কাছে গিয়ে বললেন, আমি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করব, আপনি আমাকে বলে দেবেন কি? এরপর লোকটি বললেন, আমি আপনাকে এই ঘরের মর্যাদার কসম দিয়ে বলছি, উহুদ যুদ্ধের দিন উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) পেলিয়েছিলেন, এ কথা আপনি জানেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বললেন, তিনি বদরের রণাংগনে অনুপস্থিত ছিলেন, যুদ্ধে অংশগ্রহন করেননি- এ কথাও কি আপনি জানেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকটি পুনরায় বললেন, তিনি বায়আতে রিদওয়ানেও অনুপস্থিত ছিলেন- এ কথাও কি আপনি জানেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি তখন আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করল। তখন ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, এসো, এখন আমি তোমাকে সব ব্যপারে অবহিত করছি এবং তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর খুলে বলছি। (১) উহুদের রনাঙ্গন থেকে তাঁর পেলানোর ব্যাপার সম্বন্ধে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। (২) বদর যুদ্ধে তাঁর অনুপস্থিত থাকার কারণ হচ্ছে এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যা (রুকাইয়া) তাঁর স্ত্রী ছিলেন। তিনি ছিলেন অসুস্থ। তাই তাঁকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মত তুমি সওয়াব লাভ করবে এবং গনীমতের অংশ পাবে। (৩) বাইআতে রিদওয়ান থেকে তাঁর অনুপস্থিত থাকার কারণ হল এই যে, মক্কাবাসীদের নিকট উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) থেকে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যাক্তি থাকলে অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মক্কা পাঠাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জন্য উসমান (রাঃ)-কে (মক্কা) পাঠালেন। তাঁর মক্কা গমনের পরই বায়আতে রিদওয়ান সংঘটিত হয়েছিল। তাই (বায়আত গ্রহণের সময়) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান হাতখানা অপর হাতের উপর রেখে বলেছিলেন, এটাই উসমানের হাত। এরপর তিনি (আবদুল্লাহ ইবনু উমর) বললেন, এই হল উসমান (রাঃ)-এর অনুপস্থিতির মূল কারণ। এখন তুমি যাও এবং এই কথাগুলো মনে গেঁথে রেখো।
হাদিস নং - ৩৭৭০
আমর ইবনু খালিদ (রহঃ) বারা ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধের দিন আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়র (রাঃ)- কে পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তারা পরাজিত হয়ে (মদিনার দিকে) ছুটে গিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর তাদেরকে পেছনের দিক থেকে ডাকা।
হাদিস নং - ৩৭৭১
ইয়াহ্ইয়া ইবনু আবদুল্লাহ সুলামী (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ফজরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর শেষ রাকাতে রুকূ থেকে মাথা উত্তোলন করে “সামি’আল্লাহু লিমান হামিদা ও রাব্বানা লাকাল হা’মদ” বলার পর বলতে শুনেছেন, হে আল্লাহ আপনি অমুক, অমুক এবং অমুকের উপর লানত বর্ষণ করুন, তখন আল্লাহ নাযিল করলেন, তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দেবেন, এ বিষয়ে আপনার করণীয় কিছুই নেই। কারণ তারা যালিম। হানজালা (রহঃ) সালিম ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া, সুহাইল ইবনু আমর এবং হারিস ইবনু হিশামের জন্য বদদোয়া করতেন। এ প্রেক্ষিতেই নাযিল হয়েছে উপরোক্ত আয়াতখানা।
হাদিস নং - ৩৭৭২
ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) সা’লাবা ইবনু আবূ মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) কতকগুলো চাঁদর মদিনাবাসী মহিলাদের মধ্যে বন্টন করলেন। পরে একটি সুন্দর চাঁদর অবশিষ্ট রয়ে গেল। তার নিকট উপস্থিত লোকদের একজন বলে উঠলেন, হে আমীরুল মু’মিনীন, এ চাঁদরখানা আপনার স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর নাতনী আলী (রাঃ)-এর কন্যা উম্মে কুলসুম (রাঃ)-কে দিয়ে দিন। উমর (রাঃ) বললেন, উম্মে সালীত (রাঃ) তার চেয়েও অধিক হকদার। উম্মে সালীত (রাঃ) আনসারী মহিলা। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছেন। উমর (রাঃ) বললেন, উহুদের দিন এ মহিলা আমাদের জন্য মশক ভরে পানি এনেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৭৭৩
আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) জাফর ইবনু আমর ইবনু উমাইয়া যামরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উবায়দুল্লাহ ইবনু আদী ইবনু খিয়ার (রহঃ)-এর সাথে ভ্রমণে বের হলাম। আমরা যখন হিম্স নামক স্থানে পৌঁছলাম তখন উবায়দুল্লাহ্ (রহঃ) আমাকে বললেন, ওয়াহ্শীর কাছে যেতে তোমার ইচ্ছা আছে কি? আমরা তাকে হামযা (রাঃ)-এর শাহাদাত বরণ করার ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব। আমি বললাম, হ্যাঁ যাব। ওয়াহ্শী তখন হিম্স শহরে বসবাস করতেন। আমরা তার সম্পর্কে (লোকদেরকে) জিজ্ঞেস করলাম। আমাদের কে বলা হল ঐ তো তিনি তার প্রাসা’দর ছায়ার মধ্যে পশমহীন মশকের মত স্থির হয়ে বসে আছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা গিয়ে তার থেকে অল্প কিছু দূরে গিয়ে থামলাম এবং তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমাদের সালামের উত্তর দিলেন। , জাফর (রহঃ) বর্ণনা করেন, তখন উবায়দুল্লাহ্ (রহঃ) তার মাথা পাগড়ি দ্বারা এমনভাবে আবৃত করে রেখেছিলেন যে, ওয়াহ্শী তার দুই চোখ এবং দুই পা ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। এমতাবস্থায় উবায়দুল্লাহ্ (রহঃ) ওয়াহ্শীকে লক্ষ্য করে বললেন, হে ওয়াহ্শী আপনি আমাকে চিনেন কি? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তখন তার দিকে তাকালেন এবং এরপর বললেন, না, আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে চিনি না। তবে আমি এটুকু জানি যে, আদী ইবনু খিয়ার উম্মে কিতাল বিন্ত আবূল ঈস নামক এক মহিলা কে বিয়ে করেছিলেন। মক্কায় তার একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করলে আই তার দাই খোঁজ করেছিলাম, তখন ঐ বাচ্চাকে নিয়ে তার মায়ের সাথে গিয়ে ধাত্রীমাতার কাছে তাকে সোপর্দ করলাম। সে দিনের সে বাচ্চার পা দু’টির মত যেন আপনার পা দু’টি দেখতে পাচ্ছি। বর্ণনাকারী বললেন, তখন উবায়দুল্লাহ্ তার মুখের পর্দা সরিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হামযা (রাঃ)-এর শাহাদাত সম্পর্কে আমাদেরকে খবর দেবেন কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বদর যুদ্ধে হামযা (রাঃ) তুআইমা ইবনু ‘আদী ইবনু খিযারকে হত্যা করেছিলেন। তাই আমার মনিব জুবায়র ইবনু মুতঈম আমাকে বললেন, তুমি যদি আমার চাচার প্রতিশোধস্বরুপ হামযা-কে হত্যা করতে পার তাহলে তুমি আযাদ। রাবী বলেন, যে বছর উহুদ পাহাড় সংলগ্ন আইনাইন পাহাড়ের উপত্যকায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সে যুদ্ধে আমি সকলের সাথে রওয়ানা হয়ে যাই। এরপর লড়াইয়ের জন্য সকলেই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালে (কাফির সৈন্যদলের মধ্য থেকে) সিবা নামক এক ব্যাক্তি ময়দানে এসে বলল, দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য কেউ কি প্রস্তুত আছ? ওয়াহ্শী বলেন, হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) (বীর বিক্রমে) তার সামনে গিয়ে বললেন, হে মেয়েদের খতনাকারিণী উম্মে আনমারের পুত্র সিবা! তুমি কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এর সাথে দুশমনী করছ? বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তিনি তার উপর প্রচন্ড আঘাত করলেন, যার ফলে সে অতীত দিনের মত বিলীন হয়ে গেল। ওয়াহ্শী বলেন, আমি হামযা (রাঃ)-কে কতল করার উদ্দেশ্যে একটি পাথরের নিচে আত্মগোপন করে ওঁত পেতে বসেছিলাম। যখন তিনি আমার নিকটবর্তী হলেন তখন আমি আমার অস্ত্র দ্বারা এমন জোরে আঘাত করলাম যে তার মূত্রথলি ভেদ করে নিতম্বের মাঝখান দিয়ে তা বেরিয়ে গেল। ওয়াহ্শী বলেন, এইটাই হল তাঁর শাহাদাতের মূল ঘটনা। এরপর সবাই ফিরে এলে আমিও তাদের সাথে ফিরে এসে মক্কায় অবস্থান করতে লাগলাম। এরপর মক্কায় ইসলাম প্রসার লাভ করলে আমি তায়েফ চলে গেলাম। কিছুদিনের মধ্যে তায়েফবাসিগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে দূত প্রেরণের ব্যবস্থা করলে আমাকে বলা হল যে, তিনি দূতদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন না। তাই আমি তাদের সাথে রওয়ানা হলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সামনে গিয়ে হাযির হলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন, তুমি কি ওয়াহ্শী? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমই কি হামযাকে হত্যা করেছিলে? আমি বললাম, আপনার কাছে যে সংবাদ পৌঁছেছে ব্যাপারটি তাই। তিনি বললেন, আমার সামনে থেকে তোমার চেহারা কি সরিয়ে রাখতে পার? ওয়াহ্শী বলেন, আমি তখন চলে আসলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ইন্তেকালের পর মূসা য়লামাতুল কায্যাব (নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার) আবির্ভূত হলে আমি বললাম, আমি অবশ্যই মূসা য়লামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব এবং তাকে হত্যা করে হামযা (রাঃ)-কে হত্যা করার ক্ষতিপূরণ করব। ওয়াহ্শী বলেন, তাই আমি লোকদের সাথে রওয়ানা করলাম। তার অবস্থা যা হওয়ার তাই হল। তিনি বর্ণনা করেন যে, এক সময় আমি দেখলাম যে, হালকা কালো বর্ণের উটের ন্যায় উষ্কখুষ্ক চুলবিশিষ্ট এক ব্যাক্তি একটি ভাঙ্গা প্রাচীরের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সাথে সাথে আমি আমার বর্শা দ্বারা তার উপর আঘাত করলাম। এবং তার বক্ষের উপর বসিয়ে দিলাম যে, তা দু কাঁধের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এরপর আনসারী এক সাহাবী এসে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তরবারী দ্বারা তার মাথার খুলিতে প্রচন্ড আঘাত করলেন। আবদুল্লাহ ইবনু ফজল (রহঃ) বর্ণনা করেছেন যে, সুলায়মান ইবনু ইয়াসির (রহঃ) আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন যে, (মূসা য়লামা নিহত হলে) ঘরের ছাদে উঠে একটি বালিকা বলছিল, হায়, হায়! আমিরুল মু’মিনীন (মূসা য়লামা)-কে একজন কালো ক্রীতদাস হত্যা করল।
হাদিস নং - ৩৭৭৪
ইসহাক ইবনু নাস্র (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (ভাঙ্গা) দাঁতের প্রতি ইংগিত করে বলেছেন, যে সম্প্রদায় তাদের নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র সাথে এরুপ আচরণ করেছেন তাদের প্রতি আল্লাহর গযব অত্যন্ত ভয়াবহ এবং যে ব্যাক্তিকে আল্লাহর রাসূল আল্লাহর পথে (জিহাদরত অবস্থায়) হত্যা করেছে তার প্রতিও আল্লাহর গযব অত্যন্ত ভয়াবহ।
হাদিস নং - ৩৭৭৫
মাখলাদ ইবনু মালিক (রহঃ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যাক্তিকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পথে হত্যা করেছে, তার জন্য আল্লাহর গযব ভীষণতর। আর যে সম্প্রদায় আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র চেহারাকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে তাদের প্রতি আল্লাহর ভয়াবহ গযব।
হাদিস নং - ৩৭৭৬
কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) সাহ্ল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আহত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছেন, আল্লাহর কসম, সে সময় যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জখম ধুয়েছিলেন এবং যিনি পানি ঢালছিলেন তাদেরকে আমি খুব ভালোভাবেই চিনি এবং কোন বস্তু দিয়ে চিকিৎসা করা হয়েছিল এ সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। তিনি বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) তা ধুয়ে দিচ্ছিলেন এবং আলী (রাঃ) ঢালে করে পানি এনে ঢালছিলেন। ফাতিমা (রাঃ) যখন দেখলেন যে, পানির দ্বারা রক্ত পড়া বন্ধ না হয়ে কেবল তা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন তিনি একখন্ড চাটাই নিয়ে তা জ্বালিয়ে তার ছাই জখমের উপর লাগিয়ে দিলেন। এতে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেল। এ ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ডানদিকের একটি দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। চেহারা জখম হয়েছিল এবং লৌহ শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে গিয়ে মাথায় বিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
হাদিস নং - ৩৭৭৭
আমর ইবনু আলী (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর গযব অত্যন্ত কঠোর ঐ ব্যাক্তির জন্য, যাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যা করেছেন এবং যে ব্যাক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেহারাকে রক্তে রঞ্জিত করেছে তার জন্যও আল্লাহর গজব অত্যন্ত ভয়াবহ।
হাদিস নং - ৩৭৭৮
মুহাম্মদ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি উরওয়া (রাঃ) কে সম্বোধন করে বললেন, হে ভাগ্নে জানো? “জখম হওয়ার পর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এর ডাকে সাড়া দিয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা সতকার্য করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলে তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরষ্কার। উক্ত আয়াতটিতে যাদের কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে তোমার পিতা যুবায়র (রাঃ) এবং (তোমার নানা) আবূ বকর (রাঃ)-ও শামিল আছেন। এ অবস্থায় (শত্রুসেনা) মুশরিকগণ চলে গেলে তিনি আশংকা করলেন যে, তারা আবারও ফিরে আসতে পারে। তিনি বললেন, কে আছ যে, তাদের পেছনে ধাওয়া করার জন্য যাবে। এ আহবানে সত্তরজন সাহাবী সাড়া দিয়ে প্রস্তুত হলেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, তাদের মধ্যে আবূ বকর ও যুবায়র (রাঃ)-ও ছিলেন।
হাদিস নং - ৩৭৭৯
আম্র ইবনু আলী (রহঃ) কাতাদা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন আরবের কোন জনগোষ্ঠীই আনসারদের তুলনায় অধিক সংখ্যক শহীদ এবং অধিক মর্যাদার হকদার হবে বলে আমরা জানিনা। কাতাদা (রহঃ) বলেন, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) আমাকে বলেছেন, উহুদ যুদ্ধের দিন আনসারদের সত্তর জন শহীদ হয়েছেন, বিরে মাউনার ঘটনায় তাদের সত্তর জন শহীদ হয়েছেন এবং ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন সত্তর জন। বর্ণনাকারী বলেন যে, বিরে মাউনার ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জীবদ্দশায় এবং ইয়ামাআর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল (মিথ্যা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )মূসা য়লামাতুল কায্যাবের বিরুদ্ধে আবূ বকর (রাঃ)-এর খিলাফত কালে।
হাদিস নং - ৩৭৮০
কুতায়বা ইব্ন সাঈদ (রহঃ) জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধের শহীদগণের দু’জনকে একই কাপড়ে (একই কবরে) দাফন করেছিলেন। কাফনে জড়ানোর পর তিনি জিজ্ঞেস করতেন, এদের মধ্যে কে কুরআন শরীফ সম্বন্ধে অধিক জ্ঞাত? যখন কোনো একজনের প্রতি ইঙ্গিত করা হত তখন তিনি তাকেই কবরে আগে নামাতেন এবং বলতেন, কিয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য সাক্ষ্য হব। সেদিন তিনি তাদেরকে তাদের রক্তসহ দাফন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাদের জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) ও আদায় করা হয়নি এবং তাদেরকে গোসলও দেওয়া হয়নি। (অন্য এক সনদে) আবূল ওয়ালী (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমার পিতা শাহাদাত বরণ করার পর (তাঁর শোকে) আমি কাঁদতে লাগলাম এবং বারবার তার চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে দিচ্ছিলাম। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণ আমাকে এ থেকে বারণ করেছিলেন। তবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এ ব্যাপারে) আমাকে নিষেধ করেননি। অধিকন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আবদুল্লাহর ফুফুকে বলেছেন) তোমরা এর জন্য কাঁদছ! অথচ জানাযা না উঠানো পর্যন্ত ফেরেশতারা নিজেদের ডানা দিয়ে তাঁর উপর ছায়া বিস্তার করছে।
হাদিস নং - ৩৭৮১
মুহাম্মদ ইবনু ‘আলা (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি একখানা তরবারি নাড়া দিলাম, অমনি এর মধ্যস্থলে ভেঙ্গে গেল। (আমি বুঝতে পারলাম) এটা উহুদ যুদ্ধে মু’মিনদের উপর আগত বিপদেরই প্রতিচ্ছবি ছিল। এরপর আমি তরবারিটিকে পুনরায় নাড়া দিলাম। এতে তা পূর্বের থেকেও অধিক সুন্দর হয়ে গেল। এর অর্থ হল (পরবর্তীকালে) মু’মিনদের বিজয় লাভ করা এবং তাদের একতাবদ্ধ হওয়া এবং স্বপ্নে আমি একটি গরুও দেখেছিলাম। উহুদ যুদ্ধে মু’মিনদের শাহাদাত বরণ করাই হচ্ছে এর তাবীর। আল্লাহর প্রতিদান অতি উত্তম বা আল্লাহর সকল কাজ কল্যানময়।
হাদিস নং - ৩৭৮২
আহ্মদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) খাব্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রাঃ)-এর সাথে হিজরত করেছিলাম। এতে আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। অতএব, আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিদান নির্ধারিত হয়ে আছে। আমাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ অতিবাহিত হয়ে গিয়েছেন অথবা (বর্ণনাকারী বলেছেন) কেউ চলে গিয়েছেন। অথচ পার্থিব প্রতিদান থেকে তিনি কিছুই ভোগ করতে পারেননি। মুস’আব ইবনু উমায়র (রাঃ) হলেন তাদের মধ্যে একজন। উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি শাহাদাৎ বরণ করেছেন। একখানা মোটা চাঁদর ব্যতীত তিনি আর কিছুই রেখে যাননি। এ দ্বারা আমরা তাঁর মাথা ঢাকলে পা দু’খানা বেরিয়ে যেতো এবং পা দু’খানা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যেত। (এ দেখে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কে বললেন, এ কাপড় দ্বারা তার মাথা ঢেকে দাও এবং উভয় পা ইয্খির (এক প্রকার ঘাস) দ্বারা আবৃত করে দাও। অথবা বললেন (বর্ণনাকারীর সন্দেহ), তাঁর উভয় পায়ের উপর ইয্খির দিয়ে দাও। আর আমাদের কেউ কেউ এমনও আছেন, যার ফল উত্তমরুপে পেকেছে, এখন তিনি তা সংগ্রহ করেছেন।
হাদিস নং - ৩৭৮৩
নাস্র ইবনু আলী (রহঃ) কাতাদা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস (রাঃ)-এর নিকট হতে শুনেছি যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উহুদ পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে) বলেছেন, এ পাহাড় আমাদের কে ভালোবাসে এবং আমরাও একে ভালোবাসি।
হাদিস নং - ৩৭৮৪
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সামনে উহুদ পাহাড় পরিলক্ষিত হলে তিনি বললেন, এ পাহাড় আমাদের কে ভালোবাসে এবং আমরা একে ভালোবাসি। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাকে হরম শরীফ ঘোষণা দিয়েছেন এনং আমি দুটি কংকরময় স্থানের মধ্যবর্তী জায়গাকে (মদিনা)১ হরম শরীফ ঘোষনা দিচ্ছি। ১ মদিনা হরম হওয়ার অর্থ হল, এর তাযীম মুসলমান দের জন্য অপরিহার্য। তবে মক্কা শরীফের মত এখানে অন্যায় করার কারণে কোনো ‘জাযা’ বা ‘দম’ দেয়াও ওয়াজিব নয়।
হাদিস নং - ৩৭৮৫
আমর ইবনু খালিদ (রহঃ) উকবা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একদা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মদিনা থেকে) বের হয়ে (উহুদ প্রান্তরে গিয়ে) উহুদের শহীদগণের জন্য জানাযার সালাত (নামায/নামাজ)-এর মত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। এরপর মিম্বরের দিকে ফিরে এসে বললেন, আমি তোমাদের অগ্রগামী ব্যাক্তি এবং আমই তোমাদের সাক্ষ্যদাতা। আমি এই মূহুর্ত্বেই আমার হাউয (কাওসার) দেখতে পাচ্ছি। আমাকে পৃথিবীর ধনভান্ডারের চাবি দেওয়া হয়েছে অথবা বললেন (বর্ণনাকারীর সন্দেহ), আমাকে পৃথিবীর চাবি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমার ইন্তেকালের পর তোমরা শির্কে লিপ্ত হবে- আমার এ ধরণের কোনো আশংকা নেই। তবে আমি আশংকা করি যে, তোমরা পৃথিবীর ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়বে।
হাদিস নং - ৩৭৮৬
ইব্রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মুশরীকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য) আসিম ইবনু উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ)-এর নানা আসিম ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একটি গোয়েন্দা দল কোথাও প্রেরণ করলেন। যেতে যেতে তারা উসফান ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছালে হুযায়ল গোত্রের একটি শাখা বনী লিহ্ইয়ানের নিকট তাঁদের আগমনের কথা জানিয়ে দেওয়া হল। এ সংবাদ পাওয়ার পর বনী লিহ্ইয়ানের প্রায় একশ তীরন্দাজ সমভিব্যাহারে তাদের প্রতি ধাওয়া করল। দলটি তাদের (মুসলিম গোয়েন্দা দলের) পদচিহ্ন অনুসরণ করে এমন এক স্থানে গিয়ে পৌঁছালো, যে স্থানে অবতরণ করে সাহাবীগণ খেজুর খেয়েছিলেন। তারা সেখানে খেজুরের আটি দেখতে পেল যা সাহাবীগণ মদিনা থেকে পাথেয়রুপে এনেছিলেন। তখন তারা বলল, এগুলো তো ইয়াসরিবের খেজুর (এর আটি)। এরপর তারা পদচিহ্ন ধরে খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকে ধরে ফেলল। আসিম ও তাঁর সাথীগণ বুঝতে পেরে ফাদফাদ নামক টিলায় উঠে আশ্রয় নিলেন। এবার শত্রুদল এসে তাঁদেরকে ঘিরে ফেলল এবং বলল, আমরা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যদি তোমরা নেমে আস তাহলে আমরা তোমাদের একজনকেও হত্যা করব না। আসিম (রাঃ) বললেন, আমি কোনো কাফেরের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে এখান থেকে অবতরণ করব না। হে আল্লাহ! আমাদের এ সংবাদ আপনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট পৌঁছিয়ে দিন। এরপর তারা মুসলিম গোয়েন্দা দলের প্রতি আক্রমণ করল এবং তীর বর্ষণ করতে শুরু করল। এভাবে তারা আসিম (রাঃ)-সহ সাতজনকে তীর নিক্ষেপ করে শহীদ করে দিল। এখন শুধু বাকী রইলেন খুবায়ব (রাঃ), যায়েদ (রাঃ) এবং অপর একজন (আবদুল্লাহ ইবনু তারিক) সাহাবী (রাঃ)। পুনরায় তারা তাদের কে ওয়াদা দিল। এই ওয়াদায় আশ্বস্ত হয়ে তাঁরা তাদের কাছে নেমে এলেন। এবার তারা তাঁদেরকে কাবু করে ফেলার পর নিজেদের ধনুকের তার খুলে এর দ্বারা তাঁদেরকে বেঁধে ফেলল। এ দেখে তাঁদের সাথী তৃতীয় সাহাবী (আবদুল্লাহ ইবনু তারিক) (রাঃ) বললেন, এটাই প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। তাই তিনি তাদের সাথে যেতে অস্বীকার করলেন। তারা তাঁকে তাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বহু টানা-হেঁচড়া করল এবং বহু চেষ্টা করল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হলেন না। অবশেষে কাফেররা তাঁকে শহীদ করে দিল এবং খুবায়ব ও যায়দ (রাঃ)-কে মক্কার বাজারে নিয়ে বিক্রয় করে দিল। বনী হারিস ইবনু আমির ইবনু নাওফল গোত্রের লোকেরা খুবায়ব (রাঃ)-কে কিনে নিল। কেননা বদর যুদ্ধের দিন খুবায়ব (রাঃ) হারিস কে হত্যা করেছিলেন। তাই তিনি তাদের নিকট বেশ কিছু দিন বন্দী অবস্থায় কাটান। অবশেষে তারা তাঁকে হত্যা করার দৃঢ় পরিকল্পনা করলে তিনি নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করার জন্য হারিসের কন্যার নিকট থেকে একখানা ক্ষুর চাইলেন। সে তাঁকে তা দিল। (পরবর্তীকালে মুসলমান হওয়ার পর) হারিসের উক্ত কন্যা বর্ণনা করেছেন যে, আমি আমার একটি শিশু বাচ্চা সম্পর্কে অসাবধান থাকায় সে পায়ে হেঁটে তাঁর কাছে চলে যায় এবং তিনি তাকে স্বীয় উরুর উপর বসিয়ে রাখেন। এ সময় তাঁর হাতে ছিল সেই ক্ষুর। এ দেখে আমি অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। খুবায়ব (রাঃ) বুঝতে পেরে বললেন, তাকে মেরে ফেলব বলে তুমি কি ভয় পাচ্ছ? ইন্শা আল্লাহ আমি তা করার নই। সে (হারিসের কন্যা) বলত, আমি খুবায়ব (রাঃ) থেকে উত্তম বন্দী আর কখনো দেখিনি। আমি তাকে আঙ্গুরের থোকা থেকে আঙ্গুর খেতে দেখেছি। অথচ তখন মক্কায় কোনো ফলই ছিল না। অধিকন্তু তিনি তখন লোহার শিকলে আবদ্ধ ছিলেন। এ আঙ্গুর তার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে প্রদত্ত রিযিক ব্যতীত আর কিছুই নয়। এরপর তারা তাঁকে হত্যা করার জন্য হারাম শরীফের বাইরে নিয়ে গেল। তিনি তাদেরকে বললেন, আমাকে দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করার সুযোগ দাও। (সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে) তিনি তাদের কাছে ফিরে এসে বললেন, আমি মৃত্যুর ভয়ে শংকিত হয়ে পড়ছি, তোমরা যদি এ কথা মনে না করতে তাহলে আমি (সালাত (নামায/নামাজ)কে) আরো দীর্ঘায়িত করতাম। হত্যার পূর্বে দ’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের সুন্নাত প্রবর্তন করেছেন সর্বপ্রথম তিনই। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ, তাদেরকে এক এক করে গুণে রাখুন। এরপর তিনি দু’টি পঙতি আবৃত্তি করলেন, “যেহেতু আমি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছি তাই আমার কোনো শংকা নেই। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যেকোনো পার্শ্বে আমি ঢলে পড়ি”। “আমি যেহেতু আল্লাহর পথেই মৃত্যুবরণ করছি, তাই তিনি ইচ্ছা করলে আমার ছিন্নভিন্ন প্রতিটি অংগে বরকত দান করতে পারেন”। এরপর উকবা ইবনু হারিস তাঁর দিকে এগিয়ে গেল এবং তাঁকে শহীদ করে দিল। কুরাইশ গোত্রের লোকেরা আসিম (রাঃ)-এর শাহাদাতের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁর মৃতদেহ থেকে কিছু অংশ নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠিয়েছিল। কারণ আসিম (রাঃ) বদর যুদ্ধের দিন তাদের একজন বড় নেতাকে হত্যা করেছিলেন। তখন আল্লাহ মেঘের মত এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠিয়ে দিলেন, যা তাদের প্রেরিত লোকদের হাত থেকে আসিম (রাঃ)-কে রক্ষা করল। ফলে তারা তাঁর দেহ থেকে কোনো অংশ নিতে সক্ষম হল না।
হাদিস নং - ৩৭৮৭
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খুবায়ব (রাঃ)-এর হত্যাকারী হল আবূ সিরওআ (উক্বা ইবনু হারিস)।
হাদিস নং - ৩৭৮৮
আবূ মা’মার (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক প্রয়োজনে সত্তরজন সাহাবীকে (এক জায়গায়) পাঠালেন, যাদের ক্বারী বলা হত। বনী সুলাইম গোত্রের দু’টি শাখা – রিল ও যাকওয়ান বি’রে মাউনা নামক একটি কূপের নিকট তাদেরকে আক্রমণ করলে তাঁরা বললেন, আল্লাহর কসম। , আমরা তোমাদের সাথে লড়াই করার উদ্দেশ্য আসিনি। আমরা তো কেবল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নির্দেশিত একটি কাজের জন্য এ পথ দিয়ে যাচ্ছি। এতদসত্ত্বেও তারা তাদের কে হত্যা করল। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাস পর্যন্ত ফজর সালাত (নামায/নামাজ) তাদের জন্য বদদোয়া করলেন। এভাবেই কুনূত পড়া আরম্ভ হয়। (রাবী বলেনঃ এর পূর্বে আমরা) কখনো আর কুনুত (এ নাযিলা) পড়িনি। আবদুল আযীয (রহঃ) বলেন, এক ব্যাক্তি আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, কুনূত কি রুকূর পর পড়তে হবে না কিরাত শেষ করে পড়তে হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না, কিরাত শেষ করে পড়তে হবে।
হাদিস নং - ৩৭৮৯
মুসলিম (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাস পর্যন্ত আরবের কয়েকটি গোত্রের প্রতি বদদোয়া করার জন্য সালাত (নামায/নামাজ) রুকূর পর কুনূত পাঠ করেছেন।
হাদিস নং - ৩৭৯০
আবদুল আলা ইবনু হাম্মাদ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রি’ল যাকওয়ান, উসায়্যা ও বনূ লিহ্ইয়ানের লোকেরা শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম —এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে সত্তরজন আনসার সাহাবী পাঠিয়ে তিনি তাদেরকে সাহায্য করলেন। সেকালে আমরা তাদেরকে ক্বারী নামে অভিহিত করতাম। তারা দিনের বেলা লাকড়ি কুড়াতেন এবং রাতের বেলা সালাত (নামায/নামাজ) কাটাতেন। যেতে যেতে তাঁরা বি’রে মাউনার নিকট পৌঁছালে তারা (আমির ইবনু তোফায়েলের আহবানে ঐ গোত্র চতুষ্টয়ের লোকেরা) তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং তাঁদেরকে শহীদ করে দেয়। এ সংবাদ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে পৌঁছালে তিনি এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আরবের কতিপয় গোত্র তথা রিল, যাক্ওয়ান, উসায়্যা এবং বনূ লিহইয়ানের প্রতি বদদোয়া করে কুনূত পাঠ করেন। আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাদের সম্পর্কিত কিছু আয়াত আমরা পাঠ করতাম। অবশ্য পরে এর তিলাওয়াত রহিত হয়ে যায়। একটি আয়াত ছিল- “আমাদের কওমের লোকদের জানিয়ে দাও। আমোড়া আমাদের প্রভুর সান্নিধ্যে পৌঁছে গিয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন। কাতাদা (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাঁকে বলেছেন, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুহাম্মদ এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আরবের কতিপয় গোত্র- তথা রি’ল, যাকওয়ান, উসায়্যা এবং বনূ লিহইয়ানের প্রতি বদদোয়া করে কুনূত পাঠ করেছেন। [ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর উস্তাদ] খলীফা (রহঃ) এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, ইবনু যুরায় (রহঃ) সাঈদ ও কাতাদা (রহঃ)-এর মাধ্যমে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা ৭০ জন সকলেই ছিলেন আনসার। তাঁদেরকে বি’রে মাউনা নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। [ইমাম বুখারী (রহঃ)] বলেন, এখানে “কুরআ’ন” শব্দটি কিতাব বা অনুরুপ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
হাদিস নং - ৩৭৯১
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মামা উম্মে সুলায়মানের (আনাসের মা) ভাই [ হারাম ইবনু মিলহান (রাঃ)]-কে সত্তরজন অশ্বারোহীসহ (আমির ইবনু তুফায়েলের নিকট) পাঠালেন। মুশরিকের দলপতি আমির ইবনু তুফায়েল (পূর্বে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তিনটি বিষয়ের যেকোন একটি গ্রহণ করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল। সে বলেছিল, পল্লী এলাকায় আপনার কর্তৃত্ব থাকবে এবং শহর এলাকায় আমার কর্তৃত্ব থাকবে। অথবা আমি আপনার খলীফা হব বা গাতফান গোত্রের দুই হাজার সৈন্য নিয়ে আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। এরপর আমির উম্মে ফুলানের গৃহে মহামারিতে আক্রান্ত হল। সে বলল, অমুক গোত্রের মহিলার বাড়িতে উটের যেমন ফোঁড়া হয় আমারও তেমন ফোঁড়া হয়েছে। তোমরা আমার ঘোড়া নিয়ে আস। তারপর (ঘোড়ায় আরোহণ করে) অশ্বপৃষ্ঠেই সে মৃত্যুবরণ করে। উম্মে সুলাইম (রাঃ)-এর ভাই হারাম [ইবনু মিলহান (রাঃ)] এক খোঁড়া ব্যাক্তি ও কোন এক গোত্রের অপর এক ব্যাক্তি সহ সে এলাকার দিকে রওয়ানা করলেন। [হারাম ইবনু মিলহান (রাঃ)] তার দুই সাথীকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা নিকটেই অবস্থান কর। আমই তাদের নিকট যাচ্ছি। তারা যদি আমাকে নিরাপত্তা দেয়, তাহলে তোমরা এখানেই থাকবে। আর যদি তারা আমাকে শহীদ করে দেয় তাহলে তোমরা তোমাদের নিজেদের সাথীর কাছে চলে যাবে। এরপর তিনি (তাদের নিকট গিয়ে) বললেন, তোমরা (আমাকে) নিরাপত্তা দিবে কি? দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একটি পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতাম। তিনি তাদের সাথে এ ধরণের আলাপ-আলোচনা করছিলেন। এমতাবস্থায় তারা এক ব্যাক্তিকে ইঙ্গিত করলে সে পেছন দিক থেকে এসে তাঁকে বর্ষা দ্বারা আঘাত করল। হাম্মাম (রহঃ) বলেন, আমার মনে হয় আমার শায়খ [ইসহাক (রাঃ)] বলেছিলেন যে, বর্শা দ্বারা আঘাত করে এপার ওপার করে দিয়েছিল। (আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হারাম ইবনু মিলহান (রাঃ) বললেন, আল্লাহু আকবর, কাবার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। এরপর উক্ত (হারামের সঙ্গী) লোকটি (অপেক্ষমান সাথীদের সাথে) মিলিত হলেন। তারা হারামের সংগীদের উপর আক্রমণ করলে খোঁড়া ব্যাক্তি ব্যতীত সকলেই নিহত হলেন। খোঁড়া লোকটি ছিলেন পাহাড়ের চূড়ায়। এরপর আল্লাহ তা’আলা আমাদের প্রতি (একখানা) আয়াত নাযিল করলেন যা পরে মনসূখ হয়ে যায়। আয়াতটি ছিল এইঃ “ আমরা আমাদের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে পৌঁছে গিয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন”। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্রিশ দিন পর্যন্ত ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) রি’ল, যাকওয়ান, উসায়্যা এবং বনূ লিহইয়ান গোত্রের জন্য বদদোয়া করেছেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এর অবাধ্য হয়েছিল।
হাদিস নং - ৩৭৯২
হিব্রান (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁর মামা হারম ইবনু মিলহান (রাঃ)-কে বি’রে মাউনার দিন বর্শা বিদ্ধ করা হলে তিনি এভাবে দু’হাতে রক্ত দিয়ে নিজের চেহারা এবং মাথায় মেখে বললেন, কাবার প্রভুর কসম, আমি সফলকাম হয়েছি।
হাদিস নং - ৩৭৯৩
উবায়দ ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মক্কার কাফেরদের) অত্যাচার চরম আকার ধারণ করলে আবূ বকর (রাঃ) মক্কা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি তাঁকে বললেন, (আরো কিছুদিন) অবস্থান কর। তখন তিনি বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি কি আশা করেন যে, আপনাকে অনুমতি দেওয়া হোক? তিনি বললেন, আমি তো তাই আশা করি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আবূ বকর (রাঃ) এর জন্য অপেক্ষা করলেন। একদিন যোহরের সালাত (নামায/নামাজ) এর সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে তাঁকে [ আবূ বকর (রাঃ)-কে] ডেকে বললেন, তোমার কাছে যারা আছে তাদেরকে সরিয়ে দাও। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, এরা তো আমার দু’মেয়ে (আয়িশা এবং আসমা)। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি জানোো আমাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি আপনার সাথে যেতে পারবো? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ আমার সাথে যেতে পারবে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার কাছে দু’টি উটনী আছে। এখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্যই এ দু’টিকে আমি প্রস্তুত করে রেখেছি। এরপর তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –কে দুটি উটের একটি উট প্রদান করলেন। এ উটটি ছিল কান-নাক কাটা। তাঁরা উভয়ে সওয়ার হয়ে রওয়ানা হলেন এবং গারে সাওরে পৌঁছে সেখানে আত্মগোপন করলেন। আয়িশা (রাঃ)-এর বৈমাত্রেয় ভাই আমির ইবনু ফুহায়রা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু তুফায়ল ইবনু সাখরার গোলাম। আবূ বকর (রাঃ)-এর একটি দুধের গাভী ছিল। তিনি (আমির ইবনু ফুহায়রা) সেটিকে সন্ধ্যাবেলা চরাতে নিয়ে গিয়ে রাতের অন্ধকারে তাদের (মক্কার কাফেরদের) কাছে নিয়ে যেতেন এবং ভোরবেলা তাঁদের উভয়ের কাছে নিয়ে যেতেন। কোনো রাখালই এ বিষয়টি বুঝতে পারতো না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ) গারে সাওর থেকে বের হলে তিনিও তাদের সাথে রওয়ানা হলেন। তাঁরা মদিনা পৌঁছে যান। আমির ইবনু ফুহায়রা পরবর্তীকালে বি’রে মাউনার যুধে শাহাদাত বরণ করেন। (অন্য সনদে) আবূ উসায়মা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিশাম ইবনু উরওয়া (রহঃ) বলেন, আমার পিতা [উরওয়া (রাঃ)] আমাকে বলেছেন, রি’রে মাউনার যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারীগণ শহীদ হলে আমর ইবনু উমাইয়া যামরী বন্ধী হলেন। তাঁকে আমির ইবনু ফুহায়রার লাশ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এ ব্যাক্তি কে? আমর ইবনু উমাইয়া বললেন, ইনি হচ্ছেন আমির ইবনু ফুহায়রা। তখন সে (আমির ইবনু তুফায়ল) বলল, আমি দেখলাম, নিহত হওয়ার পর তার লাশ আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এমনকি আমি তার লাশ আসমান যমীনের মাঝে দেখেছি। এরপর তা রেখে দেয়া হল (যমিনের উপর)। এ সংবাদ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে পৌঁছলে তিনি সাহাবীগণকে তাদের শাহাদাতের সংবাদ জানিয়ে বললেন, তোমাদের সাথীদের হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট এবং আপনিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট- এ সংবাদ আমাদের ভাইদের কাছে পৌঁছে দিন। তাই মহান আল্লাহ তাঁদের এ সংবাদ মুসলমানদের কাছে পৌঁছিয়ে দিলেন। ঐ দিনের নিহতদের মধ্যে উরওয়া ইবনু আসমা ইবনু সাল্লাত (রাঃ)-ও ছিলেন। তাই এ নামেই উরওয়া ইবনু যুবায়েরের)-এর নামকরণ করা হয়েছে। আর মুনযির ইবনু আমত (রাঃ) ও এ দিন শাহাদাত বরণ করেছিলেন। তাই এ নামেই মুনযির-এর নামকরণ করা হয়েছে।
হাদিস নং - ৩৭৯৪
মুহাম্মদ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাস পর্যন্ত সালাত (নামায/নামাজ) রুকূর পরে কুনূত পাঠ করেছেন। এতে তিনি রি’ল, যাকওয়ান গোত্রের জন্য বদদোয়া করেছেন। তিনি বলেন, উসায়্যা গোত্র আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নাফরমানী করেছে।
হাদিস নং - ৩৭৯৫
ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যারা বি’রে মাউনার নিকট নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণকে শহীদ করেছিল সে হত্যাকারী রি’ল, যাকওয়ান, বনী লিহইয়ান এবং উসায়্যা গোত্রের প্রতি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্রিশদিন পর্যন্ত ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) বদদোয়া করেছেন। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল) -এর নাফরমানী করেছে। আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, বি’রে মাউনা নামক স্থানে যারা শাহাদাতবরণ করেছেন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাঁর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র প্রতি আয়াত নাযিল করেছিলেন। আমরা তা পাঠ করতাম। আয়াতটি হল- “আমাদের কাওমের কাছে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি।
হাদিস নং - ৩৭৯৬
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আসিমুল আহওয়াল (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে নামা্যে (দোয়া) কুনূত পড়তে হবে কি না- এসম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন, হ্যাঁ পড়তে হবে। আমি বললাম, রুকূর আগে পড়তে হবে, না পরে? তিনি বললেন, রুকূর আগে। আমি বললাম, অমুক ব্যাক্তি আপনার সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আপনি রুকূর পর কুনূত পাঠ করেছেন। এর কারণ ছিল এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্তরজন কারীর একটি দলকে মুশরিকদের নিকট কোনো এক কাজে পাঠিয়েছিলেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাদের মধ্যে চুক্তি ছিল। তারা (আক্রমণ করে সাহাবীগণের উপর) বিজয়ী হল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি বদদোয়া করে সালাত (নামায/নামাজ) রুকূর পর এক মাস পর্যন্ত কুনূত পাঠ করেছেন।
হাদিস নং - ৩৭৯৭
ইয়াকুব ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি ইবনু উমর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য) নিজেকে পেশ করার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমুতি দেননি। তখন তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। তবে খন্দকের যুদ্ধের দিন তিনি (যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য) নিজেকে পেশ করলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অনুমতি দিলেন। তখন তাঁর বয়স পনের বছর।
হাদিস নং - ৩৭৯৮
কুতায়বা (রহঃ) সাহ্ল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পরিখা খননের কাজে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তাঁরা পরিখা খনন করেছিলেন আর আমরা কাঁধে করে মাটি বহন করেছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাদের জন্য দোয়া করে) বলেছিলেন, হে আল্লাহ, আখিরাতের শান্তই প্রকৃত শান্তি। আপনি মুহাজির এবং আনসারদের ক্ষমা করে দেন।
হাদিস নং - ৩৭৯৯
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে পরিখা খননের স্থানে উপস্থিত হন। এ সময় মুহাজির এবং আনসারগণ ভোরে তীব্র শীতের মধ্যে পরিখা খনন করছিলেন। তাদের কোনো গোলাম ছিলনা যারা তাদের পক্ষ হতে এ কাজ করে দেবে। যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনাহার ও কষ্ট ক্লেশ দেখতে পান, তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের শান্তই প্রকৃত শান্তি; তাই আপনি আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করে দিন। সাহাবীগণ এর উত্তরে বললেন, “আমরা সে সব লোক, যারা জিহাদের আত্মনিয়োগ করার ব্যাপারে মুহাম্মদ -এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, যতদিন আমরা জীবিত থাকি ততদিন পর্যন্ত।
হাদিস নং - ৩৮০০
আবূ মা’মার (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজিরগণ মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করেছিলেন এবং নিজ নিজ পিঠে মাটি বহন করেছিলেন। আর (আনন্দ কন্ঠে) আবৃত্তি করেছিলেন, “আমরা তো সে সব লোক যারা ইসলামের ব্যাপারে মুহাম্মদ -এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, যতদিন আমরা জীবিত থাকি ততদিনের জন্য”। বর্ণনাকারী বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ কথার উত্তরে বলতেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের কল্যাণ ব্যতিত আর কোন কল্যাণ নেই, তাই আনসার ও মুহাজিরদের কাজে বরকত দান করুন। বর্ণনাকারী [আনাস (রাঃ)] বর্ণনা করেছেন যে, (পরিখা খননের সময়) তাদেরকে এক মুষ্টি ভরে যব দেওয়া হত। তা বাসি, স্বাদবিকৃত চর্বিতে মিশিয়ে খানা পাকিয়ে ক্ষুধার্ত কাওমের সামনে পরিবেশন করা হত। অথচ এ খাদ্য ছিল একেবারে স্বাদহীন ও ভীষণ দুর্গন্ধময়।
হাদিস নং - ৩৮০১
খাল্লাদ ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) আয়মান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জাবির (রাঃ)-এর নিকট গেলে তিনি বললেন, খন্দক যুদ্ধের দিন আমরা পরিখা খনন করেছিলাম। এ সময় একখন্ড কঠিন পাথর বেরিয়ে আসলে (যা ভাঙ্গা যাচ্ছিল না) সকলেই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে বললেন, খন্দকের মাঝে একখন্ড শক্ত পাথর বেরিয়েছে (আমরা তা ভাংতে পারছি না)। এ কথা শুনে তিনি বললেন, আমি নিজে খন্দকে অবতরণ করব। এরপর তিনি দাঁড়ালেন। এ সময় তাঁর পেটে একটি পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তিন দিন পর্যন্ত অনাহারী ছিলাম। কোনো কিছুর স্বাদও গ্রহণ করিনি। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একখানা কোদাল হাতে নিয়ে প্রস্তরখন্ডে আঘাত করলেন। ফলে তৎক্ষণাৎ টা চূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হল। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য অনুমতি দিন। (তিনি অনুমতি দিলে বাড়ি পৌঁছে) আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মধ্যে আমি এমন কিছু দেখলাম যা আমি সহ্য করতে পারছি না। তোমার নিকট কোনো খাবার আছে কি? সে বলল, আমার কাছে কিছু যব ও একটি বকরীর বাচ্চা আছে। তখন বকরীর বাচ্চাটি আমি যবেহ করলাম। এবং সে (আমার স্ত্রী) যব পিষে দিল। এরপর গোশত ডেকচিতে দিয়ে আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে আসলাম। এ সময় আটা খামির হচ্ছিল এবং ডেকচি চুলার উপর ছিল ও গোশত প্রায় রান্না হয়ে আসছিল। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার (বাড়িতে) সামান্য কিছু খাবার আছে। আপনি একজন বা দুইজন সাথে নিয়ে চলুন। তিনি বললেন, কি পরিমাণ খাবার আছে? আমি তার নিকট সব খুলে বললে তিনি বললেন, এ তো অনেক উত্তম। এরপর তিনি আমাকে ডেকে বললেন, তুমি তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বল, সে যেন আমি না আসা পর্যন্ত উনান থেকে ডেকচি ও রুটি না নামায়। এরপর তিনি বললেন, উঠ! (জাবির তোমাদের খাবার দাওয়াত দিয়েছে) মুহাজিরগণ উঠলেন (এবং চলতে লাগলেন)। জাবির (রাঃ) তার স্ত্রীর নিকট গিয়ে বললেন, তোমার সর্বনাশ হোক! (এখন কি হবে?) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মুহাজির, আনসার এবং তাঁদের অন্য সাথীদের নিয়ে চলে আসছেন। তিনি (জাবিরের স্ত্রী) বললেন, তিনি কি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উপস্থিত হয়ে) বললেন, তোমরা সকলেই প্রবেশ কর এবং ভিড় কোরোনা। এ বলে তিনি রুটি টুকরো করে এরপর গোশত তিনি সাহাবীগণের নিকট তা বিতরণ করতে শুরু করলেন। (এগুলো পরিবেশন করার সময়) তিনি ডেকচি এবং উনান ঢেকে রেখেছিলেন। এমনি করে তিনি রুটি টুকরো করে হাত ভরে বিতরণ করতে লাগলেন। এতে সকলে পেট ভরে খাবার পরেও কিছু বাকী রয়ে গেল। তাই তিনি (জাবিরের স্ত্রীকে) বললেন, এ তুমি খাও এবং অন্যকে হাদিয়া দাও। কেননা লোকদেরো ক্ষুধা পেয়েছে।
হাদিস নং - ৩৮০২
আম্র ইবনু আলী (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন পরিখা খনন করা হচ্ছিল তখন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন আমি আমার স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে কোনো কিছু আছে কি? আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দারুণ ক্ষুধার্ত দেখেছি। (এ কথা শুনে) তিনি একটি চামড়ার পাত্র এনে তা থেকে এক সা পরিমাণ যব বের করে দিলেন। আমাদের গৃহপালিত একটি বকরীর বাচ্চা ছিল। আমি সেটি যবেহ্ করলাম এবং গোশত কেটে কেটে ডেকচিতে ভরলাম। আর সে (আমার স্ত্রী) যব পিষে দিল। আমি আমার কাজ শেষ করে চললাম। তখন সে (স্ত্রী) বলল, আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের নিকট লজ্জিত করবেন না। এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট গিয়ে চুপে চুপে বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা আমাদের একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করেছি এবং আমাদের ঘরে এক সা যব ছিল। তা আমার স্ত্রী পিষে দিয়েছে। আপনি আরো কয়েকজন কে সাথে নিয়ে আসুন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ স্বরে সবাইকে বললেন, হে পরিখা খননকারীগণ! জাবির খানার ব্যবস্থা করেছে। এসো, তোমরা সকলেই চল। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার আসার পূর্বে তোমাদের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও তৈরি করবে না। আমি (বাড়িতে) আসলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবা-ই-কিরাম সহ তাশরীফ আনলেন, এরপর আমি আমার স্ত্রীর নিকট আসলে সে বলল, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। (তুমি এ কি করলে? এতগুলো লোক নিয়ে আসলে? অথচ খাদ্য একেবারে নগন্য) আমি বললাম, তুমি যা বলেছ আমি তাই করেছি। এরপর সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সামনে আটার খামির বের করে দিলে তিনি তাতে মুখের লালা মিশিয়ে দিলেন এবং বরকতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর তিনি ডেকচির দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাতে মুখের লালা মিশিয়ে এর জন্য বরকতের দোয়া করলেন। তারপর বললেন, (হে জাবির) রুটি প্রস্তুতকারিনীকে ডাকো। সে আমার কাছে বসে রুটি প্রস্তুত করুক এবং ডেকচি থেকে পেয়ালা ভরে গোশত পরিবেশন করুক। তবে চুলা থেকে ডেকচি নামাবে না। তাঁরা (আগন্তুক সাহাবা-ই-কিরাম) ছিলেন সংখ্যায় এক হাজার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, তাঁরা সকলেই তৃপ্তিসহকারে খেয়ে অবশিষ্ট খাদ্য রেখে চলে গেলেন। অথচ আমাদের ডেকচি পূর্বের ন্যায় তখনও টগবগ করছিল এবং আমাদের আটার খামির থেকেও পূর্বের মত রুটি তৈরি হচ্ছিল।
হাদিস নং - ৩৮০৩
উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল উঁচু অঞ্চল ও নীচু অঞ্চল হতে এবং তোমাদের চক্ষু বিস্ফোরিত হয়েছিল (৩৩:১০) তিনি বলেন, এ আয়াতখানা খন্দকের যুদ্ধে নাযিল হয়েছে।
হাদিস নং - ৩৮০৪
মুসলিম ইবনু ইব্রাহীম (রহঃ) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক যুদ্ধের দিন মাটি বহন করেছিলেন। এমনকি মাটি তাঁর পেট ঢেকে ফেলেছিল অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তাঁর পেট ধূলায় আছন্ন হয়ে গিয়েছিল। এ সময় তিনি বলছিলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ হেদায়েত না করলে আমরা হেদায়েত পেতাম না, দান সদকা করতাম না, এবং সালাত (নামায/নামাজ)ও আদায় করতাম না। সুতরাং (হে আল্লাহ!) আমাদের প্রতি রহমত নাযিল করুন এবং আমাদের কে শত্রুর সাথে মুকাবিলা করার সময় দৃঢ়পদ রাখুন। নিশ্চয়ই মক্কাবাসীরা আমাদের প্রতি বিদ্রোহ করেছে। যখনই তারা ফিতনার প্রয়াস পেয়েছে তখনই আমরা উপেক্ষা করেছি। শেষের কথাগুলো বলার সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ স্বরে “উপেক্ষা করেছি”, “উপেক্ষা করেছি” বলে উঠেছেন।
হাদিস নং - ৩৮০৫
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে পুবালি বায়ু দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে, আর আদ জাতিকে পশ্চিমা বায়ু দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
হাদিস নং - ৩৮০৬
আহ্মাদ ইবনু উসমান (রহঃ) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আহযাব (খন্দক) যুদ্ধের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিখা খনন করছিলেন। আমি তাঁকে খন্দকের মাটি বহন করতে দেখেছি। এমনকি ধূলাবালি পড়ার কারণে তাঁর পেটের চামড়া ঢাকা পড়ে গেছে। তিনি অধিক পশম বিশিষ্ট ছিলেন। সে সময় আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে মাটি বহন করা অবস্থায় ইবনু রাওয়াহার কবিতা আবৃত্তি করতে শুনেছি। তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহ! আপনি যদি হেদায়েত না করতেন তাহলে আমরা হেদায়েত পেতাম না, আমরা সদকা করতাম না এবং আমরা সালাত (নামায/নামাজ)ও আদায় করতামনা। সুতরাং আমাদের প্রতি আপনার রহমত নাযিল করুন এবং দুশমনের মুকাবিলা করার সময় আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন। অবশ্য মক্কাবাসীরাই আমাদের প্রতি ভীতি প্রদর্শন করেছেন। তারা ফিতনা বিস্তার করতে চাইলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছি। বর্ণনাকারী (বারা) বলেন, শেষ পঙক্তিটি আবৃত্তি করার সময় তিনি তা প্রলম্বিত করে পড়তেন।
হাদিস নং - ৩৮০৭
আবদা ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রথম আমি যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি তা ছিল খন্দকের যুদ্ধ।
হাদিস নং - ৩৮০৮
ইব্রাহীম ইবনু মূসা (রাঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি হাফসা (রাঃ)-এর নিকট গেলাম। সে সময় তাঁর চুলের বেণি থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছিল। আমি তাঁকে বললাম, আপনি তো দেখেছেন, নেতৃত্বের ব্যাপারে লোকজন কি কান্ড করেছে। ইমারত ও নেতৃত্বের কিছুই আমাকে দেওয়া হয়নি। তখন তিনি বললেন, আপনি গিয়ে তাদের সাথে যোগ দিন। কেননা তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনি তাদের থেকে দূরে সরে থাকার কারণে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আমি আশংকা করছি। হাফসা (রাঃ) তাঁকে (এ কথা) বলতে থাকেন। (অবশেষে) তিনি (সেখানে) গেলেন। এরপর লোকজন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মুআবিয়া (রাঃ) বক্তৃতা দিয়ে বললেন, ইমারত ও খিলাফতের ব্যাপারে কারো কিছু বলার ইচ্ছা থাকলে সে আমাদের সামনে মাথা উঁচু করুক। এ ব্যপারে আমরাই তাঁর ও তাঁর পিতার চাইতে অধিক হকদার। তখন হাবীব ইবনু মাসলামা (রহঃ) তাঁকে বললেন, আপনি এ কথার জবাব দেননি কেন? তখন আবদুল্লাহ ইবনু উমর) বললেন, আমি তখন আমার গায়ের চাঁদর ঠিক করলাম এবং এ কথা বলার ইচ্ছা করলাম যে, এ বিষয়ে ঐ ব্যাক্তই অধিক হকদার যে ইসলামের জন্য আপনার ও আপনার পিতার সাথে লড়াই করেছেন। তবে আমার এ কথায় (মুসলমানদের মাঝে) অনৈক্য সৃষ্টি হবে, অযথা রক্তপাত হবে এবং আমার এ কথার অপব্যাখ্যা করা হবে এ আশংকায় এবং আল্লাহ জান্নাতে যে নিয়ামত তৈরি করে রেখেছেন তার কথা স্মরণ করে আমি উক্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকি। তখন হাবীব (রহঃ) বললেন, এভাবেই আপনি (ফিতনা থেকে) রক্ষা পেয়েছেন এবং বেঁচে গিয়েছেন।
হাদিস নং - ৩৮০৯
আবূ নূআইম (রহঃ) সুলায়মান ইবনু সুরাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খন্দক যুদ্ধের দিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, এখন থেকে আমরাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তারা আর আমাদের প্রতি আক্রমণ করতে পারবে না।
হাদিস নং - ৩৮১০
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) সুলায়মান ইবনু সুরাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধের দিন কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনী মদিনা ছেড়ে ফিরে যেতে বাধ্য হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি বলতে শুনেছি যে, এখন থেকে আমরাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তারা আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে পারবেনা। আর আমরা তাদের এলাকায় গিয়েই আক্রমণ করব।
হাদিস নং - ৩৮১১
ইসহাক (রহঃ) আলী (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত যে, তিনি খন্দকের যুদ্ধের দিন (কাফের মুশরিকদের প্রতি) বদদোয়া করে বলেছেন, আল্লাহ তাদের ঘরবাড়ি ও কবর আগুন দ্বারা ভরপুর করে দিন। কেননা তারা আমাদেরকে (যুদ্ধে ব্যস্ত করে) মধ্যবর্তী সালাত (নামায/নামাজ) থেকে বিরত রেখেছে, এমনকি সূর্য অস্ত গিয়েছে।
হাদিস নং - ৩৮১২
মককী ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, খন্দক যুদ্ধের দিন সূর্যাস্তের পর উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এসে কুরাইশ কাফেরদের গালি দিতে আরম্ভ করলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আজ সূর্যাস্তের পূর্বে আমি (আসর) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে পারিনি। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! আমিও আজ এ সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে পারিনি। [জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন] এরপর আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে বুতহান উপত্যকায় গেলাম। এরপর তিনি সালাত (নামায/নামাজ)-এর জন্য উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন। আমরাও সালাত (নামায/নামাজ)-এর জন্য উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলাম। এরপর তিনি সূর্যাস্তের পর প্রথমে আসরের সালাত (নামায/নামাজ) এবং পরে মাগরিবের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন।
হাদিস নং - ৩৮১৩
মুহাম্মদ ইবনু কাসীর (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কুরাইশ কাফেরদের খবর আমাদের নিকট এনে দিতে পারবে কে? যুবায়র (রাঃ) বললেন, আমি পারব। তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] আবার বললেন, কুরাইশদের খবর আমাদের নিকট কে এনে দিতে পারবে? তখনও যুবায়র (রাঃ) বললেন, আমি পারব। তিনি পুনরায় বললেন, কুরাইশদের খবর আমাদের নিকট কে এনে দিতে পারবে? এবারও যুবায়র (রাঃ) বললেন, আমি পারব। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রত্যেক নাবীরই হাওয়ারী (বিশেষ সাহায্যকারী) ছিল। আমার হাওয়ারী হল যুবায়র।
হাদিস নং - ৩৮১৪
discকুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (খন্দকের যুদ্ধের সময়) বলতেন, এক আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনই তাঁর বাহিনীকে মর্যাদা দিয়েছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই শত্রুদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। তারপর আর কিছুই কি থাকবে না অথবা এরপর আর ভয়ের কোন কারণ নেই।rip
হাদিস নং - ৩৮১৫
মুহাম্মদ ইবনু সালাম) (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনীর প্রতি বদদোয়া করে বলেছেন, কিতাম নাযিলকারী ও হিসেব গ্রহণে তৎপর হে আল্লাহ! আপনি কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করুন। হে আল্লাহ! তাদেরকে পরাজিত এবং ভীত ও কম্পিত করে দিন।
হাদিস নং - ৩৮১৬
মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহঃ) আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ, হাজ্জ (হজ্জ) বা উমরা থেকে ফিরে এসে প্রথমে তিনবার তাকবীর বলতেন। এরপর বলতেন, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব এবং প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। সব বিষয়ে তিনই সর্বশক্তিমান। আমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তনকারী, তাঁরই কাছে তওবাকারী, তাঁরই ইবাদতকারী। আমরা আমাদের প্রভুর দরবারেই সিজদা নিবেদনকারী, তাঁরই প্রশংসা বর্ণনাকারী। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন। তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।
হাদিস নং - ৩৮১৭
আবদুল্লাহ ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে সমরাস্ত্র রেখে গোসল করেছেন মাত্র। এমতাবস্থায় তাঁর কাছে জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে বললেন, আপনি তো অস্ত্রশস্ত্র (খুলে) রেখে দিয়েছেন। আল্লাহর কসম! আমরা এখনও তা খুলিনি। চলুন তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যেতে হবে? তিনি বনূ কুরায়যা গোত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, ঐদিকে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে রওয়ানা হলেন।
হাদিস নং - ৩৮১৮
মূসা (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বনূ কুরায়যার মহল্লার দিকে যাচ্ছিলেন তখন [জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অধীন] ফেরেশতা বাহিনীও তাঁর সংগে যাচ্ছিলেন, এমনকি (পথিমধ্যে) বনূ গানম গোত্রের গলিতে জিবরাঈল বাহিনীর গমনে ওড়া ধূলারাশি এখনো যেন আমি দেখতে পাচ্ছি।
হাদিস নং - ৩৮১৯
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আসমা (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধের দিন (যুদ্ধ সমাপ্তির দিন) বলেছেন, বনূ কুরায়যার মহল্লায় না পৌঁছে কেউ যেন আসরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় না করে। পথিমধ্যে আসরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর সময় হয়ে গেলে কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে পৌঁছার পূর্বে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা এখনই সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করব, কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিষেধাজ্ঞার অর্থ এই নয় যে, রাস্তায় সালাত (নামায/নামাজ)-এর সময় হয়ে গেলেও তা আদায় করা যাবে না। বিষয়টি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ওঠানো হলে তিনি তাদের কোনো দলের প্রতই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি।
হাদিস নং - ৩৮২০
ইবনু আবূল আসওয়াদ ও খলীফা (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (ব্যয় নির্বাহের জন্য) লোকেরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খেজুর হাদিয়ে দিতেন। অবশেষে তিনি বনী নাযীর এবং বনী করায়যার উপর জয়লাভ করলে আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আদেশ করল, যেন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গিয়ে তাদের দেয়া সবগুলো খেজুর গাছ অথবা কিছু সংখ্যক খেজুর গাছ তাঁর নিকট থেকে ফেরত আনার জন্য আবেদন করি। অথচ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ গাছগুলো উম্মে আয়মান (রাঃ)-কে দান করে দিয়েছিলেন। এ সময় উম্মে আয়মান (রাঃ) আসলেন এবং আমার গলায় কাপড় লাগিয়ে বললেন, এ কখনো হতে পারেনা। সেই আল্লাহর কসম, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি ঐ বৃক্ষগুলো তোমাকে আর দেবেন না। তিনি তো এগুলো আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। অথবা (রাবীর সন্দেহ) যেমন তিনি বলেছেন। এদিকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, তুমি ঐ গাছগুলোর পরিবর্তে আমার নিকট থেকে এ-ই এ-ই পাবে। কিন্তু উম্মে আয়মান (রাঃ) বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! এ কখনো হতে পারেনা। অবশেষে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (অনেক বেশি) দিলেন। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, আমার মনে হয় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে [উম্মে আয়মান (রাঃ)-কে] বলেছেন, এর দশগুণ অথবা যেমন তিনি বলেছেন।
হাদিস নং - ৩৮২১
মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ)-এর ফয়সালা মেনে নিয়ে বনী কুরায়যা গোত্রের লোকেরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা’দ কে আনার জন্য লোক পাঠালেন। এরপর তিনি গাধার পিঠে চড়ে আসলেন। তিনি মসজিদে নববীর নিকটবর্তী হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার সাহাবীকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তোমাদের নেতা বা সর্বোত্তম ব্যাক্তিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে যাও। (তিনি আসলে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, এরা তোমার ফয়সালা মেনে নিয়ে দুর্গ থেকে নিচে নেমে এসেছে। তখন তিনি বললেন, তাদের যোদ্ধাদের হত্যা করা হবে এবং তাদের সন্তানদের বন্দী করা হবে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে সা’দ! তুমি আল্লাহর হুকুম মুতাবিক ফয়সালা করেছ। কোনো কোনো সময় তিনি বলেছেন, তুমি রাজাধিরাজ আল্লাহর বিধান মুতাবিক ফয়সালা করেছ।
হাদিস নং - ৩৮২২
যাকারিয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধে সা’দ (রাঃ) আহত হয়েছিলেন। কুরাইশ গোত্রের হিব্বান ইবনু ইরকা নামক এক ব্যাক্তি তাঁর উভয় বাহুর মধ্যবর্তী রগে তীর বিদ্ধ করেছিল। কাছে থেকে তার শুশ্রূষা করার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তে একটি খিমা তৈরি করেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দকের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে যখন হাতিয়ার রেখে গোসল সমাপন করলেন তখন জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মাথার ধূলোবালি ঝাড়তে ঝাড়তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, আপনি তো হাতিয়ার রেখে দিয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি এখনও তা রেখে দেই নি। চলুন তাঁদের প্রতি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন কোথায়? তিনি বনী কুরায়যা গোত্রের প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ কুরায়যার মহল্লায় এলেন। পরিশেষে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ফয়সালা মেনে নিয়ে দুর্গ থেকে নিচে নেমে এল। কিন্তু তিনি ফয়সালার ভার সা’দ (রাঃ)-এর উপর অর্পণ করলেন। তখন সা’দ (রাঃ) বললেন, তাদের ব্যাপারে আমি এই রায় দিচ্ছি যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হবে, নারী ও সন্তানদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের ধন-সম্পদ (মুসলমানদের মধ্যে) বন্টন করে দেওয়া হবে। বর্ণনাকারী হিশাম (রহঃ) বলেন, আমার পিতা [উরওয়া (রাঃ)] আয়িশা (রাঃ) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, সা’দ (রাঃ) (বনূ কুরায়যার ঘটনার পর) আল্লাহর কাছে এ বলে দোয়া করছিলেন, হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, যে সম্প্রদায় আপনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিথ্যাবাদী বলেছে এবং দেশ থেকে বের করে দিয়েছে আপনার সন্তুষ্টির জন্য তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার চেয়ে কোন কিছুই আমার কাছে অধিক প্রিয় নয়। হে আল্লাহ! আমি মনে করি (খন্দক যুদ্ধের পর) আপনি তো আমাদের ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন তবে এখনো যদি কুরাইশদের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ বাকী থেকে থাকে তাহলে আমাকে সে জন্য বাঁচিয়ে রাখুন, যেন আমি আপনার রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারি। আর যদি যুদ্ধে অবসান ঘটিয়ে থাকেন তাহলে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত করুন এবং এতেই আমার মৃত্যু ঘটান। এরপর তাঁর ক্ষত স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে তা প্রবাহিত হতে লাগল। মসজিদে বনী গিফার গোত্রের একটি তাঁবু ছিল। তাদের দিকে রক্ত প্রবাহিত হয়ে আসতে দেখে তারা ভীত হয়ে বললেন, হে তাঁবুবাসীগণ আপনাদের দিক থেকে এসব কি আমাদের দিকে বয়ে আসছে? পরে তাঁরা দেখলেন যে, সা’দ (রাঃ)-এর ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অবশেষে এ জখমের কারণেই মারা যান।
হাদিস নং - ৩৮২৩
হাজজাজ ইবনু মিনহাল (রহঃ) আদি (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি বারা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাস্সান (রাঃ)-কে বলেছেন, কবিতার মাধ্যমে তাদের (কাফেরদের) দোষত্রুটি বর্ণনা কর আথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করার জবাব দাও। (তোমার সাহায্যার্থে) জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার সাথে থাকবেন। (অন্য এক সনদে) ইব্রাহীম ইবনু তাহ্মান (রহঃ) বারা ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী কুরায়যার সাথে যুদ্ধ করার দিন হাসান ইবনু আযিব (রাঃ)-কে বলেছিলেন (কবিতার মাধ্যমে) মুশরিকদের দোষত্রুটি বর্ণনা কর। এ ব্যাপারে জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার সাথে থাকবেন।
হাদিস নং - ৩৮২৪
মুহাম্মদ ইবনু আ’লা (রহঃ) আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো এক যুদ্ধে আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে রওয়ানা করলাম। আমরা ছিলাম ছয়জন। আমাদের একটি মাত্র উট ছিল। পালাক্রমে আমরা এর পিঠে আরোহণ করতাম। (হেঁটে হেঁটে) আমাদের পা ফেটে যায়। আমার পা দুখানাও ফেটে গেল, খসে পড়ল নখগুলো। এ কারণে আমরা আমাদের পায়ে নেকড়া জড়িয়ে বাঁধলাম। এ জন্য এ যুদ্ধকে যাতুর রিকা যুদ্ধ বলা হয়। কেননা আমরা আমাদের পায়ে নেকড়া দ্বারা পট্টি বেঁধেছিলাম। আবূ মূসা (রাঃ) উক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি এ ঘটনা বর্ণনা করাকে অপছন্দ করেন। তিনি বলেন, আমি এভাবে বর্ণনা করাকে ভাল মনে করিনা। সম্ভবতঃ তিনি তার কোন আমল প্রকাশ করাকে অপছন্দ করতেন।
হাদিস নং - ৩৮২৫
কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) সালিহ্ ইবনু খাওয়াত (রাঃ) এমন একজন সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যিনি যাতুর রিকার যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে সালাতুল (নামায) খাওফ আদায় করেছেন। তিনি বলেছেন, একদল লোক (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের জন্য) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে কাতারে দাঁড়ালেন এবং অপর দলটি রইলেন শত্রুর সম্মুখীন। এরপর তিনি তার সাথে দাঁড়ানো দলটি নিয়ে এক রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুকতাদিগণ তাদের সালাত (নামায/নামাজ) পুরা করে ফিরে গেলেন এবং শত্রুর সম্মুখে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালেন। এরপর দ্বিতীয় দলটি এলে তিনি তাদেরকে নিয়ে অবশিষ্ট রাকাত আদায় করে স্থির হয়ে বসে রইলেন। এবার মুকতাদিগণ তাদের নিজেদের সালাত (নামায/নামাজ) সম্পূর্ণ করলে তিনি তাদেরকে নিয়ে সালাম ফিরালেন। মুআয (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমরা নাখল নামক স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে ছিলাম। এরপর জাবির (রাঃ) সালাতুল (নামায) খাওফের কথা উল্লেখ করেন। এ হাদীস সম্পর্কে ইমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন, সালাতুল (নামায) খাওফ সম্পর্কে আমি যত হাদিস শুনেছি এর মধ্যে এ হাদীসটই সবচেয়ে উত্তম। লাইস (রহঃ) কাসেম ইবনু মুহাম্মদ (রাঃ) থেকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাযওয়ায়ে বনূ আনমারে সালাতুল (নামায) খাওফ আদায় করেছেন। এই বর্ণনায় মুয়ায (রাঃ)-এর অনুসরণ করেছেন।
হাদিস নং - ৩৮২৬
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) সাহ্ল ইবনু আবূ হাসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন (সালাতুল (নামায) খাওফে) ঈমাম কেবলামুখী হয়ে দাঁড়াবেন। মুকতাদীদের একদল থাকবেন তাঁর সাথে। এবং অন্যদল শত্রুদের মুখোমুখী হয়ে তাদের মুকাবিলায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। তখন ইমাম তাঁর পেছনে একতেদাকারী লোকদের নিয়ে এক রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করবেন। এরপর একতেদাকারীগণ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে রুকূ ও দু’সিজদাসহ আরো এক রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে ঐ দলের স্থানে গিয়ে দাঁড়াবেন। এরপর তারা এসে একতেদা করার পর ইমাম তাদের নিয়ে আরো এক রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করবেন। এভাবে ইমামের দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) পূর্ণ হয়ে যাবে। এরপর মুকতাদিগণ রুকূ সিজদাসহ আরো এক রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করবেন।
হাদিস নং - ৩৮২৭
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) সাহ্ল ইবনু আবূ হাসমা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৮২৮
মুহাম্মদ (রহঃ) উবায়দুল্লাহ (রহঃ) সাহল (রাঃ) থেকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর (পূর্ব বর্ণিত) হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিস নং - ৩৮২৯
আবূল ইয়ামান (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে নাজদ এলাকায় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছি। এ যুদ্ধে আমরা শত্রুদের মুকাবিলা করেছিলাম এবং তাদের সামনে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।
হাদিস নং - ৩৮৩০
মূসা’দ্দাদ (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সৈন্যদেরকে দু’দলে বিভক্ত করে) একদল সাথে নিয়ে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন। অন্যদলকে নিয়োজিত রেখেছেন শত্রুর মোকাবেলায়। তারপর (যে দল তাঁর সংগে এক রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন) তাঁর শত্রুর মুকাবিলায় নিজ সাথীদের স্থানে চলে গেলেন। অন্যদল (যারা শত্রুর মুকাবিলায় দাঁড়িয়েছিলেন) চলে আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিয়ে এক রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে সালাম ফিরালেন। এরপর তাঁরা তাদের বাকি আরেক রাকাত আদায় করলেন এবং শত্রুর মুকাবিলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। এবার পুর্বের দলটি এসে নিজেদের অবশিষ্ট রাকাতটি আদায় করলেন।
হাদিস নং - ৩৮৩১
আবূল ইয়ামান (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নাজ্দ এলাকায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। (অন্য এক সনদে) ইসমাঈল (রহঃ) জাবির ইবনু ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নাজ্দ এলাকায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করলে তিনিও তাঁর সাথে প্রত্যাবর্তন করলেন। পথিমধ্যে কাঁটা গাছ ভরা এক উপত্যকায় মধ্যাহ্নের সময় তাঁদের ভীষণ গরম অনুভূত হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানেই অবতরণ করলেন। লোকজন সবাই ছায়াবান গাছের খোঁজে কাঁটাবনের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বাবলা গাছের নিচে অবস্থান করে তরবারিখানা গাছে ঝুলিয়ে দিলেন। জাবির (রাঃ) বলেন, সবেমাত্র আমরা নিদ্রা গিয়েছি। এমতাবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ডাকতে আরম্ভ করলেন। আমরা সকলেই তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। তখন তাঁর কাছে এক বেদুঈন বসা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি নিদ্রিত ছিলাম, এমতাবস্থায় সে আমার তরবারিখানা হস্তগত করে কোষমুক্ত অবস্থায় তা আমার উপর উচিয়ে ধরলে আমি জাগ্রত হই। তখন সে আমাকে বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে কে? আমি বললাম, আল্লাহ! দেখ না, এ-ই তো সে বসা আছে। (এ জঘন্যতম অপরাধের পরও) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোনো প্রকার শাস্তি প্রদান করেননি। (অপর এক সনদে) আবান (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যাতুর রিকার যুদ্ধে আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা একটি ছায়াবান বৃক্ষের কাছে গিয়ে পৌঁছলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আরামের জন্য আমরা তা ছেড়ে দিলাম। এমন সময় এক মুশরিক ব্যাক্তি এসে গাছের সাথে ঝুলানো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর তরবারীখানা হাতে নিয়ে তা তাঁর উপর উঁচিয়ে ধরে বলল, তুমি আমাকে ভয় পাও কি? তিনি বললেন, না। এরপর সে বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে কে? তিনি বললেন, আল্লাহ। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণ তাকে ধমক দিলেন। এরপর সালাত (নামায/নামাজ) আরম্ভ হলে তিনি মুসলমানদের একটি দলকে নিয়ে দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। তারা এখান থেকে হটে গেলে অপর দলটি নিয়ে তিনি আরো দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। এভাবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হল চার রাকাত এবং সাহাবীদের হল দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ)। (অন্য এক সূত্রে) মূসা’দ্দাদ (রহঃ) আবূ বিশ্র (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি যে লোকটি তলোয়ার উঁচু করেছিল তার নাম হল গাওরাস ইবনু হারিস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযানে খাসাফার বংশধর মুহারিব গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। আবূ যুবায়র (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, নাখল নামক স্থানে আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে ছিলাম। তিনি এ সময় সালাতুল (নামায) খাওফ আদায় করেছেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, নাজদের যুদ্ধে আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সালাতুল (নামায) খাওফ আদায় করেছি। আবূ হুরায়রা খায়বার যুদ্ধের সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৮৩২
কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রাঃ) ইবনু মুহায়রীয (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি মসজিদে প্রবেশ করে আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ)-কে দেখতে পেয়ে তার কাছে গিয়ে বসলাম এবং তাকে আযল১ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বললেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে বানূ মুসতালিকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এ যুদ্ধে আরবের বহু বন্দী আমাদের হস্তগত হয়। মহিলাদের প্রতি আমাদের মনে খায়েস হল এবং বিবাহ-শাদী ব্যতীত এবং স্ত্রীহীন আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। তাই আমরা আয্ল করা পছন্দ করলাম এবং তা করার মনস্থ করলাম। তখন আমরা বলাবলি করতে লাগলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে বিদ্যমান। এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস না করেই আমরা আযল করতে যাচ্ছি। আমরা তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এরুপ না করলে তোমাদের ক্ষতি কি? জেনে রাখ, কিয়ামত পর্যন্ত যতগুলো প্রাণের আগমন ঘটবার আছে, ততগুলোর আগমন ঘটবেই।
হাদিস নং - ৩৮৩৩
মাহমূদ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাজদের যুদ্ধে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে অংশগ্রহণ করেছি। কাঁটা গাছে ভরা উপত্যকায় প্রচন্ড গরম লাগলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নিচে অবতরণ করে তার ছায়ায় আশ্রয় নিলেন এবং তরবারিখানা (গাছের সাথে) ঝুলিয়ে রাখলেন। সাহাবীগণ সকলেই গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লেন। আমরা এ অবস্থায় ছিলাম, হঠাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ডাকলেন। আমরা এ অবস্থায় ছিলাম, হঠাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ডাকলেন। আমরা তাঁর নিকটে গিয়ে দেখলাম, এক বেদুঈন তাঁর সামনে বসে আছে। তিনি বললেন, আমি ঘুমিয়েছিলাম। এমন সময় সে আমার কাছে এসে আমার তরবারিখানা নিয়ে উঁচিয়ে ধরল। ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি দেখলাম, সে মুক্তু কৃপাণ হস্তে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলছে, এখন তোমাকে আমাড় ঠেকে কে রক্ষা করবে? আমি বললাম, আল্লাহ। ফলে সে তরবারিখানা খাপে ঢুকিয়ে বসে যায়। সে তো এ-ই ব্যাক্তি। বর্ণনাকারী জাবির (রাঃ) বলেন, (এ ধরণের অপরাধ করা সত্ত্বেও) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোনো প্রকার শাস্তি প্রদান করেননি।
হাদিস নং - ৩৮৩৪
আদম (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আনমার যুদ্ধে সাওয়ারীতে আরোহণ করে মুশরিকদের দিকে মুখ করে নফল সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে দেখেছি।
হাদিস নং - ৩৮৩৫
আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) উরওয়া ইবনু যুবায়র, সাঈদ ইবনু মুস্যায়িব, আলকামা ইবনু ওয়াক্কাস ও উবায়দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবা ইবনু মাসউদ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিনী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, যখন অপবাদ রটনাকারিগণ তাঁর প্রতি অপবাদ রটিয়েছিল।। রাবী যুহরী (রহঃ) বলেন, তারা প্রত্যেকেই হাদীসটির অংশবিশেষ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি স্মরণ রাখা ও সঠিকভাবে বর্ণনা করার করার ক্ষেত্রে তাদের কেউ কেউ অন্যের চেয়ে অধিকতর অগ্রগামী ও নির্ভরযোগ্য। আয়িশা (রাঃ) সম্পর্কে তারা আমার কাছে যা বর্ণনা করেছেন আমি তাদের প্রত্যেকের কথাই যাথাযথভাবে স্মরণ রেখেছি। তাদের একজনের বর্ণিত হাদীসের অংশবিশেষ অপরের বর্ণিত হাদীসের অংশবিশেষের সত্যতা প্রমাণ করে। যদিও তাদের একজন অন্যজনের চেয়ে অধিক স্মৃতিশক্তির অধিকারী। বর্ণনাকারীগণ বলেন, আয়িশা (রাঃ) বলেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরের ইচ্ছা করতেনতখন তিনি তাঁর স্ত্রীগণের (নামের জন্য) কোরা ব্যবহার করতেন। এতে যার নাম আসত তাকেই তিনি সাথে করে সফরে বের হতেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এমনি এক যুদ্ধে (মুরায়সীর যুদ্ধ) তিনি আমাদের মাঝে কোরা ব্যবহার করেন এবং এতে আমার নাম বেরিয়ে আসে। তাই আমই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে সফরে বের হলাম। এ ঘটনাটি পর্দার হুকুম নাযিল হওয়ার পর সংঘটিত হয়েছিল। তখন আমাকে হাওদাজ সহ সাওয়ারীতে উঠানো ও নামানো হত। এমনি করে আমরা চলতে থাকলাম। অবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এ যুদ্ধ থেকে অবসর হলেন, তখন তিনি (বাড়ির দিকে) ফিরলেন। ফেরার পথে আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলে তিনি একদিন রাতের বেলা রওয়ানা হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। রওয়ানা হওয়ার ঘোষনা দেওয়ার পর আমি উঠলাম এবং (প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য) পায়ে হেঁটে সেনাছাউনি অতিক্রম করে (একটু সামনে) গেলাম। এরপর প্রয়োজন সেরে আমি আমার সাওয়ারীর কাছে ফিরে এসে বুকে হাত দিয়ে দেখলাম যে, (ইয়ামানের অন্তর্গত) ফিফার শহরের পুতি দ্বারা তৈরি করা আমার গলার হারটি ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গিয়েছে। হার তালাশ করতে করতে আমার আসতে বিলম্ব হয়ে যায়। আয়িশা (রাঃ) বলেন, যে সমস্ত লোক উটের পিঠে আমাকে উঠিয়ে দিতেন তারা এসে আমার হাওদাজ উঠিয়ে তা আমার আমার উটের পিঠে তুলে দিতেন যার উপর আমি আরোহণ করতাম। তারা মনে করেছিলেন যে, আমি এর মধ্যেই আছি, কারণ খাদ্যাভাবে মহিলাগণ তখন খুবই হালকা পাতলা হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের দেহ মাংসল ছিল না। তাঁরা খুবই স্বল্প পরিমাণে খাবার খেতে পেত। তাই তারা যখন হাওদাজ উঠিয়ে উপরে রাখেন খন তা হালকা হওয়ায় বিষয়টিকে কোনো প্রকার অস্বভাবিক মনে করেননি। অধিকন্তু আমি ছিলাম একজন অল্প বয়স্কা কিশোরী। এরপর তারা উট হাঁকিয়ে নিয়ে চলে যায়। সৈন্যদল রওয়ানা হওয়ার পর আমি আমার হারটি খুঁজে পাই এবং নিজস্ব স্থানে ফিরে এসে দেখি তাঁদের (সৈন্যদের) কোনো আহবায়ক এবং কোনো উত্তরদাতা ওখানে নেই। (নিরুপায় হয়ে) তখন আমি পূর্বে যেখানে ছিলাম সেখানে বসে রইলাম। ভাবছিলাম, তাঁরা আমাকে দেখতে না পেলে অবশ্যই আমার কাছে ফিরে আসবে। ঐ স্থানে বসে থাকা অবস্থায় ঘুম চেপে আসলে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। বানূ সুলামী গোত্রের যাকওয়ান শাখার সাফওয়ান ইবনু মুয়াত্তাল (রাঃ) [যাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফেলে যাওয়া আসবাবপত্র কুড়িয়ে নেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। ] সৈন্যদল চলে যাওয়ার পর সেখানে ছিলেন। তিনি প্রত্যূষে আমার অবস্থানস্থলের কাছে পৌঁছে একজন ঘুমন্ত মানুষ দেখে আমার দিকে তাকানোর পর আমাকে চিলে ফেললেন। তিনি আমাকে দেখেছিলেন পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে। তিনি আমাকে চিনতে পেরে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়লে আমি তা শুনতে পেয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম এবং চাঁদর টেনে আমার চেহারা ঢেকে ফেললাম। আল্লাহর কসম! আমি আর কথা বলিনি এবং তাঁর থেকে ইন্নালিল্লাহ পাঠ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাইনি। এরপর তিনি সওয়ারী থেকে অবতরন করলেন এবং সওয়ারীকে বসিয়ে তার সামনের পা নিচু করে দিলে আমি গিয়ে তাতে আরোহণ করলাম। পরে তিনি আমাকে সহ সওয়ারীকে টেনে আগে আগে চলতে লাগলেন, পরিশেষে ঠিক দ্বিপ্রহরে প্রচন্ড গরমের সময় আমরা গিয়ে সেনাদলের সাথে মিলিত হলাম। সে সময় তাঁরা একটি জায়গায় অবতরণ করছিলেন।। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এরপর যাদের ধ্বংস হওয়ার ছিল তারা (আমার প্রতি অপবাদ আরোপ করে) ধ্বংস হয়ে গেল। তাদের মধ্যে এ অপবাদ আরোপের ব্যপারে যে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল সে হল আবদুল্লাহ ইবনু উবায় ইবনু সুলূল। বর্ণনাকারী উরওয়া (রাঃ) আর বর্ণনা করেছেন যে, অপবাদ আরোপকারী ব্যাক্তিদের মধ্যে হাসান ইবনু সাবিত, মিসতাহ ইবনু উসাসা এবং হামনা বিনত জাহাশ (রাঃ) ব্যতীত আর কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। তারা গুটিকয়েক ব্যাক্তির একটি দল ছিল, এতটুকু ব্যতীত তাদের সম্পর্কে আমার আর কিছু জানানেই। যেমন আল কুরআনে মহান আল্লাহ পাক বলেছেন , এ ব্যপারে যে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তাকে আবদুল্লাহ ইবনু উবায় ইবনু সুলূল বলে ডাকা হয়ে থাকে। বর্ণনাকারী উরওয়া (রাঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) এর ব্যপারে হাসান ইবনু সাবিত (রাঃ)-কে গালমন্দ করাকে পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, হাসান ইবনু সাবিত তো ঐ ব্যাক্তি যিনি তার এক কবিতায় বলেছেন, আমার মান সম্মান এবং আমার বাপ দাদা মুহাম্মদ এর মান সম্মান রক্ষায় নিবেদিত। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এরপর আমরা মদিনায় আসলাম। মদিনায় আগমণ করার একমাস পর্যন্ত আমি অসুস্থ থাকলাম। এদিকে অপবাদ রটনাকারীদের কথা নিয়ে লোকদের মধ্যে আলোচনা ও চর্চা হতে লাগলো। কিন্তু এসবের কিছুই আমি জানিনা। তবে আমার সন্দেহ হচ্ছিল এবং তা আরো দৃঢ় হচ্ছিল আমার এ অসুখের সময়। কেননা এর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যেরুপ স্নেহ ভালবাসা লাভ করতাম আমার এ অসুখের সময় তা আমি পাচ্ছিলাম না। তিনি আমার কাছে এসে সালাম করে কেবল “তুমি কেমন আছ” জিজ্ঞাসা করে চলে যেতেন। তাঁর এ আচরণই আমার মনে চরম সন্দেহের উদ্রেক করে। তবে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাইরে বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ জঘন্য অপবাদ সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। উম্মে মিসতাহ (রাঃ) একদা আমার সাথে টয়লেটের দিকে বের হন। আর প্রকৃতির ডাকে আমাদের বের হওয়ার অবস্থা এই ছিলে যে, এক রাতে বের হলে আমরা আবার পরের রাতে বের হতাম। এ ছিল আমাদের ঘরের পার্শ্বে পায়খানা তৈরি করার পূর্বের ঘটনা। আমাদের অবস্থা প্রাচীন আরবীয় লোকদের অবস্থার মত ছিল। তাদের মত আমরাও পায়খানা করার জন্য ঝোঁপঝাড়ে চলে যেতাম। এমনকি (অভ্যাস না থাকার কারণে) বাড়ির পার্শ্বে পায়খানা তৈরি করলে আমরা খুব কষ্ট পেতাম। আয়িশা (রাঃ) বলেন, একদা আমি এবং উম্মে মিসতাহ (যিনি ছিলেন আবূ রুহম ইবনু মুত্তালিব ইবনু আবদে মুনাফের কন্যা, যার মা সাখার ইবনু আমির-এর কন্যা ও আবূ বকর সিদ্দীকের খালা এবং মিসতাহ ইবনু উসাসা ইবনু আব্বাদ ইবনু মুত্তালিব যার পুত্র) একত্রে বের হলাম। আমরা আমাদের কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে উম্মে মিসতাহ তার কাপড়ে জড়িয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে বললেন, মিসতাহ ধ্বংস হোক! আমি তাকে বললাম, আপনি খুব খারাপ কথা বলেছেন। আপনি কি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্যাক্তিকে গালি দিচ্ছেন? তিনি আমাকে বললেন, ওগো অবলা, সে তোমার সম্পর্কে কি বলে বেড়াচ্ছে তুমি তো তা শুনোনি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, সে আমার সম্পর্কে কি বলছে? তখন তিনি অপবাদ রটনাকারীদের কথাবার্তা সম্পর্কে আমাকে আমাকে জানালেন। আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, এরপর আমার পুরোনো রোগ আরো বেড়ে গেল। আমি বাড়ি ফেরার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসলেন এবং সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কেমন আছ? আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা-মাতার কাছে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক খবর জানতে চাচ্চিলাম, তাই আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বললাম আপনি কি আমাকে আমার পিতা-মাতার কাছে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিবেন? আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অনুমতি দিলেন। তখন (বাড়িতে গিয়ে) আমি আমার আম্মাকে বললাম্ আম্মাজানো, লোকজন কি আলোচনা করছে? তিনি বললেন, বেটি এ বিষয়টিকে হালকা করে ফেল। আল্লাহর কসম, সতীন আছে এমন স্বামী সোহাগিনী সুন্দরী রমণীকে তাঁর সতীনরা বদনাম করবে না, এমন খুব কমই হয়ে থাকে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি বিস্ময়ের সাথে বললাম, সুবাহানাল্লাহ! লোকজন কি এমন গুজবই রটিয়েছে। আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেন রাতভর আমি কাঁদলাম। কাঁদতে কাঁদতে ভোর হয়ে গেল। এর মধ্যে আমার অশ্রুও বন্ধ হল না এবং আমি ঘুমাতেও পারলাম না। এরপর ভোরবেলাও আমি কাঁদছিলাম। তিনি আরো বলেন যে, এ সময় ওহী নাযিল হতে বিলম্ব হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর (আমার) বিচ্ছেদের বিষয়টি সম্পর্কে পরামর্শ ও আলোচনা করার নিমিত্তে আলী ইবনু আবূ তালিব এবং উসামা ইবনু যায়েদ (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, উসামা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের পবিত্রতা এবং তাদের প্রতি (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জির) ভালবাসার কারণে বললেন, (হে আল্লাহর রাসূল)তাঁরা আপনার স্ত্রী, তাদের সম্পর্কে আমি ভাল ছাড়া আর কিছুই জানিনা। আর আলী (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল , আল্লাহ তো আপনার জন্য সংকীর্ণতা রাখেননি। তাঁকে (আয়িশা) ব্যতীত আরো বহু মহিলা রয়েছে। তবে আপনি এ ব্যাপারে দাসী [বারীরা (রাঃ)]-কে জিজ্ঞাসা করুন। সে আপনার কাছে সত্য কথাই বলবে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারীরা (রাঃ)-কে ডেকে বললেন, হে বারীরা, তুমি তাঁর মধ্যে কোনো সন্দেহমূলক আচরণ দেখেছ কি? বারীরা (রাঃ) তাঁকে বললেন, সেই আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য বিধানসহ পাঠিয়েছেন, আমি তার মধ্যে কখনো এমন কিছু দেখিনি যার দ্বারা তাঁকে দোষী বলা যায়। তবে তাঁর ব্যপারে শুধু এতটুকু বলা যায় যে, তিনি হলেন অল্প বয়স্কা যুবতী, রুটি তৈরী করার জন্য আটা খামির করে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। আর বকরী এসে অমনি তা খেয়ে ফেলে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে উঠে গিয়ে মিম্বরে বসে আবদুল্লাহ ইবনু উবায়-এর ক্ষতি থেকে রক্ষার আহবান জানিয়ে বলেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়, যে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অপবাদ ও বদনাম রটিয়ে আমাকে কষ্ট দিয়েছে তার এ অপবাদ থেকে আমাকে কে মুক্তু করবে? আল্লাহর কসম, আমি আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভাল ছাড়া আর কিছুই জানিনা। তার তাঁরা (অপবাদ রটনাকারীরা) এমন এক ব্যাক্তির (সাফওয়ান ইবনু মু’আত্তাল) নাম উল্লেখ করছে যার সম্বন্ধেও আমি ভাল ছাড়া আর কিছুই জানিনা। সে তো আমার সাথেই আমার ঘরে যায়। আয়িশা (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) বনী আবদুল আশহাল গোত্রের সা’দ ইবনু মুআয) (রাঃ) উঠে বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনাকে এ অপবাদ থেকে মুক্তি দেব। সে যদি আউস গোত্রের লোক হয় তা হলে তার শিরচ্ছেদ করব। আর যদি সে আমাদের ভাই খাযরাজের লোক তাহলে তার তাহলে তার ব্যাপারে আপনি যা বলবেন তাই পালন করব। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ সময় হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর মায়ের চাচাতো ভাই খাযরাজ গোত্রের সর্দার সাঈদ ইবনু উবাদা (রাঃ) দাঁড়িয়ে এ কথার প্রতিবাদ করলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ এ ঘটনার পূর্বে তিনি একজন সৎ এবং নেককার লোক ছিলেন। কিন্তু (এ সময়) গোত্রীয় অহমিকায় উত্তেজিত হয়ে তিনি সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ)-কে বললেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। আল্লাহর কসম, তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তাকে হত্যা করার ক্ষমতাও তোমার নেই। যদি সে তোমার গোত্রের লোক হত তাহলে তুমি তার হত্যা হওয়া কখনো পছন্দ করতে না। তখন সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) এর চাচাতো ভাই উসাঈদ ইবনু হুযাইর (রাঃ) সা’দ ইবনু ওবায়দা (রাঃ)- কে বললেন, বরং তুমই মিথ্যা কথা বললে। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি হলে মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ অবলম্বন করে কথা বলছ। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ সময় আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্র খুব উত্তেজিত হয়ে উঠে। এমনকি তারা যুদ্ধের সংকল্প পর্যন্ত করে বসে। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের থামিয়ে শান্ত করলেন এবং নিজেও চুপ হয়ে গেলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি সেদিন সারাক্ষণ কেঁদে কাটালাম। ওশ্রুঝরা আমার বন্ধ হয়নি এবং একটু ঘুম ও আমার আসেনি। তিনি বলেন, আমি ক্রন্দনরত ছিলাম আর আমার পিতা-মাতা আমার পার্শ্বে বসা ছিলেন। এমনি করে একদিন দুই রাত কেঁদে কেঁদে কাটিয়ে দেই। এর মাঝে আমার কোন ঘুম আসেনি। বরং অবারিত ধারায় আমার চোখ থেকে অশ্রুপাত হতে থাকে। মনে হচ্ছিল যেন, কান্নার ফলে আমার কলিজা ফেটে যাবে। আমি ক্রন্দনরত ছিলাম আর আমার আব্বা-আম্মা আমার পাশে বসা ছিলেন। এমতাবস্থায় একজন আনসারী মহিলা আমার কাছে আমার কাছে আসার অনুমতি চাইলে আমি আমি তাকে আসার অনুমতি দিলাম। সে এসে বসল এবং আমার সাথে কাঁদতে আরম্ভ করল। তিনি বলেন, আমরা ক্রন্দনরত ছিলাম ঠিক এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এসে সালাম করলেন এবং আমাদের পাশে বসে গেলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, অপবাদ রটানোর পর আমার কাছে এসে এভাবে তিনি আর কখনো বসেননি। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ একমাস কাল অপেক্ষা করার পরও আমার বিষয়ে তাঁর নিকট কোনো ওহী আসেনি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, বসার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালিমা শাহাদাত পাঠ করলেন। এরপর বললেন, যা হোক আয়িশা তোমার সম্বন্ধে আমার কাছে অনেক কথাই পৌঁছেছে, যদি তুমি এর থেকে মুক্ত হও তাহলে শীঘ্রই আল্লাহ তোমাকে এ অপবাদ থেকে মুক্ত করে দেবেন। আর যদি তুমি কোনো গুনাহ করে থাক তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তওবা কর। কেননা বান্দা গুনাহ স্বীকার করে তওবা করলে আল্লাহ তা’আলা তওবা কবুল করেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা বলে শেষ করলে আমার অশ্রুপাত বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি এক ফোঁটা অশ্রুও আমি আর অনুভব করলাম না। তখন আমি আমার আব্বাকে বললাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন আমার পক্ষ থেকে আপনি তার জবাব দিন। তখন আমার আব্বা বললেন, আল্লাহর কসম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কি জবাব দিব আমি তা জানিনা। তখন আমি আমার আম্মাকে বললাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন আমার পক্ষ থেকে আপনি তার জবাব দিন। তখন আমার আম্মা বললেন, আল্লাহর কসম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কি জবাব দিব আমি তা জানিনা। তখন আমি ছিলাম অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআনও বেশি পড়তে পারতাম না। তথাপিও এ অবস্থা আমি নিজেই বললাম, আমি জানি আপনারা এ অপবাদের ঘটনা শুনেছেন, আপনারা তা বিশ্বাস করেছেন এবং বিষয়টি আপনাদের মনে সুদৃঢ় হয়ে আছে। এখন যদি আমি বলি যে, এর থেকে আমি পবিত্র এবং আমি নিষ্কলুস তাহলে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি এ অপরাধের কথা স্বীকার করে নেই যা সম্পর্কে আমার আল্লাহ জানেন যে, আমি এর থেকে পবিত্র, তাহলে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন। আল্লাহর কসম, আমি ও আপনারা যে অবস্থার স্বীকার হয়েছি এর জন্য (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )ইউসুফ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিতার কথার উদাহরণ ব্যতীত আমি আর কোনো উদাহরণ খুঁজে পাচ্ছিনা। তিনি বলেছিলেনঃ “সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ, সে বিষয়ে আল্লাহই একমাত্র আমার আশ্রয়স্থল”। এরপর আমি মুখ ফিরিয়ে আমার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। আল্লাহ তা’আলা জানেন যে, সে মূহুর্তে আমি পবিত্র। অবশ্যই আল্লাহর আমার পবিত্রতা প্রকাশ করে দেবেন (এ কথার প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল) তবে আল্লাহর কসম, আমি কখনো ধারণা করিনি যে, আমার ব্যাপারে আল্লাহ ওহী নাযিল করবেন যা পঠিত হবে। আমা ব্যাপারে আল্লাহ কোনো কথা বলবেন আমি নিজেকে এতখানি যোগ্য মনে করিনি বরং আমি নিজেকে এর চেয়ে অধিক অযোগ্য বলে মনে করতাম। তবে আমি আশা করতাম যে, হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এমন স্বপ্ন দেখানো হবে যার দ্বারা আল্লাহ আমার পবিত্রতা প্রকাশ করে দেবেন। আল্লাহর কসম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনো তাঁর বসার জায়গা ছাড়েননি এবং ঘরের লোকদের থেকেও কেউ ঘর থেকে বাইরে যাননি। এমতাবস্থায় তাঁর উপর ওহী নাযিল হতে শুরু হল। ওহী নাযিল হওয়ার সময় তাঁর যে বিশেষ কষ্ট হত তখনও সে অবস্থা তাঁর হল। এমনকি প্রচন্ড শীতের দিনেও তাঁর দেহ থেকে মোতির দানার মত বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ত ঐ বানীর গুরুভারের কারণে, যা তাঁর প্রতি নাযিল করা হয়েছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এ অবস্থা দূরীভূত হলে তিনি হাসিমুখে প্রথমে যে কথাটি বললেন, তা হল, হে আয়িশা! আল্লাহ তোমার পবিত্রতা জাহির করে দিয়েছেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন্, এ কথা শুনে আমার আম্মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর। আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি এখন তাঁর দিকে উঠে যাব না। মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কারো প্রশংসা আমি করব না। আয়িশা (রাঃ) বললেন, আল্লাহ (আমার পবিত্রতা ঘোষনা করে) যে দশটি আয়াত নাযিল করেছেন, তাহল এই, “যারা এ অপবাদ রটনা করেছে (তারা তো তোমাদেরই একটা দল; এ ঘটনাকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এও তোমাদের জন্য কল্যানকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে তাদের কৃত পাপকর্মের ফল এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে তার জন্য আছে কঠিন শাস্তি। এ কথা শোনার পর মু’মিন পুরুষ এবং নারীগণ কেন নিজেদের বিষয়ে সৎ ধারণা করেনি এবং বলেনি, এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ। তারা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, সেহেতু তারা আল্লাহর বিধানে মিথ্যাবাদী। দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমরা যাতে লিপ্ত ছিলে তার জন্য কঠিন শাস্তি তোমাদেরকে স্পর্শ করত। যখন তোমরা মুখে মুখে এ মিথ্যা ছাড়াচ্ছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করছিলে যার কোনো জ্ঞান তোমাদের ছিলনা এবং একে তোমরা তুচ্ছ ব্যাপার বলে ভাবছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিল খুবই গুরুতর ব্যাপার। এবং এ কথা শোনামাত্র তোমরা কেন বললে না যে, এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের জন্য উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র, মহান! এ তো এক গুরুতর অপবাদ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাকো তাহলে কখনো অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে না, আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতের মর্মন্তুদ শাস্তি। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানোো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউই অব্যাহতি পেত না। আল্লাহ দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। (২৪:১১-২০) এরপর আমার পবিত্রতা ঘোষণা করে আল্লাহ এ আয়াতগুলো নাযিল করলেন। আত্মীয়তা এবং দারিদ্রের কারণে আবূ বকর সিদ্দিক (রাঃ) মিসতাহ ইবনু উসাসা কে আর্থিক ও বৈষয়িক সাহায্য করতেন। কিন্তু আয়িশা (রাঃ) সম্পর্কে তিনি যে অপবাদ রটিয়েছিলেন এ কারণে আবূ বকর সিদ্দিক (রাঃ) কসম করে বললেন, আমি আর কখনো মিসতাহকে আর্থিক কোনো সাহায্য করব না। তখন আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন – তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্থকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কে কিছুই দিবে না। তারা যেন তাদের কে ক্ষমা করে এবং তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। শোন! তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কে ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল; পরম দয়ালু! (২৪:২২) (এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর) আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলে উঠলেন হ্যাঁ, আল্লাহর কসম অবশ্যই আমি পছন্দ করি যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন। এরপর তিনি মিসতাহ (রাঃ) এর জন্য যে অর্থ খরচ করতেন তা পুনঃ দিতে আরম্ভ করলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তাঁকে এ অর্থ দেয়া আর কখনো বন্ধ করবনা। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমার এ বিষয় সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়নাব বিনত জাহাশ (রাঃ) কেও জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি যায়নাব (রাঃ)-কে বলেছিলেন, তুমি আয়িশা (রাঃ) সম্পর্কে কী জানো অথবা বলেছিলেন তুমি কি দেখেছ? তখন তিনি বলেছিলেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আমি আমার চোখ এবং কানকে সংরক্ষণ করেছি। আল্লাহর কসম! আমি তার সম্পর্কে ভাল ছাড়া আর কিছুই জানিনা। আয়িশা (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীগণের মধ্যে তিনি আমার সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে আল্লাহ ভীতির ফলে রক্ষা করেছেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, অথচ তাঁর বোন হামনা (রাঃ) তাঁর পক্ষ অবলম্বন করে অপবাদ রটনাকারীদের মত অপবাদ রটনা করে বেড়াচ্ছিলেন। ফলে তিনি ধ্বংসপ্রাপ্তদের সাথে ধ্বংস হয়ে গেলেন। বর্ণনাকারী ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, ঐ সমস্ত লোকের ঘটনা সম্পর্কে আমার কাছে যা পৌঁছেছে তা হল এইঃ উরওয়া (রাঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর কসম! যে ব্যাক্তি সম্পর্কে অপবাদ দেয়া হয়েছিল, তিনি এসব কথা শুনে বলতেন, আল্লাহ মহান! ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমি কোনো স্ত্রীলোকের কাপড় খুলেও কোনোদিন দেখিনি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, পরে তিনি আল্লাহর পথে শাহাদাত লাভ করেছিলেন।
হাদিস নং - ৩৮৩৬
আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, ওয়ালীদ ইবনু আবদুল মালিক (রহঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নিকট কি এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, আয়িশা (রাঃ)-এর প্রতি অপবাদ আরোপকারীদের মধ্যে আলী (রাঃ)-ও শামিল ছিলেন? আমি বললাম, না, তবে আবূ সালমা ইবনু আবদুর রহমান ও আবূ বকর ইবনু আবদুর রহমান ইবনু হারিস নামক তোমার গোত্রের দুই ব্যাক্তি আমাকে জানিয়েছে যে, আয়িশা (রাঃ) তাদের দু’জনকে বলেছেন যে, আলী (রাঃ) তার ব্যপারে সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ ছিলেন।
হাদিস নং - ৩৮৩৭
মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) আয়িশা (রাঃ)-এর মা উম্মে রুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও আয়িশা (রাঃ) বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় একজন আনসারী মহিলা প্রবেশ করে বলতে লাগল আল্লাহ অমুক অমুককে ধ্বংস করুন। এ কথা শুনে উম্মে রুমান (রাঃ) বললেন, তুমি কি বলছ? সে বলল, যারা অপবাদ রটিয়েছে তাদের মধ্যে আমার ছেলেও আছে। উম্মে রুমান (রাঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, কি শুনেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। আয়িশা (রাঃ) বললেন, আবূ বকরও শুনেছেন? সে বল, হ্যাঁ। এ কথা শুনে আয়িশা (রাঃ) বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। হুঁশ ফিরে আসার পর তাঁর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসল। এরপর আমি একটি চাঁদর দিয়ে তাঁকে ঢেকে দিলাম। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর কি অবস্থা? আমি বললাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাঁর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হয়তো সে অপবাদের ঘটনার কারণে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। এ সময় আয়িশা (রাঃ) উঠে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! (আমার পবিত্রতার ব্যাপারে) আমি যদি কসম করি, তাহলেও আপানারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না, আর যদি আমি ওযর পেশ করি তবুও আমার ওযর আপনারা কবূল করবেন না, আমার এবং আপনাদের উদাহরণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াকূব আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর ছেলেদের উদাহরণের মতই। তিনি বলেছিলেন, “ তোমরা যা বলেছ সে বিষয়ে আল্লাহই একমাত্র আমার সাহায্যস্থল”। উম্মে রুমান (রাঃ) বলেন, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কিছু না বলেই চলে গেলেন। এরপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর [আয়িশা (রাঃ)] পবিত্রতা বর্ণনা করে আয়াত নাযিল করলেন। আয়িশা (রাঃ) বললেন, একমাত্র আল্লাহরই প্রশংসা করি আর কারো না, আপনারও না।
হাদিস নং - ৩৮৩৮
ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে তিনি আয়াতাংশ “ইয তালকু’নাহু বিআলসিনাতিকুম” পড়তেন এবং বলতেন “আলওয়ালকু’” অর্থ “আলকিযবু”। ইবনু আবূ মুলায়কা (রহঃ) বলেছেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যা আয়িশা (রাঃ) অন্যদের তুলনায় বেশি জানতেন। কেননা এ আয়াত তারই ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল।
হাদিস নং - ৩৮৩৯
উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) হিশামের পিতা [উরওয়া (রাঃ)] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়িশা (রাঃ) এর সম্মুখে হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ)-কে গালি দিতে আরম্ভ করলে তিনি বললেন, তাঁকে গালি দিও না। কেননা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পক্ষ অবলম্বন করে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ) কবিতার মাধ্যমে মুশরিকদের নিন্দাবাদ করার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, তুমি কুরাইশদের নিন্দাসূচক কবিতা রচনা করলে আমার বংশ কে কি করে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আমি আপনাকে তাদের থেকে এমনিভাবে পৃথক করে রাখব যে, যেমনি ভাবে আটার খামির থেকে চুলকে পৃথক করে রাখা হয়। মুহাম্মদ (রহঃ) বলেছেন, উসমান ইবনু ফারকাদ (রহঃ) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আমি হিশাম (রহঃ)-কে তার পিতা উরওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ)-কে গালি দিয়েছি। কেননা তিনি ছিলেন, আয়িশা (রাঃ) এর প্রতি অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে অন্যতম।
No comments:
Post a Comment